দ্বাবিংশ পর্ব
অনেকদিন পর লিয়াকত খানের ফোন পেয়ে আসিফ আহমেদ কিছুটা অবাক। তিনি মনে মনে ভাবেন, এতদিন পর তার মনে পড়ল! তিনি খুব বেশি সময় নিলেন না। লিয়াকত খান কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? অনেক দিন পর...
ভাইজান, আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। বেশ কিছুদিন দেশেও ছিলাম না। ভাইজান, আপনাকে নিয়েই আমি পত্রিকাটা করব। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করেন। সত্যি বলছি ভাইজান!
ঠিক আছে। আমি অপেক্ষায় থাকলাম।
লিয়াকত খান চাইলে তাকে নিয়োগ দিয়ে রাখতে পারবেন। তিনি বলতে পারতেন, আপনি আস্তে আস্তে টিম গোছান। সময়-সুযোগমতো আমরা মার্কেটে আসব। তা তিনি করেননি। অথচ হাবিবুর রহমানকে দুই বছর বসিয়ে বেতন দিয়েছেন। ড্রাইভারসহ গাড়ি দিয়েছেন। সেটা তার গায়ে লাগেনি। তিনি বড় ভাইয়ের লোক! কাজেই তার ব্যাপারে কোনো কথা বলা যাবে না। অথচ বিপদে যে মানুষটি তার পাশে দাঁড়িয়েছিল তাকে তিনি ঘোরাচ্ছেন। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আপনাকে দিয়েই পত্রিকাটা করব- এসব আশ্বাসের বাণী শুনিয়েই খালাস!
আসিফ আহমেদ মনে মনে বলেন, লিয়াকত খানের কথা তার ভুলে যাওয়া উচিত। নেই নিচ্ছি করে সে সময় পার করবে। শেষপর্যন্ত নেবে না। এ কথা তাকে মুনমুন আহমেদ অনেকবার বলেছেন। কিন্তু মুনমুনের কথা তিনি কানে তোলেননি। মুনমুন ধৈর্য ধরছেন এটা ঠিক। ঠাণ্ডা মাথায় সংসার সামলাচ্ছেন। কিন্তু মাঝে-মধ্যে এমন সব কথাবার্তা বলেন- যা আসিফ মোটেই সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু কিছুই করার নেই। তিনি এখন বেকার। তার এই আপাতত বেকার জীবনটাকে কেউ মেনে নিতে পারছেন না। না স্ত্রী, না মা-বাবা, না আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধব। তারা সবাই বলেন, এখন কাজের সময়। এখন বসে থাকার সময় না। আসিফ আহমেদও সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন কেউ ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। সবাই পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন। যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়!
একদিন মুনমুন আহমেদ কিছুটা মেজাজ খারাপ করেই বললেন, তুমি লিয়াকত খানের ব্যাপারে কেন আশাবাদী বুঝতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, সে এখন পত্রিকা করবে না।
আসিফ আহমেদ কোনো কথা বললেন না। চুপ করে আছেন। ঠিক এই মুহূর্তেই লিয়াকত খান তার মোবাইলে ফোন দিয়েছেন। আসিফ আহমেদ দেরি না করে ফোনটা ধরলেন। হ্যালো বলতেই লিয়াকত খান বললেন, ভাইজান কেমন আছেন? অনেকদিন আপনার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি।
তেমন ভালো নেই। কদিন আগে আমার বড় ভাইটা মারা গেল!
কি বলেন! কী হয়েছিল? করোনা নাকি?
না ভাই। হার্ট অ্যাটাক। একটুও সময় দিল না। পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে গেল!
আহা! বড় কষ্ট পেলাম। বয়স কত হয়েছিল তার?
বেশি না। তেষট্টি।
হুম। আপনার মা-বাবা তো বেঁচে আছেন?
