ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
পেকুয়ায় শ্বশুরবাড়িতে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু তিউনিসিয়া-জাপান ম্যাচে রেফারির কেন বিশেষ পোশাক? গোয়ালন্দে প্রশাসনের ওপর হামলা চালিয়ে আসামিকে ছিনিয়ে নিল মাদক ব্যাবসায়ীরা ৬ষ্ঠ জাতীয় চা পুরস্কার ২০২৬-এ ইস্পাহানির অনন্য অর্জন মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী ‘মাওরা সোহেল’ গ্রেপ্তার মাদকে জড়িত বিএনপি নেতাকর্মীদের আগে গ্রেপ্তার করুন: এমপি মামুন দিনাজপুরে পুরাতন বইয়ের বাজারে মন্দা, কমেছে পাঠক বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে নোবিপ্রবিতে উৎসবের আমেজ কুষ্টিয়ায় পাথরবোঝাই ট্রাক উল্টে চালক ও সহকারী নিহত মা-বাবাকে অবহেলা করো না, জাহান্নাম নেমে আসবে পৃথিবীতে! রংপুরে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ৬ সদস্য গ্রেপ্তার তামু ও তার সুপারহিরো বাবার গল্প বাংলাদেশের হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর ম্যাচ ডিজিটাল রূপান্তরের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঢাকায় ১২তম ডিজিটাল সামিট অনুষ্ঠিত আমরা শুধু কেপ ভার্দে নই, পুরো আফ্রিকার জন্য খেলছি: বুবিস্তা বলিভিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা দোকানের তালা ভেঙে ১ হাজার ৪৪০ ক্যান বাংলাদেশি বিয়ার জব্দ খবরের কাগজের বাগেরহাট প্রতিনিধিকে প্রাণনাশের হুমকি! আজ বিশ্ব সংগীত দিবস সৃজনশীল অর্থনীতি: বাংলাদেশের নতুন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ইতিহাসের পাতায় তিউনিসিয়া-জাপান ম্যাচ: ফুটবল বিশ্বকাপের ১০০০তম লড়াই ঢাকাসহ ১৫ জেলায় ৬০ কিমি বেগে বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা উত্তরের ৪ জেলায় বন্যার শঙ্কা, আগামী ৭২ ঘণ্টায় বাড়তে পারে নদ-নদীর পানি আরেকটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে : ডা. শফিকুর রহমান স্পেনের ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন এলোয় রুম: কুরাসাও গোলরক্ষকের বিশ্বরেকর্ড ঢাকার বাতাস আজ ‘সহনীয়’, দূষণের শীর্ষে জাকার্তা টাকার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত উখ্যাইংওয়ংয়ের সাম্বা সাম্বা সাম্বা, ফিরে এল সাম্বা নৃত্য ২১ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল

জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার মতো আমাদের গ্রাম

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪ এএম
জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার মতো আমাদের গ্রাম
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

