‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’- এসব স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত হয়।
বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের সঙ্গে শিশু অহিউল্লাহও তাতে শামিল হয়। পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী সরকার নির্মমতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ভাষা আন্দোলনে শহিদ হওয়া শিশুর লাশ পর্যন্ত পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেনি। গোপনে কবর দিয়েছে। কিন্তু তাতেও দমানো যায়নি
পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে। শিশু অহিউল্লাহসহ ভাষা আন্দোলনের শহিদদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। যে চেতনার বীজ তারা বপন করেছিলেন, তা উত্তপ্ত হয়ে মহীরুহ আকার ধারণ করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তা পাকিস্তানি দুঃশাসনের কবর রচনা করে। এখানেই অহিউল্লাহর আত্মত্যাগের সার্থকতা।...
ভাষা আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ শহিদের নাম অহিউল্লাহ। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নবাবপুর রোডে পুলিশের গুলিতে সে শহিদ হয়। সরকারি বিবরণ মতে, তখন তার বয়স ছিল ১০ বছর। পড়ত তৃতীয় শ্রেণিতে। অহিউল্লাহর বাবা হাবিবুর রহমান পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রি। বাস করতেন নবাবপুর রোডের লুৎফর রহমান লেনের ১৫২ নম্বর বাড়িতে।
১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হলেও তা প্রবল আকার ধারণ করে বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারি। এদিন বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশে সমবেত হয়ে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ অভিমুখে যাত্রা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি নির্বিচারে গুলি চালালে শহিদ হন বাংলার দামাল সন্তানরা। পুলিশের গুলিবর্ষণে হতাহতের ঘটনায় ঢাকাসহ সব পূর্ববঙ্গে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে শহিদদের গায়েবানা জানাজা শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। বিক্ষোভ দমনে পুলিশ ও মিলিটারি গুলিবর্ষণ করে। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি শহিদ হন বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, আউয়াল, অহিউল্লাহসহ নাম না জানা অনেকে। পুলিশের গুলিতে আহত আবদুস সালাম কয়েক মাস পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
২১ ফেব্রুয়ারির পুলিশি নির্মমতায় সব পূর্ববাংলা উত্তাল হয়ে উঠলে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ, আনসার ও সেনা মোতায়েন করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের পাশাপাশি সেনাসদস্যরা টহল দিতে থাকে। রাইফেল তাক করে তারা বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে অবস্থান নেয়। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে হাজার হাজার মানুষ বজ্রমুষ্টি তুলে রাজপথে নেমে আসে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘ছাত্রহত্যার বিচার চাই’- এসব স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে। বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের সঙ্গে শিশু অহিউল্লাহও তাতে শামিল হয়। নবাবপুর রোডের ‘নিশাত’ সিনেমাহল-সংলগ্ন ‘খোশমহল’ রেস্টুরেন্টের সামনে পুলিশ গুলি চালালে একটি গুলি শিশু অহিউল্লাহর শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। মুহূর্তেই সে মুখ থুবড়ে রাস্তায় পড়ে যায়। তার রক্ত গড়িয়ে পড়ে লাল হয়ে যায় পিচঢালা কালো রাস্তা। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। সামরিক বাহিনীর ট্রাকে করে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয়।
