এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হাঙ্গেরির ৭১ বছর বয়সী কথাসাহিত্যিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই। সুইডিশ অ্যাকাডেমি গতকাল এই পুরস্কার ঘোষণা করে। অ্যাকাডেমি বলেছে, তার ‘অনিবার্য এবং দূরদর্শী লেখালেখি, যা মহাবিশ্বের প্রলয়ংকরী সন্ত্রাসের মাঝেও শিল্পের শক্তিকে পুনরায় সুনিশ্চিত করেছে।’
লাসলো ১৯৫৪ সালে রোমানিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব হাঙ্গেরির ছোট্ট শহর জিউলাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘সাতানটাঙ্গো’ (১৯৮৫) জন্মস্থানের মতোই একটা অজপাড়াগাঁর পটভূমিতে লেখা। কমিউনিজমের পতনের ঠিক আগে হাঙ্গেরির গ্রামাঞ্চলে একটি পরিত্যক্ত যৌথ খামারে বসবাসকারী এক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা এই উপন্যাসে ইঙ্গিতপূর্ণ শক্তিশালী ভাষায় লিখেছেন লাসলো। ভেঙে পড়া এই গ্রামীণ মানুষের বিষণ্ণ এবং মন্ত্রমুগ্ধকর চিত্রায়নের কারণে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসটি প্রথমে হাঙ্গেরি এবং পরে ইউরোপ ছাড়িয়ে বিশ্বের সাহিত্যভুবনে সমাদৃত হয়েছে। এরও তিন দশক পরে ২০১৩ সালে এটি তাই মান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করে।
এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো নীরবতা এবং প্রত্যাশা, এ রকম বিষাদাক্রান্ত দৃশ্যপটে উপস্থিত হয়েছে, যা পাঠকের হৃদয়ে তীব্র অভিঘাত তৈরি করে। তারা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে শেষ সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখে। উপন্যাসের নাম থেকেই বোঝা যায় এই উপন্যাসে ‘শয়তানের’ উপস্থিতি ঘটিয়েছেন লাসলো। ঘটেছেও তাই। নৈতিকতার অবক্ষয়, প্রতারণা উপন্যাসের আখ্যানাংশজুড়ে রয়েছে। প্রতিটি চরিত্র অপেক্ষা করতে থাকে কোনো একটা অলৌকিক ঘটনার জন্য। এর শুরুতেই আছে কাফকায়েস্কীয় একটা বাণী: ‘সে ক্ষেত্রে আমি যার জন্য অপেক্ষা করছি, তা মিস করব।’ বেলা টারের পরিচালনায় উপন্যাসটি ১৯৯৪ সালে একটি অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী মৌলিক চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছিল।
প্রখ্যাত মার্কিন লেখক ও সমালোচক সুসান সন্টাগ ক্রাসনাহোরকাইকে তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মেলানকোলি অব রেজিসট্যান্স’ পড়ে সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের শীর্ষ কথাসাহিত্যিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কার্পাথিয়ান উপত্যকায় অবস্থিত একটি ছোট হাঙ্গেরীয় শহরে সংঘটিত তীব্র জ্বরতপ্ত ভৌতিক কল্পনানির্ভর গল্প ও নাটকীয়তার জন্য এটি অসাধারণ একটি উপন্যাস হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেছেন সাহিত্য সমালোচকরা। শুরু থেকেই পাঠকরা বিবমীষা জাগায় এমন একটি চরিত্র মিসেস প্লুমের সঙ্গে পরিচিত হয় পাঠক। তারপর ঘটতে থাকে নানা ভীতিকর ঘটনা। উপন্যাসটিতে অশুভ ঘটনার আবির্ভাব ঘটেছে অনেক।
