জুন মাসের এক সন্ধ্যায় রাহাত আলম তার প্রিয় চাকরিটা ছেড়ে দেয়।
সন্ধ্যায় বৃষ্টি হচ্ছিল। অফিসে এসি চলছে, সহকর্মীরা ডেস্কে নিবিষ্ট হয়ে কাজ করছে, বাইরে বৃষ্টি; তবু কোথাও একটা অস্বস্তিকর গুমোট হাওয়া সে টের পায়। কাজে কোনোভাবেই মনটা থিতু হয় না। টেবিলে চায়ের কাপ ঠাণ্ডা হতে থাকে। কম্পিউটার সে অন করেছে ঠিকই, একবারও মাউস ছুঁয়ে দেখেনি।
রাহাত আলম একটি জাতীয় দৈনিকের মফস্বল বিভাগে কাজ করে। নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে অফিসে তার সুনাম আছে। বিভাগীয় প্রধানের অনুপস্থিতিতে সে কাজ সামলে নিতে জানে। সাত বছরে ওর কোনো প্রমোশন হয়নি, কাজের বিভাগও বদল হয়নি।
বয়সে তরুণ, কবিতা ছাপাও হয় কম; তবু কবিখ্যাতি আছে রাহাত আলমের। বাংলাদেশের সব নামি কাগজে তার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। একটা-দুটো গল্প, গদ্য, কখনো গ্রন্থালোচনা। কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায়ও তার কবিতা বেরিয়েছে। নিজস্ব রুচি ও চরিত্রের কারণে প্রচারের আলো থেকে সে নিজেকে যথাসম্ভব সরিয়ে রাখে। অফিসে তার বিভাগের লোকও অনেকদিন জানত না সে কবিতা লেখে। একটা নামি পুরস্কার পাওয়ার পর, পত্রিকায় খবর বেরোয়, ছবিসহ। অন্যদের সঙ্গে বিভাগের ইনচার্জও চোখ বড় করে তাকায়, আরিব্বাস। ভেতরে ভেতরে তাহলে এই?
এরপর রাহাত আলমের খানিকটা উপকার হয়। সে যে নির্জন, মৃদু ও মগ্নচরিত্রের মানুষ, অনেকে দেখলেও ঠিক বুঝতে পারত না। এখন বুঝতে পারে। ভাবে, লোকটা অন্যরকম। কাজের প্রেসার থাকলেও তাকে সমঝে চলে। এতে সেও খুশি।
রাহাত নিজে বড় দৈনিকে কাজ করে, কিন্তু যেচে কখনো সাহিত্যপাতার সম্পাদককে কবিতা দেয় না। এমনকি ক্যান্টিনে তারা একসঙ্গে চা খায়, হাঁটে, তবু কবিতার কথা তোলে না।
অস্বস্তির শুরু ডেস্কে বসে চা খেতে খেতে পত্রিকায় চোখ বোলানোর সময়।
বিকেলের মুখে অফিসে ঢোকে রাহাত আলম। কাঁধের ব্যাগ ও ঘড়ি খুলে টেবিলে রাখে। কম্পিউটারের সুইচ অন করে। এরপর ধীরপায়ে হেঁটে ওয়াশরুমে চলে যায়। ফিরে এসে হাতমুখ মুছতে মুছতে পত্রিকায় চোখ বোলায়। ততক্ষণে চিনি ছাড়া লাল চা এসে যায়। যন্ত্রচালিতের মতো চা খেতে খেতে আয়েশি ভঙ্গিতে দরকারি খবরগুলো পড়তে থাকে।
চায়ে চুমুক দিয়ে সে একটা খবর খুঁজতে থাকে, কিন্তু কোথাও দেখতে পায় না। ভেতরে চারের পাতায় সিঙ্গেল কলামে সে খবরটা দেখে, পড়ে এবং বিরক্তি নিয়ে চাপা রাগে ফুঁসতে থাকে। চায়ের কাপ ঠেলে সে চেয়ারে শরীর ছেড়ে দেয়।
গত রাতে রাহাত নিজে খবরটা রেডি করে দিয়ে যায়। পেজ মেকাপের সময় তার মনে হয়, খবরটা মফস্বল পাতায় না ছাপিয়ে প্রথম পাতায় ছাপানো উচিত। বার্তা সম্পাদকের সঙ্গে উদ্যোগী হয়ে সে কথাও বলেছিল। তিনি রাজি ছিলেন। পরে হাতবদল হয়ে খবরটা প্রায় নাই হয়ে গেল?
ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে একটি এলাকার নাম বাঘের বাজার। এ পথে যাত্রীবাহী বাস ‘নীরব’ নিয়মিত চলাচল করে। ঈদের ছুটি শেষে বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফিরছিলেন সন্তানসহ এক দম্পতি। ঈদ কবেই চলে গেছে, তবু অতিরিক্ত ভাড়া কাটছিল সুপারভাইজার। ভাড়া কেন বেশি নেবে? প্রতিবাদ করলে যাত্রী ও বাসকর্মীর মধ্যে উত্তপ্ত কথা বিনিময় হয়। হঠাৎ বাস থামিয়ে জোর করে বাঘের বাজারে লোকটিকে নামিয়ে দেয়। বাসের ভেতর রয়ে যায় তার স্ত্রী-সন্তান। লোকটি বাসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাত তুলে চিৎকার করে, প্রতিবাদ জানায়। ড্রাইভার কড়া চোখে দেখে লোকটিকে এবং মুহূর্তেই তাকে পিষে দিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়। তার বউ ও বাচ্চাকে নামিয়ে দেয় পরের স্টপেজে।
স্থানীয় প্রতিনিধি টেলিফোনে যখন ঘটনার বিবরণ দেন, চোখ ভিজে আসে রাহাত আলমের।
দুর্ঘটনার খবরটি ছাপা হয়েছে ভেতরের পাতায়; বড়লোকের বাড়িতে ফকির-মিসকিনকে যেভাবে লাইনে বসিয়ে খাওয়ানো হয়, সেভাবে। ভালো করে না দেখলে চোখেও পড়বে না। অথচ ড্রাগন ফলের উপকার নিয়ে ফিচার ছাপা হয়েছে প্রথম পাতায়।
হতাশা ও অন্তর্গত ক্ষোভে সে ফেটে পড়ে। চেয়ার ছেড়ে ইনচার্জের ঘরে যায়। টেবিলে শরীরের ভর দিয়ে দাঁড়ায়- বস, এটা কী হলো?
কোনটা কী হলো?
রাহাত পুরো ব্যাপারটা পূর্বাপর মনে করিয়ে দেয়।
রাহাতের কথা শেষ হওয়ার আগেই মফস্বলের বিভাগীয় প্রধান হা হা করে হাসতে থাকেন।
রাহাত ভ্রু কুঁচকে বলে, আপনি হাসছেন কেন?
বিভাগীয় প্রধান শরীর দুলিয়ে আবারও হাসতে থাকেন। হাসি থামতেই চায় না। তার চোখেমুখে তাচ্ছিল্যের ভাব। একসময় হাসি থামিয়ে বলেন, রাহাত সাহেব, আপনি খুবই ইমম্যাচিউরড কথা বলছেন।
রাহাত নির্বাক তাকিয়ে থাকে।
খবর কোনটা কোথায় ছাপা হবে, তা নিয়ে আপনার মাথাব্যথার তো কোনো কারণ নেই। না?
কী বলছেন? সাংবাদিকরা কেবল খবরপ্রচারক নয়, জাতির বিবেকও। স্বার্থ ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে গিয়ে তাদের কাজ করতে হয়।
বিভাগীয় প্রধান আবারও হাসতে থাকেন। কিন্তু এবার হাসতে হাসতেই ব্রেক কষেন; দেখুন রাহাত, কর্পোরেট লাইফ সম্পর্কে আপনার ধারণা নেই। শহুরে জীবনে আপনার মতো মানুষেরা অযোগ্য।
কী বলছেন আপনি?
