হেমন্তের সকাল, শীত শীত আমেজ। হাসপাতালের করিডরে হাহাকার আর লাইফ সাপোর্ট মেশিনের টুং টাং শব্দ। তানিয়ার চোখ ভেজা, হাত-পা কাঁপছে। স্বামী কামরুজ্জামান হিরু সাহেব সফেদ বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
হিরু সাহেব ইশারা ও ইঙ্গিতে যেন বললেন-
-‘তানিয়া… ভয় পেয়ো না। লামিয়া, সাদিয়া, নাদিরা… ওদের তুমি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করবে। তোমার ভেতর আমি আছি।’
তানিয়া চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন-
-‘তুমি আমাকে ফেলে যেতে পার? আমি একা তিনটা মেয়েকে কীভাবে গড়ে তুলব?’
হিরু সাহেব যেন ম্লান হাসলেন, আরেকবার চোখে তাকালেন। তার পর চোখ বুজে গেল। ঘর ভরে গেল যন্ত্রের নিস্তব্ধতায়।
তানিয়া নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন-
-‘হিরু… আমাকে বিধবা করে কেন চলে গেলে? তুমি কেন তিন তিনটে নাবালক মেয়ে রেখে গেলে।’
দুই
শবযাত্রা শেষে ফাঁকা ফ্ল্যাটে রাত। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু মেয়েদের কান্নার শব্দ। বড় মেয়ে লামিয়া মায়ের কোলে মাথা রেখে বলল-
-‘মা, আমাদের এখন কী হবে? বাবাকে ছাড়া আমরা কীভাবে বাঁচব।’
তানিয়া চুলে হাত বুলিয়ে বললেন-
-‘আমরা একসঙ্গে থাকব, মা। তোমাদের জন্য আমি বাঁচব, আমার জন্য তোমরা বাঁচবে।’
মেজো মেয়ে সাদিয়া আঁকড়ে ধরল মায়ের হাত-
-‘আমার বাবাকে খুব মনে পড়ছে, বাবা কেন চলে গেল, আমাকে সকালে কে স্কুলে নিয়ে যাবে?’ ছোট্ট নাদিরার বুঝে উঠতে পারছে না। কী ঘটে গেছে। বাসায় অনেক মানুষ দেখে তাকে আনন্দিত মনে হচ্ছে। বাবা যে আর নেই, তাকে আর কোনো দিন কোলে নেবে না, চকলেট কিনে দেবে না, সেটা বোঝার তার বয়স হয়নি। কেবল মাঝে মাঝে বলে ওঠে বাবা ‘হাসপাতালে গেছে, বাবা চলে আসবে।’
ছোট মেয়ে নাদিরাকে দেখে সবার চোখে পানি চলে আসে।
তানিয়া বুক চেপে ধরলেন, তিনজনকে আঁকড়ে ধরে বললেন-
-‘তোমাদের বাবা আকাশের তারা হয়ে আমাদের দেখছে। সে আছে, থাকবে আমাদের সঙ্গে।’
তিন
কয়েক সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই শ্বশুরবাড়ির ননদ-দেবরেরা সরব হয়ে উঠল।
ননদ কটমট করে বলল-
-‘হিরু ভাইয়ার তো ছেলে নেই। মেয়েরা তো অন্যের ঘরে চলে যাবে। সম্পত্তি আমাদেরও ভাগে পড়ে।’
দেবর যোগ করল-
-‘ভাবি, এত জমি-জমা একা সামলাতে পারবেন? ভাগ করে দিন, শান্তিতে থাকবেন।’
তানিয়া ঠাণ্ডা কণ্ঠে উত্তর দিলেন-
-‘এই সম্পত্তি আমার মেয়েদের ভবিষ্যৎ। আমি বেঁচে থাকি বা না থাকি, ওরা বেঁচে থাকবে এর ভরসায়।’
ভাসুর তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল-
-‘মেয়েরা কি ঘর সামলাবে নাকি? কাল তো স্বামীর ঘরে যাবে।’
তানিয়া তার ননদ, ভাসুর আর দেবরের এমন আচরণ দেখে স্তম্ভিত। ভাইয়ের তিনটে এতিম নাবালক মেয়ের জন্য তাদের সামান্য দরদ নেই।
তানিয়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে বললেন-
-‘আমার মেয়েরাই আমার ঘর। ওদের জন্য আমি পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকব।’
চার
প্রতিবেশীরা কৌতূহলভরা দৃষ্টিতে তাকায়। ফিসফিস শোনা যায়-
-‘এত সুন্দরী মহিলা, একা কতদিন থাকবে?’
