ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ২০০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’ হাদি হত্যা মামলার বাদীকে নিয়ে বোনের প্রশ্ন? জয়পুরহাট সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির টহল জোরদার রাজনীতি এক ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে: মির্জা ফখরুল হজ শেষে দেশে ফিরলেন ২৯৬৯৪ হাজি নারায়ণগঞ্জে ১৭ বন্যপাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত হান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির তথ্য ফাঁস, ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ নায়িকা মিমির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট, শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি! দোয়া গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনসহ মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা কটাক্ষের শিকার আনুশকা কলকাতার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ হাকিম চট্টগ্রামে কাফনের কাপড় পরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল হরোস্কোপের গোলকধাঁধায় ভবিষ্যৎ ভাবনা বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা সরকারের নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে পাবনায় ২০০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী সবার সহযোগিতায় বাসডুবিতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী নতুনধারার ‘কেমন বাজেট চাই’ শীর্ষক গোলটেবিল লক্ষ্মীপুরে হাসপাতালে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরকে বলাৎকার, ওয়ার্ডবয় আটক জিয়া স্মৃতি জাদুঘর শিগগিরই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী
Nagad desktop

ট্রেনে কলকাতা যাওয়ার অনুভূতিটা আজও মনে পড়ে

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
আপডেট: ০১ মে ২০২৬, ১০:৫৭ এএম
ট্রেনে কলকাতা যাওয়ার অনুভূতিটা আজও মনে পড়ে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আমার মা বলেছেন, এক সন্ধ্যায় দাদি নাকি বলেছিলেন, ‘বউমা, তোমার ছেলেটাকে আজকে সরিয়ে রেখো, ও ভয় পেতে পারে।’ কী ভেবে বলেছিলেন কেউ তা জানে না, কিন্তু রাত পোহাবার আগেই তিনি বিদায় নেন। আব্বার কেমন লেগেছিল কল্পনা করার চেষ্টা করিনি। শাশুড়িকে কাছে রাখতে পারেননি ভেবে মা যে অপরাধবোধে পীড়িত হয়েছিলেন সেটাও বুঝতে পারি। আব্বা তো এমনিতেই একাকী ছিলেন, মায়ের মৃত্যুতে তার একাকীত্ব আরও বেড়ে গেল। হয়তো সেটাই পূরণ করতে চাইতেন নিজের পরিবারের দিকে অধিক মনোযোগ দিয়ে। আমাদের পরিবারের ওটিই প্রথম মৃত্যু।

কলকাতায়
১৯৪৬-এর শেষ দিকে রাজশাহী ছেড়ে আমরা কলকাতায় যাই। এমনটা যে ঘটবে আমি তো ভাবতেই পারিনি। মাঝখানে আব্বা একবার কলকাতায় গিয়েছিলেন, কেন যেতে হয়েছিলেন আমরা ছেলেরা জানি না। মায়ের জানবার কথা, কিন্তু তিনিও আমাদের কারণটা বলেননি। আসলে গিয়েছিলেন দাপ্তরিক উন্নতির জন্য এক সাক্ষাৎকারের ডাকে। সেই উন্নতির কারণেই মফস্বল শহর রাজশাহী ছেড়ে আমাদের রাজধানী কলকাতায় যাওয়া। চিত্তরঞ্জন দাশের বেঙ্গল প্যাক্ট কার্যকর হয়নি ঠিকই, তবে তার ভেতরে মূল ব্যাপারটা যে ছিল চাকরির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান সংখ্যাসাম্য প্রতিষ্ঠা, সেই নীতিটির প্রয়োগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে এ কারণে যে তখন বাংলার প্রাদেশিক প্রশাসনে ছিল মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভা। নিয়োগের ওই নীতিতেই হিন্দু সম্প্রদায় থেকে একজন এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন, অর্থাৎ আমার বাবা প্রমোশন পেয়েছিলেন। 

১৯৪৬ সালে তো গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের বছর। তারই মধ্যে কলকাতায় গিয়ে আব্বা তাদের হেড অফিসে ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছেন, এবং মাসখানেক পরে নতুন কাজে যোগ দিতে কলকাতায় চলেও গেছেন। বড় বাবু থেকে অ্যাকাউনটেন্ট হলেন। শুধু যে কাজে যোগদান তা নয়, খিদিরপুর এলাকায় বাসা ঠিক করে ডিসেম্বরে রাজশাহীর পাট গুটিয়ে রাজধানীমুখী হওয়ার ব্যবস্থাটিও সম্পাদন করে এসেছেন। 

রাতে ট্রেনে বসে কলকাতা যাওয়ার অনুভূতিটা আজও মনে পড়ে। অনিশ্চিত ঠিকানায় যাচ্ছি এমনটা মনে হয়নি, তবে দূরে যে যাচ্ছি সেটা তো বোঝাই যাচ্ছিল। কয়েকটি স্টেশনে ট্রেন থেমেছে, সেখানকার আলো, মানুষের ওঠানামা, চলাফেরা দেখেছি, তার পরে ট্রেন যখন আবার ছুটতে শুরু করেছে তখন দূর জনপদে এবং রেললাইনের পাশেও আলো অতিদ্রুত সরে সরে যাচ্ছে, এ দৃশ্য মনে দাগ কেটে আছে। রাজশাহীর রেলস্টেশনে যতবার গেছি মনে হয়েছে সেটি একটি রহস্যময় স্থান, এবং স্পৃহা জন্ম নিয়েছে যে বড় হলে আমি রেলের গার্ড হব; আমার হুকুমে ট্রেন চলবে এবং আমি দূর দূর দেশে নির্ভয়ে চলে যেতে পারব। বাল্যকালে আরও একটি ইচ্ছা ছিল মনে, সেটি হলো ছাপাখানার মেশিনম্যান হওয়ার। রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থল বলতে আমরা বুঝতাম সাহেববাজারকে, সেখানে একটি ছাপাখানা ছিল; ওই ছাপাখানায় অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও ছাপা হতো। সাহেববাজারে যাওয়া-আসার পথে ছাপাখানার মেশিনম্যানকে দেখতাম; ট্রেডল মেশিনে পায়ে চাপ দিয়ে একটি করে কাগজ ভরে দিচ্ছেন আবার মুদ্রিত আকারে সেটি বের করে আনছেন। এতে যে কায়িক শ্রম কতটা লাগত তা নিয়ে আমার কোনো চিন্তাই ছিল না, কাজটাকে মনে হতো বেশ রোমান্টিক- ভীষণ রকম সৃষ্টিশীল। আমার তো রেলের লোক হওয়া হয়নি, কিন্তু ছাপাখানার সঙ্গে যোগাযোগটা তখন না ঘটলেও পরে ঘটেছে এবং সেটা এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে। 

