ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নেইমারকে ছাড়াই খেলবে ব্রাজিল সুন্দর পুরুষ টিভিতে আজকের খেলা কেমন হবে মুমিনের হজ-পরবর্তী জীবন জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়! ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিকআপের ধাক্কায় মা-ছেলেসহ নিহত ৩ বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও নির্বাচনের খরা কাটল মাসুদুজ্জামানের শান্তি নিদ্রা আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ পানির বোতল যে বই কেউ ছাপতে চায়নি সেই বইয়ের বুকার জয় ময়মনসিংহ মেডিকেলে হাম উপসর্গে ভর্তি আরও ১৯ শিশু বেড়েছে মুরগি, কাঁচা মরিচ-কাঁচা পেঁপের দাম বাতাসে যেন আগুনের হলকা, কষ্টে প্রাণিকুল তিন ক্যাটাগরিতে রিটেইল এশিয়া অ্যাওয়ার্ডস পেল এপেক্স ফুটওয়্যার গোপালগঞ্জে ইজিবাইকচাপায় স্কুলছাত্র নিহত দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও যাত্রীবাহী বাস পড়ল পদ্মা নদীতে চুয়াডাঙ্গায় পুত্রবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুর গ্রেপ্তার খুলনায় হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড় শাহরাস্তিতে ১৮ মামলার আসামি ‘সাদা আনোয়ার’ গ্রেপ্তার গোপালগঞ্জে দুই বাসের সংঘর্ষ, নিহত ২ ৬ ঘণ্টা পরে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম-সিলেটের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক কর্মস্থলে গরমে হাঁসফাঁস শাহরাস্তিতে শিশু ধর্ষণের অভিযোগ বৃদ্ধের বিরুদ্ধে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলে আসছে ত্রৈমাসিক ব্যবস্থা গোপালপুরে ২ নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে নেমেছে পুলিশ ভূঞাপুরে দুই গ্রামের সংঘর্ষে নিহত ১, মাইকিং করে ফের সংঘর্ষের ঘোষণা পর্যটন খাতে তাপের প্রভাব বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের খসড়া অনুমোদন
Nagad desktop

মৃত কবিতার নিষিদ্ধ প্রেম

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ১৫ মে ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
মৃত কবিতার নিষিদ্ধ প্রেম

রাত্রি যখন নগ্ন আকাশ জড়িয়ে মেঘের নিচে

অনন্ত নীল আলোর খোঁপায় ফুটায় চন্দ্র ফুল

অদৃশ্য এক স্বপ্নে তখন সমুদ্রে তার পিছে

প্রমত্ত জল উচ্ছ্বাসে ঢেউ নাচিয়ে হারায় কূল;

কূলহারা এক রক্তের নদী স্মৃতির উজান টানে

দিশেহারা স্রোতে কেন বহমান স্থবির মোহনা চরে?

চাঁদে কলঙ্কে ঘোর অমানিশা-আকাল কবিতা-গানে,

কেন এ প্রেমিক গৃহহারা হলো কবিতার প্রেমে পড়ে?

লুট হয়ে গেছে কবিতার বাড়ি, কবিতা এখন মৃত;

প্রয়োজন নেই শব্দে ছন্দে জীবনের ছবি আঁকা;

যেখানে বিশ্ব এখন নিঃস্ব, মানুষ যুদ্ধরত

সেখানে কী আর মানুষের হাতে কবিতা দেবীকে রাখা!

প্রতীক-প্রতিমা- উপমা যেখানে কয়েদি পাখির ডানা,

সেখানে আকাশে বোমারু খাঁচায় পাখির উড়িতে মানা।

গল্প সুন্দর পুরুষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
সুন্দর পুরুষ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

