আমি তখন নবম বা দশম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের ‘লজিং টিচার’ কলেজে পড়েন। একদিন তিনি জানালেন তাদের কলেজে একটি অনুষ্ঠান হবে, এতে যোগ দেবেন দেশের একজন বিখ্যাত কবি। আমার মন খুব চাইছে কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে।
মাথার মধ্যে লেখালেখির পোকা নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করে। কাকপক্ষীও যেন টের না পায়, গোপনে কাগজকলম নিয়ে বসি। লিখি। কী লিখি জানি না। একজন বিখ্যাত কবিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। ‘লজিং সার’কে খুব করে ধরলাম। সার রাজি–তার সঙ্গে অনুষ্ঠানে যাব। কিন্তু বাবার অনুমতি লাগবে। আমার বাবা কড়া মানুষ। এমনিতে কোথাও যেতে দেন না। কিন্তু আমার এ আবদারে রজি হলেন। আমার সে কী আনন্দ!
হলভর্তি লোক। ছাত্রছারা তো আছেই। অভিভাবক, স্থানীয় গন্যমান্য অনেকেই উপস্থিত। ভাগ্য ভালো, মঞ্চের কাছাকাছি বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। অনুষ্ঠানের মধ্যমণি দেশের বিখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান। মুখে চাপদাড়ি, পোশাকে পরিপাটি। তিনি যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, পুরো হল নীরব। তিনি দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করলেন। কঠিন কঠিন বিষয়। তার অনেক কথাই মাথায় ঢোকেনি। ঢোকার কথাও নয়। তার বাচনভঙ্গি খুবই আকর্ষণীয়। বুঝি আর না বুঝি শুনতে ভালো লাগছে। আমার মুগ্ধতা–সামনাসামনি একজন কবিকে দেখছি। খেয়াল করলাম, তিনি দুটি চশমা ব্যবহার করছেন। একটা খুলে আর একটা পরছেন, সেটাও বদলাচ্ছেন। কারণ কী! অনেক পরে জেনেছি, কাছে এবং দূরে দেখার জন্য আলাদা চশমা দরকার হয়।
দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে কবি নিজের লেখা কবিতা শোনালেন। এই প্রথম মনে একটা খটকা লাগল, এটা আবার কেমন কবিতা!? পাঠ্যবইয়ে যে কবিতা পড়ি, এটা তো সেরকম না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল–এদের কবিতা পড়লে বা শুনলে মনে কেমন দোলা লাগে, এই কবির কবিতায় তেমন দোলা নেই।
যাই হোক, কবিতা বুঝতে না পারলেও কবিকে ভালো লেগেছে। সব থেকে বড় কথা একজন কবিকে জীবনে প্রথম সামনাসামনি দেখা! কবি সেদিন যে কবিতাটি পড়েছিলেন, নাম ‘আমার পূর্ব বাংলা’।
পরবর্তীত, কলেজের পাঠ্যসূচিতে সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। পড়তে হয়েছে, ক্লাসে এটা নিয়ে স্যারের বক্তৃতা শুনতে হয়েছে, পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে হয়েছে। আগে আমাদের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায় ছিল ছন্দমিলের কবিতা। আগেই উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীনের কবিতায় চরণান্তে ‘মিল’-এর বিষয়টি। প্রথম দেখলাম চরণান্তে মিল নেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায়। ক্লাসে স্যার বললেন, এটা অমিত্রাক্ষর ছন্দ। শিখলাম চরণান্তের মিল ছাড়াও কবিতা হয়। স্যার আরও বললেন, মাইকেলের প্রায় কবিতাই ১৪ মাত্রার চরণে লেখা। ১৪ মাত্রা মানে ১৪টি অক্ষর। গুনে গুনে দেখলাম, তাই তো! প্রতি চরণে ১৪টি অক্ষরই তো আছে। স্যার মাত্রা ও পর্ব সম্বন্ধেও বললেন। ১৪ অক্ষর মানে ১৪ মাত্রা। এই ১৪ মাত্রার চরণ আবার দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে ৮ মাত্রা, পরের ভাগে ৬ মাত্রা, এই হলো ১৪। শিখলাম মাত্রা আর পর্ব।
এই সামান্য জ্ঞান নিয়ে সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতাটি দেখার চেষ্টা করলাম। কবিতাটি এরকম–
আমার পূর্ব বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ,
অন্ধকারের তমাল
অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়,
একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ।
সন্ধ্যার উন্মেষের মতে
সরোবরে অতলের মতো
কালো-কেশ সঞ্চয়ের মতো
বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি
আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারে অনুরাগ
ঘুমের অলসতায় চোখ বুঁজে আসার মতো শান্তি
হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া স্নিগ্ধ নীলাম্বরী
(অংশবিশেষ)
কবিতার বিষয় দেশানুরাগ। গভীর মুগ্ধ অনুভবে দেশকে দেখা। গদ্য-ছন্দে লেখা। অন্তমিল তো নেই-ই, নেই মাত্রা ও পর্ব-সমতা। আঁটোসাঁটোভাবে কাব্যালংকার না মেনেও যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হতে পারে, সৈয়দ আলী আহসানের ‘আমার পূর্ব বাংলা’ এর একটি উদাহরণ।
দুই.