চতুর্থ পর্ব

দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

তা ম্যাট্রিকটা তো পাস হলো, এবার কী করবেন? ধারেকাছে এমন কোনো কলেজ ছিল না যেখানে তিনি ভর্তি হতে পারেন। মুন্সিগঞ্জে হরগঙ্গা কলেজ স্থাপন অনেক বছর পরের ঘটনা। কলেজে পড়তে হলে সেই কলকাতায় গিয়ে থাকতে হয়। সেটা ছিল অসম্ভব এক কল্পনা। কলকাতায় আত্মীয়স্বজন বলতে এমন কেউ ছিলেন না যিনি ছেলেটিকে তার বাসায় আশ্রয় দিতে পারেন। ছিলেন যারা তারা নিজেরাই ছিলেন প্রায় নিরাশ্রয়। ছোটখাটো কাজকর্ম করতেন, কারণ তাদের লেখাপড়ার সুযোগ ঘটেনি। সবচেয়ে ভালো অবস্থায় ছিলেন যিনি তিনি কাজ জোগাড় করতে পেরেছিলেন আমেরিকান এক কোম্পানিতে, তাও অফিসে নয়, কর্মকর্তার বাসগৃহে। এরা স্বামী-স্ত্রী কলকাতায় থাকতেন, তাদের গৃহে অন্য কেউ ছিলেন না। এদের একজন দেশি কেয়ারটেকার আবশ্যক ছিল। সাহেব ও মেম সাহেবের খাবার-দাবারের জন্য কী কী দরকার কেয়ারটেকার প্রতিদিন সকালে তা জেনে নিয়ে বাজার করতেন, বাবুর্চিকে বুঝিয়ে দিতেন। মাঝে-মধ্যে পার্টি হতো, তখন বিশেষ কী রকমের খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন তা জেনে নিয়ে তদনুযায়ী আয়োজন করতেন। মোগলাই স্টাইলে তার পদবিটা ছিল খানসামা। নামটি ইংরেজদের দেওয়া; তাদের ভাবসাব ছিল মোগল বাদশাহদের মতোই। বড়দিনের ছুটিতে সাহেব-মেম নিজেদের দেশে চলে যেতেন, আমাদের ওই আত্মীয়টি তখন ছাড়া পেতেন গ্রামে আসার। তা খালি হাতে আসতেন না। বিশেষভাবে যা আনতেন তা হলো দুষ্প্রাপ্য এবং অতিশয় আকর্ষণীয় শুকনো খাবার- স্লাইস করা পাউরুটি, টিনের মাখন, প্যাকেটের বিস্কুট, বয়মে জেলি। এসব সামগ্রীর কিছু কিছু আমাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যেত। কলকাতাবাসী আরেক আত্মীয় শুনতাম সুদের ব্যবসা করেন, কল্পনা করতাম তিনি নিশ্চয়ই ভয়ংকর চেহারার কেউ হবেন; কিন্তু যখন গ্রামে এলেন এবং নিজের কন্যাসন্তানটির জন্য নিয়ে এলেন নানা আকৃতির ও শোভার খেলনা, তখন দেখলাম তিনি আমাদের আপনজনদের মতোই স্নেহভরপুর একজন মানুষ। মাতৃ-পিতৃহীন আমার বাবাকে এরা যতই স্নেহ করুন এদের কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না কলকাতার মতো হৃদয়হীন ব্যস্ত শহরে তাকে আশ্রয় দেওয়া। ওদিকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটিও তো এই সময়েই ঘটে; আমার বাবার অল্পবয়স্ক অভিভাবক ফরহাদ চৌধুরী মারা যান। 
পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্নবিলাসিতা ছেড়ে দিয়ে আব্বা কলকাতায় গিয়ে হাজির হন, কর্মের সন্ধানে। উঠেছিলেন কলিন্স লেনের যে বাসাটিতে গ্রামবাসী কয়েকজন মেস করে থাকতেন সেখানেই। ওঠা মানে মাথাগোঁজার ঠাঁই পাওয়া। এদের কলকাতা কথিত বঙ্গীয় রেনেসাঁসের শহর ছিল না, ছিল সস্তা বাসস্থানের অলিগলি। অনেকটা সেভাবেই থাকতেন, বাংলাদেশের প্রবাসীরা এখন যেভাবে থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে এবং ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন শহরে। 
রোজ সকালে আব্বা গভীর আগ্রহে পত্রিকায় কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখতেন। তার পর রাইটার্স বিল্ডিংসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যালয়ের বারান্দায় ঘোরাফেরা করতেন ভ্যাকেন্সি আছে এমন নোটিশের খোঁজে। এমনি এক দুপুরে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দোতলায় ১৫-১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরটি হাঁটাহাঁটি করছিলেন। গরমের দিন, সকালে হয়তো ভালো নাস্তা খাওয়াও হয়নি, কোথাও চাকরির কোনো সম্ভাবনা দেখেননি, ক্লান্ত হয়ে একটি অফিসের দরজার সামনে নিয়ন্ত্রণ ও জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। একটু হইচই ঘটে; তাকে অফিসের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন এক ইংরেজ, তার সঙ্গে আলাপ করছিলেন স্টেটসম্যান পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আর্থার মুর। পরিচর্যায় জ্ঞান ফিরলে তারা দুজনে কিশোরটির সঙ্গে কথা বলেন। তার প্রয়োজনের বিষয়ে জানতে চান। এবং সহানুভূতিশীল আর্থার মুর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বেঙ্গল পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কাছে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরের পদে কিশোরটিকে নিয়োগ দানের জন্য সুপারিশ করে চিঠি লেখেন। সেকালে পুলিশের চাকরিতে পরীক্ষা ছিল, কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো সুপারিশকে। কেননা, তাতে নিশ্চিত হওয়া যেত যে, প্রার্থীটি নির্ভরযোগ্য। ওদিকে পত্রিকায় সম্পাদকরা তখন বেশ মর্যাদাবান ছিলেন; বিশেষ করে যে পত্রিকা ইংরেজদের মালিকানাধীন সে পত্রিকার সম্পাদক তো বটেই। আব্বার পুরোনো কাগজপত্র তেমন রক্ষিত হয়নি; পোকায় কেটেছে, পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে, রক্ষায় তিনি যে মনোযোগী ছিলেন তাও নয়, যে কয়টি কাগজ আমরা তার মৃত্যুর পরে দেখেছি তার মধ্যে একটি হচ্ছে আর্থার মুরের চিঠির জবাবে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের অফিস থেকে বেঙ্গল ক্লাব, ক্যালকাটা ঠিকানায় পাঠানো একটি চিঠি, যাতে বলা হয়েছে- প্রার্থী যেন তার জেলার পুলিশ সুপারের কাছে আবেদনপত্র জমা দেন। কাগজপত্রের মধ্যে আরেকটি ছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তার কৃতকার্যকতার টেস্টিমনিয়াল; সেটিতে সই করেছেন স্কুলের হেডমাস্টার সুরেন্দ্র চন্দ্র পাল চৌধুরী। 