খিদিরপুরের বাসস্থানে ঢুকে প্রথমেই একটি ধাক্কা খেয়েছিলাম। এ বাসা তো অনেক ছোট রাজশাহীতে আমাদের আবাসের তুলনায়। দোতলা বাড়ির একতলায় আমরা থাকব। বরাদ্দ একটি বেশ বড় এবং তার সঙ্গে মাঝারি গোছের দুটি কামরা; দোতলায় থাকবে দুটি পরিবার। কিন্তু তবু কলকাতা তো কলকাতাই। মস্ত বড় শহর। রায়টের পরে কলকাতা আবারও সৃষ্টিশীল, তবে শহর মোটামুটি দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল- হিন্দুপাড়া ও মুসলমানপাড়া। সঠিক পাড়ায় বাসা পাওয়াটাও আগের তুলনায় শক্ত হয়ে পড়ে। খোঁজাখুঁজি করে আব্বা মুসলমানপাড়ায় শুধু ওই বাসা খুঁজে বের করেননি, দুটি পরিবারকেও জোগাড় করেছেন যারা বাড়িটির আংশিক ভাড়া বহন করবেন। একটি পরিবার আবার ছিল ঢাকা জেলারই, নরসিংদী এলাকার। এই পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিনজন। দুই ভাই এবং বড় ভাইয়ের স্ত্রী। বড় ভাই নিঃসন্তান ছিলেন; ছোট ভাইটি থাকতেন ছাদের চিলেকোঠায়। তার বয়স অল্প, পত্রপত্রিকা পড়তেন, খবর রাখতেন রাজনীতির। ছাদে গেলে তার সঙ্গে আলাপ হতো। বড় ভাইয়ের মতো তিনিও সরকারি চাকুরে ছিলেন। কী নিয়ে ঠিক জানি না, দুভাইয়ে একবার মনোমালিন্য ঘটে। সেটা টের পাওয়া গেল যখন দেখা গেল ছোট ভাই বেশ গভীর রাতে স্যুটকেস হাতে বাসায় ফিরছেন। দাঙ্গার কারণে রাত করে ফেরাটা সে সময়ে উদ্বেগজনক ছিল; দাঙ্গা থেমে গেছে তবে তার রেশ তো ছিল। পরের দিন বিকেলে ছাদে গিয়ে তার নিজের মুখে শুনলাম কী ঘটেছে। অনেকটা শরৎচন্দ্রের গল্পের বালক রামের মতোই ব্যাপার; রাগে-অভিমানে গৃহত্যাগ এবং পরে প্রত্যাবর্তন। তবে এ ক্ষেত্রে বউদি নয়, কাজ করেছেন একেবারেই অপরিচিত এক অবাঙালি রিকশাওয়ালা। ছোট ভাইটি এতই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন যে, ঠিক করেছেন চাকরি তো আর করবেনই না, ওই শহরেই থাকবেন না, চলে যাবেন গ্রামের বাড়িতে। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রিকশায় চেপে রওনা দিয়েছিলেন শিয়ালদহ স্টেশন অভিমুখে। রিকশাওয়ালা তার আরোহীর অস্থিরতা ও বিষণ্নতা দেখে জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘ব্যাপার কী, আপনাকে অত বিপন্ন মনে হচ্ছে কেন, শিয়ালদহ যাবারই বা কারণ কী?’ সহানুভুতিশীল শ্রোতার সাক্ষাৎ পেয়ে আরোহীটি নিজের মনের দুঃখের কথা খুলে বলেছেন। রিকশাওয়ালা তখন তার রিকশাটানা থামিয়ে আরোহীকে বুঝিয়েছেন, অমনটা করতে নেই, করলে দুই পক্ষের কারোই কোনো লাভ হবে না; তবে ওই আকালের কালে ক্ষতি হবে দুজনেরই। আরোহীর চিত্তও ততক্ষণে কিছুটা শান্ত হয়েছে, গ্রামে গিয়ে কী করবেন সেটা ভেবেছেন, এবং রিকশাওয়ালার পরামর্শ মেনে অনুরোধ করেছেন তাকে ফেরত নিয়ে যেতে। গৃহে প্রত্যাবর্তনে কান্নাকাটির কোনো দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল বলে না শুনলেও বিপর্যয় এড়ানো গেছে জেনে আমারও খুব ভালো লেগেছিল। এবং বক্তা ও শ্রোতা উভয়েই সংবেদনশীল রিকশাওয়ালাটির মতো মানুষ আছে বলেই জগৎটা যে কোনোমতে টিকে রয়েছে সে জ্ঞানে সেদিন সমৃদ্ধ হয়েছিলাম। 
রাজশাহীতে আত্মীয়স্বজন বলতে একটি মাত্র পরিবারই ছিল। স্থানীয় নয়, আমাদের বিক্রমপুরেরই, এবং মায়ের দিক থেকে সম্পর্কিতও বটে। আনওয়ারুল হক চৌধুরী ছিলেন পুলিশের ইন্সপেক্টর; সস্ত্রীক তিনি থাকতেন ওই শহরেই। তার মেজোভাই আজহারুল হক চৌধুরী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনমিক্স পড়েন, থাকতেন ফজলুল হক হলে। ছুটিতে একবার বড় ভাইয়ের বাসায় এসেছিলেন বেড়াতে। তার কাছেই দেখেছিলাম ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদের বার্ষিকীর একটি কপি; আমার আগ্রহ দেখে যেটি তিনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। বুঝি বা না বুঝি পত্রিকাটি আমার খুব ভালো লেগেছিল। কৌভূহল জেগেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন সম্পর্কে। রাজশাহীতে আনওয়ারুল হক চৌধুরীরা ছাড়া অন্য অনেকের সঙ্গে জানাশোনা থাকলেও আত্মীয় বলতে কেউ ছিলেন না; আনওয়ার ভাইদেরও স্বামী-স্ত্রী দুজনের সংসার; তাদের কোনো সন্তান তখনো জন্মগ্রহণ করেনি। কিন্তু বাংলার রাজধানী কলকাতা শহর ছিল আত্মীয়স্বজনে ঠাসা। যে বিক্রমপুরকে বিক্রমপুরে পাওয়া যায়নি, কী আশ্চর্য, সেটি উপস্থিত ওই কলকাতায়। সেটা ছিল মস্ত বড় এক প্রাপ্তি। তাছাড়া গড়ের মাঠ, গঙ্গা নদী, এসপ্ল্যানেড, ধর্মতলা, অনেক সিনেমা হল, চিড়িয়াখানা, এসব তো ছিলই।

খিদিরপুরে আমাদের বসবাসের রাস্তার নাম ছিল ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিট। ওয়াট হয়তো ওয়াটারের অপভ্রংশ, কেননা রাস্তাটি ছিল গঙ্গা নদীর একটি স্টিমার ঘাটের পাশেই। সে কারণে আশপাশে পূর্ববঙ্গের বেশ কিছু নৌ-কর্মচারী বসবাস করতেন। ওই রাস্তাতেই যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পৈতৃক গৃহ ছিল সেটা জেনেছি অনেক দিন পরে, মাত্র কয়েক বছর আগে, যখন আমরা তিন ভাই কলকাতায় গিয়েছিলাম বইমেলা উপলক্ষে এবং স্বভাবতই অনুসন্ধানে বের হয়েছিলাম আমাদের পুরোনো বাসস্থানের। তখনই দেখলাম ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটের নতুন নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্ট্রিট। মধুসূদন দত্ত ইংরেজি ভাষার কবি হতে গিয়ে বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। তাদের বসবাসের ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটেও দেখলাম চরিত্র বদলে পুরোপুরি বাঙালিপাড়া হয়ে গেছে। আমাদের সময়ে ওখানে উর্দু (হিন্দুস্থানী) ভাষীরাও ছিলেন, এবার মনে হলো সবাই বাংলাভাষী। শুধু তাই নয়, বড় একটি বাড়ির সামনের প্রশস্ত আঙিনায় দেখলাম কয়েকজনে একটি মঞ্চ তৈরির কাজে ব্যস্ত। আমরা তাদের কাছে আমাদের পুরাতন বসবাসের বাড়িটি কোন দিকে হতে পারে জিজ্ঞাসা করায় তারা কৌতূহলী হলেন আমাদের পরিচয় জানতে। বাংলাদেশ থেকে এসেছি এবং এক সময়ে ওই রাস্তায় আমাদের আবাস ছিল জেনে তারা খুবই প্রীত হলেন, এবং জানালেন যে, ওই বাড়িটি ছিল কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেটিতে এখন একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করা হয়েছে, পরিচালনা করে স্থানীয় একটি সমিতি, তাদেরই উদ্যোগে রবিবারের ওই সন্ধ্যায় নাটক মঞ্চস্থ হবে, যার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একাধিক কণ্ঠে তারা জানালেন যে, কেবল হেমচন্দ্র ও মধুসূদন নয়, বাংলা মহাকাব্যের অপর এক রচয়িতা রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাস করতেন ওই এলাকাতেই। বোঝা গেল তিন মহাকবির প্রতিবেশী হওয়ার কারণে তারা বেশ গর্বিত। ভদ্রলোকেরা আমাদের নাটক দেখার এবং পাঠাগারটি ঘুরে দেখে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণ অত্যন্ত আন্তরিক ছিল। আমরা আমাদের পরিচিত পুরোনো এলাকাটা দেখলাম; রাস্তার নাম বদলেছে, কিন্তু বস্তুগত উন্নতি তেমন ঘটেনি। তার কারণ হয়তো সেটি বাঙালিদের পাড়া। আমাদের হাতে সময় ছিল না, তাই ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের একজন দেখলাম সাইকেলে চেপে আমাদের ভাড়া করা ট্যাক্সির আগে আগে গিয়ে যে জায়গাটাতে আমরা একসময়ে থাকতাম সেটা দেখিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন। কেবল তাই নয়, বইমেলায় পরের দিন আমার লেখা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি বইটির কলকাতা সংস্করণের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠানে দেখলাম তিনি এসেছেন। খুব ভালো লাগল। কলকাতা যে এখন আর বাঙালিদের শহর নেই, সেটা জানতাম, কিন্তু পাড়ায়-মহল্লায় বাঙালি সংস্কৃতির চর্চার চেষ্টা যে আছে তার পরিচয় পেয়ে আমরা অত্যন্ত উৎসাহিত বোধ করেছিলাম। সেবার আমরা যে তিন ভাই বইমেলার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম; তাদের দুজন এখন আর নেই। আমার ছোট মেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষকতা করে, সেও সঙ্গে ছিল; এবং ছিলেন নতুন দিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মযহারুল ইসলাম বাবলা। ব্যবস্থাপক তিনিই। কবি হাসান ফখরী তখন কলকাতায়, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনিও এসেছিলেন।

কলকাতায় ছেচল্লিশে আমরা যখন আসি ততদিনে আমাদের ছোট মামা ম্যাট্রিক পাস করে চাকরি নিয়েছেন। তিনি তো আমাদের পরিবারেরই অংশ ছিলেন, এবার আরও ঘনিষ্ঠ হলেন। আব্বার চাচাতো বোনদের বড় দুজন তখন কলকাতায় থাকেন। বড় বোনের বাসা মির্জাপুর এলাকায়, তার দুই ছেলে আমাদের প্রায় সমবয়সী; মেজো বোনের স্বামী কলকাতা পুলিশে কাজ করেন, তার ছেলে মুজিব আর আমি একই ক্লাসে পড়ি; তারাও বাসা নিয়েছিলেন ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটের কাছেই। ওয়াটগঞ্জ থানার ওসি থাকতেন থানা-ভবনের দোতলায়; তিনিও আমাদের বিক্রমপুরেরই লোক, আব্বার চেনা। সম্পর্কে আব্বার ভাগ্নে দন্ত্যচিকিৎসক ডা. সারোয়ার; তার সার্জারি তখন খিদিরপুর এলাকাতেই। সার্জারিতে রোগীর কোনো অভাব ঘটত না। এদেরই এক ভাই এসপ্ল্যানেড এলাকায় টেইলরিং শপ খুলেছেন; নিজে তিনি মাপজোক নিয়ে কাপড়ে নকশা করে দেন, কাপড় কাটা, সেলাই করা ইত্যাদি কাজ করেন অন্য কারিগররা। তাকে দেখা যায় জ্যাকেট ও প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দোকানের সামনের এক টেবিলের অপর পাশে দাঁড়িয়ে কাপড়ের ওপর মার্কার দিয়ে নকশা এঁকে দিচ্ছেন, অঙ্কন শিল্পীর মতো করে। তার দোকানের নাম স্টাইল ক্র্যাফট। গ্রাহকরা সবাই উচ্চবিত্ত। আমার মায়ের নিকটাত্মীয়দের একটি পরিবার থাকেন কলিন্স স্ট্রিটের কাছে মার্কুইস লেনে; উত্তরাধিকার সূত্রে ওটি তাদের বসতবাড়ি। এতসব আত্মীয়দের সঙ্গে গ্রামে বা রাজশাহীতে দেখাসাক্ষাৎ হওয়া সম্ভব ছিল না; কলকাতা আমাদের জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছিল। মোটকথা, কলকাতা যেমন হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের, তেমনি আমরা যারা পূর্ববঙ্গীয় তাদেরও। নোয়াখালীর বেশ কিছু লোক থাকতেন খিদিরপুরে। তারা জাহাজ কোম্পানির কর্মী ছিলেন। পথেঘাটে, দোকানপাটে এদের উপস্থিতি টের পাওয়া যেত। বাঙাল ঘটির পৃথকীকরণটা তখন আর কার্যকর নয়।

