ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল ম্যাচের স্মৃতি ফেরাল জার্মানি কুরাসাওয়ের জালে ৭ গোল জার্মানির খুদে বিজ্ঞানীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন ডা. জুবাইদা রহমান প্রথমার্ধে ইতিহাস গড়ল কুরাসাও, ৩ গোল দিল জার্মানি মমতার দলে সংকট আরও গভীর, বিদ্রোহী এমপি বেড়ে ২২ জোটার স্মরণে বিশ্বকাপে বিশেষ উদ্যোগ নিল পর্তুগাল হোম অব ক্রিকেটে লিটনের অন্য রকম প্রথম ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রামে চাঁদপুরের তিন প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্ব চট্টগ্রামে মা-মেয়েকে হত্যা, নেপথ্যে অটোরিকশার চুক্তিপত্র নিয়ে বিরোধ বেরোবির রাজস্ব বাজেট ৮২ কোটি ৮১ লাখ টাকা ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন আজ ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টে গ্রেপ্তারের কথা শুনে চোখ খুলছেন না শিবির নেতা জিসান ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মেনে না নিলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হতো: শফিকুর রহমান গাংনীতে কুকুরের কামড়ে শিশুসহ আহত ১৭ পাবনায় স্কুলছাত্রীকে শ্লীলতাহানি, অভিযুক্তের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ফটিকছড়িতে বায়তুল ক্বোবা তৈয়্যবিয়া জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি হস্তান্তর শ্রমিক অবরোধে আড়াই ঘণ্টা স্থবির ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বন্দরে বেতনের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ আইএইচএফ ট্রফিতে দুই বিভাগে রূপা জিতল বাংলাদেশ আলু সংরক্ষণাগারে কেজিপ্রতি ৫ টাকা ভাড়ার দাবি, ৭ দিনের আল্টিমেটাম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫.৬৩ বিলিয়ন ডলার ইরান-মার্কিন চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে রবিবার, খুলে দেওয়া হবে হরমুজ প্রণালী সোনারগাঁয় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ আতঙ্কে ঘর ছাড়া, নিরাপত্তার আশ্বাস পুলিশের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনে অভিযান ইতিহাসের দুয়ারে গিয়ে থামল বাংলাদেশ, রক্ষা পেল অজিরা চুয়াডাঙ্গায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণ জব্দ করল বিজিবি গফরগাঁওয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্কুলশিক্ষিকার মৃত্যু বরগুনায় চিরকুট লিখে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা নরসিংদীবাসীর জন্য সুখবর, অনুমোদন পেল সরকারি মেডিকেল কলেজ
Nagad desktop

দারিদ্র্যই মানুষকে শিক্ষার দিকে তাড়িত করেছে

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
দারিদ্র্যই মানুষকে শিক্ষার দিকে তাড়িত করেছে
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

শুরু করা যাক পশ্চাৎভূমি দিয়েই। আমার জন্ম ১৯৩৬-এ, জুন মাসের ২৩ তারিখে। আব্বা তার ছেলেমেয়েদের জন্মের সাল-তারিখ একটি খাতায় লিখে রাখতেন, সেখান থেকেই এ তথ্য পাওয়া। সেকালে নিয়ম ছিল মায়েদের প্রথম সন্তান মায়েদের বাবার বাড়িতেই ভূমিষ্ঠ হবে; সে নিয়মে আমার প্রথম ক্রন্দন নানাবাড়িতেই। আমার নানাবাড়ি ও দাদাবাড়ি আড়িয়ল বিলের এপাড়ে-ওপাড়ে। আড়িয়ল বিল ঢাকার বিক্রমপুর পরগনার অনেকটা এলাকা দখল করে রেখেছিল। বর্ষাকালে তো বিল নয়, মনে হতো সমুদ্র। সমুদ্রের এপারে দাদাবাড়ি বাড়ৈখালী, ওপারে নানাবাড়ি সাইনপুকুর। সাইনপুকুরেরও আবার দুই ভাগ- খালপাড় ও পদ্মাপাড়। পদ্মাপাড়ের লোকদের সুবিধা বেশি, ভাগ্যকূলে স্টিমার ঘাট থাকার জন্য। সেখান থেকে স্টিমারে চেপে গোয়ালন্দ হয়ে রেলে করে সরাসরি কলকাতায় গিয়ে হাজির হওয়া যেত, একই টিকিটে; রেল কোম্পানি ও স্টিমার কোম্পানির মধ্যে ওই রকমের একটা বন্দোবস্ত ছিল; শুনেছি দুই কোম্পানির মালিকানাও নাকি ছিল অভিন্ন, অবশ্যই ব্রিটিশের। খালপাড়ের লোকেরা তুলনায় একটু অসুবিধাতেই ছিলেন, তবে সেটা খুব বড় রকমের নয়। সেই তুলনায় বাড়ৈখালীর লোকদের অসুবিধাটা ছিল অনেক বেশি; তাদের স্টিমার ধরতে হতো রীতিমতো কাঠখড় পুড়িয়ে, ভাগ্যকূল গিয়ে। সবার গন্তব্যই অবশ্য ছিল অভিন্ন- কলকাতা, বাংলার এবং তৎকালীন ভারতবর্ষেরও রাজধানী। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক পূর্ব বাংলার এক প্রান্তে বিক্রমপুর। 

