গল্প : অপরিচিতা
নমুনা সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর
নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
সুমনের মা ভাবেন তার ছেলে অন্যদের সঙ্গে মিশলে বিপথে যাবে। তাই কলেজে পড়া ছেলেকে এখনো তিনি কলেজে নিয়ে যান, কোচিংয়ে নিয়ে যান। সারা দিন ছেলেকে চোখে চোখে রাখাই তার কাজ। মায়ের ধারণা, এভাবে সতর্ক দৃষ্টি না রাখলে ছেলে বখে যেতে পারে। তাই বিন্দুমাত্র ছাড় তিনি ছেলেকে দেন না। সেই ছেলে কয়েক দিন আগে বাসার আলমারি থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে। সুমনের মা ভেবে পান না এত যত্ন করেও ছেলেকে তিনি মানুষ করতে পারলেন না কেন?
ক) শম্ভুনাথ সেন বিয়ের কত দিন আগে অনুপমকে আশীর্বাদ করে যান?
খ) ‘বংশে তো কোনো দোষ নাই?’ উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
গ) উদ্দীপকের সুমনের মা কোন বিবেচনায় অনুপমের মায়ের অনুরূপ বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছেন? বিস্তারিত লেখ।
ঘ) সুমনের মায়ের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড ঠিক ছিল কি না- উক্তিটির সত্যাসত্য নির্ণয় করো।
উত্তর: ক) শম্ভুনাথ সেন বিয়ের ঠিক তিন দিন আগে অনুপমকে আশীর্বাদ করে যান।
খ) ‘বংশে তো কোনো দোষ নাই?’ অনুপমের মামার এ উক্তিটির মাধ্যমে অনুপমের বিয়ের জন্য নির্বাচিত পাত্রীর বয়স বেশি হওয়া প্রসঙ্গে মামার এ সন্দেহদ্যোতক অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে।
অনুপমের বন্ধু হরিশ অনুপমের বিয়ের জন্য এক পাত্রীর সন্ধান দেন। অনুপমের আসল অভিভাবক তার মামা যখন জানলেন, মেয়ের বয়স পনেরো, তখন সামান্য চিন্তিত হয়েছিলেন। কারণ সেকালের বিবেচনায় এ বয়স একটু বেশিই। বাল্যবিবাহের যুগে যে মেয়ের বয়স পনেরো তার নিশ্চয়ই বংশে কোনো দোষ থাকতে পারে। এ কারণেই হয়তো এ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না। আসলে বিষয়টি ছিল, মেয়ের বাবা যোগ্য বর পাচ্ছিলেন না আবার এত উচ্চমূল্যের যৌতুকও তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। এ কারণেই মেয়ের বয়স বাড়ছিল, বংশগত দোষের কিছু ছিল না।
আরো পড়ুন : অপরিচিতা গল্পের ৮টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা ১ম পত্র
গ) উদ্দীপকের সুমনের মা অতি সচেতনতা ও আত্মগৌরববাদী মানসিকতার দিক থেকে ‘অপরিচিতা’ গল্পে অনুপমের মায়ের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছেন।
‘অপরিচিতা’ গল্পে অনুপমের মা নিজের দারিদ্র্যের অতীত ভুলে গিয়েছিলেন অনুপমের বাবার সংসারে এসে। ওকালতি করে অনুপমের বাবা প্রচুর টাকা রেখে যান মৃত্যুর আগে। এসব নিয়ে অনুপমের মায়ের অহংকার ও গৌরব এত বেশি ছিল যে, ছেলেকে তিনি কোলে কোলে অর্থাৎ অতি যত্নে বড় করেছিলেন। সেই এমএ পাস ছেলে জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত মা-মামাকে ছাড়া নিতে পারেনি। মায়ের অতি আদরে আর সতর্কতায় অনুপম হয়েছিল অন্নপূর্ণার অকর্মণ্য পুত্র কার্তিকের মতো।
