সপ্তম পর্ব
দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
রাজশাহীতে
১৯৪২-এর শেষ দিকে হবে গ্রাম ছেড়ে আমরা রাজশাহী শহরে চলে এলাম। রাজশাহীতে আব্বা অন্য কয়েকজনের সঙ্গে এক বাসায়, যাকে বলে মেস করে থাকা, সেভাবে থাকতেন। একতলা একটি বাসা ঠিক করে আমাদের নিয়ে গেলেন রাজশাহীতে। দাদিও এলেন সঙ্গে।
রাজশাহী যে তখন মস্ত বড় শহর তা নয়, মহামন্বন্তরের কারণে বিপর্যস্তও বটে; এবং এখন মনে করতে পারি শহরটি ছিল বিষণ্ন। পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, ঘুমঘুম ভাব। সংখ্যার দিকে মুসলমানরাই ছিল প্রধান; কিন্তু কর্তৃত্ব ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদেরই। এদের মধ্যে স্থানীয় ব্যবসায়ী, ভূস্বামী ও পেশাজীবীরা ছিলেন। আর ছিলেন প্রশাসনিক ব্যক্তিরা। দালানকোঠা যা ছিল তার অধিকাংশেরই মালিক ও বসবাসকারী ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরাই। স্থানীয় মুসলমানরা ওকালতি, শিক্ষকতা ও চাকরিবাকরিতে কিছু ছিলেন, তবে সংখ্যায় অল্প।
আমরা দুভাই যে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম সেই লোকনাথ হাই স্কুলে মুসলমান শিক্ষক বলতে সর্বসাকল্যে ছিলেন মাত্র দুজন। একজন আরবি পড়াতেন, অপরজন ইংরেজি। ইংরেজির শিক্ষকও নাকি স্থানীয় নন, অন্য শহর থেকে এসেছেন, তবে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন, তার নতুন কর্মস্থলে। শিল্পকারখানা বলতে তেমন কিছু গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য দুটি পেশাই ছিল উন্মুক্ত। একটি ঘোড়ার গাড়ি (টমটম) চালানো, অন্যটি নান রুটি বানানো।
বছরে একবার শহরটি উদ্বেলিত, কোনো কোনো এলাকায় প্রায় উন্মত্তই হয়ে উঠত; সেটা ঘটত মহররমের সময়ে। উদ্যাপনের শেষ দিনে তাজিয়া নিয়ে মিছিল বের হতো, তাতে সবাই হায় হাসান হায় হোসেন বলে বুক চাপড়াতেন, তবে বিশেষভাবে উত্তেজিত, প্রায় উন্মত্তই দেখা যেত কিছু যুবককে। তারা বুক চাপড়ে রক্ত বের করে ফেলতেন। এর মধ্যে আবার লাঠিখেলাও চলত। শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ ছিল না, সবাই আসতেন। অনুপ্রেরণাটা যে কেবল ধর্মীয় ছিল তা নয়, সঙ্গে বিনোদনের আকাঙ্ক্ষাও যুক্ত থাকত। মেলা বসত। বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রীও বিক্রি হতো।
শহরের ভেতরে খোলা জায়গা ছিল দুটি। ভুবনমোহন পার্ক ও মাদ্রাসা ময়দান। ওই দুই জায়গাতেই জনসভা হতো। দর্শনীয় ছিল জেলখানাটা। মস্ত বড়। ওই জেল পরে বিশেষভাবে কুখ্যাতি অর্জন করে ভেতরের খাপড়া ওয়ার্ডে অনশনরত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের হত্যা ও পঙ্গু করে দেওয়ার নিষ্ঠুরতার জন্য।
তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতর থেকে যে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল তার লক্ষণ কিন্তু অস্পষ্ট ছিল না। আমাদের ক্লাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্রাধিক্য যে থাকবে সেটা তো অবধারিত; কিন্তু মুসলমান ছাত্রদের সংখ্যা যে উপেক্ষা করার মতো ছিল তা নয়। যে বাসায় আমরা প্রথমে গিয়ে উঠি তার কাছেই থাকত হাসিলউদ্দিন শেখ নামের এক সহপাঠী। কখনো কখনো আমরা একসঙ্গেই স্কুলে গেছি। হাসিলউদ্দিনদের ছিল একটি মুদির দোকান। দোকানটি তখনকার দিনের তুলনায় বড়সড়ই ছিল; কিন্তু তার বাবা ছেলেকে দোকানের মালিক বানাবেন ভাবেননি, ভেবেছেন শিক্ষিত করে তুলবেন। সে জন্য খুব যত্ন যে নিতেন সেটা টের পাওয়া যেত। রাজশাহী শহরে ফুটবল খেলা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়; পদ্মার পারে সরকারি কলেজের পাশে বড় এক মাঠ ছিল, সেখানে নিয়মিত ফুটবল প্রতিযোগিতা চলত। মোহামেডান ক্লাব ছিল বেশ শক্তিশালী; একবার ওই টিম কলকাতা থেকে দুজন খেলোয়াড় হায়ার করে আনে, এবং তারা যে চমৎকার ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন করেছিলেন সেটা আমরা দেখেছি। টিমগুলোর একটিতে খেলে খুব নাম করেছিলেন যে একজন স্থানীয় তরুণ খেলোয়াড় তার মা আমার মায়ের কাছে ছেলের কৃতিত্ব নিয়ে গর্ব করতেন। অথচ ওই মা নিজে কিন্তু মানুষের বাসায় খণ্ডকালীন কাজ করে সংসার চালাতেন।
