সেই প্রথম, কোনো মেয়ের সঙ্গে শেয়ারে রিকশায় ওঠার অভিজ্ঞতা আবিদের।
মেয়েটির নাম খুশবু। ওর সঙ্গে যখন দেখা হয়, সময়টা ছিল অদ্ভুত। সন্ধ্যা উতরে গেছে। আকাশে কালো করে মেঘ জমেছে। থেমে থেমে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শ্যামলী থেকে বাসায় ফিরছিল সে। ফার্মগেট পেরোনোর আগেই তিরতিরিয়ে বৃষ্টি নামল। নাগরিক বৃষ্টি এমনকিছু খারাপ নয়, আবিদের ভালোই লাগে। কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকারে, বাড়ি ফেরার মুহূর্তে এমন আচানক বৃষ্টি মুগ্ধতা নয়, অনিশ্চয়তা তৈরি করে। বাংলামোটর মোড়ে বাস থেকে নামতেই বৃষ্টিটা ধরে এল। অন্যদিন এখানে মগবাজারমুখী অজস্র রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে এবং ‘মামা আসেন, মামা আসেন’ বলে ডাকাডাকি করে। আজ রিকশা প্রায় নেই, দু-একটা যা আছে, দূরের খ্যাপ ছাড়া যাবে না। রুমালের পাতলা আবরণে নিজেকে ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে। কিন্তু বৃষ্টির দাপট থেকে নিজেকে আলগা করতে পারে না। দাঁড়ানোর মতো জায়গাও নেই; মোটরপার্টসের দোকানপাট খোলা থাকলে তবু দাঁড়ানো যেত। ধুর, ভিজেই তো গেলাম; বলে আবিদ পেছনে তাকায়, তখনই মেয়েটিকে দেখে সে।
এই যে ভাই, আসুন।
আবিদ পাশ ফিরে তাকায়, চেনা কাউকে দেখে না। আর-একবার যখন মেয়েলি ডাকটি আসে, সে বুঝতে পারে, রিকশায় বসা মেয়েটি তাকেই ডাকছে।
মেয়েটি, খুশবু যার নাম, বলে- আমি মগবাজারে যাব। আপনি ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গে যেতে পারেন।
আবিদ খানিক দ্বিধা করে। কিন্তু সময় নষ্ট না করে রিকশায় উঠে বসে।
রিকশা চলতে থাকে।
আমার নাম খুশবু। মগবাজার রেললাইনের ওপাশে কাঁচাবাজারের ওদিকে থাকি। আপনি সহজ হয়ে বসুন।
আবিদ জি, বলে একবার গলা খাকারি দেয়।
খুশবু চেনা মানুষের মতো তাকায়। বলে, দুজন পুরুষ যদি রিকশায় শেয়ারে যেতে পারে, একজন মেয়ের সঙ্গে পুরুষও যেতে পারে। আর এই বৃষ্টিদিনে রিকশা পাওয়াও কঠিন।
আবিদ লজ্জিতভাবে হাসে।
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে রিকশার হুড তুলে দেওয়া হয়েছে। পায়ের নিচ থেকে হাঁটু অব্দি নীল পলিথিনে ঢাকা। খুশবুর শরীরের সঙ্গে সেঁটে থাকতে হয় আবিদকে। এনিয়ে মেয়েটির কোনোরকম সংকোচ নেই।
আবিদ মৃদু গলায় বলে, সাধারণত আমি একাই যাই। রিকশা না পেলে শেয়ারেও এসেছি। কখনো হেঁটে। কোনো মেয়ের সঙ্গে এই প্রথম।
খুশবু বলে, ঢাকা শহরে নিয়ম বলে কিছু আছে নাকি?