প্রায় অনুরূপ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, উদ্দীপকের সুমনের মার মধ্যেও। তিনিও ভেবেছেন ছেলেকে চোখে চোখে রাখতে হবে। হাতছাড়া করা যাবে না। সমাজের অন্য ছেলেরা নিশ্চয়ই তার ছেলের মতো ভালো পরিবারের সন্তান নয়। তার ছেলেকে এভাবে কড়া শাসনে রাখলেই ছেলে বড় কিছু হবে। নৈতিকতা, আত্মনির্ভরশীলতা, উপস্থিত বুদ্ধি, মানসিক বিকাশ, ন্যায়-অন্যায়বোধ প্রভৃতি শুধু কড়া শাসনের মাধ্যমে হয় না, এ বিষয়গুলো সুমনের মা কিংবা অনুপমের মা কারও অনুভূতিতে ছিল না। উভয় মা সন্তানকে অতিরিক্ত শাসন বা আদর দিয়ে নৈতিক অনুভূতিশূন্য অপদার্থে পরিণত করেছিলেন।
ঘ) সুমনের মায়ের উদ্দেশ্য মহৎ হলেও পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড ঠিক ছিল না; কারণ তিনি ছেলেকে বাস্তব জ্ঞানী ও নৈতিক গুণের অধিকারী হওয়ার অনুপ্রেরণা দেননি।
বাবা-মার শাসন, পারিবারিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা অর্জনে সন্তানদের সতর্কতার সঙ্গে বড় করতে হয়। তার মানে এই নয় বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানদের মেধা-বুদ্ধি-নৈতিকতা যাচাইয়ের জন্য একা ছাড়া যাবে না। মনে রাখতে হবে একটি পর্যায়ে সন্তানদের একাই জীবন পরিচালনা করতে হয়। বড় বা ভালো মানুষের বৈশিষ্ট্য নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করতে হয়। দুর্জন কখনো বড় বা ভালোর মাপকাঠিতে পড়ে না। আর এ কারণেই ‘অপরিচিতা’ গল্পে অনুপমকে বাস্তবচেতনাশূন্য ব্যক্তিত্বহীন অপদার্থে পরিণত করেছিলেন তার মা। অতি আদরে অপরিণত এক রক্ত-মাংসের মানুষ হয়েছিল সে। অবশ্য একপর্যায়ে সে তার ভুল বুঝে সত্যিকার মানুষ হওয়ার পথে ফিরে এসে প্রকৃত জীবনের স্বাদ পেয়েছিল।
কিন্তু উদ্দীপকের সুমনের পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহভাবে নৈতিকতা বিবর্জিত। কারণ মার চোখের সামনে সে ভালো থাকার ভান করলেও সে আসলে সুযোগ খুঁজছিল বখে যাওয়ার। লেখাপড়া, অতিআদর, চোখে চোখে রাখলে আপাত অর্থে সন্তানরা ভালো থাকলেও তাদের মধ্যে নৈতিকতাবোধ আদৌ গড়ে ওঠে কি না, তা সন্দেহের ব্যাপার। সে সন্দেহ বাস্তব রূপ নিল, যখন সুমন বাড়ির আলমারি থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে পালাল। অর্থাৎ সন্তানকে মানসিক দিক থেকে শক্তিশালী, ব্যক্তিত্ববান, নৈতিক হওয়ার শিক্ষা না দিতে পারলে বাবা-মার মহৎ উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হতে বাধ্য। এই ব্যর্থতারই শিকার সুমনের মা।
অতএব আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, শুধু সুমনের মা কেন, সব বাবা-মা-ই সন্তানকে বড়-ভালো-মহৎ দেখতে চান, তা যথার্থ তখনই হয়, যখন সন্তান নৈতিক ও বাস্তবচেতনায় বড় হয়ে ওঠে। শুধু বইয়ের পড়া, পরীক্ষার ভালো ফল দিয়ে, চোখে চোখে রেখে ভালো মানুষ সৃষ্টি সম্ভব নয়। বাবা-মা-শিক্ষকসহ সবার দায়িত্ব সন্তান ও শিক্ষার্থীকে মানসিক দিক থেকে প্রত্যয়ী, পরিচ্ছন্ন, উন্নত হওয়ার অনুপ্রেরণা দেওয়া। উদ্দীপকের সুমনের মা এখানেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক বাংলা
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর