আমার মা বলেছেন, এক সন্ধ্যায় দাদি নাকি বলেছিলেন, ‘বউমা, তোমার ছেলেটাকে আজকে সরিয়ে রেখো, ও ভয় পেতে পারে।’ কী ভেবে বলেছিলেন কেউ তা জানে না, কিন্তু রাত পোহাবার আগেই তিনি বিদায় নেন। আব্বার কেমন লেগেছিল কল্পনা করার চেষ্টা করিনি। শাশুড়িকে কাছে রাখতে পারেননি ভেবে মা যে অপরাধবোধে পীড়িত হয়েছিলেন সেটাও বুঝতে পারি। আব্বা তো এমনিতেই একাকী ছিলেন, মায়ের মৃত্যুতে তার একাকীত্ব আরও বেড়ে গেল। হয়তো সেটাই পূরণ করতে চাইতেন নিজের পরিবারের দিকে অধিক মনোযোগ দিয়ে। আমাদের পরিবারের ওটিই প্রথম মৃত্যু।
কলকাতায়
১৯৪৬-এর শেষ দিকে রাজশাহী ছেড়ে আমরা কলকাতায় যাই। এমনটা যে ঘটবে আমি তো ভাবতেই পারিনি। মাঝখানে আব্বা একবার কলকাতায় গিয়েছিলেন, কেন যেতে হয়েছিলেন আমরা ছেলেরা জানি না। মায়ের জানবার কথা, কিন্তু তিনিও আমাদের কারণটা বলেননি। আসলে গিয়েছিলেন দাপ্তরিক উন্নতির জন্য এক সাক্ষাৎকারের ডাকে। সেই উন্নতির কারণেই মফস্বল শহর রাজশাহী ছেড়ে আমাদের রাজধানী কলকাতায় যাওয়া। চিত্তরঞ্জন দাশের বেঙ্গল প্যাক্ট কার্যকর হয়নি ঠিকই, তবে তার ভেতরে মূল ব্যাপারটা যে ছিল চাকরির ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান সংখ্যাসাম্য প্রতিষ্ঠা, সেই নীতিটির প্রয়োগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে এ কারণে যে তখন বাংলার প্রাদেশিক প্রশাসনে ছিল মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভা। নিয়োগের ওই নীতিতেই হিন্দু সম্প্রদায় থেকে একজন এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন, অর্থাৎ আমার বাবা প্রমোশন পেয়েছিলেন।
১৯৪৬ সালে তো গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের বছর। তারই মধ্যে কলকাতায় গিয়ে আব্বা তাদের হেড অফিসে ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছেন, এবং মাসখানেক পরে নতুন কাজে যোগ দিতে কলকাতায় চলেও গেছেন। বড় বাবু থেকে অ্যাকাউনটেন্ট হলেন। শুধু যে কাজে যোগদান তা নয়, খিদিরপুর এলাকায় বাসা ঠিক করে ডিসেম্বরে রাজশাহীর পাট গুটিয়ে রাজধানীমুখী হওয়ার ব্যবস্থাটিও সম্পাদন করে এসেছেন।
রাতে ট্রেনে বসে কলকাতা যাওয়ার অনুভূতিটা আজও মনে পড়ে। অনিশ্চিত ঠিকানায় যাচ্ছি এমনটা মনে হয়নি, তবে দূরে যে যাচ্ছি সেটা তো বোঝাই যাচ্ছিল। কয়েকটি স্টেশনে ট্রেন থেমেছে, সেখানকার আলো, মানুষের ওঠানামা, চলাফেরা দেখেছি, তার পরে ট্রেন যখন আবার ছুটতে শুরু করেছে তখন দূর জনপদে এবং রেললাইনের পাশেও আলো অতিদ্রুত সরে সরে যাচ্ছে, এ দৃশ্য মনে দাগ কেটে আছে। রাজশাহীর রেলস্টেশনে যতবার গেছি মনে হয়েছে সেটি একটি রহস্যময় স্থান, এবং স্পৃহা জন্ম নিয়েছে যে বড় হলে আমি রেলের গার্ড হব; আমার হুকুমে ট্রেন চলবে এবং আমি দূর দূর দেশে নির্ভয়ে চলে যেতে পারব। বাল্যকালে আরও একটি ইচ্ছা ছিল মনে, সেটি হলো ছাপাখানার মেশিনম্যান হওয়ার। রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থল বলতে আমরা বুঝতাম সাহেববাজারকে, সেখানে একটি ছাপাখানা ছিল; ওই ছাপাখানায় অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও ছাপা হতো। সাহেববাজারে যাওয়া-আসার পথে ছাপাখানার মেশিনম্যানকে দেখতাম; ট্রেডল মেশিনে পায়ে চাপ দিয়ে একটি করে কাগজ ভরে দিচ্ছেন আবার মুদ্রিত আকারে সেটি বের করে আনছেন। এতে যে কায়িক শ্রম কতটা লাগত তা নিয়ে আমার কোনো চিন্তাই ছিল না, কাজটাকে মনে হতো বেশ রোমান্টিক- ভীষণ রকম সৃষ্টিশীল। আমার তো রেলের লোক হওয়া হয়নি, কিন্তু ছাপাখানার সঙ্গে যোগাযোগটা তখন না ঘটলেও পরে ঘটেছে এবং সেটা এখনো অক্ষুণ্ন রয়েছে।
খিদিরপুরের বাসস্থানে ঢুকে প্রথমেই একটি ধাক্কা খেয়েছিলাম। এ বাসা তো অনেক ছোট রাজশাহীতে আমাদের আবাসের তুলনায়। দোতলা বাড়ির একতলায় আমরা থাকব। বরাদ্দ একটি বেশ বড় এবং তার সঙ্গে মাঝারি গোছের দুটি কামরা; দোতলায় থাকবে দুটি পরিবার। কিন্তু তবু কলকাতা তো কলকাতাই। মস্ত বড় শহর। রায়টের পরে কলকাতা আবারও সৃষ্টিশীল, তবে শহর মোটামুটি দুভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল- হিন্দুপাড়া ও মুসলমানপাড়া। সঠিক পাড়ায় বাসা পাওয়াটাও আগের তুলনায় শক্ত হয়ে পড়ে। খোঁজাখুঁজি করে আব্বা মুসলমানপাড়ায় শুধু ওই বাসা খুঁজে বের করেননি, দুটি পরিবারকেও জোগাড় করেছেন যারা বাড়িটির আংশিক ভাড়া বহন করবেন। একটি পরিবার আবার ছিল ঢাকা জেলারই, নরসিংদী এলাকার। এই পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিনজন। দুই ভাই এবং বড় ভাইয়ের স্ত্রী। বড় ভাই নিঃসন্তান ছিলেন; ছোট ভাইটি থাকতেন ছাদের চিলেকোঠায়। তার বয়স অল্প, পত্রপত্রিকা পড়তেন, খবর রাখতেন রাজনীতির। ছাদে গেলে তার সঙ্গে আলাপ হতো। বড় ভাইয়ের মতো তিনিও সরকারি চাকুরে ছিলেন। কী নিয়ে ঠিক জানি না, দুভাইয়ে একবার মনোমালিন্য ঘটে। সেটা টের পাওয়া গেল যখন দেখা গেল ছোট ভাই বেশ গভীর রাতে স্যুটকেস হাতে বাসায় ফিরছেন। দাঙ্গার কারণে রাত করে ফেরাটা সে সময়ে উদ্বেগজনক ছিল; দাঙ্গা থেমে গেছে তবে তার রেশ তো ছিল। পরের দিন বিকেলে ছাদে গিয়ে তার নিজের মুখে শুনলাম কী ঘটেছে। অনেকটা শরৎচন্দ্রের গল্পের বালক রামের মতোই ব্যাপার; রাগে-অভিমানে গৃহত্যাগ এবং পরে প্রত্যাবর্তন। তবে এ ক্ষেত্রে বউদি নয়, কাজ করেছেন একেবারেই অপরিচিত এক অবাঙালি রিকশাওয়ালা। ছোট ভাইটি এতই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন যে, ঠিক করেছেন চাকরি তো আর করবেনই না, ওই শহরেই থাকবেন না, চলে যাবেন গ্রামের বাড়িতে। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রিকশায় চেপে রওনা দিয়েছিলেন শিয়ালদহ স্টেশন অভিমুখে। রিকশাওয়ালা তার আরোহীর অস্থিরতা ও বিষণ্নতা দেখে জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘ব্যাপার কী, আপনাকে অত বিপন্ন মনে হচ্ছে কেন, শিয়ালদহ যাবারই বা কারণ কী?’ সহানুভুতিশীল শ্রোতার সাক্ষাৎ পেয়ে আরোহীটি নিজের মনের দুঃখের কথা খুলে বলেছেন। রিকশাওয়ালা তখন তার রিকশাটানা থামিয়ে আরোহীকে বুঝিয়েছেন, অমনটা করতে নেই, করলে দুই পক্ষের কারোই কোনো লাভ হবে না; তবে ওই আকালের কালে ক্ষতি হবে দুজনেরই। আরোহীর চিত্তও ততক্ষণে কিছুটা শান্ত হয়েছে, গ্রামে গিয়ে কী করবেন সেটা ভেবেছেন, এবং রিকশাওয়ালার পরামর্শ মেনে অনুরোধ করেছেন তাকে ফেরত নিয়ে যেতে। গৃহে প্রত্যাবর্তনে কান্নাকাটির কোনো দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল বলে না শুনলেও বিপর্যয় এড়ানো গেছে জেনে আমারও খুব ভালো লেগেছিল। এবং বক্তা ও শ্রোতা উভয়েই সংবেদনশীল রিকশাওয়ালাটির মতো মানুষ আছে বলেই জগৎটা যে কোনোমতে টিকে রয়েছে সে জ্ঞানে সেদিন সমৃদ্ধ হয়েছিলাম।
রাজশাহীতে আত্মীয়স্বজন বলতে একটি মাত্র পরিবারই ছিল। স্থানীয় নয়, আমাদের বিক্রমপুরেরই, এবং মায়ের দিক থেকে সম্পর্কিতও বটে। আনওয়ারুল হক চৌধুরী ছিলেন পুলিশের ইন্সপেক্টর; সস্ত্রীক তিনি থাকতেন ওই শহরেই। তার মেজোভাই আজহারুল হক চৌধুরী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনমিক্স পড়েন, থাকতেন ফজলুল হক হলে। ছুটিতে একবার বড় ভাইয়ের বাসায় এসেছিলেন বেড়াতে। তার কাছেই দেখেছিলাম ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদের বার্ষিকীর একটি কপি; আমার আগ্রহ দেখে যেটি তিনি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। বুঝি বা না বুঝি পত্রিকাটি আমার খুব ভালো লেগেছিল। কৌভূহল জেগেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন সম্পর্কে। রাজশাহীতে আনওয়ারুল হক চৌধুরীরা ছাড়া অন্য অনেকের সঙ্গে জানাশোনা থাকলেও আত্মীয় বলতে কেউ ছিলেন না; আনওয়ার ভাইদেরও স্বামী-স্ত্রী দুজনের সংসার; তাদের কোনো সন্তান তখনো জন্মগ্রহণ করেনি। কিন্তু বাংলার রাজধানী কলকাতা শহর ছিল আত্মীয়স্বজনে ঠাসা। যে বিক্রমপুরকে বিক্রমপুরে পাওয়া যায়নি, কী আশ্চর্য, সেটি উপস্থিত ওই কলকাতায়। সেটা ছিল মস্ত বড় এক প্রাপ্তি। তাছাড়া গড়ের মাঠ, গঙ্গা নদী, এসপ্ল্যানেড, ধর্মতলা, অনেক সিনেমা হল, চিড়িয়াখানা, এসব তো ছিলই।
খিদিরপুরে আমাদের বসবাসের রাস্তার নাম ছিল ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিট। ওয়াট হয়তো ওয়াটারের অপভ্রংশ, কেননা রাস্তাটি ছিল গঙ্গা নদীর একটি স্টিমার ঘাটের পাশেই। সে কারণে আশপাশে পূর্ববঙ্গের বেশ কিছু নৌ-কর্মচারী বসবাস করতেন। ওই রাস্তাতেই যে মাইকেল মধুসূদন দত্তের পৈতৃক গৃহ ছিল সেটা জেনেছি অনেক দিন পরে, মাত্র কয়েক বছর আগে, যখন আমরা তিন ভাই কলকাতায় গিয়েছিলাম বইমেলা উপলক্ষে এবং স্বভাবতই অনুসন্ধানে বের হয়েছিলাম আমাদের পুরোনো বাসস্থানের। তখনই দেখলাম ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটের নতুন নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্ট্রিট। মধুসূদন দত্ত ইংরেজি ভাষার কবি হতে গিয়ে বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের একজন হয়ে উঠেছিলেন। তাদের বসবাসের ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটেও দেখলাম চরিত্র বদলে পুরোপুরি বাঙালিপাড়া হয়ে গেছে। আমাদের সময়ে ওখানে উর্দু (হিন্দুস্থানী) ভাষীরাও ছিলেন, এবার মনে হলো সবাই বাংলাভাষী। শুধু তাই নয়, বড় একটি বাড়ির সামনের প্রশস্ত আঙিনায় দেখলাম কয়েকজনে একটি মঞ্চ তৈরির কাজে ব্যস্ত। আমরা তাদের কাছে আমাদের পুরাতন বসবাসের বাড়িটি কোন দিকে হতে পারে জিজ্ঞাসা করায় তারা কৌতূহলী হলেন আমাদের পরিচয় জানতে। বাংলাদেশ থেকে এসেছি এবং এক সময়ে ওই রাস্তায় আমাদের আবাস ছিল জেনে তারা খুবই প্রীত হলেন, এবং জানালেন যে, ওই বাড়িটি ছিল কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেটিতে এখন একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করা হয়েছে, পরিচালনা করে স্থানীয় একটি সমিতি, তাদেরই উদ্যোগে রবিবারের ওই সন্ধ্যায় নাটক মঞ্চস্থ হবে, যার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একাধিক কণ্ঠে তারা জানালেন যে, কেবল হেমচন্দ্র ও মধুসূদন নয়, বাংলা মহাকাব্যের অপর এক রচয়িতা রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাস করতেন ওই এলাকাতেই। বোঝা গেল তিন মহাকবির প্রতিবেশী হওয়ার কারণে তারা বেশ গর্বিত। ভদ্রলোকেরা আমাদের নাটক দেখার এবং পাঠাগারটি ঘুরে দেখে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে আমন্ত্রণ অত্যন্ত আন্তরিক ছিল। আমরা আমাদের পরিচিত পুরোনো এলাকাটা দেখলাম; রাস্তার নাম বদলেছে, কিন্তু বস্তুগত উন্নতি তেমন ঘটেনি। তার কারণ হয়তো সেটি বাঙালিদের পাড়া। আমাদের হাতে সময় ছিল না, তাই ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল। কিন্তু তাদের একজন দেখলাম সাইকেলে চেপে আমাদের ভাড়া করা ট্যাক্সির আগে আগে