বড় বাসা ছেড়ে ছোট একটিতে বসবাস শুরু করে আমার মা প্রথমে কিছুটা অসন্তুষ্টই ছিলেন। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের আনাগোনায় অচিরেই তিনি সন্তোষ প্রকাশ করছেন, দেখা গেল। পাশেই থাকতেন হাজি সাহেবের পরিবার। বাড়িটা ছিল ওয়াক্ফ সম্পত্তি, হাজি সাহেব দেখাশোনা করতেন। ওরা ছিলেন কলকাতাওয়ালা, কিন্তু ওই পরিবারের সঙ্গেও আমার মায়ের আসা-যাওয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

আর বাড়ির দোতলায় যে দুটি পরিবার থাকত তারা তো কাছের মানুষেই পরিণত হয়েছিলেন। নরসিংদীর যিনি, দুই ভাইয়ের বড়জন, তিনি আব্বার সহকর্মীও ছিলেন, অফিসে। বস্তুত তারা দুজনে মিলেই বাড়িটা খুঁজে বের করেছিলেন। দেশভাগের পরে ঢাকায় এসে দুই পরিবারে যোগাযোগ ছিল। তৃতীয় পরিবারটির সঙ্গে যে আমার মায়ের সখ্য ছিল তার সাক্ষ্য পাওয়া গিয়েছিল অনেক বছর পরের এক ঘটনায়। তা দশ-বারো বছর আগের ব্যাপার হবে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে আমাকে দেখে তিন নম্বর পরিবারের একসময়ের-প্রধান মহিলার কেন জানি মনে হয়েছিল আমাকে তিনি আমার বালককালে দেখছেন। তার মেয়েকে তিনি বলেছিলেন খোঁজ করতে যে আমরা এক সময়ে খিদিরপুরে থাকতাম কি না। মেয়ের স্বামী ছিলেন খ্যাতনামা চারুশিল্পী, আমার পরিচিত; মহিলার পক্ষে আমাকে খুঁজে বের করা তাই কঠিন হয়নি। কথাটা আমার মাকে জানানোয় তিনি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন দেখা করতে। কিন্তু তখন নিজে তিনি অসুস্থ, আর যিনি দেখা করতে চেয়েছিলেন সেই পূর্বপরিচিতাও চলাফেরা করতে পারেন না, তাই দেখা হয়নি। এর অল্প কয়েকদিন পরেই অবশ্য আমার মা মারা যান। তখনকার দিনে সম্পর্কগুলো ছিল এরকমেরই। উল্লেখ্য যে, কলকাতায় আমাদের বসবাস ছিল মাত্র সাত মাসের।

আব্বা তো মিশনারিদের স্কুলকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে ধারণা করতেন। রাজশাহীতে পাননি; কলকাতায় এসে পেয়ে গেলেন। তাই সেখানেই আমাকে ও আমার মেজো ভাইকে দিলেন ভর্তি করে। আমাকে ক্লাস এইটে, মেজো ভাইকে ক্লাস সিক্সে। স্কুলের নাম সেন্ট বার্নাবাস হাই স্কুল। পুরোনো স্কুল, এখনো আছে; সেবার যখন কলকাতায় যাই, ঘুরে দেখে এসেছি। স্কুলের দালানকোঠায় কোনো উন্নতি দেখলাম না। বরং আগের তুলনায় কিছুটা যেন ম্রিয়মাণ। কারণ ওই একই; বাঙালিপাড়ায় অবস্থান। এপাশে খিদিরপুর, ওপারে টালিগঞ্জ। আমাদের সময়ে বালিগঞ্জ থেকেও ছাত্র আসত, এখন মনে হয় আসে না। হেড মাস্টারের সঙ্গে কথা হলো। তিনি পুরোপুরি বাংলাভাষী। ক্যাথলিক মিশনারিদের স্কুল। আমাদের সময়ে রাজশাহীতে যেমন ছিল, কলকাতার স্কুলেও তেমনি, অধিকাংশ ছাত্রই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। শিক্ষকদের মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের কেউ ছিলেন বলে মনে হয় না। হেড মাস্টার ছিলেন জাঁদরেল, তবে গোষ্ঠবিহারী মজুমদারের মতো স্থির নন; বেশ চঞ্চল। বাঙালিই, কিন্তু কথা বলতেন ইংরেজিতে। খ্রিষ্টান মিশনারিদের পোশাক পরতেন। পাঠ্যসূচি সব স্কুলে ছিল একই রকমের। সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের মনোনীত পাঠ্যবই-ই পড়তে হতো, যেমন পড়তাম রাজশাহীতে। তবে নতুন স্কুলে ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্যে ছিল বাইবেল-পাঠ।

আমরা তো ভর্তি হয়েছিলাম ছেচল্লিশের দাঙ্গার পরে, আর সাতচল্লিশের আগস্টে কলকাতা ছাড়তে হলো। স্কুলের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না; তবে বাইরে দাঙ্গার রেশ তখনো বিদ্যমান। ক্লাস শেষে হিন্দু-মুসলমান ছাত্র আমরা একসঙ্গেই বের হতাম। পথিমধ্যে হিন্দুপাড়া ও মুসলমানপাড়া পড়ত, সেখানে আমরা বিভক্ত হয়ে যেতাম। বঙ্গভূমি যে আর অখণ্ড থাকবে না হয়তো তারই পূর্বভাসের মোকাবিলা করতে হতো। গল্প শুনেছিলাম রায়টের সময়ে এক হিন্দু ছাত্র ভীষণ বিপদে পড়েছিল, ভুল করে মুসলমানপাড়ায় ঢুকে পড়ে; কিন্তু তাকে বাঁচিয়েছিলেন এক মাংস-বিক্রেতা, তিনি দৌড়ে ছুটে এসে বলেছিলেন, ‘স্কুলকা লাড়কা, ছোড় দো।’ আসলে ভালো মানুষের সংখ্যাই ছিল অধিক, সাম্প্রদায়িক হিংস্রতাটা সৃষ্টি করেছিল মতলববাজ লোকেরা।

দাঙ্গার আগে কলকাতায় ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক সব মিছিল হয়েছে যাতে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ অংশ নিয়েছেন; হতাহতও হয়েছেন, একসঙ্গে। রশীদ আলী দিবসের মিছিল ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। ডাক ও তার বিভাগের কর্মচারীরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে ধর্মঘট করেছেন কিছুদিনব্যাপী। নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এসব ঘটনা আমরা কলকাতায় আসার আগেই ঘটেছে; কিন্তু প্রভাবটা পরেও পাওয়া যাচ্ছিল। মাসব্যাপী ট্রাম ধর্মঘট ততদিন শেষ হয়েছে, কিন্তু ধর্মঘটের সময়ে ট্রাম গাড়ির সামনে কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকাকে মাঝখানে রেখে কংগ্রেস ও লীগের যে তিনটি পতাকা ওঠানো হয়েছিল ধর্মঘট শেষ হওয়ার পরেও তাদের উড়তে দেখেছি।

ভালো কথা, ট্রামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে নতুন ক্লাসের পাঠ্যবই কিনতে গিয়ে। রাজশাহীতে যেমন নিয়ম দাঁড়িয়েছিল প্রমোশনের দিন বিকেলেই সাহেববাজারের বইপাড়ায় গিয়ে বই কেনা হবে, কলকাতাতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আব্বার সঙ্গে ট্রামে চেপে আমরা দুভাই কলেজ স্ট্রিটে গেছি, বই কিনেছি মহানন্দে, কিন্তু ফেরার পথে ধর্মতলায় নামার সময় আমি পড়েছিলাম পিছিয়ে, নামতে যাব এমনি সময় ট্রাম দিয়েছে ছেড়ে। উঁচু গলায় আব্বা বললেন পরের স্টপেজে গিয়ে নামতে। তাই করেছিলাম এবং আব্বা শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে নামার সময় সামনের দিকে মুখ করে নামতে হবে। সামনে চলা চাই, পেছনমুখো হলে বিপদ, চলার ওই দিকনির্দেশটা প্রতীকী অর্থেও সত্য বটে।

ট্রামের প্রত্যেকটি স্টেশনে খবরের কাগজ পত্রপত্রিকার একটা স্টল থাকত। সেখানে বইও পাওয়া যেত। আমরা আজাদ পত্রিকা পড়তাম, মুসলমান পাঠকদের জন্য সেটাই ছিল তখনকার ধারা। আজাদ মওলানা আকরম খাঁর পত্রিকা; তিনি রক্ষণশীল; ওই পত্রিকার বিপরীতে দৈনিক ইত্তেহাদ বের হয়েছিল, সোহরাওয়ার্দী সাহেবদের মুখপাত্র হয়ে। সে পত্রিকার ছোটদের পাতা সম্পাদনা করতেন কবি আহসান হাবীব; ওই পাতায় আমি লেখা পাঠাব এমন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সেজন্য প্রত্যেক রবিবার ট্রাম স্টেশনে গিয়ে এক কপি কিনে আনতাম। কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা স্বাধীনতা কে যেন একবার বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। মনে আছে আব্বা মন্তব্য করেছিলেন, ‘আসল স্বাধীনতার কথা কিন্তু ওই পত্রিকাই বলে’। তবে একসঙ্গে দুটি পত্রিকার গ্রাহক হওয়ার জন্য উপযুক্ত সাংস্কৃতিক মানসিকতা ও আর্থিক সঙ্গতি কোনোটাই আমাদের তখন ছিল না।

