মনের টানে/ পাহাড় পানে/ ঝরনার জল/ হৃদয় শীতল।
সত্যিই তাই। ঝুম বৃষ্টিতে ঝরনার প্রান্তে না গেলে, সারা বছরের ভ্রমণের তৃপ্তিই আসে না মনে। সেই তৃপ্তি মেটাতেই হুট করে এক সন্ধ্যায় আমিসহ ঢাকা হতে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা মাইক্রোতে চেপে বসি। যেতে যেতে মহিপালে ব্রেক। আগেই স্কুল-দোস্ত লেলিনের আব্দার ছিল, রাতটা যেন ওর বাড়ি দাগনভূঞায় বিশ্রাম নিই। তাকে দেওয়া কথামতো মহিপাল হতে ডানে মোড় ঘুরিয়ে গাড়ি ছুটল উত্তর আলীপুর গ্রামের পথে। মাইক্রো চলতে চলতে বেকের বাজার হয়ে বাগেরহাট সড়কে ঢুকে যায়। বাহ্, এ যেন খুলনা বিভাগের বাগেরহাট সড়কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখানে ভর করেছে! নামে নামে যেন প্রকৃতি মিলে গেছে। খুবই চমৎকার সড়ক। দুই পাশে গাছগাছালিতে ঠাসা। এ রকম নৈসর্গিক পরিবেশে চলতে চলতে, সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ জনৈক ব্যক্তির টর্চের ইশারায় গাড়ি থামে। এবার সেই চিরচেনা কর্দমাক্ত এঁটেল মাটির গ্রামীণ সড়ক।
এক পা ফেললে দুই পা এগিয়ে যায়। এ রকমটা হতে হতেই বন্ধুর বাড়ি পৌঁছে যাই। দেরি না করে পুকুর থেকে ধরে আনা তেলাপিয়া মাছের ফ্রাই আর সবজির ঝোল দিয়ে উদোর পূর্তি শেষে বারবিকিউর প্রস্তুতি। কীসের কি বিশ্রাম! কয়লায় আগুন জ্বালাতে আর মুরগির টুকরায় হাত পাখার বাতাস করতে করতেই রাত পার। হা হা হা!! ফজরের নামাজ পড়েই গ্রাম ঘুরতে বের হয়ে যাই। ঘুরতে ঘুরতে মুহুরী নদীর ওপর বাগেরহাট ব্রিজের ওপর এসে থামি। চোখ আটকায় নদীর দুই কূলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে। টলটলে পানি। স্নিগ্ধ বাতাস। মুহুরী নদীটা ছোট ফেনী নদী নামেও পরিচিত। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চল হতে এর উৎপত্তি। এই নদীটি ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা দিয়ে প্রবেশ করে ফেনী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। প্রাতঃভ্রমণে গ্রামের বউ-ঝিরা ঘোমটা মুড়িয়ে নদীতীরবর্তী সড়ক দিয়ে হেঁটে যায় ডানে-বামে ভ্রুক্ষেপ না করেই। ওয়েস্টার্ন কালচার ধারণ করার যুগেও, বাংলাদেশি সংস্কৃতি লালন করা দেখে বেশ পুলকিত হই। সবুজে সয়লাব উত্তর আলীপুরের বসতবাড়িসহ মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর।

কথায় আছে গাছের প্রতি দরদ যাদের, মানুষের প্রতিও তারা হন সহনশীল। উত্তর আলীপুর গ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আর আন্তঃসীমান্ত নদী মুহুরীর মোহনীয় রূপ সঙ্গী করে ছুটলাম এবার সীতাকুণ্ডের পথে। সকালের সড়ক ফাঁকা পেয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই বাড়বকুণ্ড বাজারে। ছালাদিয়া [ঝুপড়ি] হোটেলে নাশতা সেরে রেললাইনের দিকে মাইক্রো এগোতে থাকে। গুদামঘরের পাশে গাড়ি পার্ক করে এবার শুরু হাঁটা। হাঁটতে হাঁটতে প্রথমেই চোখে পড়ে পৌরাণিক কাহিনিগাঁথা মন্দির বাড়বকুণ্ড। ভেতরে প্রবেশ করে অগ্নিকুণ্ডের সম্মুখে দাঁড়াই। স্বচ্ছ পানি বুদ্বুদ করতে দেখলেও, পানির ওপর কোনো আগুন জ্বলার দৃশ্য চোখে পড়েনি। পানির বুদ্বুদ ব্যাপারটা অলৌকিক কিছু নয়। জাস্ট মিথেন গ্যাসের চাপ। ভগ্নদশা মন্দিরটা ব্রিটিশ আমলের তৈরি। যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ঐতিহাসিক তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচ্য। যথাসাধ্য পবিত্রতা বজায় রেখে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে মন্দিরটা ঘুরে ঘুরে দেখি।