‘অ, মাও, শ্মশান থুইয়া..’
সত্যিই এবার বিগড়ে যায় মীনাক্ষীর গলা, মেয়ের প্রতি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওই মাইয়া, মড়া আছে শ্মশানে? বইয়া থাহুম।’
‘মনে অয় দ্যাশে মড়া কইমা গেছে।’ কথা শেষ করে হাসে সপ্তদশী মেয়ে শচী। অপ্রয়োজনীয় হাসি। এমন হাসির কোনো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মীনাক্ষীর রাগ হয়, ‘এ্যাই মাইয়া হাসনের কী হইল? রূপ খুলতাছে তর। মাইয়া, ঐ রূপের বড়াই তর বাপেও করতো।’ 
চুপ মারে রূপবতী শচী। শ্মশান ঘাটের পাশেই অপেক্ষায় ছিল মা আর মেয়ে। জগৎসংসারে মা ছাড়া কেউ নেই ওর। মাকে কষ্ট দেওয়া কী ঠিক! প্রশ্ন জাগে। নিস্তেজ গাং ধরে তাকায়। মনে মনে ভাবে একজন পুরুষকে তো মন দেওয়া হয়ে গেছে। তাকে মা কী মেনে নেবে–এমন প্রশ্নও শচীকে ভাবায়। চৈত্রেরকাল বলে গরমটা খুব তেজি ছিল। কিন্তু হঠাৎ ফুরফুরে হাওয়া আর মরারোদে আদুরে আদুরে হয়ে উঠল সেই রৌদ্রতেজ। এখানেই বাড়িঘর, ঠিকানা। বেড়ে উঠেছে মীনাক্ষীর একমাত্র মেয়ে শচীও। 
শবদেহ এলে শ্মশানপুরোহিতের ডাক পড়ে। শাস্ত্রীয় বিধান দেওয়া হয়। ভোর-সকালে এ বাড়িতে একটা চক্কর দেওয়া নিয়ম যেন তার। কখনো কখনো খবর দিতে হয়, রামচন্দ্র পুরোহিত আসেন, শাস্ত্রীয় আচারপালিত হয়। এরপর মৃতের সৎকার। নানা কাজকর্ম শেষে অর্থকড়ি মেলে। এদিয়েই সংসার চলে মীনাক্ষী আর শচীর। সপ্তাহ দুয়েক ধরে শবদেহ কম আসছে। আয়রুজি কম। ঘরে চাল-তেল নেই।
‘এমুনডা হইতাছে কী কারণে?’ পুরোহিত রামচন্দ্রের কাছে হেতু জানতে চেয়েছিল মীনাক্ষী। সঠিক জবাব নদিতে পারেননি উঠানে জলচৌকিতে বসা রামচন্দ্র। বিড়ি টানেন আর ধোঁয়া ছাড়েন ওপরের দিকে।
প্রসঙ্গ পাল্টায় মীনাক্ষী। পেছনের পাড়ায় রামচন্দ্রের ঘর। তার একমাত্র সন্তান অনন্ত। সবাই ডাকে ছোট ঠাকুর। অনন্তের ব্যাপারে রামচন্দ্রকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘দিনকাল যেমুন পড়ছে। নয়া নয়া অসুখ ধরা পড়তাছে। পোলাডা য্যান সাবধানে থাহে!’
‘আমার পোলা মানুষ হয় নাই, জানোয়ার হইছে। রেপ কেইসের মামলায় হে পয়লা নম্বর আসামি। আর আমি সর্বস্বান্ত।’ একটু থামেন রামচন্দ্র। খানিকটা গর্ব তার চোখমুখে। ‘হুনো, পোলা ছিল আগুনের গোল্লা। এসএসসি-ইন্টারমিডিয়েটে জিপিএ ফাইভ পাইছিল। ইস্কুলের মাস্টরেরা কইল সার্থক জনম আমার। হে নাকি ডাক্তর- এনজিনিয়ার অইব। ওহ্, মাই, হেই পোলা ডাক্তরি পরীক্ষায় চান্স পাইল না, এনজিনিয়ারিংয়ে না। বাড়িতে আইয়া খালি কান্দে।’ আবার থামেন রামচন্দ্র। ‘বিড়িটা নিইব্যা গ্যাছে। গ্যাসলাইট লগে নাই? দিয়াশলাই আছে?’
ঘর থেকে গ্যাসলাইটার এনে হাতে দেয় মীনাক্ষী। রামচন্দ্র বিড়ি ধরিয়ে বললেন, ‘পোলারে হ্যাসকালে কইলাম, ঢাকায় ভর্তি হ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। ভার্সিটি থেইকা পাস দিলেও দাম আছে। এহনতো কলেজ-ভার্সিটি বন্ধ। পোলার কামাই খাইমু এমন আশা আর করি না।’ সরল-স্বীকারোক্তির পরে সাবধান-সতর্ক করে রামচন্দ্র বললেন, ‘কিছুদিন থেইকা নাকি তোমার বাড়ি আসতেছে। সাবধানে থাইকো।’
“হ আসে। পোলাডা বিষ্ণুর মতো চেহারা, কতো সুন্দর। আর কী য্যান সুন্দর গানের গলা। ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার গান গাইল। মিডা গলা। সুন্দর ভাষায় কথা কয়। সিনেমার নায়কের মতন ভাষা। আমার মাইয়া শচীর লগে কথা কয়। ম্যালা কথা কয়।” তৃপ্তিমাখা কণ্ঠ মীনাক্ষীর।
‘কী অত কথা?’ উত্তরের জন্য নারীমুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন রামচন্দ্র। 
‘যাই কন, পোলা নাই আমার। আমি বুজি। পোলা অইল বংশের খুডা। মরতে অইবো না! মুখে আগুন দিবো ক্যাডা? মুখাগ্নি করব ক্যাডা?’ 
রামচন্দ্র চলে গেলে স্নানে আসার পর থেকেই আজ সাম্প্রতিক স্মৃতিকথা মনে উদয় হচ্ছিল মীনাক্ষীর। নদীর জলে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে ও। কানে বেজে উঠল স্বামীর আরও নানা কথা। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলত, ‘কেমুন সুর্মাটানা তুমার চক্ষু, অতো সৌন্দর্য ক্যান তুমার মুখে।’ কী উন্মাদনা ছিল স্বামীর। মায়ার মানুষ ছিল, আদরমাখা গলা। হঠাৎ মরে গেল। চিতাতে রাখা শবদেহে আগুন ধরাতে ধরাতে মরে গেল স্বামী। লোকে বলল, ‘অ্যাতো মদ গিলেছে যে, মাগনা মদে মরেছে।’ ডাক্তার বলল, ‘হার্ট অ্যাটাকে।’ সবগুলো শব্দ একে একে মনে পড়ল মীনাক্ষীর। ‘তোমার সুয়ামি মদে মরেছে।’ কেউ যেন তাকে কানে কানে বলে যাচ্ছে এসব। এরপর বিধবা হওয়ার শব্দটি আড়াল করা হয়। রামচন্দ্রের পরামর্শ ছিল, শাঁখ না ফেলার, সিঁদুর না মোছার। মানুষ নানাকথা বলবে, শ্মশানে বিধবাদের কর্ম তো হতেই পারে না। মৃত্যু মানুষের হবেই, সকলেরই। আত্মা ও অন্তর পরিষ্কার রাখলেই অন্তরাত্মা পবিত্র। সেখানেই ঈশ্বর, প্রভু। তুমি চাইলে তুমিও সৃষ্টিকর্তাকে পাবে। মানুষকে তুমি তুষ্ট করলেই স্বয়ং প্রভু তুষ্ট। আত্মা খুশি তো জগৎখুশি। রামচন্দ্রের বিচক্ষণতা তাকে আস্থাশীল করে তোলে, কখনো বা মনে হয় এই লোকটিই তীর্থস্থানের পূজারি। 
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে শচীর দিকে একপলক তাকিয়ে ফের মাথা ভেজাতে শ্মশান ঘাটে আরও কয়েকটি ডুব দেয় মীনাক্ষী। শরীর ভেজা তবু পানি ছিটাবে। টলটল পানি নদীতে, স্বচ্ছ কালো জল যেন। নিজের হৃষ্টপুষ্ট শরীর দেখে। বুক সামলাতে কাপড় টানে। দেহ নিয়ে কল্পনা করাও পাপকর্ম। এরপর সূর্যের দিকে তাকায়। নিরুত্তাপ সূর্য। বেলা গড়িয়ে বিকেল কিনা। 
উপশহর এলাকায় থিতু হয়ে থাকা শ্মশান ঘাটের অদূরের বাড়িটিতেই জীবনের বড় সময় ধরে আছে মীনাক্ষী। বিয়ের পর কত কিছু বদলে গেছে এখানকার। আগে ছিল নদী। এখন মাটি ভরে ভরে নদীভরাট হয়ে শুকিয়েছে। দূরের দিকে ছোটখাটো খাল। পাশে থাকা কচুরিপানা ভর্তি খালটার এখন অস্তিত্ব নেই। আর দখলবাজদের অত্যাচারে স্রোতধারা নদী হয়েছে সরু। নাম জানা না জানা সারসার গাছ ছিল পাড় ঘেঁষে। এসবের কিছু আছে তবে বড়গাছগুলো রাতের অন্ধকারে অনেকদিন আগেই কেউ কেটে নিয়ে গেছে। হিন্দুদের শ্মশানের জায়গা দখল হয়ে কাঠচিড়াইয়ের কারখানা। জমজমাট দোকান আনোয়ার টি স্টল লেখা। খানিকটা দূরে হোমিওপ্যাথির দাওয়াইয়ের দোকান ছিল, এটি এখন হয়েছে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের দোকান।
আকারে ছোট হয়ে আসছে শ্মশান। বিয়ের সাড়ে ১৮ বছরে অনেক বদলে গেছে দুনিয়া। মেয়ে স্কুল বাদ দিয়েছে গত সন। মা-মেয়ের ছোট সংসার। দুশ্চিন্তা ছিল না শচীর জন্য। কিন্তু মেয়ের প্রতি সেই মুগ্ধভাবটা আর যেন নেই এখন। 
স্নান সেরে নদীর পাড়ে ওঠে মীনাক্ষী। গামছা জড়িয়ে নেয় বুকে। এদিক-ওদিক তাকায়। পিঠছেঁড়া ব্লাউজ বদলায়। স্বামী গত হওয়ার পর থেকে সতীত্ব টিকিয়ে রাখতে একযুগ ধরে পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে মীনাক্ষীর। হিন্দু-মুসলমান পুরুষরা একসঙ্গে মিলেমিশে গিলে খেতে চায় শরীরটা। জাতপাত যায় না। তখন ছোটগোত্রের প্রশ্নও ওঠে না। কাঁখে এক কলস পানি নিয়ে ঘরমুখো হাঁটতে শুরু করে। অদূরেই ছাপরাঘর। ঠিকানা বলতেই এই ভিটে-বাড়ি। চোট্ট এক চিলতে উঠান। বাড়ির কোণে একজোড়া হাঁস। হেলেদোলে দূর্বাঘাসে খাবার খোঁজে। মুহূর্তেই মনোযোগ সরে যায়, কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে মীনাক্ষীর, হাঁসগুলোর ওপর সকল রাগ। ‘দিনভর গাঙে খাইলে–হেরপরও পেট ভরে না!’ 
ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই মীনাক্ষীর মনে কী যেন নড়ে উঠল। শচীর দিকে চোখ নেচে বেড়ায়। কোনোদিন না হলেও আজ হঠাৎ কঠিনতর ভাবনায় মন বিষিয়ে ওঠে। বিয়ে দেওয়া চাই মেয়েটার। 
‘মাও, কী হইচে?’
মায়ের জবাব না পেয়ে শচীর চোখে-মুখে অকারণ হাসি।
মীনাক্ষীর কণ্ঠ কঠিন, ‘ওই মাইয়া হাসস ক্যান? বয়স অইতাছে না। বিয়া দিতে অইব না তোরে? ট্যাকা পামু কই, ক্যাডা দিব?’
মিঠে করে হেসে শচী বলল, ‘ট্যাকা দেওনের মাইনষের অভাব অইব?’
‘কইলি কী? মাইয়ার সাঅস, কী?’ গোখরা সাপের মতো ফুঁসে ওঠে মীনাক্ষী। 
এখন বিকেল। চুপ মেরে ঘরের বারান্দায় মাটিতেই বসে পড়ে শচী। লম্বা ডাগর হাত দুটি নাচায়। টানাটানা চোখে তাকিয়ে থাকে। একটু পর বলে, ‘মাও, যাইগা লও এ্যাইহান থেইকা।’
মীনাক্ষী ঘাড় ঘুরিয়ে বড়বড় চোখে তাকায়। ‘মাইয়া, কী কইলি তুই?’
‘হ, ঠিক কইচি। দিনকাল বদলাইছে না? শ্মশানে কেউ পইড়া থাকে, কও?’
গামছা দিয়ে চুল শুকোচ্ছিল মীনাক্ষী। মুখ ঘুরিয়ে তীব্র আপত্তিমাখা কণ্ঠে বলল, ‘কই যামু, কই যামু?’
‘ভাল্লাগে না।’
‘কইলি অইব? এ্যাইডা তর বাপের ঠিকানা, এ্যাইখানেই রুটি-রুজি। আমাগো ঘরবাড়ি।’ 
‘ভাল্লাগে না, সমাজ নাই, জ্ঞাতিগোতী নাই। ক্যাডা আছে, এ্যাইখানে?’ 
চমকে ওঠে মীনাক্ষী। কয়েক মাস থেকেই মেয়ের কথাবার্তা, আচরণ, পোশাক পরার কায়দা, চলাচল সবকিছুর একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল। মেয়ের কথায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘যাগা তুই, যেইদিকে চোখ যায়, যা! আমারে মুক্তি দে।’
‘হ, যামু।’ 
মোবাইলে চটুল বাজনা আর গান বেজেই চলেছিল। মীনাক্ষী অনুমান করে নিশ্চয়ই শচীর কর্ম। ছোট ঠাকুরের সঙ্গে মেশামেশি করে মেয়ের মাথা গেছে। চঞ্চলতা বেড়েছে। লাউয়ের ডগার মতো হাত নেড়ে হাতপাখার বাতাস খায় শচী। 
আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাপড় বদলা, আমার লগে আয়।’ 
তাৎক্ষণিক জবাব দেয় না শচী। 
বালিশের তলায় থাকা কভারের রং ওঠা, গ্লাসভাঙা, ছোট মোবাইল ফোনটি হাতে এনে কোমরে গুঁজে নেয় মীনাক্ষী। দৃষ্টিতে পড়তেই কাপড়ের ছেঁড়া অংশ ঘুরিয়ে গুছিয়ে পরে। নিজের সাজগোজ বলতে সরিষার তেল মাথার চুল লেপ্টে মাখা। গায়ে আঁটসাঁট হয়ে থাকা ব্লাউজটি টেনেটুনে ঠিক করে। এরপর মুখে জর্দাপান ঢুকিয়ে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী কই, আমার লগে আয়।’
‘এহন, কই যামু?’
‘তর ডানা মেলছে না, পাখা ছাটুম। পায়ে বেড়ি লাগামু।’
শচী জানে কোথায় যাবে মা। এখন পাশের ভাঙাহাটে যাবে। কমদামের ছোট মাছ, বাসি লাউ, পচা কচুরলতি আনতে যাবে। 
ঘণ্টাখানেক পর বাজার সেরে ঘরে ফিরে মীনাক্ষী। বিকেল গড়িয়ে গেছে কখন, খেয়াল নেই। দরজায় পা রেখেই মীনাক্ষী ডাক পাড়ে মেয়েকে, ‘শচী, অরে শচী?’
অবাক হয় শচীর আওয়াজ না পেয়ে। 
‘শচী গেলি কই?’
চারদিকেই যেন নিস্তব্ধতা। শুধু মাথার ওপর দিয়ে একজোড়া কাক ওড়ে গেছে।
‘শচী?’
ঘরের কোণে কাঁথা জড়ানো বস্তুর দিকে তাকায় মীনাক্ষী। চুলগুলো দেখে অনুমান হয় শচীই হবে। কেউ কী কাঁথার ভেতর ওর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। চৈত্রকালে কাঁথা কেন! চোখের ভুল হতে পারে। নানান জিজ্ঞাসা মনে তার। 
উঠানের কাপড় তুলে ঘরে আনতে যাবে তখনই কেউ যেন মীনাক্ষীকে ফাঁকি দিয়ে কুঁড়েঘর থেকে বের হয়েই দৌড় দেয় সড়কের দিকে। নিমিষে চলে যাওয়া মানবটির গড়ন যেন পরিচিত।
‘ক্যাডা? ক্যাডা যাও?’ মীনাক্ষীর উচ্চকণ্ঠ।
পরিষ্কার চোখে ধরা পড়ে যে, এ লোকটি অনন্ত, ছোট ঠাকুর; রামচন্দ্র ঠাকুরের ছেলে। বুঝতে কষ্ট হয় না, কী হয়েছে। কেন এসেছিল ছোট ঠাকুর। 
হাতের ঝাড় রেখে ঘরে ঢোকে মীনাক্ষী। ‘ছোড ঠাকুর ক্যান আইছিলো, শচী?’ 
ছোট ঠাকুরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার সময়ে মা এসে পড়েছে; এমন মুখভঙ্গি করে কিংবা এটা বোঝাতেই শচী বলল, ‘লুকাইন্যা খেইল খেলছিলাম।’
ভীষণ চমকে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল মেয়েকে। এলোমেলো চুল আর ঘর্মাক্ত কিশোরীর চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে এই লুকোচুরির 
অর্থ কী। এরপর জোরে জোরে কেঁপে কেঁপে চিৎকার 
করে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী, নিজের এমন সর্বনাশ করলি ক্যান?’
মাথা নিচু করে নিরুত্তর থাকে শচী। অতীব সুন্দরী মেয়ের এমন মুখভঙ্গি অসহ্য ঠেকে। মীনাক্ষী খেয়াল করে দরদর ঘাম মেয়ের শরীরে। এই ঘাম পশুর ওপর নৃশংস ছুরি চালানো রক্তের মতোই মনে হয় মীনাক্ষীর।

