কান খাড়া করে সিরাজ কারিগর। খুব ভালো করে শোনে পাখির সুরেলা কণ্ঠ- কুহু-কুউ! কুহু-কুউ! একাই ডেকে চলেছে। বুঝি তার সঙ্গী-সাথী কেউ নেই। আহা, কুয়াশাভেজা করুণ কণ্ঠস্বর- কুহু-কুউ! এতক্ষণে সংশয় জাগে, কোকিলের সুর নাকি! এমন রাত-বিরেতেও আকুল হয়ে কোকিল ডাকে! মধ্যরাত পেরিয়ে নিশুতি হয়ে গেছে রাতের প্রহর, তা হয়তো নয়। তবু গ্রামের এক প্রান্তে এই জনমনুষ্যহীন কবরস্থানে তো সন্ধ্যা থেকেই নেমে আসে নিঃসীম নির্জনতা, জোনাকিরা টিমটিমে টুনিবাতি জ্বালিয়ে কবরে কবরে কী যেন মন্ত্র রটিয়ে দিয়ে আসে, তার পর ঝিঁঝিপোকার দল সহসা সাইরেন থামিয়ে দেয়; তখনই নেমে আসে গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। শুনশান নীরবতা।
অথচ এই তো ঘণ্টাখানেক আগেও বেশ সরব হয়ে উঠেছিল এ জায়গাটা। বাব্বা, কত্ত মানুষের সমাবেশ! কত শত কণ্ঠে দোয়া-দরুদ, নামাজে জানাজা, তার পর ‘মিনহা খালাকনাকুম ওয়া মিন হা.... ।’ মাটি হইতে আগমন অতঃপর সেই মাটির বুকেই আত্মসমর্পণ। লোকটা মুক্তিযোদ্ধা ছিল। কাফনের পরও তার বুকের ওপরে জাতীয় পতাকা বিছানো দেখেছে সিরাজ কারিগর। মানুষের ভিড়ে খুব ভালো করে দেখতে পায়নি বটে, তবে কবরে লাশ নামানোর সময় ওই পতাকা নিয়ে কথা ওঠে, সে শুনতে পায়; পরে পতাকা টেনেও নেওয়া হয়। মরহুমের বড় ছেলে কুয়েত না কাতার থেকে এসে পৌঁছুতে বিলম্ব হওয়ায় দাফনক্রিয়া সম্পন্ন হতে হতে একেবারে মাগরিব ছুঁয়ে যায়। ডুমুরগাছের আড়ালে কবরভাঙা এক গর্তের ভেতরে দাঁড়িয়ে সিরাজ কারিগর সভয়ে সবই পর্যবেক্ষণ করে। তবে খুবই সন্তর্পণে।
ভয় তো ছিলই, এখনো আছে। আতঙ্কে-উৎকণ্ঠায় এখনো মাথার চুল খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে- ধরতে পারলেই ওরা মেরে ফেলবে। সবার চোখে-মুখে সে কী জেহাদি আগুন! গৌরীনগরের পবিত্র জমিনে তারা কিছুতেই গানবাজনা বরদাশত করবে না। বাউল গানের অতি সাধারণ মঞ্চটি সাজিয়ে সবে মাইক্রোফোন টেস্ট শুরু করেছে, তখনই লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে এসে তারা আগুন লাগিয়ে দেয় মঞ্চে, লাঠিপেটা করে তাড়িয়ে দেয় দূর-দূরান্তের বাউল ফকিরদের। সিরাজ কারিগর তখন কী করে! স্থানীয় মানুষ হিসেবে বুকে সাহস বেঁধে সে সামনে দাঁড়ায়, একতারাসহ দু-হাত ওপরে তুলে তাদের কথা ঝোঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তারা তো কোনো কথা শুনতে আসেনি। কদিন আগে এই স্কুল মাঠেই তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে গৌরীনগরের নাম পাল্টে ধর্মনগর করবে। এখানে অধর্মের কিছু আর হতে দেবে না। সুদ-ঘুষ-ব্যাভিচার অধর্ম হোক বা না হোক, গানবাজনা মোটেই চলবে না। বাউল-ফকির তাদের চোখের বিষ। এনিয়ে সারা দেশেই কলকাঠি নাড়ছে বিশেষ গোষ্ঠী। ধর্মের অন্তর্নিহিত তত্ত্বকথা যতই শোনাক গানে গানে, সেই গানই গাইতে দেওয়া হবে না। গান গাইলেই গলা টেনে ছিঁড়ে ফেলবে তারা। প্রাণের ভয় কার নেই! অগত্যা হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসে সিরাজ কারিগর। বাড়ির কাছে এসেও স্বস্তি নেই, মনে হয় কারা যেন তেড়ে আসছে, কণ্ঠে তাদের ভয়ংকর স্লোগান- ‘একটা একটা বাউল ধর, ধরে ধরে জবাই কর।’ বুকের মধ্যে হাঁপড়ের ওঠানামা, কাঁধের ওপরে সেই ধাওয়াকারীদের তপ্ত নিঃশ্বাস, সারা পিঠে তেলাপোকার দাপাদাপি। তখন কী করে সিরাজ কারিগর?