আব্বা গ্রামে ফিরেছিলেন এ সুসংবাদ নিয়ে যে পুলিশ বিভাগে তার চাকরি হওয়ার আশা আছে। সুপারিশকারী ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন যে, শরীর-স্বাস্থ্য, জ্ঞানবুদ্ধি এবং সর্বোপরি সুপারিশের বিবেচনায় আব্বার নিয়োগ না পাওয়ার কারণ নেই। কিন্তু ছেলে পুলিশের চাকরি নেবে শুনে আমার দাদি মোটেই সন্তুষ্ট হননি। ওই কাজ তার ছেলের জন্য বিপজ্জনক হবে বলে তার বিশ্বাস। এক ছেলে চলে গেছে, অবশিষ্টটি বিপদের ঝুঁকি নেবে, চোর-ডাকাত ধরতে রাতবিরাতে বনবাদাড়ে ছোটাছুটি করবে ভেবে তাকে নাকি দুশ্চিন্তাগ্রস্তই দেখা গেছে। 
মায়ের মন বুঝে আব্বা ফেরত গেছেন কলকাতায়। ঘোরাফেরা করে চাকরি পেয়েছেন এক বিদেশি কোম্পানিতে। তাদের ছিল রাবারের ব্যবসা। আসাম, বার্মা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে রাবার উৎপাদন করাত এবং চালান দিত নানা দেশে। সে কাজ কিছুদিন করে, সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়ে পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টে নিয়োগ পান; এবং কিছুদিন পরে যান ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট। ইনকান ট্যাক্সের তখন নাম ছিল সেলস ট্যাক্স, পাশাপাশি ছিল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনকাম ট্যাক্স, পরে পাকিস্তান আমলে দুটি একত্র হয়ে নাম নেয় ইনকাম ট্যাক্স। ১৯৬৩-তে অবসর গ্রহণের সময় পর্যন্ত ওই দপ্তরেই ছিলেন। অফিসার ছিলেন না, ছিলেন হেড অফিসের অফিস সুপারিনটেনডেন্ট। 
ঝোপঝাড় ও রোগ-জীবাণুতে পরিপূর্ণ আমাদের ওই গ্রামে কবি জীবনানন্দ দাশ তার রূপসী বাংলায় যে ধরনের গাছ, পাখি, লতাপাতা, ঘাস, নদী, ফসলের কথা বলেছেন সে সবের কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। তবে অসুবিধা ছিল একটাই। সেটা এই যে, সেখানকার মানুষের পক্ষে ওসবের ভেতরে সৌন্দর্য দেখতে পাওয়াটা মোটেই সহজ ছিল না। সবাই ছিলেন ভুক্তভোগী। বর্ষায় যখন নতুন পানি আসত, দেখা যেত খলবল করছে মাছ, কিংবা নৌকা নিয়ে খাল বেয়ে যখন ইছামতী নদীতে পড়া যেত, কিংবা আড়িয়ল বিলের ভেতর দিয়ে যখন নানাবাড়িতে যাওয়া ঘটত, অথবা কোনো আত্মীয়স্বজনের নৌকা যখন বিল পার হয়ে এসে ঘাটে ভিড়ত তখন আমরা নির্মল আনন্দ পেতাম। পাখির, বিশেষ করে ঘুঘুর ডাক খুব মধুর শোনাত। গাছ থেকে আম পড়ে উঠান ভরে যাওয়াতেও সৌন্দর্য ছিল। খুশি হতাম মাছ ধরতে পারলেও। কিন্তু এসব ছিল স্বল্পকালীন। মেলাতেও গেছি, কিনেছি জিনিসপত্র; নদীতে নৌকা বাইচও ছিল উত্তেজনাকর। তবে স্থায়ী ছিল অন্ধকার। এবং বিষণ্নতা। এখন মনে হয় এ বুঝি সেই বিষণ্নতা যা বহন করে জহুরুদ্দীন চৌধুরী একদা এই সীমান্ত-প্রান্তে এসেছিলেন, ছিন্নমূল হয়ে। আর এর মধ্যেই আমি ভয় পেতাম এমন দুঃস্বপ্ন দেখে যে অন্ধকারে বিরাট এক মাঠে হারিয়ে যাচ্ছি। একাকী হয়ে। ভয় ছিল সন্ধ্যার পরে দেখা বাড়ির সামনের বিরাট বটগাছটিকেও। 
১৯৪২ সালেই হবে, তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছে; যুদ্ধের ধাক্কায় গ্রামে কিছু পরিবার চলে এসেছে, আব্বার এক চাচাতো বোনও এসেছেন। তারা কলকাতায় ছিলেন। ফুপা কলকাতা পুলিশে কাজ করতেন। আমার ওই ফুপুর দুই ছেলের মধ্যে একজন ছিল আমার বয়সী; তার সঙ্গে ভারি বন্ধুত্ব আমার, আবার ঝগড়াঝাটিও তার সঙ্গেই। তার বড় ভাইটি শেখরনগরের স্কুলে ভর্তি হয়েছেন। খুবই আমুদে মানুষ ছিলেন তিনি। মাতিয়ে রাখতে চাইতেন। কিন্তু কীভাবে সেটা করবেন? উপকরণ তো নেই। তার কাছে একটা ঋণ রয়েছে আমার; তার উদ্যোগেই আমি সাঁতার শিখেছিলাম, আমার ভাইবোনদের কেউই যা শিখতে পারেনি। ওই ভাই- গিনিদা বলতাম আমরা- কাগজে বড় বড় হরফে লিখে আশপাশের গাছে টানিয়ে দিয়েছেন একটা বিজ্ঞপ্তি, ‘আসিতেছে আসিতেছে ম্যাজিক খেলা, পুকুরের পাড়ে ওই গাবগাছ তলা’। সে খেলা সত্যি সত্যি এসেছিল কি না, এসে থাকলেও কী কী চমকপ্রদ জিনিস তিনি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার কিছুই মনে নেই; তবে বুঝেছিলাম যে ম্যাজিক দেখাবেন এই ধারণাটা তিনি পেয়েছিলেন চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় গিয়ে, যেখানে আমিও গিয়েছিলাম অন্যদের সঙ্গে; এবং একটি তাঁবুর ভেতরে জাদুর খেলা দেখেছিলাম; সেটুকু ছাড়া অন্য কিছুই স্মরণ করতে পারব না। গ্রামে আনন্দ ছিল না। বরং বিষণ্নতা যে কুয়াশার মতো বিছিয়ে ছিল সেটা স্মরণ করতে পারি। উঠানে নতুন ধান মাড়ানোর সময়ে ব্যস্ততা দেখেছি ঠিকই, কিন্তু খুব একটা আনন্দ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার টাপুরটুপুর শব্দ, বর্ষার পানিতে উঠানে মাছ উঠে আসা, বৈশাখের ঝড়ে আম কুড়ানোর উৎসব, নদীতে মাঝিদের গলা ছেড়ে গান গাওয়া, আড়িয়ল বিলে গিয়ে মাছ ধরার আয়োজন ও শাপলা ফুলের সমারোহ দেখা, বেদেদের নৌকা থেকে সওদাপাতি কেনায় মেয়েদের তৎপরতা, এসব ছিল; তবে ওই যে বললাম সবই ছিল সাময়িক ঘটনা, স্থায়ী ছিল বিষণ্নতা। 
পরের কালে অনেক সময়ে মনে হয়েছে যে, পরিবেশের সমগ্র বিষণ্নতাটা যেন মূর্ত ছিল আমার দাদির চলাফেরায়, কাজকর্ম, এমনকি চেহারাতেও। ছায়া নয়, ছোঁয়া নয়, তারও বেশি। এর মধ্যেই সব কর্তব্য তিনি পালন করতেন। আব্বা থাকতেন রাজশাহীতে, পরিবারের কর্তা ছিলেন বৃদ্ধা ওই মহিলাই। পালক  ছেলেটির সময়মতো বিয়ে দিয়েছেন তিনিই। 

