[ তৃতীয় পর্ব]
এ সময় একজন এসে রুকুদের পাঠচক্রের অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে গেল। অন্য দিনের চেয়ে আজ এখানে অনেক ভিড়।
ইতোমধ্যেই রুকুরা জেনে গেছে কোটা পুনর্বহাল করে কোর্ট রায় দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের দলমত নির্বিশেষে ছাত্রদের সারা জীবনের চাওয়া বিসিএস পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ এক কলমের খোঁচায় অর্ধেক হয়ে গেল।
চারদিকে জটলায় বসে শিক্ষার্থীরা তর্ক করছে। বাইরে মিছিলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদী মিছিল বের করেছে।
কী করণীয় স্থির করতে পারছে না রুকু আর সুমাইয়া আপা। অবশেষে বক্তার মুখোমুখি হওয়ার সময় হলো। জীবনের এই আজন্ম লালিত স্বপ্ন মুহূর্তের অনুষ্ঠান কেন এইরকম এক মন খারাপ করে দেওয়া সময়ে হয়? কেন?
-আপনি মেধাবী ছাত্রী। তৎক্ষণাৎ যুক্তিযুক্ত কথা বলার ক্ষমতা আপনার আছে। এটিই বিসিএস পরীক্ষায় সাফল্যের চাবিকাঠি। তবে কোটার রায় তো শুনেছেন। এ রায়ের ফলে মেধার ভিত্তিতে বিসিএস পরীক্ষা কঠিন হয়ে গেল। এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি আঘাত।
- এখন কী হবে?
রুকু ভেবেছিল, কোনো কথা তার মুখ দিয়ে বের হবে না। কিন্তু বের হলো এবং খুবই যৌক্তিক একটি প্রশ্ন বের হলো, এখন কী হবে।
- ওয়েল। যেহেতু সাধারণ শিক্ষার্থীদের এটি কমন ইন্টারেস্ট মনে হয় এই রায় ওরা টিকাতে পারবে না। তবে সে জন্য সবাইকে নিজেদের স্বার্থে রাস্তায় নামতে হবে, নামতে হবে একটি সংগঠিত রাষ্ট্রীয় শক্তির বিরুদ্ধে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে।
সুমাইয়া আপা বললেন, সেটি কীভাবে সম্ভব? রাষ্ট্র মানে তো সংগঠিত প্রশিক্ষিত বাহিনী। তার ওপর তারা কোটা দিয়ে যুগের পর যুগ রাষ্ট্রের বাহিনী, সাংবিধানিক সংস্থা, মিডিয়া সবকিছুকে নিজেদের কোটারিভুক্ত করে নিয়েছে। ওদের বিরুদ্ধে আমরা কী করব? কী করতে পারব?
