আপনি ও আপনার টিম দিনভর কঠোর পরিশ্রম করার পরও কখনো এমন হতে পারে যে, প্রত্যাশিত সফলতা মিলছে না। অনেক সময় এর কারণটাও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এটা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। নিচে অকার্যকর টিমের কিছু সাধারণ অভ্যাস তুলে ধরা হলো। এগুলো চিহ্নিত করে পরিবর্তন আনতে পারলে আপনার টিমকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করে তোলা সম্ভব।
শক্তিশালী নেতৃত্ব
অকার্যকর বা দুর্বল টিমে যদি কোনো শক্তিমান ও দূরদর্শী নেতা না থাকে, তাহলে সেই টিমের সদস্যরা যতই পরিশ্রম করুক না কেন, কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, নেতৃত্বহীন একটি টিম অনেক সময় দিকনির্দেশনার অভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তাদের কাজের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দেয় এবং লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয় না। ফলে প্রচুর শ্রম ও সময় ব্যয় করার পরও সেই প্রচেষ্টার ফলাফল আশানুরূপ হয় না।
একটি কার্যকর ও সফল টিম গড়ে তুলতে একজন শক্তিশালী নেতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন দক্ষ নেতা শুধু নির্দেশনা দেন না, বরং টিমের জন্য একটি পরিষ্কার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা তৈরি করেন এবং প্রতিটি সদস্যকে সেই পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখেন। তিনি টিমের ফোকাস ধরে রাখেন, প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন এবং চ্যালেঞ্জের মুখে টিমকে ভেঙে পড়তে দেন না।
একজন প্রকৃত নেতা টিমের প্রতিটি সদস্যের শক্তি ও দুর্বলতা বোঝেন এবং সেই অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করেন। তিনি সদস্যদের অনুপ্রাণিত করেন, তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলেন এবং একটি ইতিবাচক কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এর ফলে টিমের সবাই নিজেদের কাজের প্রতি আরও দায়িত্বশীল ও মনোযোগী হয়ে ওঠে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি টিমের সফলতার পেছনে শক্তিশালী নেতৃত্বই হলো প্রধান চালিকাশক্তি।
টিম সদস্য
টিমের লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে নিজেকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকলে সে টিম কখনো সফলতার মুখ দেখে না। টিমের লক্ষ্যই টিমের ফোকাস হওয়া উচিত। আর যারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যস্ত থাকে তাদের দিয়ে টিমের আদর্শের প্রতিফলন করা যায় না। তাই সত্যিকারের টিমে এমন সদস্য দরকার যারা ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করে টিমের লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা
সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে যেকোনো টিমই মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। সাধারণত অকার্যকর টিম ভালোভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। একজন শক্তিমান নেতার পাশাপাশি একটি টিমের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও থাকতে হবে। দরকারি তথ্য জোগাড় করে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটি টিমকে তাদের লক্ষ্য নির্ধারণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হয় এবং সেভাবেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হয়। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে দরকারি সুপারিশ করতে হবে। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে সঠিক সিদ্ধান্তই টিমকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারে।
জবাবদিহি
জবাবদিহি ছাড়া কোনো টিমই সফল হতে পারে না। অকার্যকর টিমে কোনো জবাবদিহি থাকে না। তারা ডেডলাইন সম্পর্কে সচেতন না এবং কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে। ডেডলাইন মানা না হলে বা লক্ষ্য ছাড়া কাজ চলতে থাকলে সেখানে জবাবদিহি থাকে না। আর জবাবদিহি ছাড়া ফোকাস হারানো খুব সহজ। একটি সফল টিম তাদের লক্ষ্য অর্জন হওয়া পর্যন্ত জবাবদিহি নিশ্চিত করে থাকে। ফলে সফলতা ধরা দেয় খুব সহজেই।
ফোকাস
অকার্যকর টিমের কোনো ফোকাস থাকে না। তারা একটি ইস্যু নিয়ে আলাপ করতে বসলেই বিতর্কের লিপ্ত হয়ে পড়ে। যার কারণে টিম ফোকাস থেকে দূরে সরে যায়। ফলে তাদের লক্ষ্য পূরণ হয় না। একটি সুসংগঠিত টিমের ফোকাস হওয়া উচিত যে করেই হোক তাদের লক্ষ্য অর্জন করা। কারণ, টিম গঠন করাই হয় লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে।
সমবণ্টন
বেশির ভাগ দায়িত্ব শুধু কিছু সদস্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সে টিম কোনোভাবেই সফল হবে না। অকার্যকর টিমে সাধারণত এমনটাই দেখা যায়। এটি টিমের আদর্শের পরিপন্থি। যদি একজনকেই সবকিছু করতে হয়, তাহলে টিমের কী দরকার? একটি সফল টিম সবাইকে একত্রিত করে মনোবল বৃদ্ধি করে। ফলে টিম লক্ষ্যস্থলে একযোগে পৌঁছাতে পারে। এটি করতে হলে দলের সবার মাঝেই দায়িত্বের সমবণ্টন থাকতে হবে।
স্পষ্ট লক্ষ্য
লক্ষ্য যদি স্পষ্ট না হয়, তাহলে যত কঠোর পরিশ্রমই করা হোক না কেন, সেই পরিশ্রম থেকে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, লক্ষ্যই হলো একটি কাজের মূল দিকনির্দেশনা। এটি ঠিক করে দেয় আপনি কোথায় যেতে চান, কীভাবে সেখানে পৌঁছাবেন এবং কোন পথে অগ্রসর হবেন। লক্ষ্য অস্পষ্ট হলে কাজের গতি থাকে, কিন্তু তার কোনো নির্দিষ্ট দিক থাকে না—ফলে সময়, শ্রম ও মেধা ব্যয় হলেও তার ফলাফল কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয় না।
অকার্যকর টিমগুলোর অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো তারা তাদের লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যর্থ হয়। তারা কী অর্জন করতে চায়, কোন সময়সীমার মধ্যে তা সম্পন্ন করতে চায়, কিংবা সেই লক্ষ্য পূরণে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন—এসব বিষয়ে তাদের মধ্যে স্পষ্ট ধারণার অভাব থাকে। এর ফলে টিমের সদস্যরা নিজেদের মতো করে কাজ করতে থাকে, কিন্তু সেই কাজগুলো একসাথে মিলেও কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল তৈরি করতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায়, সারাদিন ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটানোর পরও দিনশেষে অর্জনের খাতা শূন্যই থেকে যায়।
অন্যদিকে, একটি সুগঠিত ও দক্ষ টিম সবসময় তাদের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে নেয়। তারা জানে তাদের উদ্দেশ্য কী, কেন সেই লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ এবং তা অর্জনের জন্য কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করতে হবে। শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করেই তারা থেমে থাকে না; বরং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ তৈরি করে। এই রোডম্যাপে থাকে কাজের ধাপগুলো, দায়িত্ব বণ্টন, সময়সীমা এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কৌশল।
পরিকল্পনামাফিক কাজ করার ফলে টিমের প্রতিটি সদস্য জানে তার করণীয় কী এবং সে কীভাবে সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখবে। এতে করে কাজের মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয়, সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি কমে আসে। ফলে টিম ধীরে ধীরে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায় এবং একসময় সফলতা তাদের নাগালে এসে ধরা দেয়।
তারেক/