বিক্রমপুরের সুখ্যাতি অবশ্য ছিল বহুলপ্রচলিত; কিন্তু এলাকাটির অর্থনীতি ছিল দুর্বল। এর অনেক জায়গাই বছরে ছয় মাস পানির নিচেই থাকত; ফলে কৃষির ওপর ভরসা করা যেত না। জীবিকার সন্ধানে এলাকার মানুষ যে যেমন করে পারে বেরিয়ে পড়তেন। ঢাকা শহরের গা-ঘেঁষেই তো ছিল আমাদের এ বিক্রমপুর পরগনা; কিন্তু মুর্শিদাবাদের উত্থানের আঘাতে পরিত্যক্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত ওই শহরের সঙ্গে বিক্রমপুরবাসীর যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত। ১৯৪৮ সাল থেকে পারিবারিকভাবে আমাদের বসবাস অবশ্য ঢাকাতেই; তবে তার কারণ অন্যকিছু নয়, সাতচল্লিশের দেশভাগ বটে। তার আগে আমার বাবা ঢাকা শহরে একবার মাত্র এসেছিলেন; সেও চাকরি সূত্রে এবং অত্যন্ত অল্পসময়ের জন্য।

বিক্রমপুরে অনেক বিখ্যাত মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন। বিক্রমপুরের লোক নাকি পৃথিবীর হেন স্থান নেই যেখানে পাওয়া যায় না। দুয়ের পেছনে প্রধান কারণ ওই একটাই- কৃষির ওপর নির্ভর করতে না পারা। খুব বড়মাপের জমিদার বলতে গেলে তেমন একটা ছিলেনই না। আর যারা প্রচুর জমির মালিক হয়েছিলেন, শুরুতে তারাও জমিদার নন, ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসা, চাকরি, পেশা, লেখাপড়া, বাংলার বাইরে যাওয়া, সবকিছুর জন্যই কলকাতায় ছুটতে হতো। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তো অনেককাল আগের ঘটনা, ৯৮০-১০৫৩ সালের। সেন রাজারা যে এখানে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছিলেন সেটাও অতীত ইতিহাসের ঘটনা বৈ নয়। ব্রিটিশ আমলে জগদীশচন্দ্র বসুর পক্ষে অতবড় বৈজ্ঞানিক হওয়া সম্ভব হতো না যদি তাকে বিক্রমপুরে আটকে থাকতে হতো। তার বাবা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর, যে জন্য বিভিন্ন শহরে থেকেছেন এবং পড়ালেখাও করেছেন কলকাতাতেই। চিত্তরঞ্জন বসু তো তার বাবার কাল থেকেই কলকাতাবাসী; তার বাবা ছিলেন হাইকোর্টের অ্যার্টনি। সরোজিনী নাইডু যে কবি এবং রাজনীতিক হিসেবে অমন যশস্বী হলেন তার কারণ তার বাবা ছিলেন হায়দ্রাবাদের নিজামের শিক্ষা উপদেষ্টা; নিজাম তাকে ডেকে নিয়েছিলেন শিক্ষার ব্যাপারে তার উচ্চখ্যাতির জন্য, যা তিনি অর্জন করেছিলেন কলকাতা হয়ে এডিনবরায় গিয়ে। সরোজিনী নাইডুর ছোট ভাই বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় যে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হতে পেরেছিলেন তার পেছনেও ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য হায়দ্রাবাদ থেকে তার ইংল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ। আসলে ব্রিটিশ আমলে আমাদের এলাকা দরিদ্রই ছিল। আর সেই দারিদ্র্য ঘোচানোর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাই এখানকার মানুষকে শিক্ষার দিকে তাড়িত করেছে, ফলে শিক্ষিতের হার তুলনামূলকভাবে উঁচুর দিকে উঠে গেছে। এবং শিক্ষায় এগিয়ে থাকার জন্য বিক্রমপুর খ্যাতি অর্জন করেছে।