খিদিরপুরপাড়ায় দুটি সিনেমা হল ছিল, কোনোটিতেই একবারের অধিক সিনেমা দেখা হয়নি। তবে আসল সিনেমাপাড়া ছিল ধর্মতলাতেই। নামকরা ছিল মেট্রো ও লাইট হাউস। লাইট হাউসে ‘কিসমত’ নামে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী চলছিল। ছবিটি হিন্দি, তবে নায়ক ছিলেন বাঙালি অশোককুমার। সে সময়ে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা। ছবিটি একটানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। তার কারণ যে কেবল অশোককুমার ও তার বিপরীতে লীলা চিটনিসের অনবদ্য অভিনয় তা নয়, মূল কারণ ছিল একটি গান, সেটি এরকমের, ‘দূর হটো, দূর হটো সব দুনিয়াওয়ালে হিন্দুস্থান হামারা হায়’। স্বাধীনতার জাতীয়তাবাদী ওই সংগীত দর্শক টানত; অনেকেই একাধিকবার দেখেছেন, আমি অবশ্য একবারই দেখেছি, হয়তো আমার বন্ধু ও আত্মীয় মুজিবের সঙ্গে। সুভাষ বসু তখন নেই, কিন্তু মনে হতো আজাদ হিন্দ ফৌজের কণ্ঠস্বর চলচ্চিত্রের ওই গানে চলে এসেছে।

বন্ধু মুজিবের প্রসঙ্গ আগেই এসেছে। তার বাবা, অর্থাৎ আমাদের ফুপা, বদলি হয়ে এসেছিলেন টালিগঞ্জে, কোর্ট ইন্সপেক্টর হিসেবে। তারা বাসা নিলেন আমাদের বাসার কাছেই। মুজিবও ভর্তি হলো সেন্ট বার্নাবাস স্কুলেই, এবং একই ক্লাসে। ফলে দুজনের বন্ধুত্বটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। সেটা অক্ষুণ্ন ছিল তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মুজিব মারা যায় ২০১১ সালে। তার মৃত্যু আমাকে অত্যন্ত গভীরভাবে আঘাত করেছে।

কলকাতায় থাকার সময়ে আমাদের দুজনকে এক ধরনের খেলায় পেয়েছিল। সেটা হলো বাংলা অর্থসহ কতটা ইংরেজি শব্দ বলতে পারি তার প্রতিযোগিতা। মুজিবরা থাকত দোতলা বাড়ির দোতলায়; অনেকদিনই আমরা বিকেলে তাদের বাসার ছাদে হাঁটতে হাঁটতে শব্দ নিয়ে ওই প্রতিযোগিতার খেলাটা উপভোগ করেছি। বলাবাহুল্য, উপকৃতও হয়েছি। আব্বা খুব খুশি হতেন এ খেলাটা জমছে দেখে। সে সময়ে নেসফিল্ডের ইংলিশ গ্রামার ছিল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যাকরণ বই। স্কুলে পাঠ্য ছিল, আব্বা আমাকে উৎসাহিত করতেন গ্রামার বই থেকে প্রিপজিশনের ব্যবহার মুখস্ত করতে। বলতেন, কাজে দেবে। এ ব্যাপারে তার ধারণা নির্ভুল ছিল; প্রিপজিশনের ব্যবহার আমাকে তখন তো অবশ্যই, অনেক পরেও, এমনকি এখনো জ্বালাতন করে।

রাত করে বাসায় ফিরলে উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করেছি। ওই উদ্বেগ আমাকেও একদিন ভীষণ রকম কাতর করেছিল। আব্বা অফিস থেকে ফেরার পথে কোনো কোনো দিন বাজার থেকে সওদাপাতি কিনে আনতেন, তখন ফিরতে কিছুটা দেরি হতো। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত এসে গেছে তবু আব্বা বাসায় ফেরেননি। কারণ কী? তিনি কী কোনো বিপদে পড়লেন? না জেনে হিন্দুপাড়ায় গিয়ে পড়েছেন কী? রাজশাহীতে আব্বাকে দেখেছি অফিসের অন্যসব বাবুদের মতোই ধুতি পরে অফিসে যেতে। কলকাতায় এসে তিনি পোশাক বদলে ফেলেছিলেন। ঠিক পাজামা নয়, আবার ট্রাউজার্সও নয়, নাম দিয়েছিলেন প্যান্ট-পাজামা; পাজামাই তবে দুদিকে দুই পকেট; তার ওপরে শার্ট। হিন্দু না মুসলমান, একনজরে যাতে চেনা না যায় তার ব্যবস্থা। হিন্দুপাড়া দিয়ে গেলে মনে হবে হিন্দু বটে; মুসলমানপাড়া দিয়ে যাওয়ার সময় ধারণা হবে মুসলমানই তো, পাজামা পরেছে। যা হোক, রাত হয়ে যাচ্ছে আব্বা তবু ফিরছেন না, এতে আমার ভেতর ভীষণ অস্থিরতা শুরু হলো। মা কিছু বলছেন না; ব্যস্ত রয়েছেন এটা-সেটায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনিও যে উদ্বিগ্ন সেটা আমি টের পাচ্ছি। মাকে কিছু না বলে আমি বের হয়ে পড়েছিলাম ট্রাম স্টেশনের উদ্দেশে। মা কিছু জিজ্ঞাসা করেননি, তার দশ-এগারো বছরের ছেলে আমি সন্ধ্যার পরে একাকী কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি জানতে চাননি, তবে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কোন দিকে এবং কেন যাচ্ছি। যাচ্ছি রাস্তায় গিয়ে অপেক্ষা করতেই। আমার মায়ের সঙ্গে অনুভূতির নীরব কথোপকথন পরে আরও অনেক সময়ে ঘটেছে; কিন্তু এটাই ছিল সর্বপ্রথম। আমি ট্রাম স্টেশন পর্যন্ত চলে গেছি। দেখছি আব্বা নামেন কি না। ট্রাম আসছে, ট্রাম যাচ্ছে, আব্বার দেখা নেই। আমি ঘোরাফেরা করছি আশপাশে। এমন সময় মুজিবের হঠাৎ আবির্ভাব। সে ফিরছে তাদের বাসায়। তার মা হয়তো তাকে দোকানে পাঠিয়েছিলেন কিছু কিনতে। আমার ফুপুরা চারজনই খুব জাঁদরেল ছিলেন। আমাকে অকারণে ওইখানে দেখে পিঠে থাপ্পড় দিয়ে মুজিব বলল, ‘কী রে, এখানে কীসের ঘোরাঘুরি?’ আমি তাকে আমার উদ্বেগের বিষয়টা বলতে পারলাম না; এবং বাধ্য হলাম তার সঙ্গে বাসার দিকে রওনা হতে। আব্বা ফিরলেন আমার ফেরারও পরে। তখন সবার একই প্রশ্ন, ‘কী হয়েছিল’? অপরাধীর মতো হেসে আব্বা বললেন, ‘কলিন্স স্ট্রিটে এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। সে তার বাসায় নিয়ে গেল। আমার ভুল হয়েছে।’ আব্বার সেই ম্লান হাসিটা অনেককাল আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। আগে কখনো তাকে অপরাধীর মতো ওভাবে হাসতে দেখিনি; পরে দেখেছি হয়তো, কিন্তু সেদিনকার মতো নয়। তিনি বুঝেছিলেন আমরা কতটা উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করেছি। ছেচল্লিশের রায়ট কলকাতার মানুষকে অমনভাবেই সন্ত্রস্ত রাখত। আর আমি নিজে উদ্বিগ্ন বহুবার বহুভাবে হয়েছি, কিন্তু ওই প্রথমবারের মতো আর কখনো নয়।

সাতচল্লিশের অস্বাভাবিতার মধ্যেও আমরা অবশ্য স্বাভাবিক জীবনই যাপন করেছি। আমার মা বাসা তৈরি করতে পারতেন বাবুই পাখির দক্ষতায়। কলকাতার বাসায় এসে তিনি কিছুটা হতাশই হয়েছিলন; কিন্তু দমে যাননি। গুছিয়ে বসেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন আসতেন। তিনি নিজেও যেতেন কখনো কখনো। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। এমনকি রাজশাহী থেকেও হায়াত আলী শেখ একবার এসে ঘুরে গেছেন।

আমরা দুভাইও খুশিই ছিলাম। মনে পড়ে নতুন শহরে আসার একেবারে প্রথম দিকেই গঙ্গার ধার ধরে আমরা মির্জাপুর স্ট্রিটের খোঁজে বের হয়ে পড়েছিলাম। সেখানে আব্বার চাচাতো বোনদের সবচেয়ে বড় যিনি তিনি থাকতেন। ফুপার চাকরি ছিল স্ট্রিমার কোম্পানিতে। মির্জাপুর পাড়াটা ছিল বই বাঁধাইয়ের। ছাপাখানাও ছিল কয়েকটি ছোটখাটো, তবে বই বাঁধাই ছিল বিরাট ব্যাপার। ওই কাজে মানিকগঞ্জের অনেক মানুষ তখন নিযুক্ত ছিলেন। তারা আশপাশেই বসবাস করতেন। ফুপুরা যে দোতলায় থাকতেন তার নিচতলাতেও কয়েকটি পরিবার থাকত, দেশভাগ নিশ্চয়ই এদের ভীষণ বিপদে ফেলেছিল। অচেনা শহরে সদ্য-আগত আমরা দুই কিশোর ফুপুর বাসা খুঁজে বের করে, সেখানে গিয়ে আচমকা হাজির হয়েছি দেখে তিনি যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি বিস্মিতও হয়েছেন আমাদের ‘সাহস’ দেখে। আমাদের কিন্তু কোনো অসুবিধা হয়নি; মির্জাপুর স্ট্রিট এবং তাদের বাসা খুঁজে পেতে। ফুপুর দুই ছেলে আমার প্রায় সমবয়সী। ওরা অবশ্য তখন বাসায় ছিল না।