-‘আবার বিয়ে করলে আশ্চর্যের কিছু নেই।’
তানিয়া জানেন, বিধবার প্রতিটি শ্বাস নিয়ে সমাজ বিচার করে। তিনি মনে মনে বলেন-
-‘মানুষের চোখে আমি দুর্বল, কিন্তু আমার মেয়েদের চোখে আমি শক্তি।’
পাঁচ
একদিন দুপুরে মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে দেখা হলো রবিন স্যারের সঙ্গে। বয়সে তানিয়ার চেয়ে চার-পাচ বছরের ছোট হবে, কিন্তু রবিন স্যারের মনের ভেতর গভীর সহানুভূতি জন্মে তানিয়ার প্রতি।
-‘আপনি কেমন আছেন?’ জিজ্ঞেস করলেন রবিন স্যার।
তানিয়া ম্লান হেসে বললেন—
-‘ভালো থাকার মানে জানেন, স্যার? একা তিন কন্যাকে টেনে নেওয়া মানেই টিকে থাকা।’
রবিন স্যার দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন, তারপর ধীরে বললেন-
-‘আপনি চাইলে একা থাকতে হবে না।’
তানিয়ার বুক কেঁপে উঠল। তিনি কিছু বললেন না, শুধু আকাশের দিকে তাকালেন আর ভাবলেন ‘অবিবাহিত রবিন স্যার কেনই বা আমার মতো বিধবা ও তিন কন্যার জীবনে আসবেন, আবার ভাবলেন হয়তো রবিন স্যার আমার রূপ দেখে এমন কথা বলছেন, আবার ভাবলেন আমার সম্পত্তি দেখে হয়তো রবিন স্যার আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।’
ছয়
ছোট দেবর খসরুজ্জামান প্রায়ই ফোন করে খোঁজ নিত। একদিন বাসাতেও এল। এক পর্যায়ে বলেই ফেলল-
-‘ভাবি, আমি জানি আপনি একা। চাইলে আমি পাশে থাকতে পারি… চিরদিনের জন্য।’
তানিয়া চুপ করে রইলেন। ভাবলেন ‘কীভাবে একা একা এতটা পথ পাড়ি দেব। জীবনে সঙ্গী দরকার।
পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে বললেন-
-‘খসরু, আমি আর কোনো সংসারের স্বপ্ন দেখি না। আমার জীবন শুধু আমার মেয়েদের।’
সাত
বাবার মৃত্যুর সাত বছর পর লামিয়া বড় হয়ে গেল। অনার্স শেষ করে একদিন রাতে মাকে বলল-
-‘মা, তুমি আমাদের জন্য অনেক কিছু করছ। কিন্তু তুমি নিজের কথা ভাবো না কেন?’
তানিয়া মৃদু হেসে উত্তর দিলেন-
-‘আমার নিজের কথা ভাবার সময় নেই মা। আমার জীবন তোমাদের ভেতরেই বেঁচে আছে, তুমি বড় মেয়ে তোমাকে ভালো একটা ছেলের কাছে বিয়ে দিতে পারলেই আমি সবচেয়ে খুশি হব।’
আট
মেজো মেয়ে সাদিয়া চুপচাপ। মায়ের চোখে যেন সবসময় শুধু লামিয়ার ভবিষ্যতের চিন্তা। অভিমান জমে ওঠে তার মনে।
-‘মা, তুমি সবসময় আপুর বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত। আমি কি তোমার মেয়ে নই?’