ঘটনাগুলোর একটি নাটকীয় অংশ হলো, শহরে একটা ভৌতিক সার্কাসের আগমন ঘটেছে। সেই সঙ্গে ঢুকে পড়েছে বিশাল মৃত একটি তিমি। এরপর ঘটতে থাকে নানা ভয়ংকর ঘটনা। নৈরাজ্য আর সহিংসতার দ্বারা প্ররোচিত হয় অনেকে। সেনাবাহিনী এই নৈরাজ্য রোধে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে স্বৈরাচারী অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শৃঙ্খলার নামে বিশৃঙ্খলার মধ্যে নৃশংস কাণ্ড ঘটতে থাকে। সন্ত্রাসের প্রভাব থেকে কেউই রেহাই পায় না। এ ঘটনাকে লাসলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রিত করেছেন। পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হতে পারে এ যেন আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ চেনা গল্প।
উপন্যাসটির শৈলীগত দিকটিও উল্লেখযোগ্য। প্রবাহিত দীর্ঘ বাক্যের দ্বারা গঠিত তার গদ্য। নানা বাঁক ঘুরে বাক্যটি পূর্ণবিন্দু বা ফুলস্টপের জায়গায় এসে থামে।
লাসলোর আরেকটি অসাধারণ উপন্যাস হচ্ছে ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ (২০০৬) বা যুদ্ধ এবং যুদ্ধ। আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘ব্যারন হেঙ্কহেইমস্ হোমকামিং’ (২০১৯)। দ্বিতীয় উপন্যাসটির বিষয় যদিও স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, কিন্তু লাসলো এই উপন্যাসে সাহিত্যের প্রথাগত রীতি-ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এই উপন্যাসে সমালোচকরা বলছেন, হতাশাগ্রস্ত ব্যারনের মাধ্যমে দস্তইয়েফ্স্কির ইডিয়ট ও জুয়ার আসক্তিতে আক্রান্ত চরিত্রের পুনর্জন্ম ঘটেছে। অনেক দিন পর এই ব্যারন আর্জেন্টিনা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি আশা করছেন, তিনি তার শৈশবের প্রণয়ীর সঙ্গে আবার মিলিত হতে পারবেন; যাকে তিনি কিছুতেই ভুলতে পারেননি। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে যাত্রাকালে তিনি তার জীবন এক বিশ্বঘাতক দান্তের কাছে অর্পণ করেন, যে ছিল বদমাশ সাঙ্কো পাঞ্জার নোংরা সংস্করণ।
চূড়ান্ত পর্বে উপন্যাসটি হাস্যরসাত্মক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের দ্বারা ব্যারন চমৎকার অভ্যর্থনার মুখোমুখি হন; কিন্তু উপন্যাসের এই বিষণ্ণ নায়ক তার করুণ জীবনের ভবিতব্যকে এড়াতে পারেন না।
এ ধরনের আখ্যানের সঙ্গে আরও বেশ কয়েকটি মহাকাব্যিক উপন্যাসের কথা বলা যেতে পারে। সে রকম একটি উপন্যাস হচ্ছে ‘হেরশেখ্ট ০৭৭৬৯’ (২০২৪)। এর আখ্যানে পাঠক কার্পেথিয়ানদের কোনো ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মধ্যে নিজেদের খুঁজে পাবেন না। খুঁজে পাবেন এই সময়ের জার্মানির থুরিংগেনের ছোট শহরের চমকপ্রদ বিশ্বাসযোগ্য ঘটনা এবং তার চিত্রায়নের মধ্যে। এর চরিত্রগুলো সামাজিক নৈরাজ্য, হত্যা এবং অগ্নিসংযোগের দ্বারা জর্জরিত। সমালোচকরা বলছেন, এই উপন্যাসের একটি চরিত্র যেন আতঙ্কিত ভীতিকর পটভূমিতে প্রখ্যাত কম্পোজার জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের শক্তিশালী উত্তরাধিকার হিসেবে অভিনয় করে চলে। এটি এমন একটি রচনা, যা এক নিশ্বাসে লেখা, এতে সহিংসতা এবং সৌন্দর্যকে ‘অবিশ্বাস্যভাবে সমন্বিত’ করেছেন লাসলো।
লাসলোর ‘হেরশেখ্ট ০৭৭৬৯’ শীর্ষক উপন্যাসকে মহান সমসাময়িক জার্মান উপন্যাস হিসেবে বর্ণনা করেছেন সমালোচকরা। এর নায়ক হেরশেখ্ট হলেন একজন উদার হৃদয়ের বিশ্বাসী মানুষ, যে শিশুর আদর্শ ধারণ করে আছে। ঠিক দস্তইয়েফ্স্কি নির্মিত পবিত্র বোকা যেন সে; ‘দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স’ (১৯৯৮) উপন্যাসের ভোলুস্কার মতো। তিনি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানো শক্তিগুলোর ওপর আস্থা রেখেছেন, কিন্তু একসময় আশাহত হন। তাতে তার প্রতিক্রিয়া হয় তীব্র। লাসলোর উপন্যাসে প্রায় ক্ষেত্রেই অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু ঘটে, এই উপন্যাসের উপসংহারেও সেটাই ঘটেছে।