বিশ্ব আরও একটি প্রতিভা হারাল, যিনি আমাদের অনন্তকাল মুগ্ধ করে রাখার মতো অসংখ্য সুর উপহার দিয়েছেন। তিনি আশা ভোঁসলে। রবিবার (১২ এপ্রিল) ৯২ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দুর্বলতা এবং বুকে সংক্রমণের কারণে প্রবীণ এই গায়িকাকে গতকাল শনিবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
প্রায় আট দশক ধরে সংগীত জগতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন আশা ভোঁসলে। ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত ছিলেন সংগীতের একচ্ছত্র তারকা। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তার অপ্রচলিত প্রতিভা চরমে পৌঁছায়, বিশেষ করে আর ডি বর্মনের সঙ্গে তার কাজগুলো ভারতীয় সংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করে। তার কণ্ঠ এতটাই অভিযোজ্য যে, একই শিল্পী দিয়ে রোমান্টিক, দুঃখের, চঞ্চল বা আধুনিক- সব ধরনের গান সফলভাবে গাওয়ানো সম্ভব হয়েছে।
আশা ভোঁসলে ষাট ও সত্তরের দশকের আধুনিক, পাশ্চাত্য-প্রভাবিত শব্দের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে শিল্পজগতে নিজের একটি স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করেছিলেন।
তিনি শুধু একটি ধারার গানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তার কণ্ঠে শাস্ত্রীয় সংগীত, গজল, পপ, কাবারে, লোকসংগীত, চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সবই অসম্ভব শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে। তাই আশা ভোঁসলে ‘বহুমুখীতার রানি’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
তিনি ‘অপ্রচলিত’ পথকেই নিজের পরিচয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তার ক্যারিয়ারের শুরুতেই বড় বোন, প্রয়াত লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তুলনা হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল, যার কণ্ঠ ছিল আরও কোমল। কিন্তু আশা ভোঁসলে খুব সহজে ও দ্রুত তার কণ্ঠ পরিবর্তন করতে পারতেন। কণ্ঠস্বর পরিস্থিতি বা গানের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলে নেওয়া, একই গানে ভিন্ন ভিন্ন স্টাইল ফুটিয়ে তুলতে পারতেন।
মজার বিষয় হলো, তার তুলনামূলক তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর তাকে আরও বেশি বিদ্রোহী চরিত্রগুলোর জন্য প্লেব্যাক গাওয়ার সুযোগ এনে দেয়।
তিনি হিন্দি চলচ্চিত্রের নায়িকার জন্য প্রচলিত কণ্ঠধারাকে এক আকর্ষণীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে বদলে দেন- যা আধুনিক ভারতীয় নারীর এক নতুন পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। আর এভাবেই জন্ম নেয় এক প্লেব্যাক সুপারস্টার।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি তার স্বাভাবিক ঝোঁকের কারণেই তিনি সংগীত ইতিহাসে সর্বাধিক রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি সবকিছুকেই সংগীতে রূপ দিতে পারতেন- এখানে একটুখানি ফিসফিস, সেখানে খিলখিল হাসি, আর মাঝে একটি মৃদু গুঞ্জন।
কর্মজীবনের প্রধান মাইলফলক
‘রিদম কিং’ নামে পরিচিত ওপি নায়ার থেকে শুরু করে সংগীতে এক বিপ্লব ঘটানো আরডি বর্মণ পর্যন্ত, প্রতিটি সুরকারের পছন্দ অনুযায়ী আশা ভোঁসলে তার কারিগরি গায়কী কৌশলকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন।
ভোঁসলের ঝাঁঝালো কণ্ঠ নায়ারকে মুগ্ধ করেছিল, যার ফলস্বরূপ আবেদনময়ী আবহে ‘আইয়ে মেহেরবান’-এর মতো হিট গান তৈরি হয়- যেখানে এক ধরনের মাদকতাময় আবেশ মিশে ছিল।
আর ডি বর্মনের সঙ্গে তিনি আবারও নিজেকে জ্যাজ রিফ ও লাতিন বিটের সংমিশ্রণে নতুনভাবে গড়ে তোলেন, যা ছিল বহুমুখীতার এক অনবদ্য নিদর্শন। এর ফলেই আমরা পাই ‘আজা আজা ম্যায় হুঁ পেয়ার তেরা’-এর মতো চার্টবাস্টার। তখনকার দিনে এটি এক ধরনের পশ্চিমা প্রভাবিত নতুন পরীক্ষা ছিল, যা আগে খুব একটা চেষ্টা করা হয়নি।
আশা ভোঁসলে ‘গাওয়ার অযোগ্য লিরিক’, যেমন ‘মেরা কুছ সমান’- ১৯৮৭ সালে, যা তখন কাঠামোবিহীন বলে সমালোচিত হয়েছিল- সেটিকেও তিনি পুরস্কারজয়ী সুরে রূপান্তর করেছিলেন।
আশা ভোঁসলে ছিলেন গণমানুষের গায়িকা। এটা স্পষ্টভাবেই বলা যায়। একসময় তিনি সাহসী কাবারে গান ‘পিয়া তু আব তো আজা’-এর মতো একটি উদ্দাম কাবারে গান রেকর্ড করতে পারতেন। আর একই সময়ে হিপ্পি ধাঁচের ‘দম মারো দম’-এ একেবারে ভিন্ন রূপে হাজির হতেন।
আবার গজল যেমন ‘ইন আঁখো কি মস্তি’ এবং ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’-গানে তিনি গায়কীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গভীর আবেগের এক অসাধারণ সমন্বয় দেখিয়েছিলেন- যা সহশিল্পীদেরও বিস্মিত করেছিল।
সময় যত এগিয়েছে, ৬২ বছর বয়সে তিনি এ আর রহমানের সঙ্গে ‘রঙ্গিলা রে’-গানে কাজ করেন, যা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়, তিনি সময় ও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নিজেকে তাল মিলিয়ে চলতে পেরেছিলেন।
আজ তিনি সত্যিই এক বিশাল শূন্যতা রেখে গেছেন, কিন্তু তার সংগীত বেঁচে আছে- প্রতিটি যুগে, প্রতিটি প্রজন্মের জন্য। সূত্র: এনডিটিভি
কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই
অমিয়/