চতুর্থ অধ্যায় : পর্যায় সারণি
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: পর্যায় সারণি বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বিভিন্ন মৌলের ক্রমপরিবর্তন দেখানোর প্রয়াসে মৌলগুলোকে যে সারণিতে সাজানো হয়, তাকে পর্যায় সারণি বলা হয়। ১৭৮৯ সালে বিজ্ঞানী ল্যাভয়শিয়ে ভৌত অবস্থার ওপর ভিত্তি করে, ১৮৬৪ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন নিউল্যান্ড মৌলগুলোর ভর অনুযায়ী, ১৮৬৯ সালে রুশ বিজ্ঞানী ডিমিট্রি ম্যান্ডেলিফ পারমাণবিক ভর অনুসারে ও ১৯১৩ সালে বিজ্ঞানী হেনরি মোসলে পারমাণবিক সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে পর্যায় সারণি প্রস্তাব করেন, যা নানা পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে বর্তমান পর্যায় সারণির রূপ লাভ করেছে।
প্রশ্ন: পর্যায় বলতে কী বোঝায়? পর্যায় সারণিতে মোট কতটি পর্যায় রয়েছে?
উত্তর: পর্যায় সারণির আনুভূমিক সারিগুলোকে পর্যায় বলে। বর্তমান পর্যায় সারণিতে মোট ৭টি পর্যায় আছে। প্রতিটি পর্যায়ের মৌলগুলোর ধর্ম অভিন্ন তবে ক্রমপরিবর্তনশীল হয়। যেমন- একই পর্যায়ে যতই ডানদিক যাওয়া যায়, ততই মৌলগুলোর মধ্যে ধাতুর ধর্ম হ্রাস পায় ও পরমাণুর আকার ছোট হয়।
প্রশ্ন: শ্রেণি বা গ্রুপ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: পর্যায় সারণির লম্ব স্তম্ভ বা উল্লম্ব সারিগুলোকে শ্রেণি বলে। সদৃশ ধর্মের মৌলগুলো একটি শ্রেণিতে স্থান পায়। বর্তমান পর্যায় সারণিতে মোট ১৮টি গ্রুপ আছে। আগে পর্যায় সারণির এ ১৮টি গ্রুপকে রোমান হরফের সংখ্যা I থেকে VIII দিয়ে প্রকাশ করা হতো। সপ্তম শ্রেণির পরের শ্রেণিকে শূন্য শ্রেণি বলা হতো। আগের এ শ্রেণিকরণকে সর্বশেষ পর্যায় সারণির সংস্করণে ১৮টি গ্রুপে ভাগ করে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে যা, IUPAC কর্তৃক গৃহীত হয়েছে।
প্রশ্ন: ডোবেরাইনারের ত্রয়ীসূত্র কী?
উত্তর: রাসায়নিক ধর্মের সাদৃশ্য আছে এরকম তিনটি মৌলের মধ্যবর্তী মৌলটির পারমাণবিক ভর, অন্য দুটি মৌলের পারমাণবিক ভরের গড় মানের সমান হয়। যেমন- Li, Na এবং K মৌল তিনটির মধ্যে রাসায়নিক ধর্মের মিল আছে। কিন্তু সূত্রটি খুব কমসংখ্যক মৌলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ায় বিশেষ গুরুত্ব লাভ করতে পারেনি। এরপর ১৮৬৪ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী জন নিউল্যান্ড তার বিখ্যাত অষ্টক তত্ত্ব প্রকাশ করেন।
আরো পড়ুন : পর্যায় সারণি অধ্যায়ের ১৬টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এসএসসি পরীক্ষার রসায়ন
প্রশ্ন: নিউল্যান্ডের অষ্টক তত্ত্ব সম্পর্কে যা জানো লেখ?
