ত্রয়স্ত্রিংশ পর্ব
জি স্যার।
যাও; এবার ওদের ডেকে আনো।
মাসুদ সামনের দিকে মাথা নিচু করে বাইরে বের হয়। শাহবাজ খানের সহকারী ওয়াসিমের কাছে গিয়ে বলে, আপনার কাছে কি তৈল মিলন ও তেলবাজ তুষারের ফোন নম্বর আছে?
আছে তো! কেন, স্যার ডাকছে নাকি?
হুম। এখনই হাজির করতে বলছেন। কি করা যায় বলেন তো!
ঠিক আছে আমি ডাকছি। ওয়াসিম মাসুদকে আশ্বস্ত করল।
ওয়াসিম দুজনের মোবাইলে ফোন দিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে এমডি সাহেবের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিল। তারা কিছু বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু ওয়াসিম তাদের কথা বলার কোনো সুযোগই দিল না। ওয়াসিমের ফোন পেয়ে দুই তেলবাজ বিদ্যুতের গতিতে এমডি সাহেবের বাসায় গিয়ে হাজির হয়। মাসুদ তাদের ওয়েটিং রুমে বসতে বলে। তারা এমডি সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু এমডি সাহেবের দিক থেকে ডাক পড়ছে না। দুই তেলবাজ অস্থির হয়ে আছে। কতক্ষণ আর অপেক্ষা করা যায়! অপেক্ষারও তো একটা সীমা আছে! তারা বিরক্তি হয়ে ওয়েটিং রুম থেকে বাইরে বের হয়। ওয়াসিম আর মাসুদকে খোঁজে। তারাও কেউ আশপাশে নেই। অন্য কোনো মানুষজনও নেই। কাকে জিজ্ঞেস করবে? প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর দুই তেলবাজ ওয়েটিং রুম থেকে বের হয়। বাইরে বের হয়ে তারা উভয়েই বোকা বনে যায়। বিস্ময়ের সঙ্গে তারা একে অপরকে বলে, আমাদের বসিয়ে রেখে এমডি সাহেব চলে গেলেন! তার পিএস-এপিএসও চলে গেল!
একেকজন মানুষের একেক ধরনের নেশা থাকে। কারও লেখার নেশা, কারও পড়ার নেশা, কারও ভ্রমণের নেশা, কারও মদের নেশা; আবার কারও নারীর নেশা। তবে শাহবাজ খানের নেশা দুটি। মদ ও নারী। দুটো নেশাই তাকে পেয়ে বসেছে। মদের মধ্যেও আবার জাত-অজাত আছে। ভালো জাতের মদ, মন্দ জাতের মদ। তিনি ভালো জাতের মদ ছাড়া খান না। সব ব্র্যান্ড তার পছন্দও না। তাছাড়া পুরনো মদে তার ভীষণ আসক্তি। বিশ-ত্রিশ-চল্লিশ বছরের পুরনো মদ পেলে তিনি পাগল হয়ে যান। সারা রাত তিনি ওই মদ নিয়েই পড়ে থাকতে পারেন। নারী আসক্তিও তার ব্যাপক। দেশের মডেল, নায়িকা, গায়িকা থেকে শুরু করে বোম্বে-হলিউডের নায়িকাও তার করতলে ধরা দিয়েছে। এখন কলেজপড়ুয়া মেয়েরা নাকি তার জন্য (টাকার জন্য) পাগল। তারা হুমড়ি খেয়ে শাহবাজ খানের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ছে।
এখনকার কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা নাকি টাকার কাঙাল। টাকা পেলে তারা সবকিছু বিলিয়ে দিতে পারে। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগান শাহবাজ খান। তিনি টাকা বিলিয়ে ইজ্জত লোটেন। তবে মদ খাওয়ার ব্যাপারে তিনি ভীষণ চুজি। সবার সঙ্গে মদ খেতে পারেন না। মদ আর নারীও একসঙ্গে ভোগ করেন না। দুটোই তিনি আলাদা সময়ে আলাদাভাবে উপভোগ করেন। তাই তিনি সপ্তাহের একটা দিনকে ‘অ্যালকোহল ডে’; আরেকটা দিনকে ‘ডার্লিং ডে’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ওই দুই দিনকে তিনি সব কাজ থেকে আলাদা করে রাখেন।
