শো শেষ হতেই মঞ্চজুড়ে নেমে আসে আলো-আঁধারির মায়া। দর্শকরা তখনো মুগ্ধ, হাততালির শব্দ মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে। পারফরমাররা একে একে নেমে যায় মঞ্চ থেকে, কিন্তু যিনি পুরো আয়োজনের নেপথ্য রচয়িতা তিনি তখনো স্টেজের এক পাশে দাঁড়িয়ে, প্রতিটি পরিবেশনার সফলতা মন থেকে উপলব্ধি করছেন। তেমনি একজন আসাদ খান।
নাচ, মঞ্চ আর ফ্যাশনের ছন্দে যিনি দীর্ঘদিন ধরে বুনে চলেছেন নতুন গল্প। তিনি শুধু একাধারে একজন ফ্যাশন স্টাইলিস্ট, মডেল ও চলচ্চিত্র নৃত্য পরিচালক হিসেবে কাজ করে চলেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। তার প্রতিষ্ঠান ‘আসাদ খান প্রোডাকশন’ আজ দেশের অন্যতম পরিচিত একটি নাম, যারা নৃত্যনির্ভর পারফরম্যান্স, করপোরেট শো, মিউজিক ভিডিও, ফ্যাশন শো এবং রিয়েলিটি শোতে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি ‘রানআউট’, ‘ইউ-টার্ন’ এবং ‘রাত্রির যাত্রী’র মতো চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালনা করেছেন, এই তিনটি ছবিতেই তিনি কোরিওগ্রাফির যে পরিশ্রম ও সৌন্দর্য দেখিয়েছেন, তা প্রশংসিত হয়েছে দর্শক ও নির্মাতাদের কাছেও।
তবে মিউজিক ভিডিওতে তার অবদান আরও বিস্তৃত। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও মিউজিক ডিরেক্টর হাবিব ওয়াহিদের ‘মনের ঠিকানা’, জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আঁখি আলমগীরের ‘রাজকুমারী’, সুরেলা কণ্ঠশিল্পী লিজার ‘পাগলি সুরাইয়া’ ও ‘আসমানি’, প্রীতম হাসানের ‘ফ্রেশ জোশে বাংলাদেশ’, জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কণার ‘কালা’, বিন্দু কণার ‘বড়লোকের বেটি লো’, রেশমি ও ইবরার টিপুর ‘নেশা লাগিলো রে’, নিশির ‘প্রেম সুনামি’, অবন্তি সিঁথির ‘বনমালী’ কর্ণিয়ার ‘শাকালাকা মন’ এই তালিকা যেন শেষই হয় না। প্রতিটি গানের দৃশ্যায়নে তার ছন্দ, দৃষ্টিভঙ্গি ও গানের সঙ্গে শারীরিক অভিব্যক্তির মেলবন্ধন ছিল নিখুঁত।

শুধু মিউজিক ভিডিও নয়, স্টেজ শোতেও রয়েছে তার দক্ষতা। আরটিভি স্টার অ্যাওয়ার্ড, আরটিভি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, আরটিভি আলোকিত নারী, দীপ্ত স্টার অ্যাওয়ার্ড, দীপ্ত কিডস সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড, নেসলে ফ্যামিলি নাইট, কৃষি এওয়ার্ড, আকিজ সিরামিক লোগো উন্মোচন, জিপি সিএস নাইট জিপি, জিপি অ্যাচিভার্স শো, বাংলালিংক ডিলার মিট, স্যামসাং মোবাইল লঞ্চিং, অপ্পো মোবাইল লঞ্চিং, লিনেক্স মোবাইল লঞ্চিং, ভিভো মোবাইল লঞ্চিং, হুয়াওয়ে মোবাইল লঞ্চিংসহ বিভিন্ন করপোরেট ও বিনোদনমূলক আয়োজনের প্রতিটি পরিবেশনা শুধু চোখধাঁধানো।