আমাদের দৃষ্টিতে শহরের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল সরকারি কলেজ। সে কলেজে কয়েকজন যশস্বী অধ্যাপক অধ্যাপনা করতেন। দুজন মুসলমান অধ্যাপকের মধ্যে যারা যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাদের নাম আমরা সে সময়েই শুনেছি। এদের একজন ইংরেজির অধ্যাপক আবু হেনা; অপরজন দর্শনের সাইদুর রহমান। রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজের মুসলিম ছাত্রাবাসটি ছিল উল্লেখযোগ্য। কয়েকটি দালান এবং মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় সেই সমাহারটি শিক্ষার্থীতে ভরপুর থাকত। তারা একটি সাংস্কৃতিক জীবনও গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকতেন বলে মনে হয়। খোলা মাঠে মঞ্চ বানিয়ে নাটকের মঞ্চায়ন যে করতেন সেটা বেশ মনে আছে; একটিতে আব্বা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। নাটকের আগে একটি সংগীতানুষ্ঠান হয়েছিল। তার একটি গান এখনো ভুলিনি, কৃষক বাবা তার ছেলেকে বলছে, ‘বাজান, চল যাই চল মাঠে লাঙল বাইতে, আমিনার বিয়ার কথা কমুনে রাইতে, রাইতে।’ গানের সঙ্গে লাঙল চালানোর ভঙ্গিও ছিল। মাথাল, লুঙ্গি, গামছাসহ পিতা-পুত্র উভয়েরই ছিল কৃষকের বেশবাস। মঞ্চে বেশ একটা গ্রামীণ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সত্তর-আশি বছর পার হয়ে গেছে; আমিনাদের বিয়ের সমস্যা তো মেটেইনি, আরও প্রকট হয়েছে। আব্বা তার কিশোর ছেলের যে বিনোদন আবশ্যক এটা কখনো ভোলেননি। ছেলে দৈর্ঘ্যে এবং প্রস্থে উভয় দিকেই বেড়ে উঠুক এমনটাই চাইতেন। শহরে সিনেমা হল ছিল একটি; সেটি টাউন হল হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। নাম অলকা। পরে আরেকটির আবির্ভাব ঘটে, সেটি বেশ ঝকঝকে তকতকে ছিল বলে মনে পড়ে। নাম কী ছিল? মনে হয় ছায়াবাণী। সিনেমা হলটির উদ্বোধনে যাদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল তাদের মধ্যে আব্বাও ছিলেন; তিনি নিজে যাননি, তবে অফিসের পিওন নারায়ণকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে পাঠিয়েছিলেন সিনেমা দেখতে। সিনেমাটির নাম ছিল ‘সাত নম্বর বাড়ি’। মার্জিত মধ্যবিত্ত রুচির ছবি; নায়ক আবার কিছুটা বিদ্রোহী ভাবাপন্ন। সে চলচ্চিত্রের দু-একটি সংলাপ দীর্ঘকাল স্মরণে ছিল, এখনো আছে। অলকাতেও একবার সিনেমা দেখেছি, আমার ছোট মামার সঙ্গে। আব্বার তো আপন ভাইবোন বলতে কেউ ছিলেন না, আমাদের তিন মামার সঙ্গে তার সম্পর্কটা ছিল ভ্রাতৃপ্রতিম; ছোটমামা, যিনি আমার মায়ের ছোট ভাই, তিনি তো ছিলেন অনেকটা আমাদের পরিবারেরই একজন। ছোটমামা তার ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে, প্রস্তুতির কালে, কিছুদিন রাজশাহীতে আমাদের সঙ্গে থেকেছেন। তখন তারও যে বিনোদন আবশ্যক এটা আব্বার খেয়ালের বাইরে ছিল না; ছোটমামাকে টাকা দিয়ে বলেছিলেন সিনেমা দেখে আসতে এবং আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে। সেটা ছিল একটি হিন্দি সিনেমা, নাম সম্ভবত ‘মীরাবাঈ’। সিনেমায় একজন ধর্মপ্রাণ মহিলা যে একটি কামান রক্ষা করার জন্য অসীম সাহসে শত্রুপক্ষের সামনে একাকী দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। সেই ছবিটা ভুলবার মতো ছিল না; ভুলিওনি।
আমরা চার ভাই মিলে বিনোদনের ঘরোয়া বন্দোবস্ত করতাম। যেমন- ওই যে নাটক দেখেছিলাম কলেজছাত্রদের, তার অনুকরণে নাটকের একটা দৃশ্যের অবতারণা করার চেষ্টা করেছিলাম আমাদের একতলা বাসার প্রশস্ত বারান্দায়। আমিই নায়ক, স্বভাবতই। একটি সংলাপ ছিল, ‘আমি সুরাপান করব।’ সেকালে নায়করা অনেকেই নিজেদের বীরত্ব ও নায়কত্বকে ওইভাবেই উপস্থাপিত করতেন। আব্বা ওই সংলাপটি শুনে ফেলেছিলেন, বলেছিলেন, ‘না, না, ওসব বলতে নেই। সুরাপান তো খুব বাজে কাজ।’
চলবে...