গিয়ে যে জায়গাটাতে আমরা একসময়ে থাকতাম সেটা দেখিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছেন। কেবল তাই নয়, বইমেলায় পরের দিন আমার লেখা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি বইটির কলকাতা সংস্করণের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠানে দেখলাম তিনি এসেছেন। খুব ভালো লাগল। কলকাতা যে এখন আর বাঙালিদের শহর নেই, সেটা জানতাম, কিন্তু পাড়ায়-মহল্লায় বাঙালি সংস্কৃতির চর্চার চেষ্টা যে আছে তার পরিচয় পেয়ে আমরা অত্যন্ত উৎসাহিত বোধ করেছিলাম। সেবার আমরা যে তিন ভাই বইমেলার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম; তাদের দুজন এখন আর নেই। আমার ছোট মেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষকতা করে, সেও সঙ্গে ছিল; এবং ছিলেন নতুন দিগন্ত পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক মযহারুল ইসলাম বাবলা। ব্যবস্থাপক তিনিই। কবি হাসান ফখরী তখন কলকাতায়, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনিও এসেছিলেন।
কলকাতায় ছেচল্লিশে আমরা যখন আসি ততদিনে আমাদের ছোট মামা ম্যাট্রিক পাস করে চাকরি নিয়েছেন। তিনি তো আমাদের পরিবারেরই অংশ ছিলেন, এবার আরও ঘনিষ্ঠ হলেন। আব্বার চাচাতো বোনদের বড় দুজন তখন কলকাতায় থাকেন। বড় বোনের বাসা মির্জাপুর এলাকায়, তার দুই ছেলে আমাদের প্রায় সমবয়সী; মেজো বোনের স্বামী কলকাতা পুলিশে কাজ করেন, তার ছেলে মুজিব আর আমি একই ক্লাসে পড়ি; তারাও বাসা নিয়েছিলেন ওয়াটগঞ্জ স্ট্রিটের কাছেই। ওয়াটগঞ্জ থানার ওসি থাকতেন থানা-ভবনের দোতলায়; তিনিও আমাদের বিক্রমপুরেরই লোক, আব্বার চেনা। সম্পর্কে আব্বার ভাগ্নে দন্ত্যচিকিৎসক ডা. সারোয়ার; তার সার্জারি তখন খিদিরপুর এলাকাতেই। সার্জারিতে রোগীর কোনো অভাব ঘটত না। এদেরই এক ভাই এসপ্ল্যানেড এলাকায় টেইলরিং শপ খুলেছেন; নিজে তিনি মাপজোক নিয়ে কাপড়ে নকশা করে দেন, কাপড় কাটা, সেলাই করা ইত্যাদি কাজ করেন অন্য কারিগররা। তাকে দেখা যায় জ্যাকেট ও প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দোকানের সামনের এক টেবিলের অপর পাশে দাঁড়িয়ে কাপড়ের ওপর মার্কার দিয়ে নকশা এঁকে দিচ্ছেন, অঙ্কন শিল্পীর মতো করে। তার দোকানের নাম স্টাইল ক্র্যাফট। গ্রাহকরা সবাই উচ্চবিত্ত। আমার মায়ের নিকটাত্মীয়দের একটি পরিবার থাকেন কলিন্স স্ট্রিটের কাছে মার্কুইস লেনে; উত্তরাধিকার সূত্রে ওটি তাদের বসতবাড়ি। এতসব আত্মীয়দের সঙ্গে গ্রামে বা রাজশাহীতে দেখাসাক্ষাৎ হওয়া সম্ভব ছিল না; কলকাতা আমাদের জন্য অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছিল। মোটকথা, কলকাতা যেমন হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের, তেমনি আমরা যারা পূর্ববঙ্গীয় তাদেরও। নোয়াখালীর বেশ কিছু লোক থাকতেন খিদিরপুরে। তারা জাহাজ কোম্পানির কর্মী ছিলেন। পথেঘাটে, দোকানপাটে এদের উপস্থিতি টের পাওয়া যেত। বাঙাল ঘটির পৃথকীকরণটা তখন আর কার্যকর নয়।
বড় বাসা ছেড়ে ছোট একটিতে বসবাস শুরু করে আমার মা প্রথমে কিছুটা অসন্তুষ্টই ছিলেন। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের আনাগোনায় অচিরেই তিনি সন্তোষ প্রকাশ করছেন, দেখা গেল। পাশেই থাকতেন হাজি সাহেবের পরিবার। বাড়িটা ছিল ওয়াক্ফ সম্পত্তি, হাজি সাহেব দেখাশোনা করতেন। ওরা ছিলেন কলকাতাওয়ালা, কিন্তু ওই পরিবারের সঙ্গেও আমার মায়ের আসা-যাওয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