উঠোনের কোনায় মাটির উনুনে ভাত চাপিয়েছে নুরুন্নাহার। হাঁড়িতে ভাত ফুটছে টগবগ করে। উনুনের আগুনে লাল হয়ে আছে তার মুখের মানচিত্র। দু-পাশে দুই পুত্র-কন্যা খিদের জ্বালায় ঘ্যানর ঘ্যানর করছে। ওদের সামলাতে গিয়ে বেড়ার আড়ে থমকে দাঁড়ানো বাপের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয় না। সিরাজ কারিগরও নুরুন্নাহারকে কিছু না বলে হাতের একতারাটা নামিয়ে রাখে বেড়ার কাছে, তখনই তেড়ে আসা মানুষের ক্রুদ্ধ হইহল্লা ভেসে আসে; একটুও বিলম্ব না করে বাড়ির পাশের পগার টপকে সে দ্রুতবেগে পালিয়ে যায়। না পালিয়ে কী করবে! সে খুব ভালোই জানে উত্তেজনায় তারা অন্ধ হয়ে গেছে, কারও হিতাহিত জ্ঞান নেই, যাচ্ছেতাই একটা কিছু করতে পারে। তক্ষুনি মাঠের ভেতর দিয়ে দৌড়ুতে দৌড়ুতে পশ্চিমপাড়ার এ কবরস্থান।
কিন্তু এ কী! ওই যে দূরে মাটির ওপরে লাশ পড়ে আছে যে! কে কখন এভাবে ফেলে গেল মানুষের লাশ! কিছুই তো টের পায়নি কেউ! বিস্ময়ে চোখের পাতা পড়ে না সিরাজ কারিগরের। মাথার ওপরে ক্ষীণকায় একফালি চাঁদ অসংযত দৌর্বল্যে ঝুলে আছে আকাশের গায়ে। মরা মাছের চোখের মতো ফ্যাকাশে এবং ঘোলাটে আলো ছড়াচ্ছে সেই চাঁদ, কিন্তু কুয়াশার সঙ্গে মাখামাখি হয়ে চেপে বসা অন্ধকার তাতে বিশেষ ফিকে হয় না। হাতের তেলোয় চোখ রগড়ে সে সরু দৃষ্টিতে খুব ভালো করে তাকায়। ততক্ষণে বেশ কয়েকটি ধূর্ত শেয়াল এসে ঘিরে ধরেছে সাদা কাফনবন্দি লাশ। শুধু শেয়াল নয়, গোটা দুই হায়েনাও আছে দলে। তাদের চোখের মণি জ্বলছে ধকধক করে। তারা নিজেদের মধ্যে যুক্তিশলা করে ঠিক করে নেয় লাশের মাথা নাকি পায়ের দিকে শুরু করবে আক্রমণ। পেটের ক্ষুধা তাদের প্রতিহিংসাপরায়ণ করে, আবার কখনো-বা ঐক্যবদ্ধও করে। তারা সবাই মিলে একযোগে সম্মিলিত আক্রমণের সূচনা করতে যাবে, এমন সময় আচানক এক ঘটনা ভয়ানক চমকে দেয় সবাইকে। স্তম্ভিত হয়ে তারা তাকিয়ে দ্যাখে- সাদা কাফনে মোড়া লাশ নিজে থেকেই মাথা উঁচু করে উঠে বসে। এমন অভাবিত দৃশ্য তারা আগে কখনো দ্যাখেনি। কবরস্থানের লাশ নিয়েও তো কম নাটক হয় না! বিশেষত, অল্প বয়সের আত্মঘাতী মেয়েদের লাশ নিয়ে ডাক্তার-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের কত রকম ক্যাদ্দানিই দেখেছে তারা। নতুন করে পোস্টমর্টেম করা, হাড়হাড্ডি নিয়ে টানাটানি পর্যন্ত হয়, সেসব খবরও তাদের জানা। কিন্তু এই ঘনঘোর রাতের বেলা লাশ নিয়ে এ কী কেত্তন শুরু হলো!