তবে হ্যাঁ, শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহের এই এলাকার নিজস্ব একটি ঐতিহ্য রয়েছে। ক্ষীণ ধারায় হলেও সেটি অতীত থেকে বর্তমানে প্রবহমান। অবশ্য আরও একটি সামাজিক ব্যাপার ঘটেছিল; সেটা হলো স্কুলের সংখ্যাবৃদ্ধি। এত অধিক সংখ্যায় স্কুল প্রদেশের কম জায়গাতেই ছিল। এর পেছনেও কারণ ছিল। সেটা হলো ধনাঢ্য ব্যক্তিরা, যাদের সম্পদ অর্জিত হয়েছিল মূলত ব্যবসার মাধ্যমে, তারা সুখ্যাতি অর্জনের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের নামকরণ ঘটেছে পরিবারেরই কারও নামে। দ্বিতীয়ত, যারা জমির মালিক হয়েছিলেন তাদের বড় অংশটি কলকাতায় থাকলেও একাংশ গ্রামেই থাকত। প্রজাদের কাছ থেকে এরা জমির খাজনা আদায় করতেন, সেই সঙ্গে জমিজমার দেখাশোনাও কিছুটা করতেন; এদের সন্তানদের জন্য স্কুল দরকার পড়ত, সে স্কুলও এরাই প্রতিষ্ঠা করতেন। গ্রামে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবারের কেউ হয়তো হেডমাস্টারের দায়িত্বও নিতেন। পালাপার্বণে প্রবাসীরা জাঁকজমক করে যখন ‘দেশে’র বাড়িতে আসতেন, তখন বেশ একটা সাড়া পড়ে যেত। এ ছাড়া বিক্রমপুরে মেলা হতো, যাত্রার আয়োজন থাকত, নাট্যাভিনয়েরও প্রচলন ছিল; এসবে কলকাতা থেকে দেশে আসা জমিদারবাড়ির সহায়তায় ও অংশগ্রহণে ঘটত। স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধির তৃতীয় কারণ শিক্ষিত লোকেরা যারা বাইরে থাকতেন তারাও আগ্রহী হতেন স্কুল স্থাপনে। গ্রামে থাকতেন কিংবা আসা-যাওয়া করতেন এমন শিক্ষিতজনরাও উদ্যোগে যোগ দিতেন। উদ্যোগ বেশ ফলপ্রসূ হতো।

তবে স্কুলগুলো ছিল নির্দিষ্ট কিছু স্থানে। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তো অবশ্যই, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার জন্যও সাধারণ ঘরের ছেলেরা ওই সব স্কুলে যেতে পারত না। আর মেয়েদের জন্য আলাদা স্কুল রয়েছে এমন খবর পাওয়াই যায়নি। মেয়েদের মধ্যে তারাই শিক্ষিত হতে পারত কর্মসূত্রে যাদের পরিবার গ্রামের বাইরে বিভিন্ন শহরে থাকত; যেন সরোজিনী নাইডুরই ছোট ছোট সংস্করণ। গ্রামে-থাকা মেয়েরা ঘরে যেটুকু পাওয়া সম্ভব ছিল সেটুকু শিক্ষাই পেত। অতটুকুই ছিল সম্বল।