সুমাইয়া আপার রাজনৈতিক জ্ঞান রুকুকে মুগ্ধ করে।
-আপনার প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর আছে। যেহেতু স্বৈরাচারের কারণে শিক্ষার্থীদের মতো কৃষক শ্রমিক ব্যবসায়ী চাকরিজীবী সব মানুষই বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, কোটাবিরোধী আন্দোলনকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমরা প্রথমে গ্রামেগঞ্জে যাব, জনে জনে বোঝাব। এদিকে রাজপথে চলবে আন্দোলন। জানি সরকার এ আন্দোলন দমন করতে সর্বস্ব নিয়োগ করবে; শহরের আন্দোলন হয়তো থামিয়েও দেবে, কিন্তু সে পর্যায়ে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও হবে; জনতার সংগঠিত শক্তির সামনে কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারে না। তাই জনতার সেই শক্তি সঞ্চয়নই এখন আসল কাজ।
- সেটি কীভাবে করবেন, এখনো ঘোরের মধ্যে থাকা রুকু প্রশ্ন করে।
- আমরা পুরো দেশকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করেছি। প্রতিটি জোনে জনশক্তি ঠিক করা হবে। শহরের আন্দোলন দমাতে এ সপ্তাহেই সরকার ঈদের বন্ধ দিতে যাচ্ছে। তারা ভাববে, আন্দোলন অবদমিত হয়ে গেছে; কিন্তু আমরা এই সময়টাই কাজে লাগাব। যখন ঈদের পর ঢাকার আন্দোলন প্রকাশ্য হবে আর সেই আন্দোলন দমানোর প্রয়াস পাবে সরকার, চারদিক থেকে তখনই লোকজন ঢাকাগামী হবে। আমরা প্রাথমিক প্ল্যান করলাম, তারপর ধীরে ধীরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা, মসজিদ, মন্দির, জেলে, কৃষক, দোকানি, শ্রমিক- সবাই ইনভলবড হবে। তখন প্রতিদিনের আন্দোলন পরবর্তী দিনের আন্দোলনের গতিধারা নির্মাণ করবে। এভাবেই কোটা আন্দোলন একদিন রাজনৈতিক রূপ পাবে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জনগণের আন্দোলন হয়ে উঠবে।
রুকু আর সুমাইয়া আর কিছু না বলে থেমে যায়। যদিও রুকু জানত, ঈদের বন্ধ শিগগিরই শুরু হবে; তবে তার আজন্ম লালিত আশাকে হতাশায় নিমজ্জিত করা কোটার সংবাদ নিয়ে গ্রামে যাবে এ কোনো দিন কল্পনা করেনি সে। এ কি কোনো দিন কল্পনা করে কোনো শিক্ষার্থী?
এ সময় হঠাৎ তাদের সচকিত করে বক্তা বললেন, আমি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জোনে যাবে। বোয়াল ভাসা নদীর অববাহিকা বরাবর যত জায়গা আছে সব জায়গায় যাব জনে জনে। আপনাদের বাড়ি যেহেতু ওই দিকে, আমাদের গ্রুপে জয়েন করতে পারেন।
এ যেন মেঘ না চাইতে জলের মতো রুকুর কাছে। সব হারানোর বিপরীতে এ মানুষটির সঙ্গ পাবে সে তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি জীবনে আর কী হতে পারে!
দুজন এক বাক্যে সাড়া দিল।
আন্দোলনের বুলেটিন, পথনকশা, কন্টাক্ট, প্রথম মিটিংয়ের স্থান ইত্যাদি বুঝে নিতে রাত হয়ে গিয়েছিল। রুকু ভাবতে থাকল, এই একটি দিনে তার জীবনের কত কিছু উলট-পালট হয়ে গেল।
একটি দিনের সকাল আর সন্ধ্যায় কত পার্থক্য!
পর্ব- ২
শ্রাবণ দিনের বিকেল। ঢাকা শহরে এ সময় ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। তার ওপর আজ আকাশে মেঘ করেছে। রুকু নাম না জানা গ্রামের এক চালা ঘরের দেউড়িতে বসে চা পান করছিল। এখানকার চায়ের দোকানগুলো এমনই। চা পানরত গ্রামীণ লোকগুলো তার দিকে তাকাচ্ছিল, বারবার। মানুষ এমন সুন্দরও হয়!