সিরাজ কারিগর সহসা নিজের গায়ে চিমটি কাটে, সে নিজে এখনো বেঁচে আছে তো! সংশয় ঘোঁচানোর জন্য আবারও দু-চোখ রগড়ে তাকায় সেই লাশের দিকে। আচ্ছা, এখনো সে লাশ বলছে কোন বিবেচনায়? লোকটি তো চেয়ারে হেলান দেওয়ার মতো করে দিব্যি পিঠটান সটান হয়ে বসে আছে। তার এ ওঠাবসা দেখে শেয়াল এবং হায়েনারা বেশ খানিক সরে গিয়ে পিছিয়ে বসে, পরস্পরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে এবং নিম্নকণ্ঠে কী যেন বলা-কওয়াও করে। আহা, ক্ষুধার অন্ন এভাবে বেহাত হয়ে গেলে তারাই বা কী করবে!
ক্ষুধা তার পেটেও লেগেছে। নানান ঝামেলায় সারা দিনে খাওয়ার সুযোগ পায়নি। সেই সঙ্গে আবার টানটান উত্তেজনা। নানারকম হই-হাঙ্গামার আভাস তো কানের দরজায় আগেই আছড়ে পড়েছে। তবু কি না মোস্তফা মেম্বারের আশ্বাসের ওপর ভরসা করে স্কুল মাঠে গানের প্যান্ডেল সাজিয়েছে, সে মঞ্চে এসে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবে। কিন্তু কাজের বেলায় লবডঙ্কা। সন্ত্রাসীদের হামলার সময় কোথায় মোস্তফা মেম্বার! তার টিকিও দেখা যায়নি। বাউলদের তখন নিজের প্রাণ বাঁচানোই বড় দায়। কীসের ক্ষুধা-তৃষ্ণা! হ্যাঁ, বাড়ির উঠোনে নুরুন্নাহারের উনুনে টগবগানো ভাতের বলক উঠতে দেখে এক নিমেষের জন্য সিরাজ কারিগর উন্মনা হয়েছিল বটে, কিন্তু পেছনে তেড়ে আসা কোলাহল শুনে সে আর দাঁড়াতে পারেনি, পগার ডিঙিয়ে মাঠে এসে এই এতদূর। সহসা ক্ষুধাতুর নাতি-নাতনি দুটোর শুকনো মুখ মনে পড়ে যায়- আহা, ওরা ভাত খেয়েছে তো! জুঁই ফুলের মতো সাদা ধবধবে ভাত। মুখে তোলার আগে হাতে নিলেই আনন্দে মন ফুরফুরে হয়ে যায়। কে জানে সিরাজ কারিগরকে না পেয়ে তার বাড়িতেই আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে কি না। তাদের পক্ষে সব সম্ভব। হ্যাঁ, অসম্ভবও সম্ভব। কবর থেকে মরা মানুষ তুলে এনে যারা আগুনে পোড়াতে পারে তাদের পক্ষে আর অসম্ভব কী!
