শতাধিক গ্রন্থের লেখক ও কথাসাহিত্যিক মাসুদ আহমেদ। কর্মজীবনে তিনি প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘চৈত্রপবন ও দিগন্তরেখা’ উল্লেখযোগ্য পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সাহিত্য পুরস্কারসহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।
আপনি এখন কী লিখছেন?
‘আকাশ গঙ্গা’ নামে একটি মহাজাগতিক উপন্যাস লিখছি। তাতে সৌরজগৎ, ছায়াপথ, সময়, মৃত ও জীবিত প্রিয়জনের জীবনস্রোত এবং ধর্মের অভয়বাণীর প্রতিচিত্র স্থান পাচ্ছে। সৃষ্টির অপার সৌন্দর্য, পার্থিব ও অপার্থিব জীবনের পরম্পরায় বিজ্ঞান ও কল্পনার মিশ্রণে এ লেখাটি রচনার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া ‘২৮৩ দিন ও রাত’ নামে ১৯৭১-এর একটি কাহিনিতেও হাত দিয়েছি। ১ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের এ রাজনৈতিক উপাখ্যানে সে সময়ের প্রধান কুশীলব এবং ঘটনাপুঞ্জি স্থান পাবে। চরিত্রগুলোর মনন এবং ঘটনার পূর্বাপর ও বিকাশ এবং পরিণতি তাতে আঁকার চেষ্টার করব। আমাদের জাতীয় জীবনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী দুটি ভার্সন থাকে। এজন্যই হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, বাঙালির বলা কোনো কথার শতকরা ৫০ ভাগ সত্য হওয়াই যথেষ্ট।’ কিন্তু আমার এ লেখায় তা হবে না।
এবারের বইমেলায় আপনার কোনো বই আসছে কি না?
‘লাবণ্যময়ী বসুধা, আমি তোমায় দেখেছি’ নামে একটি ভ্রমণ সাহিত্য এ মেলায় প্রকাশিত হয়েছে। হেরোডোটাস পৃথিবীর ইতিহাস লিখতে বসেছিলেন। যন্ত্রশকট, বাষ্পীয় জাহাজ বা বাইসাইকেল তখনো আবিষ্কার হয়নি। পদব্রজে ও পাল তোলা নৌকার সাহায্যে তিনি যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন তা প্রায় আড়াই হাজার বছর পরও পৃথিবীর সব সভ্য জাতিকে বিস্ময়াভিভূত করে রেখেছে। শংকর-এর লেখা ‘কত অজানারে’ বিংশ শতাব্দীর পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের সভ্যতার অনেক দিককে গ্রন্থবদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ভ্রমণ করে তার অভিজ্ঞতা আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। তা অনেক ক্ষেত্রে সাহিত্য ও দর্শনে পরিণত হয়ে উঠেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন ও ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বের নানা জনপদ দেখবার সূত্রে আমি এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে গেছি। এ লেখায় সেসব স্থানের নিসর্গ, বারিধি, বনাঞ্চল, মানুষ, অর্থনীতি, সরকার, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ক্ষমা, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, পোশাক, গুণ, দয়া, নিষ্ঠুরতা, আবহাওয়া এবং মানবসভ্যতায় তাদের অবদানের নানা প্রমাণ ও খুঁটিনাটি বিবরণ ফুটে উঠেছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার গুণাবলি এবং আমাদের অনুন্নত কিন্তু বিশাল প্রতিবেশীর আচরণ ও নানা গুণের মূল্যের কথাও এতে বলেছি। বিশ্বের কুড়িটিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ দেশের মৌলিক উপাদানগুলোর এমন বর্ণনা বিধৃত করা এই একক গ্রন্থের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বর্ণনা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতিটির নোঙরবদ্ধ লেখচিত্র বলে পাঠকের কাছে মনে হবে। একটি বিশাল মেধাবী জাতির যুথবদ্ধ প্রচেষ্টা ও তার সুফলের সময়ানুক্রম এ অধ্যায়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ভ্রমণ কাহিনি গ্রন্থপুঞ্জের মধ্যে এটি এক নতুন সংযোজন।
আপনার বই নিয়ে পাঠকের উদ্দেশে বলুন?
’৭১-এর সাহিত্যে পশ্চিম পাকিস্তানি চরিত্র, যুদ্ধের নৃশংসতার সঙ্গে মানবিকতা, শান্তি, যুদ্ধশিশু ইত্যাদি উপজীব্য আর কোনো লেখক আমার মতো আনেননি। এগুলোতে আগ্রহী পাঠকদের অনুরোধ করব মাওলা ব্রাদার্স ও ‘অন্যপ্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত আমার উপন্যাস ও গল্প সংকলনগুলো পড়তে। চৈত্র পবন ও দিগন্তরেখা, অন্যদিন, বিজন নীল জলে, রৌদ্র বেলা ও ঝরা ফুল, নবীন প্রভাত ও বিকেল শেষের আলো’ গল্পগুলোতে বিশেষ করে এই উপজীব্য পাওয়া যাবে।
বর্তমান সময়ে সাহিত্য সম্পর্কে আপনার মতামত বলুন।
ভালো পাঠযোগ্যতা আছে এমন লেখা কম ছাপা হচ্ছে। যদিও প্রকাশিত বইপত্রের সংখ্যা অনেক বেশি। শামসুর রাহমানের মতো কবিতা কিংবা
ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো গদ্য খুব কমই দেখতে পাই।
ইদানীং আপনি কোন বই পড়ছেন? কোন বই আপনাকে আকৃষ্ট করেছে?
রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প ও কবিতা এবং প্রশান্ত কুমার পাল বাবুর লেখা তার জীবন কাহিনি নতুন করে পড়ছি। জনাব মোস্তফা কামালের লেখা মোহিনীও পড়ছি।
বাংলা সাহিত্য ইংরেজি অনুবাদ আশানুরূপ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে পিছিয়ে পড়ছে- এ বিষয়টিকে আপনি সংকট মনে করেন কি না?
মূলত অনুবাদের জন্য নয়, সাহিত্যে বিশ্বদৃস্টি তথা শ্বাশত মানবজীবন থাকতে হবে। এরপর সেগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করে বিশ্বসভায় নিতে হবে। তাহলে আমরা আগাতে পারব। দেশের সবগুলো সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া একজন সাহিত্যিক আমাকে সরলভাবে এবং সেমিনারে প্রকাশ্যে বলেছেন, তার অনুবাদ যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ সাহিত্যিকের হস্তক্ষেপের পরও সেখানকার কোনো প্রকাশক ছাপাতে অপারগতা জানিয়েছে। অনুবাদের কারণে নয় বরং রচনায় ভারতবর্ষের হাজার বছরের আত্মার কান্না শুনতে পেয়েই রবীন্দ্রনাথকে পাশ্চাত্য আন্তর্জাতিকীকরণ করতে সম্মত হয়েছিল। এ গুণ না থাকায় হুমায়ুন আহমেদের ‘জননী ও জ্যোৎস্নার গল্প’ এবং ‘গৌরীপুর জংশন’ ইংরেজিতে অনূদিত হলেও পাশ্চাত্যে সেগুলো কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
খবরের কাগজ সাহিত্য সাময়িকী ‘সুবর্ণরেখা’ সমৃদ্ধ হোক, কবি হয়ে এ কামনাই রইল।