শাহবাজ খান ভ্রুণ হত্যা মামলা নিয়ে বড় পেরেশানিতে আছেন। টাকা দিয়ে তিনি সব করতে পারছেন আর মামলা উল্টাতে পারবেন না! এটা তো হতে পারে না। তিনি না করতে পারলে তার বাপ আছেন। তিনি করবেন। অথচ তিনিও এখন কেমন যেন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এ কারণে তিনি ভীষণ বিরক্ত। তার কিছুই ভালো লাগছে না। কাজেও মন বসছে না। অফিসে গিয়ে দ্রুত বাসায় ফিরে এসেছেন। সেই সন্ধ্যা থেকে তিনি মদ গিলছেন। রাত বারোটা একটা পর্যন্ত টানা মদ গেলা চলছে। এখন আর তার হিতাহিত কোনো জ্ঞান নেই।
শাহবাজ খান মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে তৈল মিলন ও তেলবাজ তুষারকে ফোন দিলেন। দুজনকেই ফোন করে আচ্ছামতো গালমন্দ করলেন। এমন গালাগাল তারা বাপের জন্মেও শোনেনি। মদ খেলে শাহবাজ খানের মাথা ঠিক থাকে না। তখন কাকে কী বলেন তা তিনি নিজেও জানেন না। গালাগালের একপর্যায়ে তিনি বললেন, শালারপো তাড়াতাড়ি আমার বাসায় আয়। তা না হলে চাকরি নট। তৈল মিলন আর তেলবাজ তুষার কিছু একটা করতে চাচ্ছিল; কিন্তু বলতে পারল না। তাদের বলার সুযোগই দেওয়া হয়নি। কী আর করা! তারা উভয়েই চরম বিরক্তি নিয়ে বাসা থেকে বের হলো। তেলবাজ তুষার নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে। তার পাশের আসনে বসে তৈল মিলন। তারাও শাহবাজ খানকে গালাগাল শুরু করে। শালা মদখোর! শালা মাগীখোর! শালা হেন কোনো বদ কাজ নেই যা সে করে না। সারাজীবন বদ কাজ করবা আর ধরা খাইবা না তা কী কইরা হয়! এইবার শালা মাইনকার চিপায় পড়ছে। এইবার বুঝবা ঠেলা! সব কি আর টাকা দিয়া কেনা যায়! পুলিশ ঘুষ খেয়ে মামলা থেকে রেহাই দিলেও পিবিআই নাও দিতে পারে। সবাই তো অসৎ না! কিছু সৎ অফিসারও তো আছে!
গাড়ি পৌঁছাল শাহবাজ খানের বাড়ির প্রধান গেটের সামনে। সেখানে নিরাপত্তারক্ষীরা বলল, ভেতর থেকে আপনাদের ঢোকার কোনো অনুমতি মেলে নেই। আপনারা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। সকালে ডাক পড়লে যাবেন; না পড়লে চলে যাবেন। কথা শেষ।
দুই তেলবাজ বিস্ময়ের দৃষ্টিতে নিরাপত্তারক্ষীর দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহেরুন্নেসার ভীষণ মন খারাপ। করোনার কারণে দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে খুব একটা বের হতে পারেননি। বলা যায়, ইচ্ছা করেই তিনি বের হননি। একটু সাবধানে চলাফেরা করেছেন। তিনি একটু সচেতন ধরনের মানুষ। তিনি তার দাদা-দাদির কাছে শুনে এসেছেন, সতর্কতার মার নেই। মানে সতর্ক থাকলে অনেকটাই নিরাপদ থাকা যায়। আর করোনার মতো ভয়ানক ছোঁয়াচে রোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে সতর্ক থাকা তো অতি জরুরি। সে কারণেই তিনি নিজেকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি রেখেছেন। করোনা কমে আসার পর কিছু কিছু প্রোগ্রামে যাওয়া শুরু করেন।
চলবে...
আরও পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,