ধরা যাক, আমাদের মাছুমা খালার কথা। আমার মা ও মাছুমা খালা আপন বোন ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন নিকটাত্মীয় এবং সমবয়সী। খালপাড়ে পাশাপাশি বাড়ি এবং দুজনেই খান গোষ্ঠীর। কিন্তু মাছুমা খালা যে উচ্চশিক্ষা পেয়েছেন, সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন, বই লিখেছেন কয়েকটি, একাকী বিলেত গেছেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্কলারশিপ নিয়ে, পোস্ট-গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা নিয়ে এসেছেন শিক্ষকতার; এসবই সম্ভব হয়েছে শৈশবে বাবার সঙ্গে শহরে থাকার কারণে। মেধা অবশ্যই ছিল। কিন্তু ওইভাবে তা কাজে লাগত না যদি গ্রামের বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করার পরিবেশটা না পেতেন। আমার মা যা শিখেছেন সবটাই নিজেদের ঘরে এবং আপনজনদের সান্নিধ্যে, কোনো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ তিনি পাননি। ১৯৫০ সালে ঢাকার আজিমপুর এলাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য যে আবাসিক কলোনিটি তৈরি হয় তাতে মাছুমা খালার বাসা এবং আমাদের বাসা ছিল খুব কাছাকাছি। শৈশবে যেমন ছিল মা ও খালার বাড়ির নৈকট্য অনেকটা তেমনটি। কিন্তু কী বিস্তর পার্থক্য; আমার মা গৃহিণী, মাছুমা খালা সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। ইস্কাটনে একখণ্ড জায়গা কিনে মাছুমা খালা একতলা একটা বাড়িও তৈরি করেছিলেন। আমার মায়ের বাসাটা তার স্বামীর, মাছুমা খালার বাসার বরাদ্দটি তার স্বামীর নয়, ছিল তার নিজের নামে। যেন শহর ও গ্রামের দূরত্ব।

মোট কথা, অতীতে যেমনই থাকুক ইংরেজ আগমনের পরে আমাদের পরগনার অবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। প্রান্তিক গ্রামগুলো ছিল ঝোপঝাড়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন। বর্ষার সময়ে কোনো কোনো গ্রামকে মনে হতো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। শিক্ষিত ও অবস্থাপন্ন মানুষ কেউ কেউ গ্রামে আসা-যাওয়া করতেন, অনেকেরই পরিবার-পরিজন থাকত গ্রামের বাড়িতেই। তাতে সামগ্রিক অন্ধকার ঘুচত না। তবে শিক্ষিতের হার যেহেতু তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল এবং শিক্ষিতদের একাংশ যেহেতু গ্রামে থাকতেন, শিক্ষকতাও করতেন এবং একদিন পরে হলেও খবরের কাগজও যেহেতু নিয়মিত আসত, তাই মানুষের রাজনৈতিক চেতনাও নেহায়েত গ্রাম্য ছিল না। বরং ছিল বেশ শহুরে ধরনের। রাজনৈতিক কাজকর্ম চালু ছিল; কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা ছিলেন, পরে মুসলিম লীগের তৎপরতাও শুরু হয়। গ্রামের বাইরে অন্যত্র, কলকাতায় এবং অন্যান্য শহরে কী ঘটছে না-ঘটছে তার খবর তারা রাখতেন। শিক্ষিত তরুণদের রাজনৈতিক অগ্রসরমানতা ছিল অনুভবযোগ্য। সর্বভারতীয় বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই বিক্রমপুরে এসেছেন; জনসংযোগ তো অবশ্যই, জনসভাও করেছেন।

কিন্তু যা বলছিলাম, প্রান্তিক পূর্ববঙ্গের একটি প্রান্তিক এলাকা যে আমাদের ওই পরগনা সেটা যেমন ভৌগোলিকভাবে সত্য, তেমনি সত্য ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকেও। নদীর ভাঙন ও গতির পরিবর্তন এ এলাকাকে অনেকবার এবং বহুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের উদ্যোগে ঢাকা নতুন একটি প্রদেশের রাজধানী হবে এমন সম্ভাবনায় শহরটি আড়মোড়া ভেঙে বুঝি-বা জেগে উঠছিল, কিন্তু রাজধানী হয়েও যে টিকল না এবং ১৯১১-এর শেষে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হচ্ছে দেখে অখণ্ড বাংলার ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্রিটিশ শাসকরা যে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যায় তাতেও ঢাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশের আশাভঙ্গ ঘটে।