আপনি গ্রামের বাড়িতে হালচাষ করলে ভালো করতেন। কর্পোরেট দুনিয়ায় আপনারা বেমানান। অপটু। উটকো।
ইনচার্জের শেষ কথার পর আর দাঁড়ায় না রাহাত আলম। মৃদুপায়ে সে ডেস্কে ফিরে আসে। কিছু একটা করা দরকার। তীব্র তর্ক। প্রতিবাদ। অথবা কেবলই কথা। বসের কথার একটা দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া দরকার; সে মনে মনে ভাবে।
কিন্তু কী আশ্চর্য! একটা শব্দও মাথায় আসে না রাহাতের। অথচ শব্দের ভেতর-বাইরের রূপ-রস-গন্ধ নিয়েই সে কারবার করে। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে কাকের যেমন বিব্রত ও ল্যাদল্যাদে অবস্থা হয়, তার শব্দেরা আজ তেমন এলোমেলো, দিশাহীন।
জগতের কোনো চাকরিই বিশুদ্ধ নয়। চাকরি মানেই এক ধরনের পরাধীনতা। সংবাদপত্রের কাজটা রাহাত পছন্দ করে। মাস শেষ হলেই বেতন মেলে, তাও নয়। কাজের ফাঁকে এখানে ভাববার অবকাশ আছে, চারপাশের মানুষ ও ছবি দেখার খোলা আকাশ আছে। প্রান্তরের মতো মুক্তির স্বাদ আছে। অন্য অনেক চাকরিতে যা নেই। সে কারণেই চাকরিটা সে বেছে নিয়েছিল।
আজ কী যে হলো, অফিসের সবকিছু অচেনা আর অর্থহীন লাগছে।
পিয়নকে ইশারা করতেই ডেস্ক থেকে পত্রিকা ও চায়ের কাপ সরিয়ে নিয়ে যায়। রাহাত কিছুক্ষণ থম ধরে বসে থাকে। মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকে।
রাহাত মৃদু পায়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটতে থাকে।
বাথরুম এক রহস্যময় জায়গা। রাহাতের কোনো চাপ নেই। তবু সে বাথরুমে বসে থাকে। বেশকিছু সময় কেটে যায়। তার শিশ্নে একধরনের ভোঁতা অনুভূতি হয়। তবু সে বেরোয় না। নানা কথা মনে আসে। একবার মনে হয়, জায়গাটার নাম কেন বাঘের বাজার হলো?
কোনো একসময় এখানে বাঘের রাজ্য ছিল; এমনটা হতে পারে। মানুষ যখন নিজেই বাঘরূপে আবির্ভূত হয়, সত্যিকারের বাঘের পলায়ন ছাড়া গতি থাকে না। এখন অবশ্য সাফারি পার্কের ভেতরে জ্যান্ত বাঘ ঘুরে বেড়ায়। দেখে মায়া ও বিভ্রম হয়।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ধীরপায়ে সে নিজের ডেস্কে আসে। কম্পিউটারে দ্রুতগতিতে কিছু একটা টাইপ করে। একবার আড়চোখে লেখাটা পড়ে। প্রিন্ট করে। কাগজের নিচের দিকে খসখস করে একটা সিগনেচার ও তারিখ দেয়। বিভাগীয় প্রধানের ঘরে যায়। ইনচার্জের চোখে সে তাকায় না, কথাও বলে না। কাগজটা টেবিলে রেখে পেছন ফিরে দাঁড়ায়। কাগজ হাতে নিয়ে ইনচার্জ বিস্ফারিত চোখে তাকান। তাকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়ে রাহাত সরে যায়। ডেস্ক থেকে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নিঃশব্দে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে।
বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যায় রাহাত আলমের। হাতমুখ ধুয়ে সে বসার ঘরে যায়। রিমোট হাতে নিয়ে টিভি ছাড়বে, তখনই কানে আসে, মেয়ে গভীর গলায় কবিতা পড়ছে।
স্ত্রী বলেছিল, মেয়েটা টেলিভিশনে খবর পাঠের স্বপ্ন দেখে। কবিতা আবৃত্তির কোর্সে ভর্তি হতে চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কম পয়সায় ভালো আবৃত্তি শেখায়। রাহাত সময় করে মেয়েকে নিয়ে যেতে পারেনি। পরে বউই নিয়ে গিয়েছিল মেয়েকে।
এক মাসেই মেয়ে এমন চমৎকার কবিতাপাঠ শিখে ফেলেছে! রাহাত খুব অবাক ও মুগ্ধ হয়।
এমনভাবে মেয়েটা কবিতা পড়ছে যেন তার নিজেরই কথা। উচ্চারণ ও ভঙ্গি এতটা নিবিড়; আত্মবিশ্বাসে ভরা। রাহাত এতদিনেও কবিতাটির মর্মাথটুকু উপলব্ধি করতে পারেনি, এতটুকুন মেয়ে টের পেয়ে গেল?