রুকু সুন্দরী। বিশেষ করে তার চোখ, শত্রুর তাড়া খাওয়া চকিত হরিণীর মতো এমন চোখ পৃথিবীতে কে কখন দেখেছে। কিন্তু মিড নাইট ব্লু প্যান্টের ওপর টাই-ডাই জিন্সের শার্ট পরে সে ছেলেদের ছদ্মবেশ নিয়েছে। শহরে এ পোশাকে সে দিব্যি চলাফেরা করে, কেউ কোনোদিন ধরতে পারেনি। তাহলে কি গ্রামের লোকগুলোর তৃতীয় নয়ন আছে! রুকু ভাবল, বিপ্লব শেষ হয়ে গেলে একদিন তাকে গ্রামীণ আর শহুরে মানুষদের আইকিউয়ের তুলনামূলক বিচার করে দেখতে হবে।
কিন্তু এখন বৃষ্টি এল বলে। তেঁতুলঝরা গ্রাম বহু দূরের পথ। সে আসন্ন বৃষ্টির মুখে উৎসুক গ্রামীণ কয়েকটি চোখ পেছন ফেলে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
রুকুর কাছে এখনো অদ্ভুত লাগছে, ছেলেটি ডাক দিল, অমনি সে বেরিয়ে এল। কোথায় যাবে, কতদূরের পথ কিছুই জানা নেই, শুধু বলা হলো শহরের পূর্ব প্রান্তে বারৈয়াঢালাতে যাও, তারপর পথ তোমাকে দেখিয়ে নিয়ে যাবে তেঁতুলঝরা গ্রামে, যেখানে একটি হরিতকী বৃক্ষতলে আমি অপেক্ষায় থাকব। ব্যস আর কিছু নেই, পাঠচক্রের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ফেলে চুপিসারে পালিয়ে আসা। প্রেম এমনো হয়!
বারৈয়াঢালাতে এসে রুকু একটুখানি থামল। এখানে ধলেশ্বরী নদী ভাটির দিকে বাঁক নিয়েছে। নদীতীর জুড়ে আসন্ন বৃষ্টির প্রস্তুতি। কিষানিরা তীরে শুকাতে দেওয়া ধান ত্রস্তে গোলায় ভরছে। একজন রাখাল গো-পালের দল তাড়িয়ে বাথানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। রাখালের গায়ে, গরুর পায়ে বৃষ্টি দিনের অলসতা লেপ্টে আছে।
নদীর বাঁকে এসে রুকু ভাবছে তেঁতুলঝরা গ্রামের পথ কোন দিকে। সে বলেছিল, পথই তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। এখন কোথায় সে পথ, আর কোথায় বা পথের দিশারি!
বিস্রস্ত-চিত্তে তার ক্লান্ত চোখ দুটি নদীর বুকে একটি ছই-দেওয়া পানসি নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকল। নৌকাটির গায়ে বেলা শেষের এক খণ্ড ক্ষয়িষ্ণু আলো প্রিয়ার গালে প্রেমিকার শেষ চুম্বনের মতো জড়িয়ে আছে, আর সেই আলোতে এমন সময় দেখা গেল সেই মুখ।
ছইয়ের ভেতর থেকে বের হয়ে রুকুর দিকে তাকিয়ে থাকল ভাসা ভাসা সেই দুটি চোখ, যার আহ্বানে স্লোগান-মুখরিত পাঠচক্রের মিটিং ছেড়ে রুকু এই বিরানা প্রান্তরে এসে হাজির হয়েছে।
রুকুর একবার ইচ্ছে হলো, তাকে ডাকে; ডেকে বলে, দেখা যদি হলোই কেন তাকে নায়ে তুলছে না সে।
কিন্তু তার অন্তরের চিন্তা অধরের মুখে আসার আগেই নদীতীর সুনসান করে এতক্ষণ আসি আসি করে যে বৃষ্টি আসেনি তা এসে পড়ল। আর সেই বৃষ্টির আবছায়ায় রুকু দেখল, ছই দেওয়া নৌকাটি নদীর তীর বরাবর গ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রুকু বুঝল, এটিই ‘পথই তোমাকে পথ দেখাবে’র নমুনা। সে টের পেল, তার শিরায় শিরায়, প্রবাহিত রক্তের অণুতে অণুতে এক অব্যক্ত আনন্দের শিহরণ নদীর ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু টের পেল না, কখন তার পা দুটি তাকেও সেই পথের দিকে রওনা করিয়ে দিয়েছে।
এদিকে পথচলতি দু-একজন মানুষ বিহনে সবকিছু নির্জনতার অধিকারে চলে গেছে। নদীতীরের পল্লিগুলোতে মিটি মিটি আলো জ্বলে উঠেছে। একটি ঘরের দাওয়ায় একজন বালক মুখে আঙুল পুরে পথের দিকে, পথ চলতি রুকুর দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছে। তার অপাপবিদ্ধ মনে প্রশ্ন জাগছে, এই মেঘ মেদুর বরষায় এমন সোমত্ত মেয়েটি একাকী কোথায় পথ চলেছে?