অতঃপর শুরু বাড়বকুণ্ড ঝরনায় যাওয়ার মূল ট্রেইল। প্রচুর সবুজের সমারোহ।
এ যেন বাঁধানো ছবির ক্যানভাস। গাছের লতাপাতা সব চকচকে সবুজ। পাথুরে ঝিরির টলটলে পানি। নান্দনিক ক্যাসকেড। নৈঃশব্দ্যের মাঝে কলকলিয়ে শব্দ তোলা ঝিরিতে অবিরাম বয়ে চলা ঝরনার পানি। কোথাও কোথাও মনে কাঁপন ধরা বনের আদিমতা। ঘন জঙ্গলের পাশ কেটে ‘দে-ছুট’ দামালদের ছুটে চলা। কোথাও-বা সাঁতরে খুম পারি দেওয়া। হাইকিং করার ফাঁকে ফাঁকে ঝিরির গায়ে থাকা পাথরে বসে খানিকটা সময় জিরিয়ে নেওয়া। কখনো কখনো ভ্রমণবন্ধুরা খুনসুটিতে মেতে উঠি। পরম যত্নে বানানো বাবলুর একমাত্র বউর দেওয়া কেক খেয়ে শক্তি সঞ্চয় করি। কখনো-বা সবাই মিলে হো হো করে হেসে উঠি, যখন দেখি কেউ তার শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে গিয়ে পল্টি খেয়ে ঝিরিতে গড়াগড়ি খায়। এমন হাস্যরসে হাইকিং-ট্র্যাকিং করাকালে মানসিক মনোবল বেড়ে হয় দ্বিগুণ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অবগাহনে ডুবে পথ চলতে চলতে হুঁশ ফেরে যখন নয়ন জুড়ায়, ধরা দেয় ক্ষিপ্রগতিতে গড়িয়ে পড়া পানির ধারার বাড়বকুণ্ড ঝরনার বিশালতা। ঝরনার প্রান্তরে পৌঁছে মেতে উঠি জলকেলিতে।
সেদিন ছিল ক্ষণে ক্ষণে ঝুম বৃষ্টি। মেঘ-বৃষ্টিতে ঝরনার যৌবন ফুলেফেঁপে ওঠে। তখন এর সৌন্দর্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ঢের আকর্ষণীয়। প্রায় ষাট ফিট উচ্চতার বাড়বকুণ্ড ঝরনার শুভ্র পানির ধারা গড়িয়ে পড়ার মনোরম দৃশ্য, যা শুধু মননেই ধারণ করা যায়। চওড়া ঝরনাটার গায়ে বসে মনের আনন্দে সময় পার করে দেওয়া যায় অবলীলায়। এর উপরে রয়েছে আরও একটি ঝরনা। আমাদের কেউ কেউ সঙ্গে নেওয়া রশি বেয়ে তরতর করে সেখানটায় উঠে যায়। দৈহিক গড়ন ছিপছিপে হলে পাহাড় ট্রাকিংয়ে বাড়তি অনেক বিস্ময়কর কিছুই মিলে যায়। ইচ্ছেমতো বাড়বকুণ্ড ঝরনার পানিতে ভিজে, একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরতি পথ ধরি।
যাবেন কীভাবে
দেশের যেকোনো প্রান্ত হতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড বাজার। সেখান হতে অটো/সিএনজি করে গোডাউন।
থাকা-খাওয়া
ঢাকা হতে একদিনেই ঘুরে আসা যাবে। সঙ্গে জনসংখ্যা অনুযায়ী শুকনো খাবার রাখতে হবে। থাকতে চাইলে চিটাগাং শহরে প্রচুর হোটেল-মোটেল রয়েছে।
সতর্কতা
খুব ভোরে ট্রেইলে ঢুকবেন না। বিকালের মধ্যেই ফিরবেন। সঙ্গে মূল্যবান সামগ্রী ও খুব বেশি টাকা রাখবেন না। স্থানীয় গাইড ও রশি নিতে ভুল করবেন না। খাবারের অপচনশীল মোড়ক ব্যাগে করে নিয়ে আসবেন। হড়কা বানে পড়ে গেলে সাহস না হারিয়ে, গাছের সঙ্গে রশি বেঁধে ধরে রাখবেন।