ঢাকা ৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে দর্শকদের দুয়োধ্বনি হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৫৮ হাজার ৬৩৯ জন বাংলাদেশি লৌহজংয়ে ভাঙারি ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা আদিতমারীতে শিশু নন্দিনী হত্যার দায় স্বীকার পাওনা টাকার বিরোধেই খুন হন আরিফ আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম ইরানের সঙ্গে চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ করল যুক্তরাষ্ট্র আলফাডাঙ্গায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১ জনের মৃত্যু, আহত ৩ নতুন দায়িত্বে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. জাহিদ চট্টগ্রামের অপহরণকারীদের হুমকিমূলক চিরকুট,নিখোঁজ শিশু উজবেকিস্তানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে কলম্বিয়ার শুভ সূচনা ধোবাউড়ায় শিশু নিছামনি ধর্ষণ-হত্যার বর্ণনা দিলেন ৪ ধর্ষক গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক ১৩ অঞ্চলে ঝড়ের পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সতর্ক সংকেত রাসুল (সা.)-এর রাতের অভ্যাস কি ছিল? মেসি-দ্যুতিতে রঙিন বিশ্ব ভুল পরিকল্পনায় ঝুলে গেল মন্ত্রীদের জন্য মসজিদ নির্মাণ প্রকল্প মেসিতে মাতাল বিশ্ব বাঁশখালীতে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যুবকের মৃত্যু কুমিল্লায় কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ২ বিশ্বকাপে অভিষেকেই বিরল ভৌগোলিক কৃতিত্ব উজবেকিস্তানের ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন করেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান শেষ মুহূর্তের ইরেনকির গোলে পানামাকে হারিয়ে ঘানার জয়; খেলোয়াড়দের রেটিং দূরত্ব হাজার মাইল, উৎসব ক্যাম্পাসে তিস্তায় আরেকটি ব্যারেজ নির্মাণ হবে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী ফিফা বিশ্বকাপে কোচ হিসেবে পঞ্চম ব্যালন ডি’অর বিজয়ী হলেন ফাবিও ক্যানাভারো বিশেষ ‘লেগাসি’ ব্যাজ পরে মাঠে নামলেন রোনালদো, মেসি ও মদ্রিচ গ্রুপসেরার দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই শিশুদের স্বপ্নের কথা শুনলেন জাইমা রহমান প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে সিন্ডিকেট বিলুপ্তিসহ ৭ দাবি
Nagad desktop

আহমদ রফিক: শতকের প্রান্তে প্রয়াণ

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫, ১২:২৩ পিএম
আহমদ রফিক: শতকের প্রান্তে প্রয়াণ
ছবি: সংগৃহীত

আহমদ রফিকের সৃজনকর্মের বড় বৈশিষ্ট্য তিনি প্রতিটি কাজেই আবেগকে পরিহার করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন। লেখার ভুবনে তিনি একজন সত্যের বার্তাবাহী। জাতির বিবর্তনের ইতিহাস তিনি নির্মোহভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। আমাদের সমাজে সঠিক ও যৌক্তিক তথ্যের অপ্রতুলতার এ মন্দাদশায় তিনি আলোকোজ্জ্বল বাতিঘর।…

অনেকটা দীর্ঘজীবন পেরিয়ে শতকের প্রান্তে এসে গত ২ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দেহের নাশ হলো আহমদ রফিকের। ৯৬ বছরের জীবনের শেষভাগটা একাকীত্বে কেটেছে। স্ত্রী গত হয়েছেন ২০০৬ সালে। তার পর সন্তানহীন আহমদ রফিক যে জীবনটা বহমান রেখেছিলেন তা আনন্দদায়ক ছিল না। দুই বছর আগেও লেখালেখিটা জারি রেখেছিলেন। বাংলাদেশে আহমদ রফিকের মতো সার্বক্ষণিক লেখক বিরল। জীবনের প্রয়োজনে খণ্ডকালীন কিছু কাজে যুক্ত হলেও তিনি লেখালেখির জগৎকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে স্থির করেছিলেন। এজন্যই লেখালেখির ক্যানভাসটা বিশাল তার।
 