হ্যাঁ।
চিন্তা করবেন না। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আসিফ ভাই, আমি আপনার ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করছি। খুব শিগগিরই আপনাকে জানাব। ভালো থাকবেন ভাই।
আপনিও ভালো থাকবেন।
ফোন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুনমুন আহমেদ জানতে চাইলেন, কে ফোন করেছে লিয়াকত সাহেব?
হ্যাঁ।
কী বললেন উনি?
ভাইয়ের জন্য দুঃখ করলেন। আর বললেন, কিছুদিনের মধ্যে উনি জানাবেন।
দেখ, মোটেও সে ডাকবে না। এসব বলে সে সময় নিচ্ছে।
আসিফ আহমেদ শুধু দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন। কোনো কথা বললেন না।
অজিত কুমার এক সময় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসসে ছিলেন। সাংবাদিক হিসেবে তার অবস্থান বেশ মজবুতই ছিল। ওই অবস্থায় কারও চাকরি যাবে এটা কেউ ভাবতেও পারেনি। অথচ অজিত কুমারের চাকরি চলে গেছে। তার অপরাধ কী সে বিষয়ে তাকে কিছুই বলা হয়নি। পরে জানা গেল, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাসস থেকে ত্রিশ-চল্লিশজন সাংবাদিকের চাকরি গেছে। অজিত কুমার অনেকদিন শুয়ে-বসেই কাটিয়েছেন। পরে ইউএনডিপির একটি প্রজেক্টে ঢুকে নিজের মান বাঁচিয়েছেন। তা না হলে কতদিন যে বেকার থাকতে হতো কে জানে!
অজিত কুমারের সঙ্গে আসিফ আহমেদের সম্পর্ক বরাবরই ভালো ছিল। তবে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ একদিন অজিত কুমার ফোন করলেন আসিফ আহমেদের কাছে কুশলাদি জানতে চাইলেন। কোথাও যোগদান করেছেন কিনা সেটাও জানতে চাইলেন। যখন তিনি শুনলেন আসিফ কোথাও যোগ দেয়নি; সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ন্যাশনাল গ্রুপ পত্রিকা করবে। আপনি রাজি থাকলে আমি আলাপ করে দেখতে পারি।
ন্যাশনাল গ্রুপের ভাবমূর্তি তেমন ভালো নয়। মানুষজন এই গ্রুপটিকে মাফিয়া গ্রুপ বলে তিরস্কার করে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হলে নিজের মান-সম্মান বলে কিছু থাকবে না। বিষয়টা নিয়ে আসিফ আহমেদ ভাবতে লাগলেন। আসিফ তার মতামত দিতে দেরি করাতে অজিত কুমার বললেন, কি হলো; কিছু বলেন!
না মানে...
আমি আলাপ করি। কথাবার্তা বলতে তো দোষ নেই। কী বলেন?
আচ্ছা ঠিক আছে। কথা তো বলাই যায়।
ঠিক আছে। আপনাকে আমি পরে জানাব। ভালো থাকবেন।
আপনিও ভালো থাকবেন অজিত দা।
ফোন রেখে আসিফ আহমেদ সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। ন্যাশনাল গ্রুপ নিয়ে ভাবেন। এই গ্রুপের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেগুলো তার মনের ওপর দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। তিনি মনে মনে বলেন, না না! কোনো মাফিয়া গ্রুপের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাই না! সারা জীবন বেকার থাকলেও না!
১৬
বৈরম খানের মেজাজ আজ কিছুটা ঠাণ্ডা। কদিন ধরে তার উত্তাপ-উত্তেজনায় বাসাটা একটা দোজকখানায় পরিণত হয়েছিল। কেউ হাসতে পারত না। প্রাণখুলে কথা বলতে পারত না। কেউ উচ্চস্বরে কথা বললেই তাকে তুলাধোনা করা হতো। আজ সবার মধ্যেই একটা স্বস্তিভাব।
বৈরম খান নাশতা শেষ করার পর তার সামনে চা এগিয়ে দিলেন দিলরুবা খান। তিনিও এক কাপ চা নিয়ে তার কাছে বসলেন। বৈরম খান চায়ে চুমুক দেওয়ার পর দিলরুবা খান বললেন, চা ঠিক আছে?