চলবে...

বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি
বই

ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষাঋতু ছাড়াও যে ঝুম বৃষ্টির অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে তা এমরান কবিরের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থবৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনিনা পড়লে বোঝাই যেত না বর্ষার সময় ঝুম বৃষ্টিতে বারান্দায় বসে বই পড়লে যেমন অজান্তেই বৃষ্টির গতিময় ফোঁটা শরীরে পড়ে, শিহরণ জাগে আর নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয় মনএমরান কবিরের এই কাব্যপাঠে সে রকমই অভিজ্ঞতা হলো শব্দের মেঘেও যে বৃষ্টির ছটা থাকে তাও বুঝিয়ে দিল মেঘে গর্জন নেই তবে বর্ষণ আছে ফ্ল্যাপ থেকেই শুরু হয়েছে মেঘের ঘনঘটা, ‘তোমার ভূগোলে আসার পর/ ভেবে দেখ/ কীরূপ ছিল আমার জয়োল্লাস/ আজ ভূগোলের গোলে/ থামিয়ে রেখেছি গান/ ফেরার পথে নিয়ে যাব/ তোমার না-দেখানো-/ বৃষ্টির সোনালি আগুন/ যার জন্য অনেক আগেই আমি/ হয়েছিলাম খুন পুরো কাব্যে যেন এই শৈল্পিক খুনেরই প্রতিধ্বনি

এই বইয়ের উৎসমুখে একটি গদ্য শোভা পেয়েছে সেখানে লিখেছেন তিনি, ‘কোনো ঋতুই আমাদের কাছে পুরাতন হয়ে আসে না যতবারই আসে ততবারই যেন নতুন যেন ছন্দের সাথে ছন্দের সহবাস

কবিতায় বলেছেন তিনি, ‘বাতাস তখন আগুন আগুন,/ পলকে পলকে তার রমণীয় শিখা!’ বৃষ্টির আগে বাতাসের কাছে গ্রীষ্মের যে তীব্রতা তা কবি রমণীয় শিখার সঙ্গে তুলনা করেছেনমেঘ মেঘ গল্পকবিতাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে  মনে ভেসে ওঠে, ‘বনের ভেতর বন, তাহার ভেতর পালকের গান, উড়ন্ত উচ্ছল তার নয়নের আসমান’–কী শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিনি বর্ষাকে জীবন্ত করে তুলেছেন

বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মানুষ, বাংলার বর্ষাকে তিনি যেন শব্দের ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন এভাবে বাংলার মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া, বর্ষার বৃষ্টি গায়ে মেখে বড় হওয়া এক জলময় চিরায়ত রোমাঞ্চকর বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে, ‘বৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনি কবিতাগুলো