নদীর তীরে ধলেশ্বরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা দেয়াল। দেয়াল জুড়ে লেখা, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। রুকুর ভালো লাগছিল, তাদের আন্দোলন এই নিভৃত পল্লিতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে বৃষ্টি নেই। পল্লিগ্রাম বিকেলী সূর্যের আলোয় অলস শুয়ে আছে। ডানে নদীর একটি ছোট্ট শাখা গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়েছে। শাখা নদীর সেতু পাড় হলে একদল ভিক্ষুর সঙ্গ পেল রুকু। তাদের গায়ে কঠিন চীবর। প্রাচীন পালি ভাষায় লেখা মন্ত্র যপে তারা পথ চলছে। রুকু বুঝতে পারল এটি একটি বৌদ্ধ গ্রাম। নদীর দিকে পেছন ফিরে স্বয়ং তথাগতের একটি সোনালি মূর্তি নির্ভরতার হাসি দিয়ে যেন বা রুকুর দিকেই তাকিয়ে ছিল। তার একহাতে জপমালা অন্য হাত সমাধি মুদ্রায় আচ্ছন্ন।
রুকু কী করণীয় বুঝে উঠতে পারছে না। হঠাৎ দেখল, ভিক্ষুর দল করজোড়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই করল সে। মহাপরিনির্বাণের কোনো অচেনা জগতে বিচরণশীল বুদ্ধ কি ভাবলেন জগতের কে তার হিসাব করে!
এখানকার নদীতীর হেলেঞ্চা আর বন-কলমীর দামে নিবিড়। নদীর নীল জল গোলাপি ফুলে আচ্ছন্ন। রুকু মনে মনে আওড়াল-
বেগুনি রঙের রসে ঢলঢল দু’খানি ঠোঁটে,
মরমের মধু উথলি যেন বা উছলি ওঠে।
এতটুকু পথ চলতে হাঁপিয়ে গিয়েছিল রুকু। পথের পাশে একটি টং দোকানে বসল সে। দোকানে নিম্নবিত্ত মানুষের ভিড়। প্রায় সবাই চায়ে বনরুটি আর বিস্কুট চুবিয়ে খাচ্ছে। রুকু জানে, পাশ্চাত্যে এটাকে বলে ডাঙ্কিং। আর যারা এটা করে তাদের ডাঙ্কার বলে সমাজে হেয় করা হয়। কিন্তু রুকু এও জানে এসব মানুষের সহজিয়া জীবন, জীবনের স্বাদ শহুরে মানুষজন কোনোদিন আস্বাদন করতে পারে না। সবকিছু ছাপিয়ে তার হঠাৎ ইচ্ছে হলো, কোনোদিন পৃথিবীর কোনো এক দূরতম নিভৃত কোণে একটি কুটিরের নিরালায় যদি সেই ভাসা ভাসা চোখের মানুষটির সঙ্গে জীবনটা এই ধলেশ্বরী নদী তীরের হংস হংসীর মতো কাটিয়ে দিতে পারত!
নিজের চিন্তার জগৎ থেকে দোকানির ডাকে বাস্তবে ফিরল রুকু। ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা এগিয়ে দিতে দিতে দোকানি বললেন, একটি ভাপা পিঠা কি চেখে দেখবেন?
-না, শুধু চা-ই চলবে।
-শেরপুরের তুলসীমালা চালে যশোরের পাটালি গুড় দেওয়া ভাপা পিঠা? নেবেন একটা?