বৃষ্টির কারণে রাস্তা ফাঁকা। রিকশা মগবাজার মোড়ে এসে পড়ে। বৃষ্টি থামার নাম নেই দেখে খুশবু বলল, মামা, ভাড়া বাড়িয়ে দেব। আপনি রেলগেটের কাছে নামিয়ে দেন।
কথায় এতটুকু আঞ্চলিক টান নেই। আবিদ বুঝতে পারে না, মেয়েটি কোন এলাকার। তার নিজের গন্তব্যও রেলগেটের কাছেই। সে বলল, ভাই, ব্রিজের তলাটা দ্রুত পার হয়ে যাও।
খুশবু প্রশ্নচোখে তাকায়।
আবিদ বলে, বলা তো যায় না, নিচ দিয়ে পারাপারের সময় যদি ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ে।
খুশবু হা হা করে হেসে ওঠে; ফ্লাইওভারটা ভাঙার আর সময় পেল না!
রেলগেট পেরিয়ে রিকশা থামে। পার্স খুলতে খুলতে খুশবু বলে, আপনি দশ টাকাই দিন। বাঁকি কুড়ি টাকা আমি দিচ্ছি।
আবিদ মাথা দোলায়।
বৃষ্টিটা ধরে আসে। খুশবু বলে, সরি, আমার ব্যাগে কোনো ভাঙতি নেই। মামা, পাঁচশ টাকা ভাঙতি হবে? রিকশাওয়ালা বিরস মুখে তাকায়।
আমার কাছে ভাঙতি আছে। পুরোটা আমি দিচ্ছি।
খুশবু খুব আপত্তি করে।
দেখুন, এই বৃষ্টির মধ্যে আর কষ্ট করার দরকার নেই। আবার কখনো দেখা হলে-
খুশবু তেরচা চোখে তাকায়।
না, যদি দেখা হয় আর কী, শোধ দিয়ে দেবেন।
খুশবু এবার লাজুক চোখে তাকায়। মাধুরী মেশানো ভঙিতে হাসে। চলে যায়।
বাসায় ফিরে কাপড় বদলে আবিদ স্নানঘরে ঢুকে পড়ে। বেরিয়েই দেখে ফোন বাজছে। গ্রাম থেকে মা ফোন করেছেন। খুশবুর কথা একদমই সে ভুলে যায়। ঢাকা শহর অনেককিছুই ভুলিয়ে দেয় মানুষকে। ভুলিয়ে রাখে।
অনেকদিন কেটে যায়। দিনযাপনের নিয়তিরেখায় খুশবুর কথা মনেও থাকে না আবিদের।
এক ছুটির দিনের সন্ধ্যায় শাহবাগ থেকে বাসায় ফেরে আবিদ। মগবাজারে রেলক্রসিংয়ের কারণে তাকে থামতে হয়। ট্রেন আসছে। মানুষ-রিকশা-গাড়ি থেমে আছে নিরুত্তাপ। হঠাৎ দেখে, সেই মেয়েটি। রিকশা থেকে নামছে। আবিদের চোখে খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ে। সে কাছে এগিয়ে যায়- কেমন আছেন?
খুশবু প্রথমে চোখ পিটপিট করে। পরে উচ্ছ্বাসিত হয়- আরে আপনি?
ট্রেন চলে যাওয়ার পর জ্যাম ও ভিড় আলগা হয়ে আসে। ওরা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ায়।
খুশবুর মুখে আজ কথা কম। হাসিও তেমন দীর্ঘ হয় না।
ওর কি মন খারাপ কোনো কারণে? সে কথা আর জিজ্ঞেস করা হয় না।
একটু ঝামেলায় আছি। মা খুব অসুস্থ। আজ যাই।
আবিদ বলে, আচ্ছা।
একদিন আপনার সঙ্গে চা খাব, কেমন?