যে জায়গাটিতে আমাদের নিজেদের বংশানুক্রমিক বসবাস সেটি প্রান্তিক বিক্রমপুরেরও প্রত্যন্ত একটি প্রান্ত। যেন সীমান্তরেখা। এর পরেই বিশাল আড়িয়ল। থানা সদর শ্রীনগরে; আমাদের বাড়ৈখালী গ্রাম তার শেষ সীমান্তে। স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন পারিবারিকভাবে আমাদের ভেতর উঠেছে; সেটা হলো এই বিরান মুলুকে আমাদের পূর্বপুরুষ বসতি গড়েছিলেন কোন বিবেচনায়? আমার প্রয়াত মেজো ভাই আমানুল ইসলাম চৌধুরী পেশায় ছিল প্রকৌশলী; এ বিষয়ে তার কিছুটা বৈজ্ঞানিক কৌতূহল ছিল। এনিয়ে জীবিতদের ভেতর যিনি বলতে পারতেন তিনি আমাদের বাবা। বাবার সঙ্গে আমাদের ওই ভাইটির ভালো আদান-প্রদান ছিল। তার কাছে সে শুনেছে অমন জায়গায় বসতি স্থাপনটা স্বেচ্ছায় ঘটেনি, ঘটেছে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূর্যাস্ত আইনের কারণে। আব্বার এ বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে শ্রী যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তের লেখা বিক্রমপুরের বিবরণ নামের বইটিতে। এই লেখক বিক্রমপুরের বিষয়ে অসাধারণ কষ্টসাধ্য গবেষণা করেছেন এবং বিক্রমপুরের ইতিহাসসহ বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। বিক্রমপুরের বিবরণ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এবং গণবিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান খান, ইতিহাস বিষয়ে কৌতূহলের প্রেরণায় যিনি পুরোনো বই সংগ্রহ করতে ভালোবাসেন এবং ভারি খুশি হন আগ্রহীজনকে বইয়ের কপি উপহার দিতে পারলে; তার অনুগ্রহে বইটি এক কপি আমি পেয়েছি। তাতে জহুরুদ্দীন চৌধুরী নামে একজনের কথা আছে, যার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ‘আঞ্চলিকভাবে পারিবারিক পরিচয়ে এরা খ্যাতিবান ছিলেন’, কিন্তু ‘ইহারা উপযুক্ত সময়ে খাজনা দিতে না পারায় সম্পত্তি নীলাম হইয়া যায়’; এবং গুরুপ্রসাদ রায় ও তার দুই ভাই ‘সেই সম্পত্তি বিশ হাজার টাকা দিয়া ক্রয় করেন।’ রায়রা ছিলেন ব্যবসায়ী। এরা ব্যবসা করতেন লবণ ও চালের। লবণ তখন বাইরে থেকে আমদানি করা হতো এবং বিক্রি হতো পাইকারি নিলামে। রায় ভ্রাতারা লবণ ক্রয়ে উদ্যোগী ছিলেন, নিলামে বিপুল পরিমাণ লবণ কিনে তারা মজুত করে রাখতেন এবং পরে তা উঁচু দরে বাজারে ছাড়তেন। [লবণের কারবারে মুনাফার বিষয়ে আমাদের প্রজন্মের মানুষদের স্মরণে থাকার কথা যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বিক্রমপুরেরই এক বিখ্যাত ব্যক্তি জনাব ফজলুর রহমান কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন এবং পেয়ে তার এক আত্মীয়কে লবণ আমদানির একচেটিয়া পারমিট পাইয়ে দিয়েছিলেন।

আত্মীয়টি অত্যাবশ্যকীয় ওই পণ্যটি মজুত করেন এবং তার দর সেরপ্রতি ষোলো টাকায় তোলেন, যেটি ছিল একটি কারণ, যে জন্য ১৯৫৪-এর প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ সরকারের পতন ঘটে। স্থানীয়ভাবে লবণ তৈরির ওপর ব্রিটিশ সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করায় গান্ধীজি ১৯৩২ সালে যে লবণ সত্যাগ্রহর মাধ্যমে বড় রকমের রাজনৈতিক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন সেটিও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।] শুধু লবণ নয়, চালের ব্যবসাতেও রায় ভ্রাতারা মজুতদারি করতেন। এরা জমিদার ছিলেন না, কিন্তু নিলামে জমি কিনে জমিদার হয়ে গেলেন। ব্যবসার সঙ্গে রায়দের জমিদারিও চলতে থাকল এবং তারা অতি দ্রুতবেগে সমৃদ্ধশালী হতে থাকলেন। এদেরই একজন পরে ইংরেজপ্রদত্ত রাজা উপাধিতে ভূষিত হন, তার আগে পেয়েছিলেন রায়বাহাদুর উপাধি।