আর বাড়ির দোতলায় যে দুটি পরিবার থাকত তারা তো কাছের মানুষেই পরিণত হয়েছিলেন। নরসিংদীর যিনি, দুই ভাইয়ের বড়জন, তিনি আব্বার সহকর্মীও ছিলেন, অফিসে। বস্তুত তারা দুজনে মিলেই বাড়িটা খুঁজে বের করেছিলেন। দেশভাগের পরে ঢাকায় এসে দুই পরিবারে যোগাযোগ ছিল। তৃতীয় পরিবারটির সঙ্গে যে আমার মায়ের সখ্য ছিল তার সাক্ষ্য পাওয়া গিয়েছিল অনেক বছর পরের এক ঘটনায়। তা দশ-বারো বছর আগের ব্যাপার হবে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে আমাকে দেখে তিন নম্বর পরিবারের একসময়ের-প্রধান মহিলার কেন জানি মনে হয়েছিল আমাকে তিনি আমার বালককালে দেখছেন। তার মেয়েকে তিনি বলেছিলেন খোঁজ করতে যে আমরা এক সময়ে খিদিরপুরে থাকতাম কি না। মেয়ের স্বামী ছিলেন খ্যাতনামা চারুশিল্পী, আমার পরিচিত; মহিলার পক্ষে আমাকে খুঁজে বের করা তাই কঠিন হয়নি। কথাটা আমার মাকে জানানোয় তিনি উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন দেখা করতে। কিন্তু তখন নিজে তিনি অসুস্থ, আর যিনি দেখা করতে চেয়েছিলেন সেই পূর্বপরিচিতাও চলাফেরা করতে পারেন না, তাই দেখা হয়নি। এর অল্প কয়েকদিন পরেই অবশ্য আমার মা মারা যান। তখনকার দিনে সম্পর্কগুলো ছিল এরকমেরই। উল্লেখ্য যে, কলকাতায় আমাদের বসবাস ছিল মাত্র সাত মাসের।
আব্বা তো মিশনারিদের স্কুলকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে ধারণা করতেন। রাজশাহীতে পাননি; কলকাতায় এসে পেয়ে গেলেন। তাই সেখানেই আমাকে ও আমার মেজো ভাইকে দিলেন ভর্তি করে। আমাকে ক্লাস এইটে, মেজো ভাইকে ক্লাস সিক্সে। স্কুলের নাম সেন্ট বার্নাবাস হাই স্কুল। পুরোনো স্কুল, এখনো আছে; সেবার যখন কলকাতায় যাই, ঘুরে দেখে এসেছি। স্কুলের দালানকোঠায় কোনো উন্নতি দেখলাম না। বরং আগের তুলনায় কিছুটা যেন ম্রিয়মাণ। কারণ ওই একই; বাঙালিপাড়ায় অবস্থান। এপাশে খিদিরপুর, ওপারে টালিগঞ্জ। আমাদের সময়ে বালিগঞ্জ থেকেও ছাত্র আসত, এখন মনে হয় আসে না। হেড মাস্টারের সঙ্গে কথা হলো। তিনি পুরোপুরি বাংলাভাষী। ক্যাথলিক মিশনারিদের স্কুল। আমাদের সময়ে রাজশাহীতে যেমন ছিল, কলকাতার স্কুলেও তেমনি, অধিকাংশ ছাত্রই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। শিক্ষকদের মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের কেউ ছিলেন বলে মনে হয় না। হেড মাস্টার ছিলেন জাঁদরেল, তবে গোষ্ঠবিহারী মজুমদারের মতো স্থির নন; বেশ চঞ্চল। বাঙালিই, কিন্তু কথা বলতেন ইংরেজিতে। খ্রিষ্টান মিশনারিদের পোশাক পরতেন। পাঠ্যসূচি সব স্কুলে ছিল একই রকমের। সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের মনোনীত পাঠ্যবই-ই পড়তে হতো, যেমন পড়তাম রাজশাহীতে। তবে নতুন স্কুলে ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্যে ছিল বাইবেল-পাঠ।
আমরা তো ভর্তি হয়েছিলাম ছেচল্লিশের দাঙ্গার পরে, আর সাতচল্লিশের আগস্টে কলকাতা ছাড়তে হলো। স্কুলের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না; তবে বাইরে দাঙ্গার রেশ তখনো বিদ্যমান। ক্লাস শেষে হিন্দু-মুসলমান ছাত্র আমরা একসঙ্গেই বের হতাম। পথিমধ্যে হিন্দুপাড়া ও মুসলমানপাড়া পড়ত, সেখানে আমরা বিভক্ত হয়ে যেতাম। বঙ্গভূমি যে আর অখণ্ড থাকবে না হয়তো তারই পূর্বভাসের মোকাবিলা করতে হতো। গল্প শুনেছিলাম রায়টের সময়ে এক হিন্দু ছাত্র ভীষণ বিপদে পড়েছিল, ভুল করে মুসলমানপাড়ায় ঢুকে পড়ে; কিন্তু তাকে বাঁচিয়েছিলেন এক মাংস-বিক্রেতা, তিনি দৌড়ে ছুটে এসে বলেছিলেন, ‘স্কুলকা লাড়কা, ছোড় দো।’ আসলে ভালো মানুষের সংখ্যাই ছিল অধিক, সাম্প্রদায়িক হিংস্রতাটা সৃষ্টি করেছিল মতলববাজ লোকেরা।