কলকাতায় তো আমরা মোটামুটি গুছিয়ে বসেছি; দেশ স্বাধীন হবে এমনই আশা, তাতে আমাদের সুবিধা হবে এটাও নিশ্চিত। কারণ আব্বার চাকরি কলকাতার হেড অফিসে, সেখান থেকে বদলি হয়ে মফস্বলে যে যাবেন এমন শঙ্কা নেই। স্কুলের হিন্দু সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কারও কারও সঙ্গে বন্ধুত্বও গড়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিযোগিতার জন্যও প্রস্তুত হচ্ছি। ম্যাট্রিক শেষ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হব এ রকমের ধারণা।

এর মধ্যেই যেটা ছিল কল্পনারও বাইরে, তার ঘোষণা এল। দেশ ভাগ হয়ে যাবে হিন্দুস্থান-পাকিস্তানে- জুনের ৩ তারিখে রেডিওতে শোনা গেল ওই কথা। ‘স্বাধীনতার’ ওই ঘটনার বাস্তবিক ফলটা কী দাঁড়াবে সে সম্বন্ধে আমরা ছোটরা তো নয়ই, আমাদের অভিভাবকরাও কিছুই ভাবতে পারছিলেন না। তারা হতবাক হয়ে গেছিলেন। দাঙ্গা দেখেছেন, এবার না জানি কী দেখতে হবে- এই বুঝি ছিল তাদের প্রশ্ন। কে কোথায় ছিটকে পড়বেন কে জানে? 

চলবে...

বই পরিচিতি মাস্টার বাড়ি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
মাস্টার বাড়ি
বই

মাস্টার বাড়ি

এস. আকরাম হোসেন

শ্রেণি: উপন্যাস

প্রকাশনী: খান প্রকাশনী

প্রকাশকাল: ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৫০, মূল্য: ২৫০ টাকা

এস. আকরাম হোসেন বিখ্যাত কথাশিল্পী আকবর হোসেনের গ্রামের সন্তান গ্রামে বিখ্যাত অনেক মনীষীর জন্ম বিপ্লবী বাঘা যতীন, সাহিত্যিক ললিতকুমার চট্টোপাধ্যায়, কবি শরৎশশী দেবী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক . আজিজুল ইসলাম- গ্রামের নক্ষত্র সন্তান অভিনেতা-কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পৈত্রিক বাড়ি এখানে এস. আকরাম হোসেনের জন্মভাগ্য ঈর্ষণীয় -গ্রামে জন্মে এস. আকরাম হোসেন লেখক হয়ে-উঠবেন এটাই স্বাভাবিক তিনি কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখেন মুক্তকলাম লেখেন তাঁর লেখাতে দেশভাবনা-সমাজ-সমকাল-অর্থনৈতিক অবস্থা-প্রেম-প্রণয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সমাজের নানান অসংগতি তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তা সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধতায় উপস্থাপন করেন তাঁর ভাষা প্রয়োগের দক্ষতা ঈর্ষণীয় তাঁর উপন্যাসমাস্টার বাড়িপ্রকাশিত হয়েছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক -উপন্যাসের বিষয়বস্তু-চরিত্র নির্মাণ-সংলাপ- আর্থ-সমাজচিত্র-লেখকের চিন্তা-দর্শন, সর্বোপরি শিল্পমান পাঠকমনে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করবে এবং ভাবাবে পাঠককে মুগ্ধ-আবেশে ধরে রাখার শক্তি আছে বিশেষ করে ভাষাপ্রয়োগের কৌশলে তিনি মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেনমাস্টার বাড়িহৃদয়গ্রাহী সুখপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে পাঠকমনে সহজেই নিজস্ব জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে-বিশ্বাস করি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গ্রামীণজীবনের নানামাত্রিক সামাজিক সমস্যা উপন্যাসটির বিষয়বস্তু গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে সুদের ব্যবসা সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে সুদেও কবলে পড়ে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে এসব থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে মুক্ত করে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য উপন্যাসের নায়ক জিহাদ অক্লান্ত পরিশ্রম করছে এলাকায় সুদের ব্যবসা যারা করে তারা মূলত অসহায় মানুষদের সুদের ফাঁদে ফেলে তাদের রক্ত চুষের নেয় সুদগ্রহণকারী এসব মানুষ সুদেও চক্রাহারে ক্রমশ জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলে গ্রন্থটিতে শুধু সমস্যা তুলে ধরেনি, সমস্যার সমাধানও লেখক তুলে ধরেছেন সেসঙ্গে গ্রামীণ জীবনে প্রেম বিরহ যেমন আছে তেমনি দেশপ্রেমের চিত্র ফুটে উঠেছে এস. আকরাম হোসেনেরমাস্টার বাড়িনিখাদভাবে দেখা অসম্ভবরকমের খাঁটি একটি উপন্যাস আপনাকে অসম্ভব চুম্বক-আকর্ষণে ধরে রাখার অসামান্য শক্তি রয়েছে বইটির পরতে পরতে সহজ সরল ভাষায় সমাজজীবনের অসামান্য বুনন- ‘মাস্টার বাড়িউপন্যাস

বই পরিচিতি কৃষি শব্দকোষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
কৃষি শব্দকোষ
বই

কৃষি শব্দকোষ

মৃত্যুঞ্জয় রায়

শ্রেণি: ইংরেজি-বাংলা অভিধান

প্রকাশনী: ঐশ্বর্য প্রকাশ

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২১

পৃষ্ঠা: ৫০৩, মূল্য: ৯৫০ টাকা

 

পড়তাম ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইংরাজী ভাষায় কৃষির মতো একটি মাটিময় কাঁচা ফসলের গন্ধমাখা বিষয়গুলো পড়তে গিয়ে কেমন যেন নিরস লাগত, দুর্বোধ্যও কৃষি পড়ে তো মূলত কৃষকদেরই পরামর্শ দিতে হবে, শিক্ষক গবেষক হবে আর কজন? সেজন্য কৃষির মতো একটা বিষয় ইংরাজীতে পড়ার ছিলাম ঘোর বিরোধী কিন্তু না পড়েই তো উপায় ছিল না শিক্ষকরা তো বাংলায় পড়ান না শেষে বাংলায় নোট করা আমিই শুরু করলাম সাথে পেলাম অনেক সুহৃদ বন্ধুদের চাকরি জীবনে এসে ভেবেছিলাম কৃষির পড়াশুনাটা বোধহয় বাংলাতেই চলছে কিন্তু আমার সে ভাবনায় ভুল ছিল আবার কৃষি ইংরাজীতে ফেরত গেছে বাংলা কি দীনহীনের ভাষা? কেবল চাষাভূষার বুলি? এসব কথা ভাবলেই মনটা বিষন্নতায় ভরে ওঠে

উচ্চশিক্ষায় এত বছর পরও কেন আমরা মধুর মতো বাংলা ভাষায় পড়তে পারছি না! পাশ করার পর তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে মুখস্থ বিদ্যায় আর কতটুকু কেদ্দারী করা যায়? ফলে অনেকের পেশাগত দক্ষতার অভাব ঘটছে অনেকটা তাড়না থেকে কৃষির ছাত্রছাত্রী পেশাজীবীদের জন্য লিখলাম বই এটি চাকুরিকালীন সময়ে করা সম্ভব ছিল না বিধায় মনে মনে ভেবেছিলাম, অবসরে যাওয়ার পর কাজটি ধরব অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে পিআরএল- যাওয়ার পর চার মাসের মধ্যে এটি লিখে শেষ করি, পরের চার মাসে এটি প্রকাশিত হয় এতে কৃষি সংশ্লিষ্ট তিন হাজারের বেশি শব্দের ইংরাজী থেকে বাংলা অর্থ সে সম্পর্কে খুব সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে বইটি পাঠক কৃষিজীবীরা সাদরে গ্রহণ করেছেন বলে আমি আনন্দিত

বই পরিচিতি দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন
বই

ইউসুফ হাসান অর্ক

শ্রেণি: সমকালীন লোককাহিনি

প্রকাশনী: বাংলা একাডেমি

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৬৮, মূল্য: ৪৪০ টাকা

 

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী নাট্যমূলক পরিবেশনার অগাধ ভাণ্ডার বিবেচনার ক্ষেত্রে আমাদের মগ্নতায় এখনো দাসত্ব ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের দৌরাত্ম্য রয়ে গেছে সংলাপমূলক দ্বন্দ্ব দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তথাকথিতদৃশ্যকাব্যহয়ে উঠলেই তাকে বলা যাবেবিশ্বমানের নাটকীয় কিছু হলো’- ভাবনার বাইরে গিয়ে দেশজ সম্পদের স্বকীয় ঐশ্বর্যের দ্যোতনাকে যে কয়জন মানুষ উপলব্ধি করে উদ্যোগী হয়েছিলেন তার মধ্যে দীনেশচন্দ্র সেন প্রথম সারির তারই হাত ধরে এসব ঐশ্বর্যেরনাগরিকসমাজে প্রবেশ বলা যায় নগরমঞ্চে এদের পরিবাহন সে সময় থেকেই তার পর থেকে নানা মাধ্যমে পরিবাহন প্রক্রিয়া কখনো স্তিমিত, কখনো বা জোরালো গতিতে অব্যাহত রয়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে লোককাহিনিগুলো পরিবাহনের আরেকটি মাত্রা নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নগরকেন্দ্রিক থিয়েটার মঞ্চে কাহিনিগুলো ঐতিহ্য প্রণোদিত অথচ নতুন রীতিতে মঞ্চায়িত হতে শুরু করে লোককাহিনি পরিবাহনের পাশাপাশি অভিনয়রীতি নিরীক্ষার এক বি-ঔপনিবেশিক প্রতিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা চলে ধরনের উদ্যোগগুলোকে পাশাপাশিসাংস্কৃতিক পরিবাহন’-এর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেও এগুলোকে বিবেচনা করা অসমীচীন নয় তাই দীনেশচন্দ্র সেনকে প্রণতি জানিয়ে লোককাহিনি পরিবাহনের এক সমকালিক প্রবণতাকে গ্রন্থে স্বীকৃতি দেওয়া গেছে লোকজ ধারার সাহিত্য পরিবেশনায়ফুইডিটি যে উদার প্রশ্রয়, তাকে গ্রহণ করে নগরকেন্দ্রিক পরিবাহন-প্রক্রিয়া তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রন্থটিতে লোককাহিনিনির্ভর তিনটি নাট্য প্রযোজনার সমুদয় বিশ্লেষণ থেকে সমকালে লোককাহিনির পরিবাহন নিরীক্ষা বিষয়ে ধারণা অর্জন সম্ভবফোকলোর’, ‘পারফরম্যান্স স্টাডিজনাট্যকলাবিষয়ের শিক্ষার্থী গবেষকদের জন্য তো বটেই, পাশাপাশি বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় সংশ্লিষ্ট অভিনেতা-নির্দেশকদের জন্যও গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