গবেষক-লেখক যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত আরও যা জেনেছেন তা এই রকমের যে, রায় ও কুণ্ডুদের মধ্যে ব্যবসা নিয়ে প্রচণ্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল; কিন্তু এক সময়ে সমীকরণ ঘটে, তারা এক হয়ে যান এবং রায়রাও কুণ্ডু নামেই পরিচিত হতে থাকেন। খাজনা দিতে না পারা জহুরুদ্দীন চৌধুরীর জমি ক্রয় বিষয়ে যোগেন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘এই সম্পত্তি ক্রয় ব্যাপারে গুরুপ্রসাদ ও তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতৃদ্বয় যে মহত্ত প্রদর্শন করিয়াছিলেন তাহা বিশেষ প্রশংসনীয়। সম্পত্তি বিক্রয় হইয়া গিয়াছে, মর্মপীড়িত বৃদ্ধ ভূম্যধিকারী জহুরুদ্দীন চৌধুরী সম্পত্তির নতুন মালিক গুরুপ্রসাদ ও তাহাদের ভ্রাতাদের সহিত নারায়ণগঞ্জে আসিয়া সাক্ষাৎ করিয়া জানাইলেন যে, যদি তিনি এক বৎসরের মধ্যে যে মূল্যে রায় ভ্রাতৃগণ সম্পত্তি ক্রয় করিয়াছেন তাহা দিতে পারেন তাহা হইলে তাঁহারা সম্পত্তি তাঁহাকে প্রত্যার্পণ করিবেন কি-না। ভ্রাতৃগণ বলিলেন যে, আপনি সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন আমরা এক বৎসরের মধ্যে সম্পত্তি দখল করিব না, আপনার নিকট আমরা সুদ চাহি না, কেবল মাত্র টাকাটা দিতে পারিলেই সম্পত্তিও প্রত্যার্পণ করিব। বৃদ্ধের আশা পূর্ণ হইল না। জহুরুদ্দীন চৌধুরী টাকা সংগ্রহ করিতে পারিলেন না। সম্পত্তি কুণ্ডুদেরই রহিয়া গেল।’ (বিক্রমপুর বিবরণী, পৃ-৭১)

চলবে...

কবিতা হেলিওস

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
হেলিওস

একটা অবসরপ্রাপ্ত দুপুরকে নিয়ে

          অর্ধবৃত্তের মতো অবকাশ রচনা করেছি

 

আছে মা-পাখির ডিম ভেঙে যাবার প্রতিকল্পে

            সর্বজনীন বেদনা

বৃদ্ধ বাবার ঝাপসা দৃষ্টির ভেতর এক বুকচাপা

            দীর্ঘশ্বাসের সীমিত চতুর্ভুজ

রানা প্লাজাসদৃশ ব্যথিত পাণ্ডুলিপি

তরতাজা যুবকের গুম হওয়ার ন্যায়

                   একটা দীর্ঘ সকাল

আছে মায়ের জেগে থাকা চোখ

আছে একজোড়া

            সুসিদ্ধ ইকোলজি

আছে বোনের ব্যবহৃত কাঁকড়া ক্লিপের উদার সৌন্দর্য

আছে একটা গামছায় হাত মোছার দুটো অবিকল সবাক ছবি

 

এই তো আমার রূপকল্পের ইতিবৃত্ত

 

 এখন কোনো অবসরপ্রাপ্ত দুপুরকে নিয়ে

            আমি পূর্ণবয়স্ক অবকাশ রচনা করব

জীবনের সব হুলস্থূল এনে ভরে রেখে দেব

 

 দ্যাখো, হেলিওসের মতোনই তোমাদের কাছে যাব আমি

 

ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

ছোট্ট এক টুকরো আত্মা

গহিন অতলের অবাধ চত্বরে বৈভবে থাকে

তাকে কি টুকরো টুকরো করা যায়

অবয়বে বেড়ে ওঠে না কস্মিনকালে

এক টুকরোই থেকে যায় আদিঅন্ত কাল

ভূমিদস্যুরা তবু ওই জলা দখলে মত্ত হয়

বেপরোয়া ছুরি-কাঁচির নির্মমতায়

ঝরনার উৎস স্তব্ধ করে

ফালি ফালি করা অবয়ব থেকে বেরোয়

অজস্র শোণিত ধারা

নদী পর্যন্ত যেতে পারে না শুকিয়ে জ্বলে

ভেসে ভেসে বেড়ায় নিশ্চিহ্ন কাঠামো

নিক্ষিপ্ত হয় মর্তের ঝড়ে

মর্গের ব্যবচ্ছেদে খুঁজে পায় না শিশু আত্মা

পায় শুধু

ছোট্ট এক টুকরো জীবনের অবিকাশ! অবিকাশ!

কবিতা অধরা ও কবি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
অধরা ও কবি

অধরা

সময়ের বেড়াজালে বন্দি খাঁচায়

দূর পানে চেয়ে থাকি তোমার আশায়

উজান সময় স্রোতে এই অবেলায়

তুমি আসবে তো? ভালোবাসবে তো?

 

কবি

কী আছে তোমার? অর্থ, বিত্ত, বৈভব?

প্রভাব, প্রতিপত্তি? বলো, চুপ থেকো না

, এসব তোমার নেই! এবার, তুমিই বলো

আমি কেমন করে তোমার কবিতা হই?

কেমন করে তোমার কাছে আসি

কেমন করে তোমায় ভালোবাসি?

কবিতা প‌রিণ‌তি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম
প‌রিণ‌তি

কালো চিমনিরধোঁয়ায় আকাশের বুকজুড়ে মে কালোমেঘ

মৃত পাখির বাসা সে ড়ে রক্তাক্ত নে

্যামল বাগানগুলো ড়ে আছে যুদ্ধাহত ক্ষতবিক্ষত সৈনিকের তো

জ্বলন্ত কয়লার পাহাড়,

জাগিয়ে তোলে মাটির গহ্বরে ঘুমিয়ে থাকা আগুনকে

প্লাস্টিকের সমুদ্দুর,

ক্ষুধার্ত দৈত্যের তো গিলে খাচ্ছে পৃথিবীকে

যুদ্ধের দামামা পোড়ামাটির ্যস বাড়াতে থাকে শুধু

বোমার ব্দে রে পড়ে পাখির পালক,

আকাশের নীল রং

ভাঙা কাচ য়ে আছড়ে ড়ে মিনে

পৃথিবীর কপালে আগুনের থার্মোমিটার

কামারের হাতুড়ির তো আছড়ে ড়ে উন্মত্ত রোদ

জ্বরে পোড়া পৃথিবীর গা থেকে ঝরতে থাকে বরফ অবিরাম

বৃদ্ধের শুভ্র দাড়ির তন

 

ক্ষুধার্ত সমুদ্র গিলে খায়,

মানুষের স্বপ্নে বোনাউঠোন

তৃষ্ণার কঙ্কা মিনে আঁকে ছড়ানো মানচিত্র

নদীর তীর ক্ষুধার্ত ষাঁড়ের তো গ্রামে ঢুকে ড়ে পাখির কিচিরমিচির বাজেয়াপ্ত হয় কোনো এক ভোরে,

বাড়তে থাকে ছিন্নমূল মানুষের ভেলা,

পৃথিবীর জ্বর নামানোর দাওয়াই খুঁজতে,

লি থেকে মাথাগুলো জড়ো হয় জাতিসংঘের টেবিলে

কথার খই ফোটে, বে চোখ বাঁধা থাকে কালো ফিতায়

 

কবিতা বলির আগে

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
বলির আগে

আমার কথার পরে যদি কোনোদিন

ব্যথা পেয়ে থাকো

যদি এই দুর্দিনে সমূহ বিপদে মনে করো

ডাক দিও কোনো এক নির্মম সকালে

 

আমার বুকেরপরে দূর্বা যেমন থাকে

বেদনায় নীলপদপিষ্ট হলুদ সোহাগে

একবার চোখের জলে ধুয়ে নিও

সকল কলুষতাযেভাবে ধর্ম ছাগ

বলির আগে মুছে ফেলে যত ক্লেদ