দাঙ্গার আগে কলকাতায় ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক সব মিছিল হয়েছে যাতে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ অংশ নিয়েছেন; হতাহতও হয়েছেন, একসঙ্গে। রশীদ আলী দিবসের মিছিল ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। ডাক ও তার বিভাগের কর্মচারীরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে ধর্মঘট করেছেন কিছুদিনব্যাপী। নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এসব ঘটনা আমরা কলকাতায় আসার আগেই ঘটেছে; কিন্তু প্রভাবটা পরেও পাওয়া যাচ্ছিল। মাসব্যাপী ট্রাম ধর্মঘট ততদিন শেষ হয়েছে, কিন্তু ধর্মঘটের সময়ে ট্রাম গাড়ির সামনে কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকাকে মাঝখানে রেখে কংগ্রেস ও লীগের যে তিনটি পতাকা ওঠানো হয়েছিল ধর্মঘট শেষ হওয়ার পরেও তাদের উড়তে দেখেছি।
ভালো কথা, ট্রামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে নতুন ক্লাসের পাঠ্যবই কিনতে গিয়ে। রাজশাহীতে যেমন নিয়ম দাঁড়িয়েছিল প্রমোশনের দিন বিকেলেই সাহেববাজারের বইপাড়ায় গিয়ে বই কেনা হবে, কলকাতাতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আব্বার সঙ্গে ট্রামে চেপে আমরা দুভাই কলেজ স্ট্রিটে গেছি, বই কিনেছি মহানন্দে, কিন্তু ফেরার পথে ধর্মতলায় নামার সময় আমি পড়েছিলাম পিছিয়ে, নামতে যাব এমনি সময় ট্রাম দিয়েছে ছেড়ে। উঁচু গলায় আব্বা বললেন পরের স্টপেজে গিয়ে নামতে। তাই করেছিলাম এবং আব্বা শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে নামার সময় সামনের দিকে মুখ করে নামতে হবে। সামনে চলা চাই, পেছনমুখো হলে বিপদ, চলার ওই দিকনির্দেশটা প্রতীকী অর্থেও সত্য বটে।
ট্রামের প্রত্যেকটি স্টেশনে খবরের কাগজ পত্রপত্রিকার একটা স্টল থাকত। সেখানে বইও পাওয়া যেত। আমরা আজাদ পত্রিকা পড়তাম, মুসলমান পাঠকদের জন্য সেটাই ছিল তখনকার ধারা। আজাদ মওলানা আকরম খাঁর পত্রিকা; তিনি রক্ষণশীল; ওই পত্রিকার বিপরীতে দৈনিক ইত্তেহাদ বের হয়েছিল, সোহরাওয়ার্দী সাহেবদের মুখপাত্র হয়ে। সে পত্রিকার ছোটদের পাতা সম্পাদনা করতেন কবি আহসান হাবীব; ওই পাতায় আমি লেখা পাঠাব এমন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সেজন্য প্রত্যেক রবিবার ট্রাম স্টেশনে গিয়ে এক কপি কিনে আনতাম। কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা স্বাধীনতা কে যেন একবার বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। মনে আছে আব্বা মন্তব্য করেছিলেন, ‘আসল স্বাধীনতার কথা কিন্তু ওই পত্রিকাই বলে’। তবে একসঙ্গে দুটি পত্রিকার গ্রাহক হওয়ার জন্য উপযুক্ত সাংস্কৃতিক মানসিকতা ও আর্থিক সঙ্গতি কোনোটাই আমাদের তখন ছিল না।
খিদিরপুরপাড়ায় দুটি সিনেমা হল ছিল, কোনোটিতেই একবারের অধিক সিনেমা দেখা হয়নি। তবে আসল সিনেমাপাড়া ছিল ধর্মতলাতেই। নামকরা ছিল মেট্রো ও লাইট হাউস। লাইট হাউসে ‘কিসমত’ নামে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী চলছিল। ছবিটি হিন্দি, তবে নায়ক ছিলেন বাঙালি অশোককুমার। সে সময়ে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা। ছবিটি একটানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। তার কারণ যে কেবল অশোককুমার ও তার বিপরীতে লীলা চিটনিসের অনবদ্য অভিনয় তা নয়, মূল কারণ ছিল একটি গান, সেটি এরকমের, ‘দূর হটো, দূর হটো সব দুনিয়াওয়ালে হিন্দুস্থান হামারা হায়’। স্বাধীনতার জাতীয়তাবাদী ওই সংগীত দর্শক টানত; অনেকেই একাধিকবার দেখেছেন, আমি অবশ্য একবারই দেখেছি, হয়তো আমার বন্ধু ও আত্মীয় মুজিবের সঙ্গে। সুভাষ বসু তখন নেই, কিন্তু মনে হতো আজাদ হিন্দ ফৌজের কণ্ঠস্বর চলচ্চিত্রের ওই গানে চলে এসেছে।