আহমদ রফিক ভাষাসংগ্রামী ও ভাষা আন্দোলন বিষয়ক গবেষক, একই সঙ্গে রবীন্দ্রচর্চার নিষ্ঠাবান গবেষক, দেশভাগ বিষয়ে আদ্যোপান্তের পর্যবেক্ষক, বিশিষ্ট কবি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের গতি-প্রকৃতির পর্যবেক্ষক। তার লেখালিখি শিল্প-সংস্কৃতির নানা শাখায় বিস্তৃত। প্রতিটি বিষয়ে আহমদ রফিক গভীর পর্যবেক্ষণ ও অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ স্বকীয় ধারায় সমুজ্জ্বল। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৯), একুশে পদক (১৯৯৫)-সহ দেশ-বিদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা ও স্বর্ণপদক পেয়েছেন।

আহমদ রফিকের সৃজনকর্মের বড় বৈশিষ্ট্য তিনি প্রতিটি কাজেই আবেগকে পরিহার করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন। লেখার ভুবনে তিনি একজন সত্যের বার্তাবাহী। জাতির বিবর্তনের ইতিহাস তিনি নির্মোহভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। আমাদের সমাজে সঠিক ও যৌক্তিক তথ্যের অপ্রতুলতার এ মন্দাদশায় তিনি আলোকোজ্জ্বল বাতিঘর। তিনি ছাত্রাবস্থায় উপলব্ধি করেছিলেন স্বতন্ত্র ভূমি পাকিস্তানের আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান অন্ধ আবেগে ১৯৪৬-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের বাক্সে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু মুসলিম লীগের অবাঙালি কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী সে স্বপ্নের কোনো দাম দেয়নি। বাঙালি মুসলমানকে তারা বারবার বিজাতীয় জ্ঞানে অবজ্ঞা করেছে, ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক প্রয়োজনে, মূলত মেকি ধর্মীয় ঐক্যের স্লোগান তুলে। বাঙালি মুসলমান তাতে দুলেছে। এমন সুস্পষ্ট বিষয়টি আহমদ রফিক আগেভাগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তার কর্মে ও লেখায় সেসব বিষয় প্রতিভাত হয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে আহমদ রফিক আন্দোলনের পূর্বাপর ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ততার সুবাদে বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন।

আহমদ রফিকের যৌবনকাল ছিল বর্ণিল। ১৯২৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্ম হলেও প্রাথমিক পড়াশোনা করেছেন নড়াইল ও মুন্সীগঞ্জে। ঢাকা মেডিকেলে ১৯৪৯ সালে তার ভর্তির সময় ঢাকা নগরী এক প্রাকৃত নগরী। তার গায়ে গ্রামীণ পৃথিবীর ঘ্রাণ। গাছপালাভরা মাঠ বিরল বসতির পাড়াগুলোয় পুকুর আর কাঁচামাটির পথ বুকে নিয়ে ঢাকা নগরী। রেসকোর্সের নরম ঘাসভরা মাঠ, লেকে শাপলা, শালুক, নীলপদ্ম, পাড়ে ঝাকড়া শিরীষ। দিলকুশার দীঘল দেবদারুর সারি, খিলগাঁওয়ে আমবাগানের দিঘি- সব মিলিয়ে এক ইন্দ্রপুরী। এমন পরিবেশে সমাজ বদলের ভাবনায় বোধ হয় পেয়ে বসেছিল আহমদ রফিককে। এই সমাজ বদলের আন্দোলন, পদ্ধতি ও প্রকরণ নিয়ে সতীর্থদের সঙ্গে মতভেদ থাকলেও এর প্রয়োজন সম্পর্কে সংশয় ছিল না। ছিল না কোনো দ্বিচারিতা। সাম্যবাদী চেতনাসম্পন্ন পূর্ণকালীন লোকজীবন কাটানো মানুষটি সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণের দক্ষতা দেখিয়েছেন। রাজনীতিকে চুলচেরা বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যৎকে দেখেছেন নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের জাগরণ ও বিস্তারে জোর প্রচেষ্টা বরাবরই ছিল তার লেখায়। তিনি বিশ্বাস করতেন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য ভূখণ্ড-ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধের উদ্ভাস এবং সেই চেতনায় আন্দোলিত পথে জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব, যা সত্যিকার অর্থে হতে পারে সর্বজনীন এক জাতিরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবে এর চেহারা-চরিত্রটা ভিন্ন। জনগণের নামে এবং জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে তাদেরই সহায়তায় শিক্ষিত এলিট ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা পূরণের মধ্যদিয়ে যে জাতীয়তার বিকাশ তা জনসাধারণের স্বার্থনির্ভর সর্বজনীন চরিত্র অর্জন করতে পারে না। এজন্য মধ্যবিত্ত ও সুবিধাভোগী শ্রেণির নগরকেন্দ্রিক বিকাশ ও তাদের স্বার্থপরতাই মূলত দায়ী। এ বিশ্বাস আহমদ রফিকের লেখায় প্রতিভাত হয়েছে।