কবিতা জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়!

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৪২ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়!
খবরের কাগজ গ্রাফিক্স

আমরা কি বেঁচে আছি?
বেঁচে নেই আমাদের ভালোবাসাও!
কে বলেছে ভালোবাসা একবার
হয়। কতো গভীর সম্পর্কও একদিন
হয়ে যায় ফিকে।
হয়তো কিছু একটা আঁকড়ে ধরে
বাঁচার চেষ্টা ভালো থাকার অভিনয়।
এভাবে জীবন একদিন শেষ হয়ে
যায়। জীবন বহতা নদীর মতো 
বয়ে চলে অবিরাম।
যেখানে তার উৎপত্তি সে ফিরে
আসে না কখনো সেখানে, প্রতিনিয়ত
ছুটে চলে সাগরের পানে মিশবে বলে।
কিছু ভালোবাসা চরম ভুল।
সুনামির চেয়েও ভয়ংকর, আবেগ
কিংবা কিছুটা মোহ। মোহ কেটে
গেলে সব শেষ। মনের হদিস কেউই
জানে না। মনের বন্ধ দরজা আর
খোলা যায় না একজীবনেও। কিছু
স্মৃতিও একদিন বিস্মৃতির আড়ালে
চলে যায়। জীবনের সকাল, দুপুর,
সন্ধ্যা! রাত্রি শেষে আর জীবনের
সকাল হয় না, যত আকুতি জানানো
হোক না-কেন। জীবনের কিছু পথে দুবার
হাঁটা হয় না এবং  যায়ও না। মানুষ সময়ের
সাথে বদলে যায়। এভাবে চলতে
চলতে জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়।

কবিতা বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:১৫ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:১৭ এএম
বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও
খবরের কাগজ গ্রাফিক্স

 মিরাজ নিজের দুই ঠোঁটে চুমো খাও।
নিজকে জড়িয়ে ধরে বলো 
আই লাভ ইউ।
যে আঙুলে জমা পড়েছে বিষাদ-বেদনা 
সেই আঙুলকে আদর করো।

মিরাজ, কে তোমাকে কথা দিয়েছিল? 
কে কথা রাখেনি! 
এই সব হাওয়া-বাতাসের মন্ত্র ভুলে গিয়ে 
বুকের ভেতরে সৃষ্টি করো আদম বাগান।
যে হাত স্পর্শ করেছে অবৈধ নারীর আঙুল 
সে হাতকে কালেমা পড়িয়ে মানুষ বানাও।

মিরাজ, আদম-হাওয়া-গন্দমের ইতিহাস ভুলে যাও।
নিজেকে বিষণ্ণ বৃক্ষের মতো মনে করো না।
আজ থেকে প্রবেশ করো আঙুর ফলের বাগানে।
দুই ঠোটের মাঝখানে জমে থাকা বিষকে পরিণত করো মধুতে।
চোখের খুনপাখিকে লালনের গান শোনাও।

কবিতা শান্তি নিদ্রা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:০৩ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:০৮ এএম
শান্তি নিদ্রা
খবরের কাগজ গ্রাফিক্স

ভিড়-বাট্টায় খুঁজো না আমায় একাকী শূন্যে থাকি
জোয়ারভাটায় সম্বিৎ পাই আত্মাকে দিই ফাঁকি
আত্ম গ্লানিতে পর্যুদস্ত সাম্পান ভেসে যায়
খাণ্ডব আসে জলে-রোদ্দুরে এবং লু হাওয়ায়;
বর্ষক্রমায় অভুক্ত থাকা নিয়তির কারসাজি
খেয়ালের বশে সান্ত্বনা পেতে যোদ্ধার বেশে সাজি
একাদশী আর পূর্ণিমা রাতে চন্দ্রশোভায় শুয়ে
চন্দ্রালোকের অপার মায়ায় কলঙ্ক নিই ধুয়ে
অমাবস্যায় নিরালোক রথ করে যদি হাহাকার
মুহূর্তে প্রিয় হয়ে ওঠে যতো অপার অন্ধকার।

অবহেলা-গাঙে সন্তরণের কষ্টে হারাই কূল
সন্তাপে পুড়ি আপন গহনে জমে রাজ্যের ভুল
ভুলের মাশুল নিত্যি দিচ্ছি যাচ্ছে না তবু পাপ
মুক্তির পথে জমে আছে শত কষ্টের অনুতাপ
ভুলে ভরা এই জীবন আমার ভুলের স্বপ্নে বাঁচা
সীমাবদ্ধ এ ভুবন আসলে অজেয় লৌহ খাঁচা।
বৈশাখী ঝড় তাণ্ডব হলে আসবে মুক্তি তবে
মানুষে সমতা আসে না বিশ্বে শান্তি-নিদ্রা কবে!

আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১০:৪৭ এএম
আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

পঞ্চদশ পর্ব

আমরা তো ভর্তি হয়েছিলাম ছেচল্লিশের দাঙ্গার পরে, আর সাতচল্লিশের আগস্টে কলকাতা ছাড়তে হলো। স্কুলের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না; তবে বাইরে দাঙ্গার রেশ তখনো বিদ্যমান। ক্লাস শেষে হিন্দু-মুসলমান ছাত্র আমরা একসঙ্গেই বের হতাম। পথিমধ্যে হিন্দুপাড়া ও মুসলমানপাড়া পড়ত, সেখানে আমরা বিভক্ত হয়ে যেতাম। বঙ্গভূমি যে আর অখণ্ড থাকবে না হয়তো তারই পূর্বভাসের মোকাবিলা করতে হতো। গল্প শুনেছিলাম রায়টের সময়ে এক হিন্দু ছাত্র ভীষণ বিপদে পড়েছিল, ভুল করে মুসলমানপাড়ায় ঢুকে পড়ে; কিন্তু তাকে বাঁচিয়েছিলেন এক মাংস-বিক্রেতা, তিনি দৌড়ে ছুটে এসে বলেছিলেন, ‘স্কুলকা লাড়কা, ছোড় দো।’ আসলে ভালো মানুষের সংখ্যাই ছিল অধিক, সাম্প্রদায়িক হিংস্রতাটা সৃষ্টি করেছিল মতলববাজ লোকেরা। 

দাঙ্গার আগে কলকাতায় ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক সব মিছিল হয়েছে যাতে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ অংশ নিয়েছেন; হতাহতও হয়েছেন, একসঙ্গে। রশীদ আলী দিবসের মিছিল ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। ডাক ও তার বিভাগের কর্মচারীরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে ধর্মঘট করেছেন কিছুদিনব্যাপী। নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এসব ঘটনা আমরা কলকাতায় আসার আগেই ঘটেছে; কিন্তু প্রভাবটা পরেও পাওয়া যাচ্ছিল। মাসব্যাপী ট্রাম ধর্মঘট ততদিন শেষ হয়েছে, কিন্তু ধর্মঘটের সময়ে ট্রাম গাড়ির সামনে কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকাকে মাঝখানে রেখে কংগ্রেস ও লীগের যে তিনটি পতাকা ওঠানো হয়েছিল ধর্মঘট শেষ হওয়ার পরেও তাদের উড়তে দেখেছি। 
ভালো কথা, ট্রামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে নতুন ক্লাসের পাঠ্যবই কিনতে গিয়ে। রাজশাহীতে যেমন নিয়ম দাঁড়িয়েছিল প্রমোশনের দিন বিকেলেই সাহেববাজারের বইপাড়ায় গিয়ে বই কেনা হবে, কলকাতাতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আব্বার সঙ্গে ট্রামে চেপে আমরা দুভাই কলেজ স্ট্রিটে গেছি, বই কিনেছি মহানন্দে, কিন্তু ফেরার পথে ধর্মতলায় নামার সময় আমি পড়েছিলাম পিছিয়ে, নামতে যাব এমনি সময় ট্রাম দিয়েছে ছেড়ে। উঁচু গলায় আব্বা বললেন পরের স্টপেজে গিয়ে নামতে। তাই করেছিলাম এবং আব্বা শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে নামার সময় সামনের দিকে মুখ করে নামতে হবে। সামনে চলা চাই, পেছনমুখো হলে বিপদ, চলার ওই দিকনির্দেশটা প্রতীকী অর্থেও সত্য বটে। 

ট্রামের প্রত্যেকটি স্টেশনে খবরের কাগজ পত্রপত্রিকার একটা স্টল থাকত। সেখানে বইও পাওয়া যেত। আমরা আজাদ পত্রিকা পড়তাম, মুসলমান পাঠকদের জন্য সেটাই ছিল তখনকার ধারা। আজাদ মওলানা আকরম খাঁর পত্রিকা; তিনি রক্ষণশীল; ওই পত্রিকার বিপরীতে দৈনিক ইত্তেহাদ বের হয়েছিল, সোহরাওয়ার্দী সাহেবদের মুখপাত্র হয়ে। সে পত্রিকার ছোটদের পাতা সম্পাদনা করতেন কবি আহসান হাবীব; ওই পাতায় আমি লেখা পাঠাব এমন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সেজন্য প্রত্যেক রবিবার ট্রাম স্টেশনে গিয়ে এক কপি কিনে আনতাম। কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা স্বাধীনতা কে যেন একবার বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। মনে আছে আব্বা মন্তব্য করেছিলেন, ‘আসল স্বাধীনতার কথা কিন্তু ওই পত্রিকাই বলে’। তবে একসঙ্গে দুটি পত্রিকার গ্রাহক হওয়ার জন্য উপযুক্ত সাংস্কৃতিক মানসিকতা ও আর্থিক সঙ্গতি কোনোটাই আমাদের তখন ছিল না। 
খিদিরপুরপাড়ায় দুটি সিনেমা হল ছিল, কোনোটিতেই একবারের অধিক সিনেমা দেখা হয়নি। তবে আসল সিনেমাপাড়া ছিল ধর্মতলাতেই। নামকরা ছিল মেট্রো ও লাইট হাউস। লাইট হাউসে ‘কিসমত’ নামে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী চলছিল। ছবিটি হিন্দি, তবে নায়ক ছিলেন বাঙালি অশোককুমার। সে সময়ে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা। ছবিটি একটানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। তার কারণ যে কেবল অশোককুমার ও তার বিপরীতে লীলা চিটনিসের অনবদ্য অভিনয় তা নয়, মূল কারণ ছিল একটি গান, সেটি এরকমের, ‘দূর হটো, দূর হটো সব দুনিয়াওয়ালে হিন্দুস্থান হামারা হায়’। স্বাধীনতার জাতীয়তাবাদী ওই সংগীত দর্শক টানত; অনেকেই একাধিকবার দেখেছেন, আমি অবশ্য একবারই দেখেছি, হয়তো আমার বন্ধু ও আত্মীয় মুজিবের সঙ্গে। সুভাষ বসু তখন নেই, কিন্তু মনে হতো আজাদ হিন্দ ফৌজের কণ্ঠস্বর চলচ্চিত্রের ওই গানে চলে এসেছে। 