সমাজবোধ ও জীবনবীক্ষা মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা

চতুর্থ পর্ব

মাঝে পড়ালেখার কারণে শাহবাজ খানের বিদেশ অবস্থান, তাদের মধ্যে সেই সময়ে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেনি। যোগাযোগও ছিল না। করোনাকালীন তাদের মধ্যে হুট করেই আবার যোগাযোগ স্থাপন হয়। শাহবাজ খান ধনীপুত্র। নিজেও পিতার শিল্পসাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। মোহিনীও শিল্পদ্যোক্তা, ধনী ব্যবসায়ী। আরেফিনের মৃত্যুর পরে  মোহিনীর জীবনে শাহবাজ খান আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু মোহিনী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুকৌশলে শাহবাজ খানের ফাঁদে পা দেননি। বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘন করেননি। করতেও দেননি। আরেফিন মৃত্যুবরণ করলেও মোহিনীর মস্তিষ্কের কোষে কোষে বেঁচে আছে আরেফিন। তার সঙ্গে যাপিত অসংখ্য স্মৃতি মোহিনী নিজের ভেতর লালন করেন। আরেফিন না থেকেও পুরো আরেফিনই তার জীবনে জীবন্ত হয়ে আছে। সেখান থেকে মোহিনীর মুক্তি ঘটেনি, মুক্তি ঘটাতে চানওনি। মোহিনীর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা ও সততা তার চরিত্রকে উচ্চমার্গের করেছে। শাহবাজ খানের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু যখন তিনি জানলেন শাহবাজ খানের সঙ্গে রুবিনা নাম্মী এক কলেজছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। রুবিনাকে গুলশানে নিজে বাসা ভাড়া করে রাখতেন। রক্ষিতার মতো। অনেকটা ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র জমিদার গোবিন্দলাল আর রোহিনীর অবস্থা। গোবিন্দলাল রোহিনাকে বিয়ের আশ্বাসে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে বিয়ে তো করেইনি, গুলি করে হত্যা করেছিল। রুবিনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনাই ঘটেছে। একালের ‘জমিদার’ শাহবাজ খান বিয়ের আশ্বাসে রুবিনাকে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে হত্যা করেছে। রুবিনার মনে রোহিনীর মতোই আশা ছিল স্বপ্ন ছিল শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করবে, তার সংসার হবে, সন্তান হবে। কিন্তু শাহবাজ খান ছিলেন পুরোটাই ভোগবাদী মানসিকতাসম্পন্ন। সে কারণে একপর্যায়ে রুবিনাকে হত্যা করে সে। রুবিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল। অর্থাৎ ভ্রুণসহ হত্যার শিকার হয় রুবিনা। এটা মোহিনী জানার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অফিসে জানিয়ে দেন, শাহবাজ খান যেন তার অফিসে কখনোই আসতে না পারে। তার জন্য এ অফিস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। মোহিনীর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে। কারণ তিনি রুবিনার বিষয় নিয়ে শাহবাজ খানের সঙ্গে কোনো কথা বলা বা আলোচনা করারই প্রয়োজন মনে করেননি। এরকম একজন নষ্টকীটের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব থাকতে পারে না, কোনোরকম আর যোগাযোগ হতে পারে না। তিনি মুহূর্তেই মানসিক দৃঢ়তা, সততা ও আদর্শে এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছেন। অথচ শাহবাজ খানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকে। শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরুর কথা সরাসরি বলেছে। যা বিনয়ের সঙ্গে মোহিনী প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গাটি তো তাদের মধ্যে ছিল। শাহবাজ খানের রুবিনা হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা জানার পরই তিনি মুহূর্তেই তার জীবন থেকে শাহবাজ খানকে উপড়ে তুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব কতটা শক্তিশালী হলে মুহূর্তেই দীর্ঘদিনের বন্ধুকে এভাবে ছুড়ে ফেলতে পারা যায়, তা সহজেই অনুমিত হতে পারে। এখানে শাহবাজ খানের অর্থ-ক্ষমতা-বন্ধুত্ব কোনো কিছুই মুহূর্তের জন্যও মোহিনীকে ভাবাতে পারেনি। মোহিনী এমনই এক নির্লোভ, নির্মোহ, সত্যের ও আদর্শের ধারক হয়ে ওঠেন।

মোহিনীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসিফ আহমেদ। প্রখ্যাত সাংবাদিক তিনি। মোহিনীর আসিফ আহমেদের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে মানসিক দুর্বলতা থাকলেও কখনো তা প্রকাশ করেননি। বন্ধুত্বকে অতিক্রম করে অন্য কোনো সম্পর্কে আগাননি। আসিফ আহমেদকে তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। তার পাশে সহযোগিতার হাত বাড়াতে চয়েছেন। এমনকি আসিফ আহমেদকে মাথায় রেখেই পত্রিকা প্রকাশনার কথাও ভেবেছেন। আসিফ আহমেদ তাকে না জনিয়ে অনলাইন পত্রিকা ‘ঢাকাপ্রকাশ’ করলে মোহিনীর কণ্ঠে অভিমান ও অনুযোগের প্রকাশ ঘটেছে। বন্ধুত্বের প্রতি তার যে সম্মান ও দায়িত্ববোধ তা অসাধারণ। আসিফ আহমেদ বন্ধুত্বের সীমানা কখনোই অতিক্রম করেননি। তার শান্ত-স্নিগ্ধ কিন্তু ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ মোহিনীকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে। বন্ধু হয়েও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আত্মসস্মানবোধ এবং হৃদয়গত উপলব্ধি- মোহিনী চরিত্রে অপূর্ব সুঘ্রাণ তৈরি করেছে। আরেফিনের দরিদ্র পরিবারের প্রতি তার যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ তা বাঙালি নারীর চিরকালীন যে ব্যক্তিক-সৌন্দর্য ও দায়িত্ববোধ তা চমৎকারভাবে লেখক তুলির আঁচড়ের মতো কয়েকটা টানেই জীবন্ত করে এঁকেছেন। আরেফিনের বাবা আলী আকবর যখন অফিসে এসে মোহিনীকে না পেয়ে ফিরে গেছেন, রেখে গেছেন অসহায় আকুতিভরা পত্র, সেই পত্র পড়ে মোহিনীর ভেতর যে মানসিক কষ্ট-যন্ত্রণা হয়েছে, নিজের ভেতর বেদনার্ত আর্তনাদ হয়েছে, মানসিক কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। অফিসের কর্মকর্তার প্রতি তার এ বিষয়ে নির্মোহ আচরণ এবং দ্রুত দ্বিগুণ পরিমাণে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। এর ভেতর দিয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল মোহিনীকে পাই। বাঙালির নারীর জীবনে স্বামী-পরিবার যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা মোহিনী চরিত্রে পরিলক্ষিত হয়। তিনি ধনীকন্যা। নিজেও ধনী শিল্পোদ্যোক্তা। স্বামী মৃত। নিজে কখনো শ্বশুরবাড়ি যাননি। তিনি অনায়াসে এসব এড়িয়ে চলতে পারতেন। তিনি তা করেননি। বরং আরেফিনের মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবারের দায়িত্ব বহন করছেন। তিনি জানেন আরেফিনের টাকাতেই সংসার চলত। আরেফিনের মৃত্যুতে পরিবারটা অসহায়। তাই তিনি নিজেই বাড়ির যেন পুত্রবধূ নয়, নিজেই সংসারের দায়িত্ব পালনে আরেফিন হয়ে ওঠেন। মোহিনী যেন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রমীলাকেই মনে করিয়ে দেয়। স্বামী মেঘনাদ যখন বিপদগ্রস্ত তখন তিনি চুপ থাকতে পারেননি। তিনি মুহূর্তেই যুদ্ধসাজে তৈরি হয়ে স্বামী মেঘনাদকে উদ্ধারের জন্য ছুটে গেছেন। মোহিনীর প্রেক্ষিত ভিন্ন। কিন্তু দায়িত্বের জায়গা অনেকখানিই এক। বিশেষ করে বাঙালি নারীর কাছে স্বামীর পরিবার বিপদগ্রস্ত হওয়া মানে সে বিপদ তার নিজেরই। সেখানে তার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। শ্বশুরবাড়ির প্রতি বাঙালি নারীর হৃদয়সত্য ও দায়িত্ববোধে মোহিনী চরিত্র অসামান্য হয়ে উঠেছে।

মোহিনী দেড় বছরের ব্যবধানে বাবা মোহসীন আহমেদ ও মা আনোয়ারা বেগমকে হারিয়ে দিশেহারা। বাবা মৃত্যুর আগে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও কন্যা মোহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে ‘আনোয়ারা-মোহসীন ট্রাস্ট’ গঠন করেন। মোহিনী সে ট্রাস্টের প্রধান। নিজের কোম্পানিও ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত করেন। যাতে তাদের মৃত্যুর পরে কোম্পানিগুলো কোনো সমস্যার শিকার না হয়ে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। ট্রাস্ট থেকে মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রকাশনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। করোনায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। কারণ তিনি জানেন মৃত্যু অবধারিত। আরেফিন ও বাবা-মায়ের মতো একদিন তাকেও চলে যেতে হবে। সে কারণে উপার্জিত অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ব্যক্তি মোহিনী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি। ভেবেছেন দেশের অসহায় মানুষের কথা। নিজেকে নিজেই অতিক্রম করার অসাধারণ চরিত্র মোহিনী।

উপন্যাসের মোহিনীর গুরুত্ব বিবেচনা করে যে বিষয়টি ভাবনায় আসে তা হলো, প্রধান চরিত্র মোহিনী হওয়া সত্ত্বেও কিছু অধ্যায়ে মোহিনীবাদেই স্বতন্ত্র গতিতে এগিয়েছে।   

চলবে...