বাংলাদেশের রবীন্দ্রচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ আহমদ রফিক। রবীন্দ্রবিষয়ক একাধিক গ্রন্থে বিষয়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে রবীন্দ্রপ্রতিভা নবরূপে পাঠকদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তার লেখার শিরোনামের মধ্যদিয়ে আহমদ রফিকের রবীন্দ্রচর্চার পরিচয় মেলে। রবীন্দ্র বিষয়ে তার আলোচনার শিরোনাম- রবীন্দ্রনাথ: সমাজ ও সম্প্রদায়, যন্ত্র, যান্ত্রিকতা ও রবীন্দ্রনাথ, মাতৃভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রগল্পে মধ্যাহ্ন-প্রকৃতির রূপ, রবীন্দ্র-চিত্রকলা প্রাকৃত আদিমতা, আরেক কালান্তরে, প্রজন্মের রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি প্রবন্ধে রবীন্দ্রচিন্তার সঙ্গে মানুষের পরিচয় ঘটানোর প্রয়াস রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুল ও জীবনানন্দ নিয়ে তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে। তার নজরুল বিষয়ক গ্রন্থ ‘বাঙলা আধুনিকতা ও নজরুল’ (২০১৮), জীবনানন্দের ওপর ‘জীবনানন্দ কবি প্রেমিক ও গৃহী’ (২০১৮) বিশেষ পাঠকপ্রিয়। 
নজরুলকে তিনি নানা মাত্রায় উপস্থাপন করে নজরুলচর্চার উৎসাহকে উসকে দিয়েছেন। মূল্যায়ন করেছেন ভেতর ও বাহির থেকে।

দেশভাগ পর্বে অনেক কিছু বিভাজনের রোয়েদাদ হলেও সংস্কৃতিকে তো আর ভূগোল দ্বারা বিভাজন করা যায় না। এজন্য ভৌগোলিক বিভাজনে যাই হোক, আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ঐকতানকে একটি জাতিরাষ্ট্রের বেদিমূল হিসেবে দেখেছেন আহমদ রফিক, যা অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম।

জীবনোপলব্ধি ও স্বোপার্জিত অভিজ্ঞতার ফলে তার রচনায় ফলেছে সোনালি ফসল। আহমদ রফিকের বেশকিছু বইয়ে বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ, বিকাশ ও গতি গন্তব্যের নির্দেশ রয়েছে এবং ভেদহীন বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বিনির্মাণের সমস্যা উদ্ঘাটনের প্রয়াস রয়েছে। এ ধরনের বইয়ের মধ্যে ‘সংস্কৃতি তথা যুক্তিবাদ মুক্তচিন্তা’ (২০১৮), ‘এ কোন বাংলাদেশি সমাজ’ (২০১৭), ‘শিল্প সংস্কৃতি জীবন’ (২০১৪), ‘বাংলাদেশ জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা’ (২০০০), ‘রাজনীতির বিবিধ প্রসঙ্গ’ (২০১৭), ‘সংঘাতময় বিশ্বরাজনীতি’ (২০১৭) উল্লেখযোগ্য।