লেখালেখির এই জীবনে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কারও সঙ্গে কালেভদ্রে, কারও সঙ্গে মাঝেমাঝে, কারও সঙ্গে প্রায় নিত্য দেখাসাক্ষাৎ হয়। সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল মাঝেমাঝে, প্রয়োজনে। কেউ কেউ যেমন করেন, বয়সের দেওয়াল তুলে অনুজদের একটু দূরেই রাখেন। সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষ। অনুজদের তিনি সহজ আনন্দে গ্রহণ করতেন।
একবার হলো কী, আমি রেডিওতে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম। শাহবাগ তখন রেডিওর প্রধান কেন্দ্র। উপস্থিত হয়ে দেখি আমি যাদের সঙ্গে কবিতা পড়ব, তারা সবাই দেশের খ্যাতিমান কবি, আমি একমাত্র কবিযশঃপ্রার্থী তরুণ। এক-দুজন তো তাচ্ছিল্য করল। আমি মেনে নিয়েছি। কারও কারও খ্যাতির অহংকার তো থাকতেই পারে। রেওয়াজ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সৈয়দ আলী আহসান সেদিন আমার লেখার মৃদু প্রশংসাই করেছিলেন।
বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ আলী আহসানের গ্রন্থসংখ্যা অনেক। শুধু সংখ্যা বিচারে নয়, বিষয়-বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। এর মধ্যে একটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করছি। বইটির নাম ‘প্রেম যেখানে সর্বস্ব’। উল্লেখ করার কারণ, এই বইটির আমি ‘আঁতুড়-সাক্ষী’।
আমি তখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় যুক্ত। ওই কাগজে সৈয়দ আলী আহসানের আনেক লেখা ছাপা হয়েছে। যখনই চেয়েছি, সৈয়দ আলী আহসান লেখা দিয়েছেন। তবে লেখাটি তৈরি হতো ‘শ্রুতিলিখন’ পদ্ধতিতে।
‘প্রেম যখানে সর্বস্ব’ একটি সংকলন গ্রন্থ। এই সংকলন গ্রন্থের প্রায় সবকটি লেখারই আমি ছিলাম ‘শ্রুতি লেখক’। নির্দিষ্ট সময়ে যেতাম সৈয়দ আলী আহসানের কলাবাগান এলাকার বাসায়। তিনি আগে থেকেই যেন প্রস্তুত থাকতেন। আমি খাতাকলম নিয়ে বসতাম। তিনি চোখ বুঁজে বলতেন–ধীর গতি, স্পষ্ট উচ্চারণ। হাতের কাছে কোনো ‘রেফারেন্স’ নেই। তিনি বলে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সব তথ্যই তার মুখস্থ। লেখার শেষ বাক্যটি বলে চোখ খুলতেন, বলতেন, চলবে তো? মননশীল আধুনিক কাব্যবোধ, চিত্রকলা, প্রেমানুভূতির বহুমাত্রিকতা ছিল লেখাগুলোর বিষয়। ফরাসি সাহিত্যের আনুপূর্বিক খুঁটিনাটি, শিল্পকলার বাহ্যিক সৌন্দর্য ও অন্তর-ঐশ্বর্য তার ওইসব লেখায় বিস্তৃত। চিত্রশিল্প বা ভাস্কর্য বিশ্লেষণে ‘নারী’ বিষয়টি সৈয়দ আলী আহসানের লেখায় বিস্তৃত নতুন মাত্রা পেত। বিশেষ করে নারীশরীরের সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য বর্ণনায় তার ভাষা-প্রাঞ্জলতায় শিল্পচেতনারূপ দ্যুতি ছড়াত।
অসংকোচেই বলি, শ্রুতিলেখক হিসেবে আমি বেশ আনন্দই পেতাম।