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘নবাবপুর রোডের ঘটনা’ শীর্ষক সংবাদে এক যুবকের মৃত্যু ও এক শিশুর মাথায় বেয়নেট চার্জের সংবাদ ছাপা হয়, তাতে বলা হয়: ‘বেলা প্রায় ১১টার সময় রথখোলা ও ‘নিশাত’ সিনেমা হলের মোড়ের মধ্যবর্তী স্থানে একটি চলতি সামরিক ট্রাক হইতে অপেক্ষমাণ নিরীহ পথচারীদের ওপর বেপরোয়াভাবে গুলি চালানো হয় বলিয়া জানা গিয়াছে। ফলে একজন যুবক ঘটনাস্থলেই নিহত এবং দুজন আহত হয়। আহতদের মধ্যে একটি বালককে বেয়নেট দ্বারা মাথায় আঘাত করা হয় বলিয়া জানা গিয়াছে। আরও প্রকাশ, সামরিক ট্রাকে করিয়া তাহাদের লইয়া যাওয়া হয়।’ ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে অহিউল্লাহর বৃদ্ধ বাবা হাবিবুর রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। সন্তানের লাশ ফেরত চাইলে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা নানা ভাঁওতাবাজি করে তা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে কঠোর নিরাপত্তায় তার লাশ দাফন করা হয়।
ভাষা আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ শহিদ অহিউল্লাহর লাশ ভাষা আন্দোলনের অন্য শহিদদের লাশের পাশে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। ঢাকা সিটি করপোরেশনের লাশ দাফনের খাতায় তার নাম পাওয়া গেলেও কবরটি শনাক্ত করা যায়নি। ওই সময় সরকারি বিবরণে হতাহতের যে তথ্য জানানো হয়, তাতে অহিউল্লাহকে ১০ বছরের ‘অজ্ঞাত বালক’ বলে উল্লেখ করা হয়। পুলিশের গুলিতে শহিদ হলেও সরকারি বিবরণে মৃত্যুর কারণ বলা হয় মোটর দুর্ঘনা। এও বলা হয়, ‘তাহার মৃত্যু সম্পর্কে আরও তদন্ত চলিতেছে। জনাব ওবায়দুল্লাহর উপস্থিতিতে হাফেজ আবদুল গফুর তার জানাজা পড়েন।’
কিশোর অহিউল্লাহর কবর যেমন শনাক্ত করা যায়নি, তেমনি তার বিস্তারিত পরিচয়ও জানা যায়নি। ভাষা-আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে আহসানুল হক নামক জনৈক ব্যক্তি তাকে নিয়ে ‘আট বছরের ছেলে’ নামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকায় ১৯৫৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়: ‘আট বছরের ছোট্ট যে সেই ছেলে/ পুরোভাগে দাঁড়ায় সবায় ঠেলে/ তার সে ছোট কচি গলার স্বরে/ লাখো জনের উঠল দাবি ফুটে।/ উত্তেজনায় মুখ রাঙিয়ে উঠে।/ হঠাৎ সেথা কাঁপিয়ে চারিধার/ গর্জে উঠে রাইফেলেরই সার,/ তারই মাঝে একটি কচি গলা/ হারিয়ে গেল আর্তনাদের রোলে!/ ফিরে সে আর গেল না মার কোলে।’ ১৯৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একই পত্রিকায় অহিউল্লাহকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বাংলা একাডেমির ‘ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা’ গ্রন্থে তার পরিচয় ও শহিদ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শিশু অহিউল্লাহ সরকারি স্বীকৃতি পাননি। একুশে পদকের তালিকায় আজও ওঠেনি তার নাম। কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণও হয়নি তার নামে। পাঠ্যপুস্তকেও গুরুত্ব পায়নি এই শহিদ।
পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী সরকার নির্মমতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ভাষা আন্দোলনে শহিদ হওয়া শিশুর লাশ পর্যন্ত পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেনি। গোপনে কবর দিয়েছে। কিন্তু তাতেও দমানো যায়নি পূর্ববাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে। শিশু অহিউল্লাহসহ ভাষা আন্দোলনের শহিদদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। যে চেতনার বীজ তারা বপন করেছিলেন, তা উপ্ত হয়ে মহিরুহ আকার ধারণ করে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তা পাকিস্তানি দুঃশাসনের কবর রচনা করে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, আউয়াল, অহিউল্লাহর দেখানো পথেই এ অঞ্চলের মানুষ অগ্রসর হয়েছে এবং স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছে স্বাধীন বাংলাদেশ। পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধানেও বাংলা ভাষা ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে লাভ করেছে মর্যাদাপূর্ণ স্থান। এখানেই অহিউল্লাহর আত্মত্যাগের সার্থকতা।