বন্ধু মুজিবের প্রসঙ্গ আগেই এসেছে। তার বাবা, অর্থাৎ আমাদের ফুপা, বদলি হয়ে এসেছিলেন টালিগঞ্জে, কোর্ট ইন্সপেক্টর হিসেবে। তারা বাসা নিলেন আমাদের বাসার কাছেই। মুজিবও ভর্তি হলো সেন্ট বার্নাবাস স্কুলেই, এবং একই ক্লাসে। ফলে দুজনের বন্ধুত্বটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। সেটা অক্ষুণ্ন ছিল তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মুজিব মারা যায় ২০১১ সালে। তার মৃত্যু আমাকে অত্যন্ত গভীরভাবে আঘাত করেছে।
কলকাতায় থাকার সময়ে আমাদের দুজনকে এক ধরনের খেলায় পেয়েছিল। সেটা হলো বাংলা অর্থসহ কতটা ইংরেজি শব্দ বলতে পারি তার প্রতিযোগিতা। মুজিবরা থাকত দোতলা বাড়ির দোতলায়; অনেকদিনই আমরা বিকেলে তাদের বাসার ছাদে হাঁটতে হাঁটতে শব্দ নিয়ে ওই প্রতিযোগিতার খেলাটা উপভোগ করেছি। বলাবাহুল্য, উপকৃতও হয়েছি। আব্বা খুব খুশি হতেন এ খেলাটা জমছে দেখে। সে সময়ে নেসফিল্ডের ইংলিশ গ্রামার ছিল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যাকরণ বই। স্কুলে পাঠ্য ছিল, আব্বা আমাকে উৎসাহিত করতেন গ্রামার বই থেকে প্রিপজিশনের ব্যবহার মুখস্ত করতে। বলতেন, কাজে দেবে। এ ব্যাপারে তার ধারণা নির্ভুল ছিল; প্রিপজিশনের ব্যবহার আমাকে তখন তো অবশ্যই, অনেক পরেও, এমনকি এখনো জ্বালাতন করে।
 
রাত করে বাসায় ফিরলে উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করেছি। ওই উদ্বেগ আমাকেও একদিন ভীষণ রকম কাতর করেছিল। আব্বা অফিস থেকে ফেরার পথে কোনো কোনো দিন বাজার থেকে সওদাপাতি কিনে আনতেন, তখন ফিরতে কিছুটা দেরি হতো। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত এসে গেছে তবু আব্বা বাসায় ফেরেননি। কারণ কী? তিনি কী কোনো বিপদে পড়লেন? না জেনে হিন্দুপাড়ায় গিয়ে পড়েছেন কী? রাজশাহীতে আব্বাকে দেখেছি অফিসের অন্যসব বাবুদের মতোই ধুতি পরে অফিসে যেতে। কলকাতায় এসে তিনি পোশাক বদলে ফেলেছিলেন। ঠিক পাজামা নয়, আবার ট্রাউজার্সও নয়, নাম দিয়েছিলেন প্যান্ট-পাজামা; পাজামাই তবে দুদিকে দুই পকেট; তার ওপরে শার্ট। হিন্দু না মুসলমান, একনজরে যাতে চেনা না যায় তার ব্যবস্থা। হিন্দুপাড়া দিয়ে গেলে মনে হবে হিন্দু বটে; মুসলমানপাড়া দিয়ে যাওয়ার সময় ধারণা হবে মুসলমানই তো, পাজামা পরেছে। যা হোক, রাত হয়ে যাচ্ছে আব্বা তবু ফিরছেন না, এতে আমার ভেতর ভীষণ অস্থিরতা শুরু হলো। মা কিছু বলছেন না; ব্যস্ত রয়েছেন এটা-সেটায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনিও যে উদ্বিগ্ন সেটা আমি টের পাচ্ছি। মাকে কিছু না বলে আমি বের হয়ে পড়েছিলাম ট্রাম স্টেশনের উদ্দেশে। মা কিছু জিজ্ঞাসা করেননি, তার দশ-এগারো বছরের ছেলে আমি সন্ধ্যার পরে একাকী কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি জানতে চাননি, তবে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কোন দিকে এবং কেন যাচ্ছি। যাচ্ছি রাস্তায় গিয়ে অপেক্ষা করতেই। আমার মায়ের সঙ্গে অনুভূতির নীরব কথোপকথন পরে আরও অনেক সময়ে ঘটেছে; কিন্তু এটাই ছিল সর্বপ্রথম। আমি ট্রাম স্টেশন পর্যন্ত চলে গেছি। দেখছি আব্বা নামেন কি না। ট্রাম আসছে, ট্রাম যাচ্ছে, আব্বার দেখা নেই। আমি ঘোরাফেরা করছি আশপাশে। এমন সময় মুজিবের হঠাৎ আবির্ভাব। সে ফিরছে তাদের বাসায়। তার মা হয়তো তাকে দোকানে পাঠিয়েছিলেন কিছু কিনতে। আমার ফুপুরা চারজনই খুব জাঁদরেল ছিলেন। আমাকে অকারণে ওইখানে দেখে পিঠে থাপ্পড় দিয়ে মুজিব বলল, ‘কী রে, এখানে কীসের ঘোরাঘুরি?’ আমি তাকে আমার উদ্বেগের বিষয়টা বলতে পারলাম না; এবং বাধ্য হলাম তার সঙ্গে বাসার দিকে রওনা হতে। আব্বা ফিরলেন আমার ফেরারও পরে। তখন সবার একই প্রশ্ন, ‘কী হয়েছিল’? অপরাধীর মতো হেসে আব্বা বললেন, ‘কলিন্স স্ট্রিটে এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। সে তার বাসায় নিয়ে গেল। আমার ভুল হয়েছে।’ আব্বার সেই ম্লান হাসিটা অনেককাল আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। আগে কখনো তাকে অপরাধীর মতো ওভাবে হাসতে দেখিনি; পরে দেখেছি হয়তো, কিন্তু সেদিনকার মতো নয়। তিনি বুঝেছিলেন আমরা কতটা উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করেছি। ছেচল্লিশের রায়ট কলকাতার মানুষকে অমনভাবেই সন্ত্রস্ত রাখত। আর আমি নিজে উদ্বিগ্ন বহুবার বহুভাবে হয়েছি, কিন্তু ওই প্রথমবারের মতো আর কখনো নয়।