গল্প সুন্দর পুরুষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
সুন্দর পুরুষ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

‘অ, মাও, শ্মশান থুইয়া..’
সত্যিই এবার বিগড়ে যায় মীনাক্ষীর গলা, মেয়ের প্রতি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওই মাইয়া, মড়া আছে শ্মশানে? বইয়া থাহুম।’
‘মনে অয় দ্যাশে মড়া কইমা গেছে।’ কথা শেষ করে হাসে সপ্তদশী মেয়ে শচী। অপ্রয়োজনীয় হাসি। এমন হাসির কোনো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মীনাক্ষীর রাগ হয়, ‘এ্যাই মাইয়া হাসনের কী হইল? রূপ খুলতাছে তর। মাইয়া, ঐ রূপের বড়াই তর বাপেও করতো।’ 
চুপ মারে রূপবতী শচী। শ্মশান ঘাটের পাশেই অপেক্ষায় ছিল মা আর মেয়ে। জগৎসংসারে মা ছাড়া কেউ নেই ওর। মাকে কষ্ট দেওয়া কী ঠিক! প্রশ্ন জাগে। নিস্তেজ গাং ধরে তাকায়। মনে মনে ভাবে একজন পুরুষকে তো মন দেওয়া হয়ে গেছে। তাকে মা কী মেনে নেবে–এমন প্রশ্নও শচীকে ভাবায়। চৈত্রেরকাল বলে গরমটা খুব তেজি ছিল। কিন্তু হঠাৎ ফুরফুরে হাওয়া আর মরারোদে আদুরে আদুরে হয়ে উঠল সেই রৌদ্রতেজ। এখানেই বাড়িঘর, ঠিকানা। বেড়ে উঠেছে মীনাক্ষীর একমাত্র মেয়ে শচীও। 
শবদেহ এলে শ্মশানপুরোহিতের ডাক পড়ে। শাস্ত্রীয় বিধান দেওয়া হয়। ভোর-সকালে এ বাড়িতে একটা চক্কর দেওয়া নিয়ম যেন তার। কখনো কখনো খবর দিতে হয়, রামচন্দ্র পুরোহিত আসেন, শাস্ত্রীয় আচারপালিত হয়। এরপর মৃতের সৎকার। নানা কাজকর্ম শেষে অর্থকড়ি মেলে। এদিয়েই সংসার চলে মীনাক্ষী আর শচীর। সপ্তাহ দুয়েক ধরে শবদেহ কম আসছে। আয়রুজি কম। ঘরে চাল-তেল নেই।
‘এমুনডা হইতাছে কী কারণে?’ পুরোহিত রামচন্দ্রের কাছে হেতু জানতে চেয়েছিল মীনাক্ষী। সঠিক জবাব নদিতে পারেননি উঠানে জলচৌকিতে বসা রামচন্দ্র। বিড়ি টানেন আর ধোঁয়া ছাড়েন ওপরের দিকে।
প্রসঙ্গ পাল্টায় মীনাক্ষী। পেছনের পাড়ায় রামচন্দ্রের ঘর। তার একমাত্র সন্তান অনন্ত। সবাই ডাকে ছোট ঠাকুর। অনন্তের ব্যাপারে রামচন্দ্রকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘দিনকাল যেমুন পড়ছে। নয়া নয়া অসুখ ধরা পড়তাছে। পোলাডা য্যান সাবধানে থাহে!’
‘আমার পোলা মানুষ হয় নাই, জানোয়ার হইছে। রেপ কেইসের মামলায় হে পয়লা নম্বর আসামি। আর আমি সর্বস্বান্ত।’ একটু থামেন রামচন্দ্র। খানিকটা গর্ব তার চোখমুখে। ‘হুনো, পোলা ছিল আগুনের গোল্লা। এসএসসি-ইন্টারমিডিয়েটে জিপিএ ফাইভ পাইছিল। ইস্কুলের মাস্টরেরা কইল সার্থক জনম আমার। হে নাকি ডাক্তর- এনজিনিয়ার অইব। ওহ্, মাই, হেই পোলা ডাক্তরি পরীক্ষায় চান্স পাইল না, এনজিনিয়ারিংয়ে না। বাড়িতে আইয়া খালি কান্দে।’ আবার থামেন রামচন্দ্র। ‘বিড়িটা নিইব্যা গ্যাছে। গ্যাসলাইট লগে নাই? দিয়াশলাই আছে?’
ঘর থেকে গ্যাসলাইটার এনে হাতে দেয় মীনাক্ষী। রামচন্দ্র বিড়ি ধরিয়ে বললেন, ‘পোলারে হ্যাসকালে কইলাম, ঢাকায় ভর্তি হ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। ভার্সিটি থেইকা পাস দিলেও দাম আছে। এহনতো কলেজ-ভার্সিটি বন্ধ। পোলার কামাই খাইমু এমন আশা আর করি না।’ সরল-স্বীকারোক্তির পরে সাবধান-সতর্ক করে রামচন্দ্র বললেন, ‘কিছুদিন থেইকা নাকি তোমার বাড়ি আসতেছে। সাবধানে থাইকো।’
“হ আসে। পোলাডা বিষ্ণুর মতো চেহারা, কতো সুন্দর। আর কী য্যান সুন্দর গানের গলা। ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার গান গাইল। মিডা গলা। সুন্দর ভাষায় কথা কয়। সিনেমার নায়কের মতন ভাষা। আমার মাইয়া শচীর লগে কথা কয়। ম্যালা কথা কয়।” তৃপ্তিমাখা কণ্ঠ মীনাক্ষীর।
‘কী অত কথা?’ উত্তরের জন্য নারীমুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন রামচন্দ্র। 
‘যাই কন, পোলা নাই আমার। আমি বুজি। পোলা অইল বংশের খুডা। মরতে অইবো না! মুখে আগুন দিবো ক্যাডা? মুখাগ্নি করব ক্যাডা?’ 
রামচন্দ্র চলে গেলে স্নানে আসার পর থেকেই আজ সাম্প্রতিক স্মৃতিকথা মনে উদয় হচ্ছিল মীনাক্ষীর। নদীর জলে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে ও। কানে বেজে উঠল স্বামীর আরও নানা কথা। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলত, ‘কেমুন সুর্মাটানা তুমার চক্ষু, অতো সৌন্দর্য ক্যান তুমার মুখে।’ কী উন্মাদনা ছিল স্বামীর। মায়ার মানুষ ছিল, আদরমাখা গলা। হঠাৎ মরে গেল। চিতাতে রাখা শবদেহে আগুন ধরাতে ধরাতে মরে গেল স্বামী। লোকে বলল, ‘অ্যাতো মদ গিলেছে যে, মাগনা মদে মরেছে।’ ডাক্তার বলল, ‘হার্ট অ্যাটাকে।’ সবগুলো শব্দ একে একে মনে পড়ল মীনাক্ষীর। ‘তোমার সুয়ামি মদে মরেছে।’ কেউ যেন তাকে কানে কানে বলে যাচ্ছে এসব। এরপর বিধবা হওয়ার শব্দটি আড়াল করা হয়। রামচন্দ্রের পরামর্শ ছিল, শাঁখ না ফেলার, সিঁদুর না মোছার। মানুষ নানাকথা বলবে, শ্মশানে বিধবাদের কর্ম তো হতেই পারে না। মৃত্যু মানুষের হবেই, সকলেরই। আত্মা ও অন্তর পরিষ্কার রাখলেই অন্তরাত্মা পবিত্র। সেখানেই ঈশ্বর, প্রভু। তুমি চাইলে তুমিও সৃষ্টিকর্তাকে পাবে। মানুষকে তুমি তুষ্ট করলেই স্বয়ং প্রভু তুষ্ট। আত্মা খুশি তো জগৎখুশি। রামচন্দ্রের বিচক্ষণতা তাকে আস্থাশীল করে তোলে, কখনো বা মনে হয় এই লোকটিই তীর্থস্থানের পূজারি। 
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে শচীর দিকে একপলক তাকিয়ে ফের মাথা ভেজাতে শ্মশান ঘাটে আরও কয়েকটি ডুব দেয় মীনাক্ষী। শরীর ভেজা তবু পানি ছিটাবে। টলটল পানি নদীতে, স্বচ্ছ কালো জল যেন। নিজের হৃষ্টপুষ্ট শরীর দেখে। বুক সামলাতে কাপড় টানে। দেহ নিয়ে কল্পনা করাও পাপকর্ম। এরপর সূর্যের দিকে তাকায়। নিরুত্তাপ সূর্য। বেলা গড়িয়ে বিকেল কিনা। 