- না। শুধু চা-ই দেন,
-একটা হাত ঝাড়া পিঠা দিই তাহলে?
-রুকুর ভ্রু একটু কুঞ্চিত হলো। কিন্তু অজানা জায়গা বলে কথা। বললো,
-ঠিক আছে, দেন একটা।
কিন্তু খেয়েই বুঝল, গ্রামের মুরুব্বি ঠিকই বলেছেন। এ পিঠার কামড়ে কামড়ে গ্রামীণ মুগ্ধতা জড়িয়ে আছে।
মুরুব্বি দোকানি বললেন, এ পিঠা রূপগঞ্জের বালাম চালের বানানো। মায়ের হাতের পিঠা।
-আপনার মা বানিয়েছেন এ পিঠা?
-কী যে বলেন ভাই। আমি তো নিজেই সত্তরে পা দিলাম। আমার মা তো চলে গেছেন সেই কবে। সুতিকা রোগে-
-এই যে বললেন, মায়ের হাতে বানানো পিঠা? রুকু তাকে কথা শেষ করতে দেয় না।
-ও। এই মা তো সবার মা, দেশমাতৃকা। যিনি নিজের হাতে পিঠা বানান, নকশিকাঁথা বোনেন, ছোট্ট ছেলেকে ঘুম পাড়ান, ছেলে বড় হলে বাইরে থেকে আসলে হাতপাখায় তাকে শীতল করেন, বিপদে আপদে তার আঁচলের তলায় সন্তানকে ঢুকিয়ে ফেলেন। এই মাকে আমি একার মা বলি কীভাবে?
-জ্ঞানের কথা।
-কিছু বললেন?
-না। আমার এখনো অনেক কিছু শেখার বাকি।
-দোকানি কিছুক্ষণ চুপ মেরে থাকলেন। তারপর একটু উশখুশ করে সামনে ঝুঁকে চুপিসারে বললেন-
-শহরে আন্দোলন জমছে কেমন? আমরা কিন্তু প্রস্তুত।
রুকু একটু হাসল। কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। তার অন্তরাত্মা ধলেশ্বরী নদীতীরে এক অজানা গ্রাম্য মানুষের কথায় শ্রাবণের ভরা নদীর মতো দু’কূল ছাপিয়ে গেল। তার মন বলল, আন্দোলন গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে কিন্তু মনের ভাব মুখে প্রকাশ করল না সে। দোকানিকে বলল,
-তেঁতুলঝরা গ্রাম আর কতদূর?
দোকানি আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে থাকল। বলল,
-এ তল্লাটে এমন নাম তো শুনিনি।
রুকু বুঝল, এ লোক নিতান্তই ঘরকুনো। ‘পথই তাকে পথ দেখাবে’ বলেই আবার পথে নেমে পড়ল সে।
এদিকে পথ নির্জন। ছায়া ঘনিয়েছে বনে বনে। রুকু ভয় পেয়ে গেল। এ সময়, এ জলার্দ্র, মেঘের সন্ধ্যার সময়ে নদীতীরের আঁধারে বিশেষ সৃষ্টিদের চলাচল শুরু হয়।
ছোটবেলায় রুকুর দিমা গল্প করতেন, নদীর পাড় দিয়ে হাঁটার সময় কেউ যদি পেছন থেকে নাকি সুরে বলে, ‘বড় ক্ষুধা লেগেছে, একটি মাছ দাও গো’ খবরদার পেছনে তাকাবে না।
বড় চাচার মেয়ে, বড়’বু প্রশ্ন করতেন, তাকালে কী হবে দি’মা?
-কী আর হবে, পরদিন নদীতে অর্ধপোতা অবস্থায় তোকে উদ্ধার করা হবে।
ভয়ে রুকুরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরত। সেই রুকু এখন বড় হয়েছে, বিপ্লবী হয়েছে। তার কি ভয় পেলে চলে?
চলবে...