সাতচল্লিশের অস্বাভাবিতার মধ্যেও আমরা অবশ্য স্বাভাবিক জীবনই যাপন করেছি। আমার মা বাসা তৈরি করতে পারতেন বাবুই পাখির দক্ষতায়। কলকাতার বাসায় এসে তিনি কিছুটা হতাশই হয়েছিলন; কিন্তু দমে যাননি। গুছিয়ে বসেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন আসতেন। তিনি নিজেও যেতেন কখনো কখনো। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। এমনকি রাজশাহী থেকেও হায়াত আলী শেখ একবার এসে ঘুরে গেছেন।
 
আমরা দুভাইও খুশিই ছিলাম। মনে পড়ে নতুন শহরে আসার একেবারে প্রথম দিকেই গঙ্গার ধার ধরে আমরা মির্জাপুর স্ট্রিটের খোঁজে বের হয়ে পড়েছিলাম। সেখানে আব্বার চাচাতো বোনদের সবচেয়ে বড় যিনি তিনি থাকতেন। ফুপার চাকরি ছিল স্ট্রিমার কোম্পানিতে। মির্জাপুর পাড়াটা ছিল বই বাঁধাইয়ের। ছাপাখানাও ছিল কয়েকটি ছোটখাটো, তবে বই বাঁধাই ছিল বিরাট ব্যাপার। ওই কাজে মানিকগঞ্জের অনেক মানুষ তখন নিযুক্ত ছিলেন। তারা আশপাশেই বসবাস করতেন। ফুপুরা যে দোতলায় থাকতেন তার নিচতলাতেও কয়েকটি পরিবার থাকত, দেশভাগ নিশ্চয়ই এদের ভীষণ বিপদে ফেলেছিল। অচেনা শহরে সদ্য-আগত আমরা দুই কিশোর ফুপুর বাসা খুঁজে বের করে, সেখানে গিয়ে আচমকা হাজির হয়েছি দেখে তিনি যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি বিস্মিতও হয়েছেন আমাদের ‘সাহস’ দেখে। আমাদের কিন্তু কোনো অসুবিধা হয়নি; মির্জাপুর স্ট্রিট এবং তাদের বাসা খুঁজে পেতে। ফুপুর দুই ছেলে আমার প্রায় সমবয়সী। ওরা অবশ্য তখন বাসায় ছিল না।
 
কলকাতায় তো আমরা মোটামুটি গুছিয়ে বসেছি; দেশ স্বাধীন হবে এমনই আশা, তাতে আমাদের সুবিধা হবে এটাও নিশ্চিত। কারণ আব্বার চাকরি কলকাতার হেড অফিসে, সেখান থেকে বদলি হয়ে মফস্বলে যে যাবেন এমন শঙ্কা নেই। স্কুলের হিন্দু সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কারও কারও সঙ্গে বন্ধুত্বও গড়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিযোগিতার জন্যও প্রস্তুত হচ্ছি। ম্যাট্রিক শেষ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হব এ রকমের ধারণা।
 
এর মধ্যেই যেটা ছিল কল্পনারও বাইরে, তার ঘোষণা এল। দেশ ভাগ হয়ে যাবে হিন্দুস্থান-পাকিস্তানে- জুনের ৩ তারিখে রেডিওতে শোনা গেল ওই কথা। ‘স্বাধীনতার’ ওই ঘটনার বাস্তবিক ফলটা কী দাঁড়াবে সে সম্বন্ধে আমরা ছোটরা তো নয়ই, আমাদের অভিভাবকরাও কিছুই ভাবতে পারছিলেন না। তারা হতবাক হয়ে গেছিলেন। দাঙ্গা দেখেছেন, এবার না জানি কী দেখতে হবে- এই বুঝি ছিল তাদের প্রশ্ন। কে কোথায় ছিটকে পড়বেন কে জানে? 

চলবে...