সিরাজ কারিগরের খুব ইচ্ছে করে বাড়ি যেতে।
কবরস্থানে প্রাণহীন নিস্তব্ধতা তবু মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু কাফনবন্দি লাশের সক্রিয় উপস্থিতি তাকে খুবই ভাবনায় ফেলে দেয়। শেয়াল কিংবা হায়েনারা নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছে বটে, এখন এ লোকটি যদি তার দিকেই হাত বাড়িয়ে দেয়, কিংবা সে নিজেই এগিয়ে এগিয়ে আসে তার দিকে, তখন সে কী করবে! এ কথা ভাবতেই কানের লতি গরম হয়ে যায়, মাথার পাতলা চুলও খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। একবার চোখের পলক ফেলে পুনর্বার তাকাতেই অবাক বিস্ময়ে সে থ হয়ে যায়-
কাফনবন্দি লোকটি বসা ভঙ্গি থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে, তার মাথা যেন-বা আকাশ স্পর্শ করতে চায়। কিন্তু কে এই আচানক লোকটি! কীভাবেই বা জানা যায় তার আদ্যোপান্ত পরিচয়! কাফনের কাপড়ের মাথার দিকে গিঁট যদি কোনোক্রমে আলগা হয়ে খসে পড়ে, তাহলে তার মুখটা দেখেও হয়তো খানিক অনুমান করা সম্ভব হতো। কিন্তু অত উঁচুতে সে তাকাবে কী করে! লোকটির মাথা যে ওপরে উঠেই যাচ্ছে। সিরাজ কারিগর বেঁটেখাটো মাঝারি সাইজের মানুষ। এভাবে তাকাতে গিয়ে সে ঘাড়ে ব্যথা পায়, কেমন যেন ফিক লেগে যায়। তখনই সে দেখতে পায় কাফনের ঊর্ধ্বাংশের গিঁট খসে গিয়ে লোকটির চেহারা বেরিয়ে পড়েছে। সেই চেহারা দেখে সারা শরীর তার প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে, দাঁতেমুখে বুঝি বা খিঁচুনিও ধরে যায়। সে মানতেই পারে না- দূর ফরিদপুরের নুরা পাগলার মতো বুজুর্গ লোক এ মধ্যরাতে এখানে আসবে কী করে!
নুরা পাগলার সঙ্গে তার পরিচয় সামান্যই।
সেই কবে একদিন এই নুরা পাগলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে তার নাম শুনে সে চমকে ওঠে, তার পর সেই নাম নিয়ে ব্যাখ্যান করে- ‘একে তো সিরাজ, তাই আবার কারিগর! বড্ড গুণীন নাম রে তোর!’
সিরাজ কারিগর হাত কচলে ঘাড়মাথা দুলিয়ে বিনয়ে বিগলিত হয়ে আবারও নিজের নাম বলে, ‘সিরাজ কারিগর।’ জন্মদাতার নামও যোগ করে, ‘পিতা দুলাল কারিগর।’
নুরা পাগলা চোখ বুঁজে গুনগুনিয়ে ওঠে, ‘ওরে সিরাজ সাঁই কয় লালন রে তোর ঘোর গেল না...।’
তখন সিরাজ কারিগর দুহাত কপালে ঠেকিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং সবিনয়ে বলে, ‘কোথায় সাঁইজি আর কোথায় বা আমি! দীন হীন অতি সামান্য মানুষ বাবা!’
নুরা পাগলার কণ্ঠে আবারও লতিয়ে ওঠে মহতের পদ, ‘পাবি সামান্যে কি তার দেখা...?’