প্রায় প্রতিটি কবিতায় বর্ষার সঙ্গে এক রহস্যের চাঁদমুখ হয়ে ধরা পড়বে একটা চরিত্রঅধ্যাপিকা কে এই অধ্যাপিকা? তিনি বইটি উৎসর্গও করেছেন সেই অধ্যাপিকাকে অথচ তাকে সুনির্দিষ্ট করা দুরূহ বর্ষায় যেমন মেঘ থাকে, ঝড় থাকে, বৃষ্টি থাকে, বন্যা থাকে, বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথ থাকে, বৃক্ষের সঙ্গে বৃষ্টির অজ্ঞাত গল্প থাকে, ঠিক তেমনি কাব্যের বর্ণনায়, শব্দে, ভাবে চরিত্র বর্ষার মতোই রহস্য-রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে! কি জলকন্যা? একি বৃষ্টিবিলাসী নারী? কি কাব্যের পূর্ণতা? নাকি প্রকৃতির রূপক? নাকি কবির মনে সদা জেগে থাকা এক সৌন্দর্যের অনুপম মুখ? আবিষ্কারের জন্য পড়তে পড়তে বই শেষ হবে, রহস্যের শেষ হবে না, ‘অধ্যাপিকা,/ আপনি তো খুউব/ সরল অঙ্কের মতো/ তুমুল বৃষ্টিবাহিকা!’ কিংবাসবাই তো ছাত্র, রোদে রোদে থাকি বিস্মিত পাঠে/ তাপে তাপে বাষ্পীয় উত্তাপে, জানতে পারিনি একা/ আপনি এমন মেঘের মতোন উচ্ছল গায়িকা/ এমন ভেজা গান, গেয়ে যান/ ভিজে যায়/ সমস্ত অববাহিকা

মিথ মৈথুনকবিতায় তিনি আরও গাঢ় রহস্যের শ্যামল বনে বৃষ্টির ফোঁটার মতো করে বলে উঠলেন, ‘তার চেয়ে, অধ্যাপিকা/ সবুজ ঘাসের পাশে হাঁটতে থাকুন ধীরে/ আর তাকিয়ে দেখুন বারবার, কী যে অপরূপ রূপ বরষার

বর্ষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বর্ষার জলে ভেজা ভেজা পথে চলতে থাকা এই নিগুঢ় প্রতীকী চরিত্রটি বর্ষাকে সবাই উপলব্ধি করলেও কবি এমরান কবিরের কাব্য যেন বর্ষার স্বচ্ছ আয়না; অতীত, বর্তমান, দেখা-অদেখা সব একসঙ্গে অধ্যাপিকার  প্রতিটি চরণে, শাড়ির ভাঁজে এসে পাঠক হৃদয়ে ভর করে

মাঠ-ঘাট, জলে ভরা নদী, দিঘি, কূলভাঙা নদী বেয়ে গেয়ে যাওয়া বর্ষার সুখের মাঝি, কাদাময় পথ, বৃষ্টির আলিঙ্গন, বর্ষায় অভাবি গৃহিণীর অনাহারে থাকা, জলে পাতিহাঁসের মতো অবাধ গোসল করা শিশুর দল, ঘরের কোনে নিভৃতে একাকি দুটো মনের এক শরীর হওয়ার রহস্যের খেলাসবই আছে কাব্যে

কাব্যে ছোট ছোট কবিতা থাকলেও শেষে আত্মমগ্ন বীজের প্রত্ন ধারাপাত শিরোনামীয় একটি দীর্ঘ কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে ৩০০ চরণেরও অধিক কবিতা পাঠককে এক অভূতপূর্ব শিল্পআস্বাদনের অভিজ্ঞতা দেবে, ‘একদম নিঃশব্দ একাকিনী/ একান্তে দাঁড়িয়ে, একান্তে শুধু/ তিনি শুদ্ধতম একাকিনী/ আঁচল কোমরে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন মাঠে/ সেই সবুজ কৃষাণী

বর্ষার বিপুল, বিস্তৃত বহুমুখী চরিত্র অবদানের সঙ্গে যেমন বহুবিধ আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে তেমনি দীর্ঘ কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষাণীবাংলার চিরায়ত মাতৃরূপিণী অবয়ব তিনি মমতায় সংগ্রামে, শ্রমে শ্রান্তিতে, ত্যাগে তিতিক্ষায়, ভালোবাসায় রুক্ষতায় এক-একক-অদ্বিতীয় তিনি চির বিজয়িনী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া ইমারতের মতো হলেও বাইরে তার হাসির ছটাযেন পাকা ধান

আমরা জানি বৃষ্টি আমাদের এই অঞ্চলের কৃষি, সভ্যতা সংস্কৃতির কতটাজুড়ে রয়েছে দীর্ঘ কবিতাটিতে তা উঠে এসেছে দারুণভাবে কবিতাটিতে রয়েছে অদ্ভুত আত্মগীতি রয়েছে মায়া মোহনার কথা, নরম মাটি কৃষাণ-কৃষাণীর নরম হৃদয়ের কথা, রয়েছে ধান গানের কথা উৎপাদন আর জেগে উঠবার কথাও সবচেয়ে রয়েছে এক অপরূপ সম্ভাবনার কথা সব মিলয়ে বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের রোমান্টিকতা আর চিরায়ত বাংলার সম্বন্ধসূত্র উঠে এসেছে যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে আমাদের কৃষি, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংগ্রাম, প্রেম, কাম আর আর্থ-সামাজিক অবস্থা