আহমদ রফিকের প্রবন্ধ গ্রন্থের শিরোনাম উদ্দীপকধর্মী। এ তালিকায় আছে-  ‘আর কত প্রাণ হবে বলিদান’, ‘পুড়ছে মানুষ উড়ছে ছাই’, ‘তবু রাজনীতির জয়গান গাই’, ‘এ সমাজ বাণিজ্যের নায়কদের’, ‘ঐতিহ্য বিলাসী হয়েই আমরা খুশি’ ইত্যাদি। তার রচনার কলকব্জা সত্যাগ্রহী ও খরস্রোতা।

আহমদ রফিক শক্তিমান কবি। তার কবিতায় গ্রামীণ নিসর্গের রূপময়তা মাটি ও মানুষকে আবেগায়িত করে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীকালে রক্ত, হনন ও রণাঙ্গনের প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে তার কবিতার ধারা ফেরারি বিপ্লবের জন্য অনাবেগ আকাঙ্ক্ষায় ধাবিত। আহমদ রফিকের কবিতার বইয়ের মধ্যে ‘নির্বাসিত নায়কেরা’ (১৯৬৬), ‘বাউল মাটিতে মন’ (১৯৭০), ‘রক্তের নিসর্গে স্বদেশ’ (১৯৭৯), ‘বিপ্লব ফেরারি তবু’ (১৯৮১), ‘পড়ন্ত রোদ্দুর’ (১৯৯৪), ‘ভালোবাসা ভালো নেই’ (১৯৯১) ইত্যাদি। আহমদ রফিকের ‘অনেক রঙের আকাশ’ নামীয় একটি গল্পগ্রন্থ রয়েছে।

কবিতা বিষয়ক গদ্যরচনায় আহমদ রফিক সর্বশেষ পারঙ্গম। এ কথার সত্যতা মেলে ‘কবিতার উৎস ও সৃষ্টি’, ‘কবিতার ও আধুনিকতার চরিত্র বিচার’, ‘বাংলা কবিতার ঐতিহ্য-চরিত্র: দ্বৈতরূপের দ্বন্দ্ব’, ‘গুলি বারুদ আর রক্তের ঝাঁজ নিয়ে কবিতা’, ‘বাংলা কবিতায় প্রেম: তার বিচিত্র অভিসার’ ইত্যাদি প্রবন্ধে।

আহমদ রফিকের আত্মজীবনীতে (‘পথ চলতে যা দেখেছি’, ২০১৫) জীবনের বোহেমিয়ান রূপ থেকে নগরজীবনে থিতু হওয়ার নানা ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। গ্রামের বৈশাখী মেলার দর্শনে যে কোমলমন কৈশোরের পললে গড়েছিলেন যৌবনে দেশভাগ প্রত্যক্ষ করে ভাষা আন্দোলনের দুঃসময়ে নিজেকে সমর্পণ করেন সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে। কখনো পিছপা হননি তিনি। কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতায় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যুক্ত থেকে জীবনকে যাপন করেছেন সমাজ-দায়বদ্ধ মানুষ হিসেবে। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে তিনি নিজেকে সংযুক্ত রেখেছেন এ মাটির একনিষ্ঠ কর্মী রূপে। কৈশোরের ব্রিটিশ উপনিবেশ, যৌবনে পাকিস্তান জামানা, জীবনের মধ্যগগনে ও পড়ন্ত বেলায় অবলোকন করেছেন বাংলাদেশকে। তাকে ত্রিকালদর্শী বলাই যায়। আত্মজীবনীতে তিনি বলছেন- ‘এ লেখা স্মৃতিকথা, আত্মকথা নয়, বলা যায় স্মৃতির আলোয় প্রতিফলিত ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতির আলেখ্য’। স্বভাবতই ব্যক্তির চোখে ঘটনা চিত্রণ, জীবনকে তিনি বলতে চেয়েছেন সহিষ্ণু লড়াই হিসেবে। আহমদ রফিকের আত্মজীবনীর সঙ্গে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাখ্যান নিয়ে রচিত গ্রন্থ, দুই মৃত্যুর মাঝে নান্দনিক একাকিত্বে, তার অবিভক্ত বাংলা পাকিস্তানের বৈরিতা ও বাংলাদেশ পর্বের সামাজিক দুরবস্থা দেখার অভিজ্ঞতা উঠে এসে তার প্রভাব ফেলেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ১৯৫০ সালের দাঙ্গায়। বহু ঘটনা সাক্ষী আহমদ রফিকের রচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে।