প্রথমদিনেই এসব ঘোরলাগা গানের জাদুতে সে আটকে যায়। আবার নামের শেষে কারিগর পদবি নিয়েও অনেক কিছু জানতে পারে। লালন সাঁইজির সঙ্গে কারিগরের কী সম্পর্ক, সে খবরও তার জানা ছিল না। বাপ-দাদা ছিল তাঁতবোনা কারিগর, সেই সুবাদে কেবল পদবিটুকুই পেয়েছে সে, আর কিছুই পায়নি। পেয়েছে গানের কণ্ঠ, সঙ্গে তার একতারা। অসময়ে স্ত্রী বিয়োগ ঘটলে এ একতারাকেই সে আঁকড়ে ধরে বেশি করে। নুরা পাগল তাকে পুনর্বার সংসারী হওয়ার পরামর্শ দেয়, সংসারে থেকেও সন্ন্যাসধর্ম পালনের কথা বলে। সিরাজ কারিগর সে পথে যায়নি। কিন্তু এতদিন পরে কবরস্থানের এ নিস্তব্ধতায় সেই মানুষটি আসবে কী করে! তার তো স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, কবরে সমাহিত হয়েছে, আবার কবর থেকে তুলে এনে শতসহস্র অপমানের পর আগুনে পুড়িয়ে ছাইভস্ম করা হয়েছে; এত কিছুর পরে সেই মানুষ এখানে কেন সে এক গোলকধাঁধা।
সাদা কাফনের মোড়ক থেকে উদ্ভাসিত নুরা পাগলার ঊর্ধ্বমুখী চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় নিজের দেহের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে সিরাজ কারিগর, লুটিয়ে পড়ে ডুমুরগাছের তলায়। রাতের মধ্যপ্রহর পেরিয়ে যাওয়ার পর শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাকাডাকিতে চেতনা ফিরতেই আবিষ্কার করে- মায়ের কোলে মাথা রেখে সে শুয়ে আছে আনমনে। দৃশ্যটি বড়ই মনোরম। কিন্তু কোথায় তার মা? শৈশবে মাকে হারিয়ে সে অনাথ এতিম হয়েছে। মায়ের কোল পাবে কোথায়! এ কী কুহক! কপালে ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়া পেয়ে চোখ মেলে তাকাতেই অবাক- নুরুন্নাহার! তুই এখানে!
নুরুন্নাহারের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুফোঁটা। অস্ফুটে সে ডেকে ওঠে, ‘বাপজি!’
স্বামী পরিত্যক্তা এ মেয়েটিকে নিয়েই সিরাজ কারিগরের সংসার। সে ডাকে বাপজি বলে। বড়ই স্নেহমহী। পেটের ছেলেমেয়ে দুটো যেমন তার কাছে, বাপজিও তাই। সিরাজ কারিগরের চোখ ভিজে আসে। সে শুধায়, ‘তুই এখানে কেন মা!’
মায়ের মুখে উত্তর নেই।
‘তুই বাড়ি যা।’
এবার ডুকরে ওঠে নুরুন্নাহার, ‘বাড়ি নেই বাপজি। আগুনে পুড়িয়ি দিয়িচে।’
কথা সরে না মুখে। এমন আশঙ্কা যে ছিল না তা নয়। তবু আঁতকে ওঠে সিরাজ কারিগর, সত্যিই আগুনে জ্বালিয়ে দিল ঘরবাড়ি! মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কী করে! ছেলেমেয়ে নিয়ে নুরুন্নাহার এখন দাঁড়াবে কোথায়!
খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাফনবন্দি নুরা পাগলা সহসা হা হা করে হেসে ওঠে। সে হাসির শব্দ হয় কড়কড়ে বজ্রপাতের মতো। কবরস্থানের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে। তখন কী করে সিরাজ কারিগর! মায়ের কোল থেকে অবোধ শিশুর মতো মাথা উঁচু করতেই নেই হয়ে যায় মায়ের কোল, তখন শিশুর মতোই ভয়ার্ত কণ্ঠে সে কাতরে ওঠে, ‘নুরুন্নাহার! তুই কোথায় গেলি মা?’
কোথাও কোনো উত্তর নেই। চোখের সামনে দণ্ডায়মান নুরা পাগলাও নেই। সিরাজ কারিগর এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। সদ্যশায়িত মুক্তিযোদ্ধার কবরের পাশ দিয়ে অতি সন্তর্পণে পায়ে পায়ে হেঁটে সে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। একেবারে মূল গেটের কাছে এসে দেখতে পায় কাফনমোড়া এক লাশ পড়ে আছে। সেই লাশ ডিঙিয়ে সে বাইরে আসবে কী করে। লাশের মাথার দিকে কিংবা পায়ের দিকে একটুখানি ফাঁকফোকর পেলেই হয়। মাথা নিচু করে সেই ফাঁক খুঁজতে গিয়ে সে চূড়ান্ত ধাক্কা খায়। গিঁট খোলা কাফনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে লাশের মুখমণ্ডল। চেহারা দেখে সিরাজ কারিগর স্পষ্ট শনাক্ত করতে পারে- অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে এ লাশটা তার নিজেরই লাশ! চেহারা দেখেও সে মানুষ চিনবে না! তাই কিছুতে হয়!