বাংলা উপন্যাসের জনপ্রিয়তার ধারায় আকবর হোসেন গুরুত্বপূর্ণ নাম। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া গ্রামে জন্ম, ১ অক্টোবর ১৯১৭, মৃত্যুবরণ করেন ২ জুন ১৯৮১, ঢাকার ১৮ উত্তর কমলাপুর নিজ বাসভবনে। তিনি খুব সাহসের সঙ্গে তার উপন্যাসের বিষয়বস্তু নির্বাচন করেছিলেন। গতানুগতিকতাকে পরিহার করে জীবন ও সমাজের গভীর সত্য ও ক্ষতকে শিল্পভাষ্যে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন উপন্যাস সাহিত্যে। তার উপন্যাস শুধু নির্মাণের নাম নয়, দর্শনেরও নাম। উপন্যাসের চরিত্রের ভেতর দিয়ে তার প্রয়াস ঘটিয়েছেন। পঞ্চাশ থেকে সত্তর- এই তিন দশক তিনি বাঙালি পাঠকদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রাখতে সক্ষম হন। বিশেষ করে তার অবাঞ্ছিত উপন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যে বিশেষ একটি স্থান দখল করে নিতে সক্ষম হয়। উপন্যাসটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। উপন্যাসটির জন্ম ও প্রকাশ-ভাগ্যে ঘটেছিল বহুমাত্রিক নাটকীয়তা।
আকবর হোসেন কলকাতা রিপন কলেজে বিএ ক্লাসে অধ্যয়নকালে তার প্রথম উপন্যাস ‘অবাঞ্ছিত’ রচনা করেন। বিখ্যাত এ গ্রন্থটি মাত্র আঠারো দিনের রচনা। প্রথম পাণ্ডুলিপিতে বিভিন্ন চরিত্রের নাম হিন্দুয়ানি নামাঙ্কিত করেছিলেন। দেশ বিভাগের পর গ্রন্থ প্রকাশের আগে তা পরিবর্তন করে প্রায় সব চরিত্রের নাম মুসলিম পরিবারে প্রচলিত নামানুসারে নামাঙ্কিত করেন। আমরা প্রথম পাণ্ডুলিপিতে ইন্দ্র, শীলা, মীনাক্ষী এবং নরেনকে; পরবর্তীতে ফিরোজ, রোকেয়া, রেখা এবং আমীর রূপে পাই। সমাজ, ধর্ম এবং রাষ্ট্র জীবনে একটা অবাঞ্ছিত সন্তানকে মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করার এ প্রয়াস লেখকের মধ্যে কীভাবে দানা বেঁধে উঠেছিল তারই স্বরূপ লক্ষ করা যায় এ গ্রন্থে।
‘অবাঞ্ছিত’ পাণ্ডুলিপি নিয়ে তিনি দেখা করেছেন অনেক লব্ধ প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের সঙ্গে। তাদের মূল্যবান মতামত জানার প্রত্যাশায়। ১৯৪১ সালে রচিত এ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রথমে গিয়েছিলেন গোপাল হালদারের কাছে। দীর্ঘ এক বছর তিনি সেখানে ঘুরেছেন। এরপর বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪), কাজী আব্দুল ওদুদ (১৮৯৮-১৯৭০), নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১৯১৮-১৯৭০), এস ওয়াজেদ আলী ও কবি জসীম উদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকের দ্বারে ধরনা দিয়েছেন বছরের পর বছর। কিন্তু কেউই তার এ উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি পড়েননি।
অবাঞ্ছিতর পাণ্ডুলিপি আকস্মিকভাবে প্রখ্যাত ফিল্ম ডাইরেক্টর সুশীল মজুমদারের স্ত্রীর হস্তগত হয়। এটি ১৯৪৬ সালের প্রথম দিকের ঘটনা। সুশীল মজুমদারের স্ত্রী পাণ্ডুলিপিটি পড়ে মুগ্ধ হন এবং পাণ্ডুলিপির কাহিনি সংক্ষিপ্তাকারে লিখে বোম্বাইয়ে অবস্থানরত স্বামীর নিকট পাঠিয়ে দেন। সুশীল বাবু এটি পড়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠলেও দাঙ্গার ভয়াবহতার কারণে এর বাস্তবায়ন আর ঘটেনি।