উত্তর: মৌলগুলোকে ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ভর অনুসারে সাজালে কোনো একটি মৌলের ধর্মের সঙ্গে পরবর্তী অষ্টম মৌলের ধর্মের সাদৃশ্য দেখা যাবে। এটি অষ্টক তত্ত্ব নামে পরিচিত। যেমন: Li (7) Be (9.02) B (10.8) C(12) N(14) O(16) F(19) Na(23) Mg(24)|। এ ক্ষেত্রে Li থেকে শুরু করে অষ্টম মৌল Na-এর ধর্মের এবং Be থেকে শুরু করে অষ্টম মৌল Mg-এর ধর্মের সাদৃশ্য রয়েছে। এভাবে প্রথম দিকের কতগুলো মৌলের ক্ষেত্রে এ সূত্র প্রযোজ্য হলেও Ca(20) পরবর্তী মৌলগুলোর ক্ষেত্রে এ সূত্র খাটে না।
প্রশ্ন: ম্যান্ডেলিফের পর্যায় সূত্র সম্পর্কে যা জানো লেখ?
উত্তর: ১৮৬৯ সালে রাশিয়ান রসায়নবিদ ডিমিট্রি ম্যান্ডেলিফ আবিষ্কৃত মৌলগুলোর পারমাণবিক ভরকে ভিত্তি ধরে পর্যায় সারণিতে উচ্চক্রমানুসারে সাজিয়ে দেখেন একই ধর্মবিশিষ্ট মৌলগুলো একই কলামে স্থান পায়। তাই তিনি এভাবে সন্নিবেশিত মৌলগুলোর ক্ষেত্রে একটি সূত্র প্রতিষ্ঠা করেন। সূত্রটি ছিল ‘যদি মৌলগুলোকে ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক ভর অনুসারে সাজানো হয়, তবে তাদের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়।’ ১৯১৩ সালে বিজ্ঞানী হেনরি মোসলে পারমাণবিক সংখ্যা আবিষ্কারের পর ম্যান্ডেলিফ তার পর্যায় সূত্র সংশোধন করেন। ম্যান্ডেলিফের সংশোধিত পর্যায় সূত্র হলো, ‘মৌলগুলোর ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি তাদের পারমাণবিক সংখ্যা অনুসারে পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়।’ এ পর্যায় সূত্রটিই আধুনিক পর্যায় সারণির ভিত্তি। এ কারণে ম্যান্ডেলিফকে পর্যায় সারণির জনক বলা হয়।
প্রশ্ন: পর্যায় সারণির ভিত্তি সম্পর্কে যা জানো লেখ?
উত্তর: পর্যায় সারণি সৃষ্টির সময় মৌলগুলোর পারমাণবিক ভরকে ভিত্তি ধরা হয়েছিল। পরবর্তীতে পারমাণবিক সংখ্যাকে ভিত্তি ধরা হয়। বর্তমানে একথা স্বীকৃত যে পর্যায় সারণির সত্যিকার ভিত্তি হচ্ছে মৌলগুলোর ইলেকট্রন বিন্যাস। প্রতিনিধিত্বমূলক মৌলগুলোর ইলেকট্রন বিন্যাসে সর্বশেষ স্তরে যতটি ইলেকট্রন বিদ্যমান, তা থেকে পর্যায় সারণিতে মৌলটির অবস্থান কত নম্বর গ্রুপে তা হিসাব করা যায়। আর ইলেকট্রন বিন্যাসে যতটি স্তর আছে মৌলটির অবস্থান তত নম্বর পর্যায়ে।
প্রশ্ন: রাসায়নিক ক্রিয়াশীলতা সম্পর্কে যা জানো লেখ?
উত্তর: পর্যায় সারণির বামদিকের গ্রুপগুলোর উপর থেকে যত নিচের দিকে নামা যায়, মৌলগুলোর রাসায়নিক সক্রিয়তা তত বাড়তে থাকে। কিন্তু পর্যায় সারণির ডানদিকে অবস্থিত একই গ্রুপের মৌলগুলোর ক্ষেত্রে উপর থেকে যত নিচের দিকে নামা যায়, মৌলগুলোর রাসায়নিক সক্রিয়তা তত কমতে থাকে।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা
কবীর