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাই মধ্য-ইউরোপীয় ঐতিহ্যের এক মহান লেখক, যা কাফকা থেকে থমাস বার্নহার্ড পর্যন্ত বিস্তৃত; অ্যাবসার্ডিটি এবং অদ্ভুত কিন্তু জীবনের নানা অনিবার্য পরিণামের দিকে ধাবমান। তিনি মননশীল, সূক্ষ্মভাবে প্রাচ্যের দিকেও ঝুকেছেন তিনি। গ্রহণ করেছেন প্রাচ্যের পটভূমি, গদ্যস্বর ও সুর। এর ফলে তার চীন ও জাপান ভ্রমণের পটভূমিতে পাই একগুচ্ছ লেখা। একটা হারিয়ে যাওয়া বাগানের প্রেক্ষাপটে তিনি লেখেন ‘আ মাউন্টেইন টু দ্য নর্থ, আ লেক টু দ্য সাউথ, প্যাথ্স্ টু দ্য ওয়েস্ট, আ রিভার টু দ্য ইস্ট’ (২০২২) উপন্যাসটি। এতে আছে রহস্যময় শক্তিশালী গীতিধর্মী গল্প, যে গল্পটি ঘটে কিয়োটের দক্ষিণ-পূর্বে। মানবিক অনুভূতির তীব্র প্রকাশ ঘটেছে এর আখ্যানে। অন্ধত্ব ও অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সাজানো এর সতেরোটি গল্প। সৌন্দর্য এবং শিল্পসৃষ্টির দিক থেকে গল্পগুলো অসমান্য বলা যায়। এই গল্পগুলো লাসলোর প্রধান রচনা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। তার প্রতিটি লেখাই আসলে বিশ্বসাহিত্যে যারা আসন করে নিয়েছেন, তাদের লেখার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্রমণের প্রতি তার রয়েছে দুর্মর আকর্ষণ। একবার তিনি ১৯৮৭ সালে কমিউনিস্ট হাঙ্গেরি ত্যাগ করে ফেলোশিপ নিয়ে এক বছরের জন্য পশ্চিম বার্লিনে এসেছিলেন। পরে পূর্ব এশিয়া, বিশেষ করে মঙ্গোলিয়া ও চীনে আসেন। সেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে লিখেছিলেন ‘দ্য প্রিজনার অব উরগা, ডিস্ট্রাকশন অ্যান্ড সরো বিনিথ দ্য হেভেনস’ উপন্যাসগুলো। প্রাচ্যের প্রতি তার রয়েছে সহজাত আকর্ষণ।
‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার’ বইটির জন্য তিনি ইউরোপজুড়ে ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছিলেন এবং কিছু সময়ের জন্য অ্যালেন গিন্সবার্গের নিউইয়র্ক অ্যাপার্টমেন্টে এসে থেকেছেন। তারা দুজনে আসলে খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। কিংবদন্তি এই বিট কবির সমর্থন তাকে বেশ প্রাণিত করেছিল বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। লাসলোকেও দেখা যায়, গিন্সবার্গের মতো পুঁজিবাদবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করতে।
লাসলো আসলে বিষণ্ণতা, চিন্তার সূক্ষ্ণতা, মহাকাব্যিক বিস্তার, ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের কারণে সমকালের শ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন। সাহিত্য সমালোচকরা তাকে উত্তর-আধুনিক লেখক হিসেবেও উল্লেখ করে থাকেন। অমানবিক পরিস্থিতি, আতঙ্কগ্রস্ত বিরুদ্ধ সমাজ, শোষণ, স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সব সময় উচ্চকণ্ঠ তিনি। রচনাশৈলীতেও আছে অভিনবত্ব। দীর্ঘ সর্পিল বাক্য, বিষণ্ণ থিমের উপস্থিতির কারণে তার লেখাকে সমালোচকরা একদিকে গোগোল ও মেলভিল এবং অন্যদিকে কাফকার সঙ্গে তুলনা করে থাকেন।
নোবেল কমিটি নানা সময়ে অনেক বিতর্কিত লেখককে পুরস্কার দিলেও এবার যে তারা বিশ্বমানের একজন যোগ্য লেখককেই পুরস্কার দিয়েছে, সে কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।