করোনাকাল নিয়ে মোস্তফা কামালের দীর্ঘ উপন্যাস ‘বিষাদ বসুধা’র দ্বিতীয়খণ্ড ‘মোহিনী’। মোহিনীকে ঘিরেই উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে...
নীলিমা হঠাৎ আবদুর রহমানকে ডেকে পাঠালেন।
আবদুর রহমান শাহবাজ খানের নিরাপত্তাকর্মী। নীলিমার ডাক পেয়ে সে থরথর করে কাঁপছে। সে কোনো ভুল করেছে কি না, তা নিয়ে ভাবে। আর দোয়া-দরুদ পড়ে বুকে ফুঁ দেয়। বিড়বিড় করে বলে, খোদা আমার চাকরিডা রাইখো! চাকরি না থাকলে যে না খাইয়া মরতে হইব!
আবদুর রহমান বাড়ির বাইরের ঘরে বসে আছে। সে অপেক্ষা করছে। মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে। আর কোথাও কোনো ভুল করেছে কি না, তা নিয়ে ভাবছে। কিছুই মনে পড়ে না তার। সে যখন টেনশনে থাকে তখন তার মাথা খালি হয়ে যায়। কোনো কিছুই মনে করতে পারে না। কিছুক্ষণ আগের কথাও সে ভুলে যায়। এ রকম কি অন্য কোনো মানুষের হয়? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে আবদুর রহমান।
এর মধ্যেই নীলিমার সহকারী পুতুল আবদুর রহমানের কাছে আসে। তাকে ডাকে। আবদুর রহমান অন্যমনস্ক। তার ডাক সে শুনতে পায়নি। সে কখন এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে, তাও খেয়াল করেনি। হঠাৎ থতমত খেয়ে বলে, আ আ আমাকে ব ব বলছেন?
তো কাকে বলব? এখানে আর কেউ আছে?
না মানে! আমি আসলে খেয়াল করি নাই!
তা খেয়াল করবেন কেন? থাকেন তো শুধু ধান্দায়।
পুতুলের কথা শুনে আবদুর রহমান আরও ঘাবড়ে যায়। সে ভাবে, নিশ্চয়ই তাকে সান্টিং দেওয়ার জন্য ডেকেছেন। তা না হলে পুতুল এমন আচরণ কেন করবে? ও নিশ্চয়ই জানে বিষয়টা।
আবদুর রহমান এবার পুতুলকেও সমীহ করতে শুরু করল। সে কাচুমাচু করে বলল, ম্যাম কেন আমাকে ডাকছেন তা আপনি নিশ্চয়ই জানেন!
আবদুর রহমানের সমীহ অবস্থা দেখে পুতুলের ভাব যেন বহুগুণে বেড়ে গেল। এমনিতেই মেম-সাহেবার সহকারী হিসেবে তার ভাবের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। সেই ভাবের ওপর সমীহ যোগ হলে তো কথাই নেই। গরম ভাতে ঘি পড়ার মতো অবস্থা। পুতুল হামবড়া ভাব নিয়ে বলল, ঠিকঠাক মতো কাজ-কাম করেন? নাকি শুধু ঘোরাফেরা সার!
পুতুলের কথায় আবদুর রহমান আরও ভয় পেয়ে যায়। সে কম্পিত কণ্ঠে বলল, এই চাকরির ওপর আমার সংসার। কাজ না করলে চাকরি থাকব? কাজের ব্যাপারে আমার কোনো গাফিলতি নাই।
ঠিক আছে। আপনি অপেক্ষা করেন। ম্যাম নাশতা করছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাকব আপনাকে।
আবদুর রহমান মাথা নেড়ে সায় দেয়। পুতুল বিদ্যুতের বেগে আবার ঘরের ভেতরে ছুটে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার আবদুর রহমানের কাছে ফিরে আসে। তাকে ডেকে নিয়ে যায় ভেতরের ঘরে। সে এক পা আগায়, দুই পা পেছায়, এরকম অবস্থা। পুতুল তাকে তাড়া দিয়ে বলে, কী হলো? দেরি করছেন কেন? কোনো সমস্যা?
আবদুর রহমান মুখে কিছু বলল না। সে না-সূচক মাথা নাড়ে। এক রকম টলতে টলতেই নীলিমার সামনে গিয়ে হাজির হয়। নীলিমা সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। আবদুর রহমান তার সামনে গিয়ে কুর্নিশের ভঙ্গিতে সালাম করল। তার পর সামনের দিকি ঝুঁকে দাঁড়িয়ে রইল। নীলিমা তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখলেন। তাকে রিড করার চেষ্টা করলেন। তার পর বললেন, আবদুর রহমান তুমি তোমার স্যারের সঙ্গে কতক্ষণ থাক?
আবদুর রহমান নরম গলায় বলল, স্যার যতক্ষণ বাসার বাইরে থাকেন।
তাতে তোমার অসুবিধা হয় না?
জি হয়। কিন্তু আমি তো স্যারের নিরাপত্তার দায়িত্বে। তাই...
আচ্ছা তোমার বাসা কই?
কাছাকাছিই।
তোমার পরিবার আছে?
জি।
ছেলেমেয়ে?
এক ছেলে।
বউ কিছু করেন?
জি না।
তোমার বেতন কত?
ত্রিশ হাজার। আর স্যার মাঝে-মধ্যে খুশি হয়ে বকশিশ টকশিশ দেন।
হুম।
তা দিয়ে ঠিকমতো সংসার চলে?
যে মাসে ভালো বকশিশ পাই, সে মাসে ঠিকমতো চলে। যে মাসে কম পাই সে মাসে টানাটানি হয়।
গত কিছুদিন যে দেরি করে বাসায় আসে। তোমরা কোথায় যাও?
