তৃতীয় অধ্যায় : বল
(গত ২৭ অক্টোবর প্রকাশের পর)
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: গতির ওপর ঘর্ষণের প্রভাব ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কোনো বস্তুর গতির ওপর ঘর্ষণের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ঘর্ষণ হলো এক ধরনের বাধাদানকারী বল, যা বস্তুর গতিকে মন্থর করে। ঘর্ষণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক সমস্যা সৃষ্টি করলেও চলাচল ও যানবাহন চালনার জন্য ঘর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাস্তা ও টায়ারের পৃষ্ঠ প্রয়োজনমতো অমসৃণ করা হয় যাতে গাড়ি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। গতি নিয়ন্ত্রণে যে ব্রেক ব্যবহার করা হয় তা ঘর্ষণের নীতির ওপর কাজ করে।
প্রশ্ন: কোন ক্ষেত্রে স্থিতি ঘর্ষণ উৎপন্ন হয়, ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: দুটি তলের একটি অপরটির সাপেক্ষে গতিশীল না, তাই এদের মধ্যে স্থিতি ঘর্ষণ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ যখন কোনো একটি বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করা হয়, তখন যদি এ বল বস্তুর গতি সৃষ্টি করতে না পারে তাহলে স্থিতি ঘর্ষণ কাজ করে। যেমন- মেঝের ওপর অবস্থিত একটি ভারী বস্তুকে টানার পরও গতিশীল না হলে যে ঘর্ষণ বল উৎপন্ন হয় তাই স্থিতি ঘর্ষণ এবং গতি সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এ বল কাজ করে।
প্রশ্ন: প্রবাহী ঘর্ষণ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যখন কোনো তরল পদার্থ বা বায়বীয় পদার্থের গতিপথে কোনো স্থিরবস্তু রাখা হয় বা কোনো বস্তুকে তরল বা বায়বীয় পদার্থের মাঝ দিয়ে গতিশীল হতে হয় তখন উভয়ের মধ্যে এক ধরনের ঘর্ষণ উৎপন্ন হয়। এ ধরনের ঘর্ষণকে প্রবাহী ঘর্ষণ বলে। সাধারণত জাহাজ পানিতে চলার সময়ে বা বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসের মাঝ দিয়ে পড়ার সময়ে এই ধরনের ঘর্ষণের উৎপত্তি হয়।
প্রশ্ন: প্যারাসুটে কোন ধরনের ঘর্ষণ বল কাজ করে এবং তা কীভাবে ব্যবহার করা হয়? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্যারাসুট বায়ুর বাধাকে কাজে লাগিয়ে কাজ করে। এখানে বায়ুর বাধা হলো এক ধরনের প্রবাহী ঘর্ষণ বল, যা পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের বিপরীতে ক্রিয়া করে। খোলা অবস্থায় প্যারাসুটের বাইরের তলের ক্ষেত্রফল অনেক বেশি হওয়ায় বায়ুর বাধার পরিমাণও বেশি হয়, ফলে আরোহীর পতনের গতি অনেক হ্রাস পায়। ফলে আরোহী ধীরে ধীরে মাটিতে নিরাপদে নেমে আসে।
প্রশ্ন: চাকার ব্যবহারে কীভাবে ঘর্ষণ কমে, ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আমরা জানি, বিসর্প ঘর্ষণের তুলনায় আবর্ত ঘর্ষণের মান কম। এই উদ্দেশ্যে চাকা আবিষ্কৃত হয়। বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে চাকা লাগানো থাকে। চাকা হলো একটি সুকৌশল আবিষ্কার। চাকার বৃত্তাকার আকৃতি ঘর্ষণকে ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনে। সুটকেসে চাকা লাগানোর ফলে ঘর্ষণের মান কমে যায় এবং এটি টানা সহজতর হয়। অর্থাৎ চাকা লাগানোর ফলে আবর্ত ঘর্ষণের মান পিছলানো ঘর্ষণের তুলনায় অনেক কমে যায়।
প্রশ্ন: ‘বল-বেয়ারিং একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বল-বেয়ারিং ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন তলের মধ্যবর্তী ঘর্ষণকে আরও কমানো সম্ভবপর হয়েছে। বল-বেয়ারিং হলো ক্ষুদ্র, মসৃণ ধাতব বল। এগুলো সাধারণত ইস্পাতের তৈরি। বল-বেয়ারিং কোনো যন্ত্রের গতিশীল অংশগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে বসানো থাকে। বল-বেয়ারিংগুলোর ঘর্ষণের ফলে যন্ত্রের গতিশীল অংশগুলোর পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি ঘর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে না। অর্থাৎ তলগুলো একটি অপরটির ওপর দিয়ে পিছলানোর পরিবর্তে গড়িয়ে যায় এবং ঘর্ষণ কমে যায়।
আরো পড়ুন : বল অধ্যায়ের ৮টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, নবম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান
প্রশ্ন: গতি নিয়ন্ত্রণে ব্রেকিং বলের কার্যক্রম ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: যানবাহন চলাচলের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী যানবাহনের গতিকে বৃদ্ধি বা হ্রাস করতে হয়। অর্থাৎ যানবাহনের গতিকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে। ব্রেক হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা যা ঘর্ষণের পরিমাপ করে গাড়ির গতি তথা চাকার ঘূর্ণনকে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করে। এর মাধ্যমে যানবাহনকে নির্দিষ্ট স্থানে থামানো সম্ভবপর হয়। যখন গাড়ির চালক ব্রেক প্রয়োগ করেন, তখন এসবেস্টসের তৈরি সু বা প্যাড চাকায় অবস্থিত ধাতব চাকতিকে ধাক্কা দেয়। প্যাড ও চাকতির মধ্যবর্তী ঘর্ষণ চাকার গতিকে কমিয়ে দেয়। ফলে গাড়ির বেগ হ্রাস পায়।
প্রশ্ন: ঘর্ষণের অপকারিতাগুলো ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অতিরিক্ত ঘর্ষণের কারণে যানবাহন সহজে চলতে পারে না। যন্ত্রপাতির গতিশীল অংশগুলোর মধ্যে ঘর্ষণের ফলে এরা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ছিঁড়ে যায়। যেকোনো ধরনের যানবাহনকে অতিরিক্ত ঘর্ষণ অতিক্রম করতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করতে হয়। যার কারণে ঘর্ষণের ফলে জ্বালানির শক্তির অপচয় হয়, যা প্রধানত তাপশক্তিরূপে আবির্ভূত হয়। ঘর্ষণের ফলে শুধু যে শক্তি তাপে পরিণত হয় তাই নয়। এর ফলে ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যার কারণে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
প্রশ্ন: ঘর্ষণ হ্রাস করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ঘর্ষণের মূল কারণ হলো অমসৃণ তল। যেখানে একটির উঁচু উঁচু খাঁজ অন্যটিতে আটকে গিয়ে ঘর্ষণের উৎপত্তি ঘটায়। এ জন্য ঘর্ষণ হ্রাসের উদ্দেশে তল যথাসম্ভব মসৃণ করা হয়। এ কাজে তেল, মবিল এবং গ্রিজসহ অন্যান্য পিচ্ছিলকারী পদার্থ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া অমসৃণ তলগুলো যাতে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরের সংস্পর্শে না থাকে সে উদ্দেশে চাকা এবং বল বেয়ারিং ব্যবহার করা হয়।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল ঢাকা
কবীর