আহমদ রফিক ষাটের দশকে সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যপত্রিকা ‘নাগরিক’। ভৌগোলিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক ব্যাপকতার বলয়ে বদলাতেও পারে সংস্কৃতি- এ ক্যানভাস এঁকেছিলেন আহমদ রফিক তার সৃজনের জমিনে। আহমদ রফিক নিজের কথা বলতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে দেশজ চেতনা, স্বাজাত্যবোধ ও প্রবহমান ধারার সঙ্গে আন্তঃসংযোগ ছিল। বিচ্ছিন্ন ও বিচ্যুত না হয়ে শেকড়ের অনুসন্ধান ও তার পরিচর্যায় অপার মনোযোগ ছিল তাঁর। যে নির্মোহ সত্যের অন্বেষণ করেছেন ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি ও পক্ষপাতকে পরিহার করে। তাঁর কিছু খেদ আছে কারণ সমাজ বদলের স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে গেল। আর বাকি থাকে অতৃপ্তি। ব্যক্তিক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কোনো খেদ নেই। এ রকম সত্যানুসন্ধানী সমাজঘনিষ্ঠ দরদি লেখক সমাজের প্রাগ্রসরতার জন্য প্রয়োজন। এ জন্যই দেহহীন আহমদ রফিক প্রাসঙ্গিক থাকবেন বহুকাল।

কবিতা হেলিওস

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
হেলিওস

একটা অবসরপ্রাপ্ত দুপুরকে নিয়ে

          অর্ধবৃত্তের মতো অবকাশ রচনা করেছি

 

আছে মা-পাখির ডিম ভেঙে যাবার প্রতিকল্পে

            সর্বজনীন বেদনা

বৃদ্ধ বাবার ঝাপসা দৃষ্টির ভেতর এক বুকচাপা

            দীর্ঘশ্বাসের সীমিত চতুর্ভুজ

রানা প্লাজাসদৃশ ব্যথিত পাণ্ডুলিপি

তরতাজা যুবকের গুম হওয়ার ন্যায়

                   একটা দীর্ঘ সকাল

আছে মায়ের জেগে থাকা চোখ

আছে একজোড়া

            সুসিদ্ধ ইকোলজি

আছে বোনের ব্যবহৃত কাঁকড়া ক্লিপের উদার সৌন্দর্য

আছে একটা গামছায় হাত মোছার দুটো অবিকল সবাক ছবি

 

এই তো আমার রূপকল্পের ইতিবৃত্ত

 

 এখন কোনো অবসরপ্রাপ্ত দুপুরকে নিয়ে

            আমি পূর্ণবয়স্ক অবকাশ রচনা করব

জীবনের সব হুলস্থূল এনে ভরে রেখে দেব

 

 দ্যাখো, হেলিওসের মতোনই তোমাদের কাছে যাব আমি

 

ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

গহিন অতলের অবাধ চত্বরে বৈভবে থাকে

তাকে কি টুকরো টুকরো করা যায়

অবয়বে বেড়ে ওঠে না কস্মিনকালে

এক টুকরোই থেকে যায় আদিঅন্ত কাল

ভূমিদস্যুরা তবু ওই জলা দখলে মত্ত হয়

বেপরোয়া ছুরি-কাঁচির নির্মমতায়

ঝরনার উৎস স্তব্ধ করে

ফালি ফালি করা অবয়ব থেকে বেরোয়

অজস্র শোণিত ধারা

নদী পর্যন্ত যেতে পারে না শুকিয়ে জ্বলে

ভেসে ভেসে বেড়ায় নিশ্চিহ্ন কাঠামো

নিক্ষিপ্ত হয় মর্তের ঝড়ে

মর্গের ব্যবচ্ছেদে খুঁজে পায় না শিশু আত্মা

পায় শুধু

ছোট্ট এক টুকরো জীবনের অবিকাশ! অবিকাশ!