নাটক ও টেলিফিল্মেও তিনি কাজ করেছেন। ‘এক্স ফ্যাক্টর’, ‘আঁধারে আলো’, ‘লিপস্টিক’, ‘রূপকথা এখন আর হয় না’, চট্টলা এক্সপ্রেসসহ বহু নাটকে তার নাচের কোরিওগ্রাফির আবেগকে আরও উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
তবে ফ্যাশন দুনিয়াতেও তার অবদান কম নয়। ইয়ালো, টুয়েলভ, মাইক্লো, বে এমপোরিয়াম, জ্যোতি শাড়ি, স্টেপ ফুটওয়্যার, গিগল, স্বপ্ন লাইফস্টাইল, উইমেন’স ওয়ার্ল্ড, জিটি৯২, বেক্সি ফ্যাব্রিক্স, ভোগ বাই প্রিন্সসহ বহু জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ফ্যাশন শোতে তিনি স্টাইলিং ও কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন।
২০১৩ সাল থেকে জাতীয় পাট দিবস, কটন ডে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কার্নিভ্যাল, অটিজম দিবস, উইমেন’স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড, স্টুডিও এক্স এবং বিউটি ব্র্যান্ড ইংলট লঞ্চিং শোর মতো সব আয়োজন তিনি যেভাবে সাজিয়েছেন, তা দেশের ফ্যাশন ইতিহাসে স্মরণীয়।

তরুণদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও তার দক্ষতা প্রশংসনীয়। আরটিভি বাংলার গায়েন, আরটিভি ইয়াং স্টার, ক্যাম্পাস স্টার, চ্যানেল আই গানের রাজা, দীপ্ত স্টার হান্ট-এর মতো জনপ্রিয় রিয়েলিটি শোতে তিনি কোরিওগ্রাফার, ফ্যাশন গ্রুমার ও স্টাইলিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন। প্রতিযোগীদের ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন, মঞ্চে চলাফেরা, অঙ্গভঙ্গি- সবকিছুতে তার প্রশিক্ষণের ছাপ স্পষ্ট।
আসাদ খানের কর্মজীবন কেবল একটি সফল ক্যারিয়ার নয়, বরং এটি এক নিঃশব্দ সংগ্রাম, নিষ্ঠা ও শিল্পসাধনার গল্প। তিনি শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি; বরং তার কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্দেশনার মাধ্যমে দেশের নৃত্য ও ফ্যাশন জগতে এনে দিয়েছেন এক নতুন ধারা। তার কোরিওগ্রাফ করা প্রতিটি পরিবেশনা যেন গল্পের মতো- যেখানে প্রতিটি দৃশ্যের রং, ছন্দ এবং শরীরী অভিব্যক্তি হয়ে ওঠে অর্থবাহী ও প্রভাবশালী।
নেপথ্যে থেকেও তিনি যেমন আলো ছড়ান, তেমনি প্রতিটি শিল্পীকে মঞ্চে তুলে ধরেন আরও আত্মবিশ্বাসী ও পরিপূর্ণভাবে। তরুণদের তিনি শুধু প্রশিক্ষণ দেন না, তাদের স্বপ্ন দেখতেও শেখান। একজন শিল্পী হিসেবে যেমন তিনি নিবেদিত, তেমনি একজন প্রশিক্ষক হিসেবেও তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বস্ত ও অনুপ্রেরণাদায়ী। তার পথচলা প্রমাণ করে, প্রতিভা তখনই পূর্ণতা পায় যখন সেটিকে ঘিরে থাকে কঠোর পরিশ্রম, সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা। আসাদ খান এখন কেবল একজন নাম নয়, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের সৃজনশীল জগতের এক স্থায়ী ও গৌরবময় পরিচিতি যিনি সামনে থাকুক বা নেপথ্যে, আলো সব সময়ই তার কর্মের ওপরেই পড়ে।