খুশবু আর দেরি করে না, চলে যায়।
ঢাকা শহর খুব ছোট; কিংবা এতটা বড় নয় যে, একবার দেখা হলে আর কোনোদিন তার মুখটা দেখা যাবে না। পরে তাদের এখানে দেখা হয়। কিংবা ওখানে। টুকরো কথা হয়। কিন্তু কোনো সম্পর্ক বা বোঝাপড়ার অবকাশ ঠিক গড়ে ওঠে না।
একদিন, আবিদ মগবাজার রেলগেটের কাছে যে দোকানে নিয়মিত ডাব খায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। আচমকা পিঠে কেউ টোকা দেয়। সে পাশ ফিরে তাকায়। খুশবু। আবিদ ওকে ডাব খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। খুশবু আপত্তি করে না, চলুন, আজ কোথাও একটু বসি। চা খাব আপনার সঙ্গে।
রেলগেট পেছনে ফেলে ওরা একটা ভালো রেস্টুরেন্টের খোঁজে সামনে এগোয়।
খুশবু বলে, চলুন, নালন্দা ফুডে বসি।
রেস্টুরেন্টটি তিন তলায়। নতুন হয়েছে। পথে যেতে চোখে পড়লেও আবিদ কখনো ঢোকেনি। এখানে চা-কফি এবং ফাস্টফুড আইটেম পাওয়া যায়।
আসুন, বলে একসঙ্গে উঠতে শুরু করলেও খুশবুই সামনে এগিয়ে যায়।
আবিদের প্যান্টের পকেটে ভাইব্রেশন হয়। ফোনটা বের করতে পকেটে হাত রেখে সে একটু দাঁড়ায়। খুশবুর উপরে ওঠার দিকে তাকিয়ে তার চোখ স্থির ও চঞ্চল হয়ে ওঠে। হার্টবিট বেড়ে যায়। সে খুশবুকে অনুসরণ করে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে থাকে। খুশবু আগে, আবিদ পেছনে। নিজের ভেতরে অচেনা অনুভূতি টের পায়। মনে হয়, তাকে যেতে হচ্ছে না। অলৌকিক কোনো টান তাকে ওপরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আবিদের চোখের সামনে খুশবুর সুডৌল নিতম্ব। খুশবুর খোলা চুল মৃদু উড়ছে। তার শরীরও দুলছে। তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি আবেদন নিয়ে তার নিতম্ব দুলে দুলে উঠছে। আগে কখনো এভাবে তাকে খেয়াল করেনি সে। পাতলা একটা মেয়ে। শ্যামলা। পোশাকেও উগ্রতা নেই। কিন্তু...। আবিদের মনে হতে থাকে, এই যে সিঁড়ি বেয়ে সে ওপরে উঠছে, তিনতলা নয়, তেরো তলায়ও উঠে যেতে পারবে। পুরুষের কাছে নারীর বক্ষসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু বুকের চেয়েও বেশি আকর্ষণ যে এভাবে তার চোখে ধরা দিল, পূর্বের থিউরিটা সে ভুলে যায়। তার কেবলই মনে হতে থাকে, মেয়েদের সমস্ত শোভা তো নিতম্বে।
রেস্টুরেন্টে কোনার দিকের একটা টেবিলে ওরা বসে।
খুশবু বলে, চায়ের সঙ্গে আর কী খাবেন?
মাথা ঝাঁকিয়ে আবিদ সোজা হয়ে বসে। হ্যাঁ, খাওয়া যায়।
আবিদ মেনু দেখার ছলে অল্প হাসে। টুকটাক কথা ও চোখাচোখি হয়। কথার পিঠে কথা। আরও কথা। একটি কথা আর একটি কথার দিকে এগিয়ে যায়। দুজনের সম্মতিতে স্যুপের ডিশ চলে আসে। খুশবু স্যুপ তুলে দেয় আবিদের বাটিতে। স্যুপ ফুরিয়ে এলে সর পড়া দুধের মতো কফি আসে। কফিতে চুমুক দিয়ে আবিদ হাত কচলায়- একটা কথা জানার ছিল-
বেশ তো, বলুন।
সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় আমাকে ডেকে আপনার রিকশায় নিলেন, আমি তো খারাপ লোকও হতে পারতাম।
খুশবু সরাসরি আবিদের চোখে তাকায়- না, পারতেন না।
কেন?
না, এমনি।
আরে বলেন, জেনে রাখি।
খেয়াল করে দেখলে, পুরুষের চোখ দেখে মেয়েরা বলে দিতে পারে, মানুষটা কী চায় এবং কেমন হতে পারে।
আপনি কি চোখের ভাষা বোঝেন?
খুশবু সে কথার জবাব দেয় না। বলে, শুনুন, আজকের বিলটা কিন্তু আমি দেব।
খুচরা আছে তো?
হা হা করে দুজন হেসে ওঠে।
তা আবিদ সাহেব, বউদি কী করেন?