কৃষাণী, নাকি অধ্যাপিকাকে বড় হয়ে বর্ষার চির ছায়া হয়ে থাকবে, মেঘের কোলে রহস্য হয়ে থাকবে তা অনুভব করতে এই কাব্য পাঠের বিকল্প নেই! বর্ষা আসবে বারবার কিন্তু কাব্যিক খুনির বিচার হবে না

সৈয়দ আলী আহসান প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২২ পিএম
প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

আমি তখন নবম বা দশম শ্রেণির ছাত্র আমাদেরলজিং টিচারকলেজে পড়েন একদিন তিনি জানালেন তাদের কলেজে একটি অনুষ্ঠান হবে, এতে যোগ দেবেন দেশের একজন বিখ্যাত কবি আমার মন খুব চাইছে কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে

মাথার মধ্যে লেখালেখির পোকা নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করে কাকপক্ষীও যেন টের না পায়, গোপনে কাগজকলম নিয়ে বসি লিখি কী লিখি জানি না একজন বিখ্যাত কবিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নালজিং সারকে খুব করে ধরলাম সার রাজিতার সঙ্গে অনুষ্ঠানে যাব কিন্তু বাবার অনুমতি লাগবে আমার বাবা কড়া মানুষ এমনিতে কোথাও যেতে দেন না কিন্তু আমার আবদারে রজি হলেন আমার সে কী আনন্দ!

হলভর্তি লোক ছাত্রছারা তো আছেই অভিভাবক, স্থানীয় গন্যমান্য অনেকেই উপস্থিত ভাগ্য ভালো, মঞ্চের কাছাকাছি বসার জায়গা পেয়ে গেলাম অনুষ্ঠানের মধ্যমণি দেশের বিখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান মুখে চাপদাড়ি, পোশাকে পরিপাটি তিনি যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, পুরো হল নীরব তিনি দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করলেন কঠিন কঠিন বিষয় তার অনেক কথাই মাথায় ঢোকেনি ঢোকার কথাও নয় তার বাচনভঙ্গি খুবই আকর্ষণীয় বুঝি আর না বুঝি শুনতে ভালো লাগছে আমার মুগ্ধতাসামনাসামনি একজন কবিকে দেখছি খেয়াল করলাম, তিনি দুটি চশমা ব্যবহার করছেন একটা খুলে আর একটা পরছেন, সেটাও বদলাচ্ছেন কারণ কী! অনেক পরে জেনেছি, কাছে এবং দূরে দেখার জন্য আলাদা চশমা দরকার হয়

দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে কবি নিজের লেখা কবিতা শোনালেন এই প্রথম মনে একটা খটকা লাগল, এটা আবার কেমন কবিতা!? পাঠ্যবইয়ে যে কবিতা পড়ি, এটা তো সেরকম না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালএদের কবিতা পড়লে বা শুনলে মনে কেমন দোলা লাগে, এই কবির কবিতায় তেমন দোলা নেই

যাই হোক, কবিতা বুঝতে না পারলেও কবিকে ভালো লেগেছে সব থেকে বড় কথা একজন কবিকে জীবনে প্রথম সামনাসামনি দেখা! কবি সেদিন যে কবিতাটি পড়েছিলেন, নামআমার পূর্ব বাংলা

পরবর্তীত, কলেজের পাঠ্যসূচিতে সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল পড়তে হয়েছে, ক্লাসে এটা নিয়ে স্যারের বক্তৃতা শুনতে হয়েছে, পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে হয়েছে আগে আমাদের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায় ছিল ছন্দমিলের কবিতা আগেই উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীনের কবিতায় চরণান্তেমিল’-এর বিষয়টি প্রথম দেখলাম চরণান্তে মিল নেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় ক্লাসে স্যার বললেন, এটা অমিত্রাক্ষর ছন্দ শিখলাম চরণান্তের মিল ছাড়াও কবিতা হয় স্যার আরও বললেন, মাইকেলের প্রায় কবিতাই ১৪ মাত্রার চরণে লেখা ১৪ মাত্রা মানে ১৪টি অক্ষর গুনে গুনে দেখলাম, তাই তো! প্রতি চরণে ১৪টি অক্ষরই তো আছে স্যার মাত্রা পর্ব সম্বন্ধেও বললেন ১৪ অক্ষর মানে ১৪ মাত্রা এই ১৪ মাত্রার চরণ আবার দুই ভাগে বিভক্ত প্রথম ভাগে মাত্রা, পরের ভাগে মাত্রা, এই হলো ১৪ শিখলাম মাত্রা আর পর্ব

এই সামান্য জ্ঞান নিয়ে সৈয়দ আলী আহসানের  আমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি দেখার চেষ্টা করলাম কবিতাটি এরকম

আমার পূর্ব বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ,

       অন্ধকারের তমাল

অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়,

      একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ

সন্ধ্যার উন্মেষের মতে

সরোবরে অতলের মতো

কালো-কেশ সঞ্চয়ের মতো

বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি

আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারে অনুরাগ

ঘুমের অলসতায় চোখ বুঁজে আসার মতো শান্তি

হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া স্নিগ্ধ নীলাম্বরী

(অংশবিশেষ)

 কবিতার বিষয় দেশানুরাগ গভীর মুগ্ধ অনুভবে দেশকে দেখা গদ্য-ছন্দে লেখা অন্তমিল তো নেই-, নেই মাত্রা পর্ব-সমতা আঁটোসাঁটোভাবে কাব্যালংকার না মেনেও যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হতে পারে, সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাএর একটি উদাহরণ

 

দুই.

