ফ্যাশন সময়ের বাহন। এটি আবেগ, গল্প এবং কল্পনার এক মায়াবী ভাষা। ঠিক সেই ভাষাতেই নতুন মৌসুমে হাজির হয়েছেন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার তাসমিম জোবায়ের। তাঁর সর্বশেষ কালেকশন ‘টিজেড স্প্রিং/সামার ২০২৬’ - যেন এক রূপকথার গল্প হিসেবে ধরা দিয়েছে। যেখানে চার মিউজ (নারী মডেল) মিলিত হয়েছেন এক জাদুকরী বাগানে। যেটি কেবল পোশাকের কালেকশন নয়, বরং এক কল্পনার জগত; যেখানে প্রকৃতি, নারীত্ব এবং সৌন্দর্য একসাথে উদযাপিত হয়েছে।
ডিজাইনার এই কালেকশনকে কল্পনা করেছেন এক দূরবর্তী দ্বীপের গল্প হিসেবে। যেন দ্বীপটি শহরের কোলাহল থেকে দূরে, যেখানে নেই সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ, কেবল প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ত সৌন্দর্য বিরাজমান। এখানে যেন সবকিছু নতুন করে শুরু হয়- আকাশে রঙিন সূর্যাস্ত, বাতাসে ঢাকের ছন্দ, আর তার মধ্যেই একে একে উপস্থিত হন চারজন নারী। তারা যেন প্রকৃতির আত্মা। কেউ ফুল হয়ে ফুটে ওঠেন, কেউ লতা হয়ে জড়িয়ে ধরেন, কেউ ফলের মতো ঝুলে থাকেন। এই দ্বীপে তারা একাকার হয়ে যান প্রকৃতির সাথে, হয়ে ওঠেন সৃষ্টির প্রথম সকাল।
পোশাকে প্রকৃতির ছাপ
তাসমিম জোবায়েরের ডিজাইনে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের ছাপ স্পষ্ট। পোশাকের নকশা যেন ফুলের উল্টো পাপড়ির মতো। কালেকশনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘ভলিউমিনাস করসেট এবং ড্রেপিং’। অর্থ্যাৎ বড়সড়, নাটকীয় করসেট যেটার সাথে সুন্দর ভাঁজ বা ঢেউখেলানো কাপড়রে ব্যবহার। এর ফলে পোশাক দেখতে নাটকীয়, শিল্পসম্মত ও প্রাণবন্ত লাগে। করসেটগুলো লম্বাটে, কোমল কাপড়ে তৈরি, যা নারীর শরীরের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। পোশাকের ভাঁজগুলো এমনভাবে কাটা ও সাজানো হয়েছে যেন মনে হয় কোকুন থেকে বেরিয়ে আসছে প্রজাপতি; একটি নতুন জন্ম, একটি নতুন জীবন।

প্রতিটি ভাঁজ যেন নাচের ছন্দে দুলে ওঠে। এই কালেকশনের রঙও প্রাণবন্ত; উজ্জ্বল গোলাপি, নীল, সাদা, পেস্টেল, আকাশি, যা প্রকৃতির উৎসবের রঙকেই মনে করিয়ে দেয়। পোশাকের সাথে ব্যবহার করা হয়েছে ছোট ছোট ফিতা। এগুলো কখনো কোমরে, কখনো কাঁধে, কখনো আবার চুলে। হালকা ফিতা যেন অনায়াসে বসে থাকে পোশাকের ভাঁজে ও চুলে। এগুলো রঙিন প্রজাপতির মতো হয়ে ওঠে, যেগুলো মনে করিয়ে দেয় শৈশবের হালকা, নির্ভার মুহূর্ত। যেন কানে ফিসফিস করে বলে জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোকে উজ্জ্বল হাসি দিয়ে আপন করে নাও।
সিল্কের কাপড়ের রোমাঞ্চ
এই কালেকশনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো স্বচ্ছ কাপড়ের ব্যবহার, ক্রিস্টাল এমব্রয়ডারি এবং ত্বক ও সিল্কের রোমান্টিক মেলবন্ধন। কাপড়ের স্বচ্ছতা এবং ত্বকের কোমলতা একসাথে মিলে একধরনের রোমান্টিক আবহ তৈরি করে।

ক্রিস্টাল দিয়ে সূক্ষ্ম নকশা করা হয়েছে, যা আলোতে ঝলমল করে। প্রতিটি পোশাক যেন নারীর শরীরের বাঁককে শিল্পের মতো গড়ে তোলে। যা তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও সৌন্দর্যময়ী করে তোলে।
হিবিস্কাস: আকর্ষণের প্রতীক
কালেকশনে হিবিস্কাস ফুল বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এর উজ্জ্বল গোলাপি রঙ, তরঙ্গায়িত পাপড়ি এবং প্রাণবন্ত গঠন নারীর উচ্ছলতা ও শক্তির প্রতীক। ডিজাইনারের প্রিয় শহর প্যারিসে হিবিস্কাস হলো প্রেম ও আনন্দের প্রতীক; তাই এটি কালেকশনের মধ্যমণি হয়ে উঠেছে।
ফ্যাশনে ইতিহাসের ছোঁয়া
কালেকশনের মধ্য দিয়ে ষাট-এর দশকের ফ্যাশন এবং হলিউডের সোনালি যুগের গ্ল্যামার আবারও ফিরে এসেছে। পোশাকের কাট, সিলুয়েট এবং অ্যাকসেসরিজে রয়েছে রেট্রো নস্টালজিয়া, তবে একেবারেই আধুনিক স্পর্শে। ফলে এই কালেকশন যেমন অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়, তেমনি ভবিষ্যতের ফ্যাশনকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে।

টিজেড স্প্রিং/সামার-২০২৬ কালেকশন হলো এক রূপকথার দ্বীপের গল্প। যেখানে নারী ও প্রকৃতি মিলেমিশে তৈরি করেছে এক নতুন জগৎ। তাসমিম জোবায়ের তাঁর নকশা, কাপড়, রঙ ও সৃজনশীলতায় আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফ্যাশন কেবল শরীর ঢাকার জন্য নয়, এটি এক শিল্প, যা আমাদের আবেগ, ইতিহাস ও স্বপ্নকে একত্রিত করে। এই কালেকশন তাই শুধু পোশাক নয়; এটি জীবনের আনন্দ উদযাপন, নতুন শুরু ও এক মায়াবী যাত্রার প্রতীক।
/এস লুপিন