রিমোর্ট পাশে সরিয়ে রাহাত সোফায় হেলান দিয়ে বসে। চোখ বন্ধ করে ঘাড়টা এপাশ-ওপাশ ফেরায়। মেয়েটা গলায় ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে পড়তে থাকে:
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ...
কী চমৎকার! নিজের মনেই কথাগুলো বলে রাহাত।
রাবেয়া এসে পাশে দাঁড়ায়; কখন এলে? যাও, হাতমুখ ধুয়ে এসো। আমি খাবার দিচ্ছি।
রাবেয়ার চোখে সে মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকায়; নিজের মেয়ে এত সুন্দর করে কবিতা পড়ে, জানতই না রাহাত। পড়ার ধরন উপলব্ধি করে মনে হয়, কবিতার ভেতরগত ভাবার্থ সে নিখুঁতভাবে রপ্তও করে নিয়েছে।
স্বামীকে এভাবে তাকাতে দেখে রাবেয়া বলে, কী হয়েছে তোমার?
রাহাত মাথা ঝাঁকায়; কিছু না। তুমি যাও, খাবারটা গরম করো।
একসময় জীবনানন্দ দাশের কবিতা খুব পড়েছে রাহাত। সে এক অদ্ভুত জিনিস; বিভোর করে ফেলে। এখন খুব একটা পড়া হয় না। অসামান্য কবিতা লিখে গেছেন জীবনানন্দ। পড়তে পড়তে মুগ্ধ করে। বুঁদ করে। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল; কিন্তু তার কবিতা ক্রমশ করাপ্ট করে ফেলে।
এতটুকুন মেয়ে আমার, যে এখনো কোলে এসে বলে, বাবা, ঘোড়া হও; সেই মেয়ে চলমান সময়ের নার্ভটা ধরে ফেলল? অথচ সে বুড়ো দামড়া হয়েও সময়টাকে উপলব্ধি করতে পারল না?
নিজেকে অপাঙ্ক্তেয় আর বাতিল মানুষ বলে অনুভূত হতে থাকে রাহাতের। রাতে স্ত্রী ও মেয়ে শুয়ে পড়লে সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। সাড়ে ১২টার মতন বাজে। একটা সিগারেট ধরায়। পথে এখনো অজস্র গাড়ি ও মানুষের ভিড়। সবার মধ্যে তাড়া ঘরে ফেরার, কিংবা ঘর ছেড়ে দূরে কোথাও যাওয়ার। পিছু ফেরার কারও সময় নেই।
একসময় নিজেকে একটা বুনো এলাকায় আবিষ্কার করে রাহাত আলম।
বাতাসে ফুলের সুরভী ও পাখির কিচিরমিচির; দূরে কোথাও বৃষ্টি নেমেছে। হিমেল হাওয়ায় জলের আভাস। সে অনুভব করে, এখানে স্ত্রী-কন্যা-চাকরির দায় ও দহন নেই। অপার্থিব আলো-হাওয়া-ঘ্রাণের ঢেউ তাকে উদাসী করে তোলে। এ কী ঘুম, না বিভ্রম; রাহাত বুঝতে পারে না। সে হাঁটতে থাকে। পথের দুপাশে বিচিত্র গাছ ও অচেনা লতাগুল্ম, মাঝরাস্তায় রাহাত; নিঃসঙ্গ ও একা।