লেখালেখির এই জীবনে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কারও সঙ্গে কালেভদ্রে, কারও সঙ্গে মাঝেমাঝে, কারও সঙ্গে প্রায় নিত্য দেখাসাক্ষাৎ হয় সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল মাঝেমাঝে, প্রয়োজনে কেউ কেউ যেমন করেন, বয়সের দেওয়াল তুলে অনুজদের একটু দূরেই রাখেন সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষ অনুজদের তিনি সহজ আনন্দে গ্রহণ করতেন

একবার হলো কী, আমি রেডিওতে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম শাহবাগ তখন রেডিওর প্রধান কেন্দ্র উপস্থিত হয়ে দেখি আমি যাদের সঙ্গে কবিতা পড়ব, তারা সবাই দেশের খ্যাতিমান কবি, আমি একমাত্র কবিযশঃপ্রার্থী তরুণ এক-দুজন তো তাচ্ছিল্য করল আমি মেনে নিয়েছি কারও কারও খ্যাতির অহংকার তো থাকতেই পারে রেওয়াজ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সৈয়দ আলী আহসান সেদিন আমার লেখার মৃদু প্রশংসাই করেছিলেন

বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ আলী আহসানের গ্রন্থসংখ্যা অনেক শুধু সংখ্যা বিচারে নয়, বিষয়-বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ এর মধ্যে একটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করছি বইটির নামপ্রেম যেখানে সর্বস্ব উল্লেখ করার কারণ, এই বইটির আমিআঁতুড়-সাক্ষী

আমি তখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় যুক্ত ওই কাগজে সৈয়দ আলী আহসানের আনেক লেখা ছাপা হয়েছে যখনই চেয়েছি, সৈয়দ আলী আহসান লেখা দিয়েছেন তবে লেখাটি তৈরি হতোশ্রুতিলিখনপদ্ধতিতে

প্রেম যখানে সর্বস্বএকটি সংকলন গ্রন্থ এই সংকলন গ্রন্থের প্রায় সবকটি লেখারই আমি ছিলামশ্রুতি লেখক নির্দিষ্ট সময়ে যেতাম সৈয়দ আলী আহসানের কলাবাগান এলাকার বাসায় তিনি আগে থেকেই যেন প্রস্তুত থাকতেন আমি খাতাকলম নিয়ে বসতাম তিনি চোখ বুঁজে বলতেনধীর গতি, স্পষ্ট উচ্চারণ হাতের কাছে কোনোরেফারেন্সনেই তিনি বলে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সব তথ্যই তার মুখস্থ লেখার শেষ বাক্যটি বলে চোখ খুলতেন, বলতেন, চলবে তো? মননশীল আধুনিক কাব্যবোধ, চিত্রকলা, প্রেমানুভূতির বহুমাত্রিকতা ছিল লেখাগুলোর বিষয় ফরাসি সাহিত্যের আনুপূর্বিক খুঁটিনাটি, শিল্পকলার বাহ্যিক সৌন্দর্য অন্তর-ঐশ্বর্য তার ওইসব লেখায় বিস্তৃত চিত্রশিল্প বা ভাস্কর্য বিশ্লেষণেনারীবিষয়টি সৈয়দ আলী আহসানের লেখায় বিস্তৃত নতুন মাত্রা পেত বিশেষ করে নারীশরীরের সৌন্দর্য মাহাত্ম্য বর্ণনায় তার ভাষা-প্রাঞ্জলতায় শিল্পচেতনারূপ দ্যুতি ছড়াত

অসংকোচেই বলি, শ্রুতিলেখক হিসেবে আমি বেশ আনন্দই পেতাম

গ্রন্থকথা মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়
বই

একটি সুন্দর জাতি গঠন করতে হলে অবশ্যই বই পড়তে হবে বই মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় আমেরিকান কবি জেমস রাসেল বলেছেন, ‘বই হলো এমন এক মৌমাছি যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে প্রসঙ্গে দুঃখ করে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশের লোক বই পড়েন বটে, কিন্তু পয়সা খরচ করে কিনে পড়েন না’…