বৈরম খান ইতিবাচক মাথা নেড়ে আবার চায়ে চুমুক দিলেন। দিলরুবা খান গলার স্বর নরম করে বললেন, তোমার কি হয়েছিল বলো তো!
আমার কিছু হয়নি। হয়েছে তোমার ছেলের।
বিস্ময়ের সঙ্গে দিলরুবা খান বললেন, মানে! ও আবার কী করল?
কী করেনি সেটা বলো? ওর জন্য আমার নাক-কান সব কাটা গেছে!
কেন? কী করেছে?
এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে তোমার ছেলের অন্তরঙ্গ ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। সেই মেয়েটি কয়েকদিন আগে আত্মহত্যা করেছে। তার সঙ্গে নাকি তোমার ছেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সে মেয়েটিকে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে রাখত।
এসব তুমি কি বলো! আমার ছেলে এসব করেছে! ষড়যন্ত্র নয় তো!
যড়যন্ত্র হতে পারে। ফলবান বৃক্ষে মানুষ ঢিল ছুড়বেই। কিন্তু সেই সুযোগ আমরা দেব কেন? তাছাড়া ওর সঙ্গে মেয়েটির ছবি দেখে কেউ বলবে না, ওই ছবি সুপার ইম্পোজ করা। ওর স্ত্রী মারা গেছে কয় মাস হয়েছে? এর মধ্যে এমন একটা ঘটনা!
দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে দিলরুবা খান বললেন, এমন কুসন্তান আমি জন্ম দিলাম!
জন্ম তো তুমি একা দাওনি! আমি ওর জন্মদাতা বাবা; তাই না! কোথাও মুখ দেখানোর উপায় আছে?
ওকে ত্যাজ্য করে দাও। আমাদের কোনো সন্তানের প্রয়োজন নেই। কুসন্তান থাকা না থাকা সমান কথা!
স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে বৈরম খান বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু আগে তো ওকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে হবে! তার পর ওকে ত্যাজ্য করব নাকি, গুলি করব সেই সিদ্ধান্ত নেব।
দিলরুবা খান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার দুই চোখে জলের ধারা নামে। তিনি ধরা গলায় বলেন, আমাদের একমাত্র ছেলে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। সে কোথায় দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে! অথচ সে সবার মুখে কালিমা লেপন করে দিয়েছে! হায় আল্লাহ! এই কাণ্ড দেখার আগেই তুমি কেন দুনিয়া থেকে আমাকে নিয়ে গেলে না!
বৈরম খান দিলরুবা খানের কাঁধে হাত রাখলেন। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আর দুঃখ করে কি করবে! হয়তো আমাদের পূর্ব-পুরুষদের কারও পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে হচ্ছে আমাদের। তা না হলে ছেলে এমন কাণ্ড ঘটাবে কেন?
দেশের গণমাধ্যমের চরম দুর্দশা চলছে। গণমাধ্যমের ওপর মানুষের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। কোনো খবরকেই এখন আর তারা বিশ্বাস করে না। তাই তাদের ক্ষোভ ঝাড়ছে ফেসবুকে। নানা ইস্যুতে মানুষ সোচ্চার হয়ে উঠছে। মাঠের রাজনীতিও মার খাচ্ছে ফেসবুকের কাছে। অনেক ক্ষেত্রে ফেসবুকই মাঠের রাজনীতিকে গরম রাখছে। এ এক কঠিন পরিস্থিতি! ফেসবুকে যে বিষয়টি ইস্যু হচ্ছে সেটির প্রতি সরকারও নজর দিচ্ছে এবং তার সমাধান হচ্ছে। দিনে দিনে ফেসবুক রাজনৈতিক শক্তির চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
চলবে...