কবিতা অধরা ও কবি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
অধরা ও কবি

অধরা

সময়ের বেড়াজালে বন্দি খাঁচায়

দূর পানে চেয়ে থাকি তোমার আশায়

উজান সময় স্রোতে এই অবেলায়

তুমি আসবে তো? ভালোবাসবে তো?

 

কবি

কী আছে তোমার? অর্থ, বিত্ত, বৈভব?

প্রভাব, প্রতিপত্তি? বলো, চুপ থেকো না

, এসব তোমার নেই! এবার, তুমিই বলো

আমি কেমন করে তোমার কবিতা হই?

কেমন করে তোমার কাছে আসি

কেমন করে তোমায় ভালোবাসি?

কবিতা প‌রিণ‌তি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম
প‌রিণ‌তি

কালো চিমনিরধোঁয়ায় আকাশের বুকজুড়ে মে কালোমেঘ

মৃত পাখির বাসা সে ড়ে রক্তাক্ত নে

্যামল বাগানগুলো ড়ে আছে যুদ্ধাহত ক্ষতবিক্ষত সৈনিকের তো

জ্বলন্ত কয়লার পাহাড়,

জাগিয়ে তোলে মাটির গহ্বরে ঘুমিয়ে থাকা আগুনকে

প্লাস্টিকের সমুদ্দুর,

ক্ষুধার্ত দৈত্যের তো গিলে খাচ্ছে পৃথিবীকে

যুদ্ধের দামামা পোড়ামাটির ্যস বাড়াতে থাকে শুধু

বোমার ব্দে রে পড়ে পাখির পালক,

আকাশের নীল রং

ভাঙা কাচ য়ে আছড়ে ড়ে মিনে

পৃথিবীর কপালে আগুনের থার্মোমিটার

কামারের হাতুড়ির তো আছড়ে ড়ে উন্মত্ত রোদ

জ্বরে পোড়া পৃথিবীর গা থেকে ঝরতে থাকে বরফ অবিরাম

বৃদ্ধের শুভ্র দাড়ির তন

 

ক্ষুধার্ত সমুদ্র গিলে খায়,

মানুষের স্বপ্নে বোনাউঠোন

তৃষ্ণার কঙ্কা মিনে আঁকে ছড়ানো মানচিত্র

নদীর তীর ক্ষুধার্ত ষাঁড়ের তো গ্রামে ঢুকে ড়ে পাখির কিচিরমিচির বাজেয়াপ্ত হয় কোনো এক ভোরে,

বাড়তে থাকে ছিন্নমূল মানুষের ভেলা,

পৃথিবীর জ্বর নামানোর দাওয়াই খুঁজতে,

লি থেকে মাথাগুলো জড়ো হয় জাতিসংঘের টেবিলে

কথার খই ফোটে, বে চোখ বাঁধা থাকে কালো ফিতায়

 

কবিতা বলির আগে

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
বলির আগে

আমার কথার পরে যদি কোনোদিন

ব্যথা পেয়ে থাকো

যদি এই দুর্দিনে সমূহ বিপদে মনে করো

ডাক দিও কোনো এক নির্মম সকালে

 

আমার বুকেরপরে দূর্বা যেমন থাকে

বেদনায় নীলপদপিষ্ট হলুদ সোহাগে

একবার চোখের জলে ধুয়ে নিও

সকল কলুষতাযেভাবে ধর্ম ছাগ

বলির আগে মুছে ফেলে যত ক্লেদ