ভালোই তো চলছিল। এরমধ্যে আবার বউদি কেন?
নেই?
জানি না।
আহা, সঙ্গী না থাকলে জীবন পূর্ণ হয় নাকি?
এটা আপেক্ষিক ব্যাপার।
এতদিনেও বিয়ে করেননি যে?
হলো না।
হলো না মানে?
আবিদ প্রসঙ্গটা এড়ানোর বাহানায় বলে, সে অনেক কথা।
দু-একটা শুনি।
ঢাকা মানুষের স্বপ্নের শহর, স্বপ্নভঙ্গেরও কি নয়?
খুশবু মুখটা এগিয়ে নিয়ে এসে বলে, এই শহর কি আপনার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে?
সেটা অন্য আর এক গল্প।
অন্য গল্পটাই বলুন।
আমাদের কথা হচ্ছিল বিয়ে নিয়ে...
বিয়ের গল্পটাই বলুন।
কার বিয়ে? আমি তো বিয়ে করিনি।
বিয়ে কেন করলেন না, সেই গল্পটাই বলুন!
বিয়ে নিয়ে দারুণ একটা কথা শুনেছিলাম-
কী কথা?
মানুষের একটা বয়স আছে, যখন সে চিন্তাভাবনা না করেও বিয়ে করতে পারে। সেই বয়স পেরিয়ে গেলে বিয়ে করতে দুঃসাহসের দরকার হয়।
আপনার এখন তাহলে সেই অবস্থা, না?
দুজনে আবারও হেসে ওঠে।
এক সকালে অফিসে বেরোনোর মুখে ফোন আসে অচেনা নম্বর থেকে।
...দাদা, আমি খুশবু। বড় বিপদে পড়েছি। মার শরীর খুব খারাপ। একা দিশেহারা বোধ করছি। এমারজেন্সি কিছু টেস্ট করাতে হবে। অপারেশনও লাগতে পারে। আপনি যদি একটু হেল্প করতেন। আমি স্যালারি পেয়ে দিয়ে দেব।
একটানা কথাগুলো বলে থামে খুশবু।
আবিদ বিচলিত বোধ করে। সান্ত্বনা দেয়- আমি তো অফিসে যাচ্ছি। দেখি, কী করা যায়।
বিকেলের দিকে খুশবুকে ফোন করে আবিদ। খুশবুর ফোন অফ। রাতে বাসায় ফিরে ফোন করে। বন্ধ। দুশ্চিন্তা হয় তার।
তিন দিন পর, খুশবুর নম্বর খোলা পাওয়া যায়, কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করে না।
সন্ধ্যায় ডাবের দোকানের সামনে দাঁড়াতেই মনির চাচা বলে, মেয়েডা তোর কে হয়?
আবিদ অবাক, কোন মেয়েটা?
ওই যে রিকশায় দেখলাম।
ধুর, কী বলেন। সেই কবে একদিন।
জিনিসটা ভালো। কিন্তু সাবধান।
কেন, কী হয়েছে?
মেয়েটা কিন্তু সেয়ানা।
আবিদ থতমত খায়- কী সব বলছেন?
আমার বলার কথা বললাম, পরে বুঝবি।
ধুর, তোমার ডাবই খাব না।
আরে ডাবটা তো খেয়ে যা, বাপ।
আবিদ আর পেছনে ফেরে না।
খটকা লাগে আবিদের। লোকটা কেন এসব কথা বলল? তার খুব অস্বস্তি হয়।
মাঝে মাঝে জীবনটাকে চরকির মতো লাগে আবিদের। ছকবাঁধা রুটিন। ঢাকা শহরে জীবনের মানে বদলে যায়, প্রতিদিন। মানুষও বদলায়। হয়তো বদলায় না। বদলায় শুধু যাপনের মানচিত্র।
সন্ধ্যায়, বাসার সিঁড়িতে উঠতে উঠতে কথাগুলো মনে আসে আবিদের। আর তখন ওর মুঠোফোনে ভাইব্রেট হয়। একটা টেক্সট আসে। তাতে লেখা-
‘দাদা, আমি খুশবু। টাকা লাগবে না। আমার মা মারা গেছে।’