আশির দশকের শেষপ্রান্তের কবি শামীম আহমদের এগারোতম কবিতার বইটি এবারের বইমেলায় এসেছে গ্রন্থে ছাপ্পান্নটি কবিতার পাঠোদ্ধার করা গেল তবে, শামীম আহমদের কবিতা স্বপ্রণোদিতভাবে একটি ভিন্ন পরিচয় নিয়ে আসে, তার কবিতা যারা নিয়মিত পড়েন তাদের কাছে সেটা উন্মোচিত হয় তার কবিতায় অসংখ্য পাশ্চাত্য প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প ব্যবহার হয় এবং বেশ দক্ষভাবে তবে বর্তমান আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে এই স্বাভাবিক প্রবণতার স্বল্পতা লক্ষণীয় এবং কেন যেন কবি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে কবিতাগুলো লিখেছেন এবং বেশ সহজভাবে প্রকাশ করেছেনযেখানে শুধু বানিয়ার বাণিজ্য বিতানে/ বোধের বাণিজ্য হয় দেশাত্ববোধের মোড়কে,/ এই চটকদার বিজ্ঞাপনে/ আমি ভুলে যাই জন্মমূল মায়ের জঠরের সুতীব্র আর্তনাদ’ (আমি মাতৃভূমি: পৃ-৪৮)জংধরা জ্যোৎস্না দেখে প্রফুল্ল হওয়া নিরেট মূর্খতা/ এর চেয়ে মোমবৃক্ষের আলো নিষ্পাপ পবিত্র/ নিজকে পুড়িয়ে লীন হয়ে যায়/ আঁধারের যবনিকাপাতে’ (বর্তমান তারুণ্যের প্রতি: পৃ-৩৮) কবি universal true চাঁদের আলোকেও আজকের দেশ সমাজের অধোগতি দেখে পুরো ক্রোধে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেনরূপকের এই দেশে আমি বড্ড সন্দিহানপ্রতিকী আলখেল্লায়, দূর্যোধনের তীরের মতো/ চিকচিক করে দৃষ্টির ফলা/ কখন যে আঁচড়ে পড়ে মৃত্যুর সওদা নিয়ে কে জানে’ (সফেদ হাঙ্গর: পৃ-৪৬) চারপাশের অবক্ষয় দেখে কবি সন্দিহান কখন যে সমাজ, জনপদ কুজনের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তা কবি দিব্যদৃষ্টিতে foresee করতে পারছেন নিবেদিতপ্রাণ কবিই সমাজের এই অধঃপাত দেখতে পারেন কারণ কবি শিষ্টজন তিনি বলে ওঠেন, ‘হে বন্ধু আমার, তুমি কি দেখো নৈসর্গিক বিলাস?/ আমি সব দেখে চোখ বুজি/ নৈষ্ঠিক ঋষির মতো/ বুকের গভীরে পুঁতে রাখি আরাধনার বীজ’ (নৈষ্ঠিক ঋষি: পৃ-৪৭)ডানাভাঙা পায়রা/ হাওয়ায় খুঁজে ফেরে আঁততায়ীর মুখ.../ রোদের গায়ে কান্না, লেগেছিল রক্তের দাগ আজ মনে হয় সময়ের স্রোতে/ মিশে যাচ্ছে সব স্মৃতি’ (আঁততায়ীর মুখ: পৃ-৬২)

শামীম আহমদের কবিতার একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবেই বলা যায়, তার কবিতায় থাকে প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি যা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তিনি প্রয়োগ করেন, যা অনেক বোদ্ধা কবির কাছেও ঈর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কাব্যের সামগ্রিক ছাপ্পান্নটি কবিতা পড়লে মনে হয় কবি চটজলদি কবিতাগুলো লিখে ফেলেছেন যার কাছে কবিতা লেখার সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ, শহীদ কাদরী এসে টেবিলের চারধারে ঘিরে ধরেন, তার কাছ থেকে এত চটজলদি কবিতাগ্রন্থ পাঠক কামনা করে না এমনও হতে পারে দেশ সামাজিক পরিবেশের সাম্প্রতিক দৈনতা তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে তবুও তার কবিতা এক অনন্যতার জন্য আমাদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে

সিলেটের ভাস্কর প্রকাশন মুদ্রণে রাজধানীর সেরা প্রকাশনকেও হার মানিয়েছে প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর অঙ্কন করেছেন আল নোমান

কবিতা অনুবাদ হয় না মানুষের

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
অনুবাদ হয় না মানুষের

সব মানুষই পরিব্রাজক

পানিপথের যুদ্ধ থেকে

            বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই পর্যন্ত

 

যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ছেড়ে

কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে

কার্তুজও জানে

            কখনো না কখনো জাগতে হবে

 

জন্মসূত্রেই মানুষ শিখেছে হানাহানি

প্রয়োগও করছে

            প্রেমে কিংবা রাষ্ট্রতন্ত্রে

 

            মানুষ কখনোই অনূদিত নয়...

কবিতা স্মৃতির ভেতর

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০১ পিএম
স্মৃতির ভেতর

যে ঢেউ ঘুমায় না সমুদ্রের মন্থর বুকে, পাশ ফিরে খোঁজে সমসূত্র-ছেঁড়া ফেরারি ঢেউ; তার মতো একাকী রাত জেগে আছি বুকের উঠোনে সুতীব্র বেদনার মাশরুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে, চিতার কালো জোছনা ঝরে পড়ে নখরে নখরে

 

হরিণখোলা মুণ্ডেশ্বরীর জলে যে দেহাতি সন্ধ্যা বিসর্জন-বিসর্জন খেলে, তুমি তার মতো আমাকে বিসর্জন দিয়ে গেছ এই স্যাঁতসেঁতে শহরে কতকাল শাদা পালকের তারাদের কোন্ডর পাখিদের মতো ডানা মেলে নামতে দেখিনি শালিকদের চরাচরে

 

আহা, কী নিখুঁত পরিকল্পনা তোমার! তবুও আতপচালের গন্ধমাখা স্মৃতির ভেতর

সোনামুখী সুই দিয়ে সেলাই করে যাব ছেঁড়া ছেঁড়া মায়ার কাহন