তানিয়া অবাক হয়ে বললেন-
-‘ও মা, তোমরা তিনজনই আমার প্রাণ। আমি তো তোমাদের জন্যই বাঁচি।’
সাদিয়া চোখ নামিয়ে চুপ করে গেল, কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল- ‘একদিন আমিও মাকে গর্বিত করব।’
নয়
ছোট্ট নাদিরা মায়ের আঁচলে লুকিয়ে বলত-
-‘মা, আমার বাবাকে যদি ফেরানো যেত!’ বাবার বয়সী পরিচিত কাউকে দেখলে সে তার সঙ্গে মিশে যায়। স্কুলে সে দেখে তার সহপাঠীদের সঙ্গে তাদের বাবা আসে। নাদিরার জন্য কেবল মা আসে।
তানিয়ার চোখ ভিজে উঠত। তিনি কষ্ট চেপে বলতেন-
-‘তোমার বাবা আমাদের আকাশের তারা হয়ে আলো দিচ্ছে, মা।’
দশ
রাতের পর রাত তানিয়া ঘুমোতে পারতেন না। মনে মনে প্রশ্ন করতেন-
-‘আমি কি ভুল করছি? কাকে বিশ্বাস করব? আত্মীয়দের? নাকি বাইরের কাউকে?’
তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিন কন্যার ভবিষ্যৎ বাঁধা। একাকীত্ব তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
এগারো
লামিয়ার জন্য একের পর এক প্রস্তাব আসে। আত্মীয়রা বড় মেয়ে লামিয়াকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে তাগিদ দেয়।
লামিয়ার জন্য যেসব প্রস্তাব আসে তা মা তানিয়ার পছন্দ হয় না। তাদের কারও সঙ্গে বয়সের পার্থক্য বেশি। কেউবা খাটো, কারও আবার অর্থবিত্ত কম।
একদিন তানিয়ার বোন লামিয়ার জন্য একটি প্রস্তাব নিয়ে এল। ছেলেটি দেখতে শুনতে ভালো, ব্যবসায় শিক্ষায় স্নাতকোত্তর। বয়সে লামিয়ার চেয়ে দুই বছরের বড়। সবই ঠিক আছে কিন্তু মা তানিয়ার মনে হলো সম্পত্তির লোভে লামিয়াকে বিয়ে করতে চায়।
একদিন লামিয়া বিরক্ত হয়ে বলল-
-‘মা, তুমি সব প্রস্তাবেই ত্রুটি খুঁজে পাও কেন?’
তানিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-
-‘আমি শুধু চাই না, ভুল মানুষের হাতে তোমাকে তুলে দিই। আমি দেখছি- অনেকে শুধু আমাদের বাড়ি আর সম্পত্তির দিকে তাকায়।’
লামিয়া শান্ত স্বরে উত্তর দিল-
-‘মা, আমি বড় হয়েছি। আমি আমার নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’
বারো
আত্মীয়দের চাপ, সমাজের কটূক্তি- সবকিছুর মাঝেও তানিয়া স্থির হলেন।
-‘আমি নতুন সংসার করব না। আমার পৃথিবী আমার তিন কন্যা।’
তিনি বুঝলেন, রবিনের সহানুভূতি কিংবা খসরুর আগ্রহ- কেউই তার জীবনের সমাধান নয়।
তেরো
এক সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। মোমবাতির আলোয় তিন কন্যা মাকে ঘিরে বসেছে।
লামিয়া মায়ের হাত ধরে বলল-
-‘মা, তুমি আমাদের জন্য সবকিছু করেছ। তুমি শক্তি দিয়েছ।’
সাদিয়া গলা ভারী করে বলল-
-‘তুমি শুধু পাশে থেকো মা, আমরা সবাই তোমার মতো দৃঢ় হব।’
ছোট নাদিরা আঁকড়ে ধরে বলল-
-‘আমার মা-ই আমার পৃথিবী।’
তানিয়ার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি তিন কন্যাকে জড়িয়ে ধরে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন-
-‘কোনো কষ্ট, কোনো লোভ আমার মেয়েদের জীবন ভাঙতে পারবে না। আমি মা, আমি শেষ পর্যন্ত লড়ব।’
এভাবেই তিন কন্যা আর মা তানিয়ার জীবন এগিয়ে চলে। দুঃখ, সম্পত্তির দ্বন্দ্ব, সমাজের চোখ, একাকীত্ব- সবকিছুর মাঝেও মাতৃত্ব দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়ের মতো।
একজন মা মিসেস তানিয়ার অদম্য সংগ্রামই হয়ে ওঠে তিন কন্যার ভবিষ্যতের আলো।