১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩ নভেম্বর শান্তিনিকেতনের বুকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। আজ তিনি বিশ্বখ্যাত দার্শনিক অর্থনীতিবিদ। তার জন্মের পর তাদের বাড়িতে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছিলেন এবং তিনি নাম দেন অমর্ত্য। গুরুদেবের দেওয়া এই নামটা আজ সার্থক। পৃথিবীজুড়ে আজ অমর্ত্য সেনের নাম। দুর্ভাগ্য, আমরা তাকে চিনতে পারলাম না। কতভাবেই তাকে হেনস্থা করা হলো। অথচ প্রত্যহ ৩০০ থেকে ৪০০ পর্যটক আসেন তার বাড়ি দেখতে। কোথায় আছি আমরা। শান্তিনিকেতনে ক্ষিতিমোহন সেনের কুঠিরে তার জন্ম হলেও তাদের আদি নিবাস বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে। অমর্ত্য সেনের বাবা আশুতোষ সেন, মা অমিতা সেন। বাবা প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। আশুতোষ সেনের বাবা সারদা প্রসাদ সেন ছিলেন একজন জেলাশাসক।
১৯৪১ সালে অমর্ত্য সেনের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রথম শিক্ষা শুরু সেন্ট গ্রেগরি উচ্চবিদ্যালয়ে। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে বিএ অনার্স পাস করেন। এরপর চলে আসেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রিনিটি কলেজে। ১৯৫৬ সালে এ কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে প্রথম হন। একই বছর কেমব্রিজ মজলিসের সভাপতি নির্বাচিত হন। অমর্ত্য সেন প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। তিনি একদিন মহলানবিশের সঙ্গে দেখা করতে যান। তাকে দেখে মহলানবিশ খুবই খুশি হন আর তার ক্যারিয়ারে মুগ্ধ হন। তিনি বলেন, কলকাতায় কোনো কলেজে চাকরি করতে। তখন মহলানবিশ সেই সময়কার পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী ত্রিগুনা সেনকে অমর্ত্য সেনের কথা বলেন। ত্রিগুনা সেন তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিতে ব্যস্ত। ত্রিগুনা সেনের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়ে ট্রিনিটি কলেজে পিএইচডি কাজ শুরু করেও দুই বছরের ছুটি নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার তাকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান পদে নিযুক্ত করেন। অর্থাৎ অমর্ত্য সেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ চালু করেন আর প্রথম বিভাগীয় প্রধান হন। অতঃপর দুই বছর চাকরি করার পর আবার ট্রিনিটি কলেজে ফিরে যান পিএইচডি করার জন্য।
এরপর তার কর্মজীবন শুরু হয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স, দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্স, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, স্টান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছেন।
বর্তমানে অমর্ত্য সেন টমাস ডব্লিউ ল্যামন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপক এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিযুক্ত আছেন। এখনো কাজ করে চলেছেন। পৃথিবীর এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয় হার্ডার্ড। একদিন ডক্টর সেন আমাকে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের ছেলেমেয়েরা এখন অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করে না। কারণ নাকি চাকরি নেই। অন্যদিকে সারা পৃথিবীর ছাত্রছাত্রী হার্ভার্ডে অর্থনীতি পড়তে আসে, তাহলে নিশ্চয়ই ওইসব ছাত্রছাত্রী পাস করে চাকরি পায়। না হলে এত খরচ করে পড়তে আসবে কেন?
সারা পৃথিবী থেকে ১০২টি পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। বর্তমানে ডক্টর সেন অ্যাডভাইজরি বোর্ড অব ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের সদস্য। তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ছিলেন।
দুর্ভিক্ষ, মানবউন্নয়ন তত্ত্ব, জনকল্যাণ, অর্থনীতি ও গণদারিদ্র্যের অন্তর্নিহিত কার্যকারণ বিষয়ে গবেষণা ও উদারনৈতিক রাজনীতিতে অবদান রাখার জন্য ১৯৯৮ সালে নোবেল পুরস্কার পান। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে ভারত সরকার তাকে ভারতরত্ন উপাধিতে ভূষিত করে। অমর্ত্য সেনই জাতিসংঘের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পর্কে মানবউন্নয়ন সূচক আবিষ্কার করেন। তিনিই প্রথম মার্কিন নাগরিক না হওয়া সত্ত্বেও ন্যাশনাল হিউম্যানিটিস মেডেলে ভূষিত হন। সারা বিশ্ব থেকে ১০২টি পুরস্কার-উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের সম্মানিত সভাপতি নির্বাচিত হন (১৯৮১); ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল স্টাডিজের সম্মানসূচক ফেলোশিপ পান (১৯৮২); গানে ভারতরত্ন (১৯৯৯); গ্রেট ব্রিটেনের অর্ডার অব কম্প্যানিয়ন অনারে ভূষিত হন (২০০০); লিংকটি পুরস্কার পান (২০০০); হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫১তম প্রারম্ভিক বক্তা ছিলেন (২০০০); আন্তর্জাতিক মানবিক ও নৈতিক সংগঠন থেকে আন্তর্জাতিক মানবিক পুরস্কার পান (২০০২); পভিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানসূচক ডিগ্রি লাভ করেন (২০০৫); ডেমোস বার্ষিক বক্তৃতা দেওয়ার জন্য নির্বাচিত হন (২০১০) এবং আমেরিকা থেকে ন্যাশনাল হিউম্যানিটিজ মেডেল লাভ করেন (২০১১)।