দেশভাগ হওয়ার পর তিনি ঢাকায় ‘দিলরুবা’ নামক একটি মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ছাপাবার জন্য পাণ্ডুলিপিটি পত্রিকার সম্পাদককে দেন। দীর্ঘ এক বছরে একটা বাক্যও ছাপার অক্ষরে বের হয়নি। তার পর একদিন ‘দিলরুবা’ পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বেশ কয়েকদিন ওই পত্রিকা অফিসে গিয়ে তালাবদ্ধ দেখে ফিরে আসেন। তার পর একদিন সহ-সম্পাদকের কাছে জানতে পারেন ‘দিলরুবা’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। সবকিছু ফেলে দেওয়া হয়েছে পাশের ডাস্টবিনে।’ এটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেই ডাস্টবিনের ময়লা কাগজপত্রের মধ্যে পাণ্ডুলিপিটি খুঁজতে শুরু করেন এবং ভাগ্যক্রমে একপর্যায়ে পেয়েও যান।
১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাস। কলকাতার সিটি কলেজের এক হিন্দু প্রফেসর এসেছিলেন ঢাকার ওয়ারীতে শ্বশুরালয়ে; তিনি তার শ্যালকের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপিটি পড়ে দারুণভাবে মুগ্ধ হন এবং এটি কেনার জন্য ভদ্রলোক প্রস্তাব দিলে লেখক কোনো কিছু চিন্তা না করে বলেন: ‘হ্যাঁ বেচতে পারি, সাড়ে তিন হাজার টাকা পেলে।’ ভদ্রলোক রাজি হন। কিন্তু যখন জানলেন লেখক হিসেবে গ্রন্থে তাঁর (আকবর হোসেন) নাম থাকবে না। তিনি আর রাজি হননি। ফিরিয়ে দেন সাড়ে তিন হাজার টাকা।
আকবর হোসেন একপর্যায়ে পাইওনিয়ার প্রেসের কর্ণধার এম এ মোহাইমেনের শরণাপন্ন হন। তিনি আশ্বস্ত করেন বইটি প্রকাশের। কিন্তু কাগজ বাবদ ১৩০০ টাকা দিতে অনুরোধ করেন। আকবর হোসেন রাজি হন। ব্যবসায়ী ধনী ছোট ভাইয়ের কাছে টাকা সহযোগিতা চাইলে, তিনি তাকে হতাশ করেন। শেষপর্যন্ত কুষ্টিয়ার কয়া গ্রামের নিজের বসতবাড়ি বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারই জ্ঞাতিভ্রাতা লুৎফর রহমানের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করেন। বাড়ি বিক্রির টাকায় তার সুবিখ্যাত উপন্যাস অবাঞ্ছিত ছাপার অক্ষরে বের হয় ১৯৫০ সালে। বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সে সময়ে এটিকে কামাল আহমেদ চলচ্চিত্রে রূপ দেন। সিনেমাটিও ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা লাভ করে। এ বইয়ের টাকায় তিনি ঢাকার উত্তর কমলাপুরে দুটি বাড়ি তৈরি করেন।
অবাঞ্ছিত বিবাহবহির্ভূত এক সন্তানের জীবন কাহিনি নিয়ে রচিত হলেও বাংলা বৈপ্লবিক উপন্যাস ধারায় অবাঞ্ছিত গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলার হিন্দু-মুসলমান তরুণ সম্প্রদায় যেভাবে স্বদেশি আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, দেশ স্বাধীন করার দৃঢ়প্রত্যয়ে, অবাঞ্ছিত উপন্যাসে তা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।