উপশহর এলাকায় থিতু হয়ে থাকা শ্মশান ঘাটের অদূরের বাড়িটিতেই জীবনের বড় সময় ধরে আছে মীনাক্ষী। বিয়ের পর কত কিছু বদলে গেছে এখানকার। আগে ছিল নদী। এখন মাটি ভরে ভরে নদীভরাট হয়ে শুকিয়েছে। দূরের দিকে ছোটখাটো খাল। পাশে থাকা কচুরিপানা ভর্তি খালটার এখন অস্তিত্ব নেই। আর দখলবাজদের অত্যাচারে স্রোতধারা নদী হয়েছে সরু। নাম জানা না জানা সারসার গাছ ছিল পাড় ঘেঁষে। এসবের কিছু আছে তবে বড়গাছগুলো রাতের অন্ধকারে অনেকদিন আগেই কেউ কেটে নিয়ে গেছে। হিন্দুদের শ্মশানের জায়গা দখল হয়ে কাঠচিড়াইয়ের কারখানা। জমজমাট দোকান আনোয়ার টি স্টল লেখা। খানিকটা দূরে হোমিওপ্যাথির দাওয়াইয়ের দোকান ছিল, এটি এখন হয়েছে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের দোকান।
আকারে ছোট হয়ে আসছে শ্মশান। বিয়ের সাড়ে ১৮ বছরে অনেক বদলে গেছে দুনিয়া। মেয়ে স্কুল বাদ দিয়েছে গত সন। মা-মেয়ের ছোট সংসার। দুশ্চিন্তা ছিল না শচীর জন্য। কিন্তু মেয়ের প্রতি সেই মুগ্ধভাবটা আর যেন নেই এখন। 
স্নান সেরে নদীর পাড়ে ওঠে মীনাক্ষী। গামছা জড়িয়ে নেয় বুকে। এদিক-ওদিক তাকায়। পিঠছেঁড়া ব্লাউজ বদলায়। স্বামী গত হওয়ার পর থেকে সতীত্ব টিকিয়ে রাখতে একযুগ ধরে পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে মীনাক্ষীর। হিন্দু-মুসলমান পুরুষরা একসঙ্গে মিলেমিশে গিলে খেতে চায় শরীরটা। জাতপাত যায় না। তখন ছোটগোত্রের প্রশ্নও ওঠে না। কাঁখে এক কলস পানি নিয়ে ঘরমুখো হাঁটতে শুরু করে। অদূরেই ছাপরাঘর। ঠিকানা বলতেই এই ভিটে-বাড়ি। চোট্ট এক চিলতে উঠান। বাড়ির কোণে একজোড়া হাঁস। হেলেদোলে দূর্বাঘাসে খাবার খোঁজে। মুহূর্তেই মনোযোগ সরে যায়, কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে মীনাক্ষীর, হাঁসগুলোর ওপর সকল রাগ। ‘দিনভর গাঙে খাইলে–হেরপরও পেট ভরে না!’ 
ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই মীনাক্ষীর মনে কী যেন নড়ে উঠল। শচীর দিকে চোখ নেচে বেড়ায়। কোনোদিন না হলেও আজ হঠাৎ কঠিনতর ভাবনায় মন বিষিয়ে ওঠে। বিয়ে দেওয়া চাই মেয়েটার। 
‘মাও, কী হইচে?’
মায়ের জবাব না পেয়ে শচীর চোখে-মুখে অকারণ হাসি।
মীনাক্ষীর কণ্ঠ কঠিন, ‘ওই মাইয়া হাসস ক্যান? বয়স অইতাছে না। বিয়া দিতে অইব না তোরে? ট্যাকা পামু কই, ক্যাডা দিব?’
মিঠে করে হেসে শচী বলল, ‘ট্যাকা দেওনের মাইনষের অভাব অইব?’
‘কইলি কী? মাইয়ার সাঅস, কী?’ গোখরা সাপের মতো ফুঁসে ওঠে মীনাক্ষী। 
এখন বিকেল। চুপ মেরে ঘরের বারান্দায় মাটিতেই বসে পড়ে শচী। লম্বা ডাগর হাত দুটি নাচায়। টানাটানা চোখে তাকিয়ে থাকে। একটু পর বলে, ‘মাও, যাইগা লও এ্যাইহান থেইকা।’
মীনাক্ষী ঘাড় ঘুরিয়ে বড়বড় চোখে তাকায়। ‘মাইয়া, কী কইলি তুই?’
‘হ, ঠিক কইচি। দিনকাল বদলাইছে না? শ্মশানে কেউ পইড়া থাকে, কও?’
গামছা দিয়ে চুল শুকোচ্ছিল মীনাক্ষী। মুখ ঘুরিয়ে তীব্র আপত্তিমাখা কণ্ঠে বলল, ‘কই যামু, কই যামু?’
‘ভাল্লাগে না।’
‘কইলি অইব? এ্যাইডা তর বাপের ঠিকানা, এ্যাইখানেই রুটি-রুজি। আমাগো ঘরবাড়ি।’ 
‘ভাল্লাগে না, সমাজ নাই, জ্ঞাতিগোতী নাই। ক্যাডা আছে, এ্যাইখানে?’ 
চমকে ওঠে মীনাক্ষী। কয়েক মাস থেকেই মেয়ের কথাবার্তা, আচরণ, পোশাক পরার কায়দা, চলাচল সবকিছুর একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল। মেয়ের কথায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘যাগা তুই, যেইদিকে চোখ যায়, যা! আমারে মুক্তি দে।’
‘হ, যামু।’ 
মোবাইলে চটুল বাজনা আর গান বেজেই চলেছিল। মীনাক্ষী অনুমান করে নিশ্চয়ই শচীর কর্ম। ছোট ঠাকুরের সঙ্গে মেশামেশি করে মেয়ের মাথা গেছে। চঞ্চলতা বেড়েছে। লাউয়ের ডগার মতো হাত নেড়ে হাতপাখার বাতাস খায় শচী। 
আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাপড় বদলা, আমার লগে আয়।’ 
তাৎক্ষণিক জবাব দেয় না শচী। 
বালিশের তলায় থাকা কভারের রং ওঠা, গ্লাসভাঙা, ছোট মোবাইল ফোনটি হাতে এনে কোমরে গুঁজে নেয় মীনাক্ষী। দৃষ্টিতে পড়তেই কাপড়ের ছেঁড়া অংশ ঘুরিয়ে গুছিয়ে পরে। নিজের সাজগোজ বলতে সরিষার তেল মাথার চুল লেপ্টে মাখা। গায়ে আঁটসাঁট হয়ে থাকা ব্লাউজটি টেনেটুনে ঠিক করে। এরপর মুখে জর্দাপান ঢুকিয়ে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী কই, আমার লগে আয়।’
‘এহন, কই যামু?’
‘তর ডানা মেলছে না, পাখা ছাটুম। পায়ে বেড়ি লাগামু।’
শচী জানে কোথায় যাবে মা। এখন পাশের ভাঙাহাটে যাবে। কমদামের ছোট মাছ, বাসি লাউ, পচা কচুরলতি আনতে যাবে। 
ঘণ্টাখানেক পর বাজার সেরে ঘরে ফিরে মীনাক্ষী। বিকেল গড়িয়ে গেছে কখন, খেয়াল নেই। দরজায় পা রেখেই মীনাক্ষী ডাক পাড়ে মেয়েকে, ‘শচী, অরে শচী?’
অবাক হয় শচীর আওয়াজ না পেয়ে। 
‘শচী গেলি কই?’
চারদিকেই যেন নিস্তব্ধতা। শুধু মাথার ওপর দিয়ে একজোড়া কাক ওড়ে গেছে।
‘শচী?’
ঘরের কোণে কাঁথা জড়ানো বস্তুর দিকে তাকায় মীনাক্ষী। চুলগুলো দেখে অনুমান হয় শচীই হবে। কেউ কী কাঁথার ভেতর ওর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। চৈত্রকালে কাঁথা কেন! চোখের ভুল হতে পারে। নানান জিজ্ঞাসা মনে তার। 
উঠানের কাপড় তুলে ঘরে আনতে যাবে তখনই কেউ যেন মীনাক্ষীকে ফাঁকি দিয়ে কুঁড়েঘর থেকে বের হয়েই দৌড় দেয় সড়কের দিকে। নিমিষে চলে যাওয়া মানবটির গড়ন যেন পরিচিত।
‘ক্যাডা? ক্যাডা যাও?’ মীনাক্ষীর উচ্চকণ্ঠ।
পরিষ্কার চোখে ধরা পড়ে যে, এ লোকটি অনন্ত, ছোট ঠাকুর; রামচন্দ্র ঠাকুরের ছেলে। বুঝতে কষ্ট হয় না, কী হয়েছে। কেন এসেছিল ছোট ঠাকুর। 
হাতের ঝাড় রেখে ঘরে ঢোকে মীনাক্ষী। ‘ছোড ঠাকুর ক্যান আইছিলো, শচী?’ 
ছোট ঠাকুরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার সময়ে মা এসে পড়েছে; এমন মুখভঙ্গি করে কিংবা এটা বোঝাতেই শচী বলল, ‘লুকাইন্যা খেইল খেলছিলাম।’
ভীষণ চমকে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল মেয়েকে। এলোমেলো চুল আর ঘর্মাক্ত কিশোরীর চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে এই লুকোচুরির 
অর্থ কী। এরপর জোরে জোরে কেঁপে কেঁপে চিৎকার 
করে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী, নিজের এমন সর্বনাশ করলি ক্যান?’
মাথা নিচু করে নিরুত্তর থাকে শচী। অতীব সুন্দরী মেয়ের এমন মুখভঙ্গি অসহ্য ঠেকে। মীনাক্ষী খেয়াল করে দরদর ঘাম মেয়ের শরীরে। এই ঘাম পশুর ওপর নৃশংস ছুরি চালানো রক্তের মতোই মনে হয় মীনাক্ষীর।