বন্ধু মুজিবের প্রসঙ্গ আগেই এসেছে। তার বাবা, অর্থাৎ আমাদের ফুপা, বদলি হয়ে এসেছিলেন টালিগঞ্জে, কোর্ট ইন্সপেক্টর হিসেবে। তারা বাসা নিলেন আমাদের বাসার কাছেই। মুজিবও ভর্তি হলো সেন্ট বার্নাবাস স্কুলেই, এবং একই ক্লাসে। ফলে দুজনের বন্ধুত্বটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। সেটা অক্ষুণ্ন ছিল তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মুজিব মারা যায় ২০১১ সালে। তার মৃত্যু আমাকে অত্যন্ত গভীরভাবে আঘাত করেছে।
কলকাতায় থাকার সময়ে আমাদের দুজনকে এক ধরনের খেলায় পেয়েছিল। সেটা হলো বাংলা অর্থসহ কতটা ইংরেজি শব্দ বলতে পারি তার প্রতিযোগিতা। মুজিবরা থাকত দোতলা বাড়ির দোতলায়; অনেকদিনই আমরা বিকেলে তাদের বাসার ছাদে হাঁটতে হাঁটতে শব্দ নিয়ে ওই প্রতিযোগিতার খেলাটা উপভোগ করেছি। বলাবাহুল্য, উপকৃতও হয়েছি। আব্বা খুব খুশি হতেন এ খেলাটা জমছে দেখে। সে সময়ে নেসফিল্ডের ইংলিশ গ্রামার ছিল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যাকরণ বই। স্কুলে পাঠ্য ছিল, আব্বা আমাকে উৎসাহিত করতেন গ্রামার বই থেকে প্রিপজিশনের ব্যবহার মুখস্ত করতে। বলতেন, কাজে দেবে। এ ব্যাপারে তার ধারণা নির্ভুল ছিল; প্রিপজিশনের ব্যবহার আমাকে তখন তো অবশ্যই, অনেক পরেও, এমনকি এখনো জ্বালাতন করে।
রাত করে বাসায় ফিরলে উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করেছি। ওই উদ্বেগ আমাকেও একদিন ভীষণ রকম কাতর করেছিল। আব্বা অফিস থেকে ফেরার পথে কোনো কোনো দিন বাজার থেকে সওদাপাতি কিনে আনতেন, তখন ফিরতে কিছুটা দেরি হতো। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত এসে গেছে তবু আব্বা বাসায় ফেরেননি। কারণ কী? তিনি কী কোনো বিপদে পড়লেন? না জেনে হিন্দুপাড়ায় গিয়ে পড়েছেন কী? রাজশাহীতে আব্বাকে দেখেছি অফিসের অন্যসব বাবুদের মতোই ধুতি পরে অফিসে যেতে। কলকাতায় এসে তিনি পোশাক বদলে ফেলেছিলেন। ঠিক পাজামা নয়, আবার ট্রাউজার্সও নয়, নাম দিয়েছিলেন প্যান্ট-পাজামা; পাজামাই তবে দুদিকে দুই পকেট; তার ওপরে শার্ট। হিন্দু না মুসলমান, একনজরে যাতে চেনা না যায় তার ব্যবস্থা। হিন্দুপাড়া দিয়ে গেলে মনে হবে হিন্দু বটে; মুসলমানপাড়া দিয়ে যাওয়ার সময় ধারণা হবে মুসলমানই তো, পাজামা পরেছে। যা হোক, রাত হয়ে যাচ্ছে আব্বা তবু ফিরছেন না, এতে আমার ভেতর ভীষণ অস্থিরতা শুরু হলো। মা কিছু বলছেন না; ব্যস্ত রয়েছেন এটা-সেটায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনিও যে উদ্বিগ্ন সেটা আমি টের পাচ্ছি। মাকে কিছু না বলে আমি বের হয়ে পড়েছিলাম ট্রাম স্টেশনের উদ্দেশে। মা কিছু জিজ্ঞাসা করেননি, তার দশ-এগারো বছরের ছেলে আমি সন্ধ্যার পরে একাকী কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি জানতে চাননি, তবে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কোন দিকে এবং কেন যাচ্ছি। যাচ্ছি রাস্তায় গিয়ে অপেক্ষা করতেই। আমার মায়ের সঙ্গে অনুভূতির নীরব কথোপকথন পরে আরও অনেক সময়ে ঘটেছে; কিন্তু এটাই ছিল সর্বপ্রথম। আমি ট্রাম স্টেশন পর্যন্ত চলে গেছি। দেখছি আব্বা নামেন কি না। ট্রাম আসছে, ট্রাম যাচ্ছে, আব্বার দেখা নেই। আমি ঘোরাফেরা করছি আশপাশে। এমন সময় মুজিবের হঠাৎ আবির্ভাব। সে ফিরছে তাদের বাসায়। তার মা হয়তো তাকে দোকানে পাঠিয়েছিলেন কিছু কিনতে। আমার ফুপুরা চারজনই খুব জাঁদরেল ছিলেন। আমাকে অকারণে ওইখানে দেখে পিঠে থাপ্পড় দিয়ে মুজিব বলল, ‘কী রে, এখানে কীসের ঘোরাঘুরি?’ আমি তাকে আমার উদ্বেগের বিষয়টা বলতে পারলাম না; এবং বাধ্য হলাম তার সঙ্গে বাসার দিকে রওনা হতে। আব্বা ফিরলেন আমার ফেরারও পরে। তখন সবার একই প্রশ্ন, ‘কী হয়েছিল’? অপরাধীর মতো হেসে আব্বা বললেন, ‘কলিন্স স্ট্রিটে এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। সে তার বাসায় নিয়ে গেল। আমার ভুল হয়েছে।’ আব্বার সেই ম্লান হাসিটা অনেককাল আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। আগে কখনো তাকে অপরাধীর মতো ওভাবে হাসতে দেখিনি; পরে দেখেছি হয়তো, কিন্তু সেদিনকার মতো নয়। তিনি বুঝেছিলেন আমরা কতটা উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করেছি। ছেচল্লিশের রায়ট কলকাতার মানুষকে অমনভাবেই সন্ত্রস্ত রাখত। আর আমি নিজে উদ্বিগ্ন বহুবার বহুভাবে হয়েছি, কিন্তু ওই প্রথমবারের মতো আর কখনো নয়।
সাতচল্লিশের অস্বাভাবিতার মধ্যেও আমরা অবশ্য স্বাভাবিক জীবনই যাপন করেছি। আমার মা বাসা তৈরি করতে পারতেন বাবুই পাখির দক্ষতায়। কলকাতার বাসায় এসে তিনি কিছুটা হতাশই হয়েছিলন; কিন্তু দমে যাননি। গুছিয়ে বসেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন আসতেন। তিনি নিজেও যেতেন কখনো কখনো। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। এমনকি রাজশাহী থেকেও হায়াত আলী শেখ একবার এসে ঘুরে গেছেন।
আমরা দুভাইও খুশিই ছিলাম। মনে পড়ে নতুন শহরে আসার একেবারে প্রথম দিকেই গঙ্গার ধার ধরে আমরা মির্জাপুর স্ট্রিটের খোঁজে বের হয়ে পড়েছিলাম। সেখানে আব্বার চাচাতো বোনদের সবচেয়ে বড় যিনি তিনি থাকতেন। ফুপার চাকরি ছিল স্ট্রিমার কোম্পানিতে। মির্জাপুর পাড়াটা ছিল বই বাঁধাইয়ের। ছাপাখানাও ছিল কয়েকটি ছোটখাটো, তবে বই বাঁধাই ছিল বিরাট ব্যাপার। ওই কাজে মানিকগঞ্জের অনেক মানুষ তখন নিযুক্ত ছিলেন। তারা আশপাশেই বসবাস করতেন। ফুপুরা যে দোতলায় থাকতেন তার নিচতলাতেও কয়েকটি পরিবার থাকত, দেশভাগ নিশ্চয়ই এদের ভীষণ বিপদে ফেলেছিল। অচেনা শহরে সদ্য-আগত আমরা দুই কিশোর ফুপুর বাসা খুঁজে বের করে, সেখানে গিয়ে আচমকা হাজির হয়েছি দেখে তিনি যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি বিস্মিতও হয়েছেন আমাদের ‘সাহস’ দেখে। আমাদের কিন্তু কোনো অসুবিধা হয়নি; মির্জাপুর স্ট্রিট এবং তাদের বাসা খুঁজে পেতে। ফুপুর দুই ছেলে আমার প্রায় সমবয়সী। ওরা অবশ্য তখন বাসায় ছিল না।
কলকাতায় তো আমরা মোটামুটি গুছিয়ে বসেছি; দেশ স্বাধীন হবে এমনই আশা, তাতে আমাদের সুবিধা হবে এটাও নিশ্চিত। কারণ আব্বার চাকরি কলকাতার হেড অফিসে, সেখান থেকে বদলি হয়ে মফস্বলে যে যাবেন এমন শঙ্কা নেই। স্কুলের হিন্দু সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কারও কারও সঙ্গে বন্ধুত্বও গড়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিযোগিতার জন্যও প্রস্তুত হচ্ছি। ম্যাট্রিক শেষ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হব এ রকমের ধারণা।
এর মধ্যেই যেটা ছিল কল্পনারও বাইরে, তার ঘোষণা এল। দেশ ভাগ হয়ে যাবে হিন্দুস্থান-পাকিস্তানে- জুনের ৩ তারিখে রেডিওতে শোনা গেল ওই কথা। ‘স্বাধীনতার’ ওই ঘটনার বাস্তবিক ফলটা কী দাঁড়াবে সে সম্বন্ধে আমরা ছোটরা তো নয়ই, আমাদের অভিভাবকরাও কিছুই ভাবতে পারছিলেন না। তারা হতবাক হয়ে গেছিলেন। দাঙ্গা দেখেছেন, এবার না জানি কী দেখতে হবে- এই বুঝি ছিল তাদের প্রশ্ন। কে কোথায় ছিটকে পড়বেন কে জানে?
চলবে...