এ ছাড়া দেশ-বিদেশে বহু সম্মানসূচক পুরস্কার পেয়েছেন। পৃথিবীব্যাপী ডক্টর সেনের খ্যাতি, ইতোমধ্যে ৩০টি ভাষায় তার বই অনূদিত হয়েছে। পৃথিবীতে সর্বাধিক জনপ্রিয় অর্থনীতিবিদ। বহু দেশের রাষ্ট্রনায়করা সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলেন। অথচ এই বিশ্বখ্যাত দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, নোবেল জয়ীকে শান্তিনিকেতনের দু-একজন কীভাবে হেনস্থা করল। তার পর মুখে চুনকালি মেখে ঘরে ঢুকে গেল। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন আমাকে বারবার বলেন, শান্তিনিকেতন আমার পৈতৃক ভূমি। এখানে আমি পড়াশোনা করেছি। গাছে উঠতাম, সাইকেলে ঘুরতাম। বিশ্বভারতীর সঙ্গে আমার পরিবারের নিবিড় সম্পর্ক। এ সম্পর্ক কোনোদিনও ভাঙবে না। শুরুদেব রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ছিলেন আমাদের অভিভাবক। আমার মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেনের অবদান কেউ ভুলতে পারবে না। প্রাণের টানে শান্তিনিকেতন আসি। এখনো অনেক গাছ আছে যা আমার জন্ম থেকেই আছে। এরা আমার আত্মীয়।
ব্যক্তিগতভাবে মিশে দেখেছি অধ্যাপক সেন সম্পূর্ণ প্রচারবিমুখ। তার নামের একটা নেমপ্লেট আজও তার বাড়ির গেটে লাগাতে পারিনি। বারবার বলেন, আমাকে একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করতে হয়। এখন আমি তাই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। মানুষের জন্যই কাজ করছি। আমি তো নেতা নই, আমি রাষ্ট্রনায়কও নই। আমার কাজ পরামর্শ দেওয়া, তত্ত্ব দেওয়া। তাই করছি। একদিন আমাকে বললেন, মানুষ আমার বই পড়েন। এই দেখো, চীনে আমার বই প্রচুর বিক্রি হয়। আমার ‘তর্কপ্রিয় ভারতীয়’ বইটির প্রথম সংস্করণ চীনে ৪৫ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য বই হলো- সামাজিক আগ্রহ ও সামাজিক উন্নয়ন (১৯৭০); অর্থনীতিতে অসমতা (১৯৭০); দারিদ্র্য দুর্ভিক্ষ (১৯৮২); আগ্রহ উন্নয়ন ও পরিমাপ (১৯৮২); খাদ্য অর্থনীতি ও স্বাধিকার অর্জন (১৯৮৬); নীতিশাস্ত্র অর্থনীতি (১৯৮৭); ক্ষুধার্ত ও জাতির প্রতিক্রিয়া (১৯৮৯); অসমতার পুনঃপরীক্ষণ (১৯৯২); জীবনের গুণাগুণ (১৯৯৩); উন্নয়ন ও সক্ষমতা (১৯৯৯); যৌক্তিকতা ও স্বাধীনতা (২০০২); তর্কপ্রিয় ভারতীয় (২০০৫), জগৎ কুঠির (২০২২)।
অধ্যাপক সেনের বইগুলো সারা বিশ্বের মানুষ পড়েন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে তার জনপ্রিয়তা ব্যাপক। সেজন্য এখনো পর্যন্ত ৩০টি ভাষায় বহু বই অনূদিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘ইকোনমিক্স ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’র একজন ট্রাস্টি।
২০০৬ সালের টাইমস ম্যাগাজিনে তিনি একজন ভারতীয় বীর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। ২০১০ সালে ওই ম্যাগাজিন পৃথিবীর ১০০ জন ব্যক্তির মধ্যে ড. সেনকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে নিউ স্টেটমেন্ট ম্যাগাজিন ডক্টর সেনকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ব্যক্তি বলেছে। এই বিশ্বনন্দিত মানুষটাকে শান্তিনিকেতন যেন চিনতে পারছে না। বিশ্বের মানুষ, বিশেষ করে রাষ্ট্রনায়করা অধ্যাপক সেনের প্রতি খুবই আস্থাশীল। একজন বিশ্বনন্দিত মানুষ শেষ বয়সে আঘাত পেলেন। প্রকাশ না করলেও তিনি খুবই ব্যথিত। অহেতুক এটা হওয়া কি প্রয়োজন ছিল? কাল-ই বিচার করবে।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অধ্যাপক সেনকে খুবই শ্রদ্ধা করেন। যেদিন থেকে জমি বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে মুখ্যমন্ত্রী তার পাশে আছেন। রাঙাবিতানে আমাকে বললেন, ‘চ্যালেঞ্জ ফর চ্যালেঞ্জ। একটা মিথ্যাকে সত্য করা খুব কঠিন’।
‘আমি ধন্য অধ্যাপক শ্রেণির মতো মানুষের স্নেহস্পর্শে আসতে পেরে’। ২০১৫ সালে তার বাড়িতে গিয়েছিলাম তার পৈতৃক ১৫৩ শতক জমির পঞ্চায়েত ট্যাক্স নেওয়ার জন্য। অধ্যাপক সেন প্রতি বছর ওই জমির জন্য পঞ্চায়েতকে ৯ হাজার টাকার ট্যাক্স দেন। উনার সই করা চেকের জেরক্স কপি পঞ্চায়েতে রাখতাম। খুবই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ট্যাক্স দেন। আমরা ভাগ্যবান অধ্যাপক সেন আমাদের পঞ্চায়েতের ভোটার (বর্তমানে পৌরসভার)।
অধ্যাপক সেনকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।
লেখক: কথাসাহিত্যিক