আবদুর রহমান বলবে কী বলবে না, তা নিয়ে ভাবে। নীলিমা তাকে অভয় দিয়ে বলেন, ভয় পেও না। তোমার চাকরি যাবে না। তুমি নির্ভয়ে বলো। না বললে বরং চাকরি যাবে। আমি তো সবই জানি। যাচাই করার জন্য তোমাকে ডেকেছি।
আবদুর রহমান ভয়ে ভয়ে বলল, স্যার কয়েকদিন ধরে ওয়েস্টিন হোটেলে যাচ্ছেন।
দিনের বেলা গুলশানে কোথায় যায়?
কয়েকদিন আগে একটা অফিসে গেছিল।
কার অফিস?
আবদুর রহমান মাথা নিচু করে চুপ করে আছে। কোনো কথা বলছে না। এবারও সে বলবে কী বলবে না, তা নিয়ে ভাবে। নীলিমা আবারও তাকে অভয় দিয়ে বললেন, বললাম তো তোমার কোনো অসুবিধা হবে না। তবে মিথ্যা তথ্য দিলে অবশ্যই তোমার সমস্যা হবে। আমি না জেনে তো তোমাকে এত প্রশ্ন করছি না। কোথায় গিয়েছিল বলো?
আবদুর রহমান কম্পিত কণ্ঠে বলল, এক ম্যাডামের অফিসে।
কী নাম তার?
নাম মনে করার চেষ্টা করে আবদুর রহমান। এর মধ্যেই নীলিমা বলল, মোহিনী ম্যামের অফিসে?
জি জি।
নাম কি মনে ছিল না? নাকি ইচ্ছা করে বলনি?
আবদুর রহমান শুকনো গলায় বলল, সরি মনে ছিল না।
নীলিমা ১০ হাজার টাকার একটি প্যাকেট আবদুর রহমানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা রাখো। এর পর সবকিছু লিখে রাখবে। আমায় প্রতিদিন জানাবে তোমার স্যার কোথায় যায়। তা না হলে তোমার চাকরি থাকবে না।
আবদুর রহমান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে কোনো কথা বলছে না। কী করবে তাও বুঝতে পারছে না। নীলিমা তাগাদা দিয়ে বললেন, টাকাটা পকেটে ঢোকাও। আমি যে তোমাকে ডেকেছি এ কথা কেউ জানবে না। কাকপক্ষিও না।
আবদুর রহমান কাচুমাচু করে টাকার প্যাকেট পকেটে ভরতে ভরতে মাথা নেড়ে নীলিমার কথায় সায় দেয়। নীলিমা দরাজ গলায় পুতুলকে ডাকেন। পুতুল পুতুল!
পুতুল হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে তার কাছে। নীলিমা তাকে বললেন, ওর কাছ থেকে ফোন নম্বরটা রাখো। আমি যখন ওকে আসতে বলব তুমি ফোনে ওর সঙ্গে কথা বলে সময় ঠিক করে নেবে।
জি ম্যাম।
পুতুল ফোন নম্বর রাখল। তার পর আবদুর রহমান চলে গেল। নীলিমা সোফায় হেলান দিয়ে বসেই আছে। মোহিনী নামক পোকা এখন তার মাথায়।
আবদুর রহমান প্রতি সপ্তাহেই নীলিমার সঙ্গে দেখা করে। তাকে শাহবাজ খানের বিষয়ে তথ্য দেয়। নীলিমা খুশি হয়ে তাকে বকশিশ দেন। প্রতিবারই সে ১০ হাজার টাকা বকশিশ পায়। ফলে বেতন-বকশিশ মিলিয়ে প্রায় লাখ টাকা সে আয় করে। হঠাৎ বদলে যায় আবদুর রহমান। টাকার গরম বলে একটা কথা আছে না! বিশ হাজার টাকা বেতনের চাকরিতে যদি লাখ টাকা আয় হয় তাহলে মাথা তো বিগড়াবেই। আর সেটা সবার আগে স্ত্রীর কাছেই ধরা পড়বে। বাস্তবে তাই ঘটেছে। স্ত্রী আয়শা বেগম আবদুর রহমানের অতিরিক্ত টাকার উৎস জানতে চায়। আবদুর রহমান কিছুতেই মুখ খুলতে রাজি নয়। সে শুধু বলে, বিশ্বাস করো, বাড়তি টাকাটা আমি বকশিশ পাই।
আয়শা বেগম বলল, বকশিশ তো তুমি আগেও পেতে। তখন তো এত টাকা দেখিনি! হঠাৎ এত টাকা কোথা থেকে এল! তুমি ভালোয় ভালোয় বলো তো ভালো! নইলে আমি কিন্তু তুলকালাম করব।
আবদুর রহমান স্ত্রীর কাছে সব কথা খুলে বলল। সব শুনে আয়শা বেগম বলল, তুমি কিন্তু বড় ধরনের একটা বিপদে পড়বে। তোমার চাকরির দরকার নেই। তুমি চাকরি ছাড়ো।
কি বল! চাকরি ছাড়লে আমরা চলব কী করে?
চলো গ্রামে চলে যাই। এখানে থাকা মোটেই নিরাপদ না।
কেন, আমি কি অসৎ পথে আয় করছি। আমি বকশিশ পাচ্ছি।
শোন, বকশিশ তুমি কী করে পাচ্ছ? স্যারের কথা ম্যাডামকে লাগাচ্ছ। এটা অন্যায়। ভয়ংকরও বটে। তুমি স্যারের চাকরি করে তার সঙ্গে নিমকহারামি করছ।
আমি কী করব? ম্যাডাম জানতে চান। তাকে না বললেও তো চাকরি যাবে।
চলবে...