পঞ্চদশ পর্ব
আমরা তো ভর্তি হয়েছিলাম ছেচল্লিশের দাঙ্গার পরে, আর সাতচল্লিশের আগস্টে কলকাতা ছাড়তে হলো। স্কুলের ভেতরে সাম্প্রদায়িকতা ছিল না; তবে বাইরে দাঙ্গার রেশ তখনো বিদ্যমান। ক্লাস শেষে হিন্দু-মুসলমান ছাত্র আমরা একসঙ্গেই বের হতাম। পথিমধ্যে হিন্দুপাড়া ও মুসলমানপাড়া পড়ত, সেখানে আমরা বিভক্ত হয়ে যেতাম। বঙ্গভূমি যে আর অখণ্ড থাকবে না হয়তো তারই পূর্বভাসের মোকাবিলা করতে হতো। গল্প শুনেছিলাম রায়টের সময়ে এক হিন্দু ছাত্র ভীষণ বিপদে পড়েছিল, ভুল করে মুসলমানপাড়ায় ঢুকে পড়ে; কিন্তু তাকে বাঁচিয়েছিলেন এক মাংস-বিক্রেতা, তিনি দৌড়ে ছুটে এসে বলেছিলেন, ‘স্কুলকা লাড়কা, ছোড় দো।’ আসলে ভালো মানুষের সংখ্যাই ছিল অধিক, সাম্প্রদায়িক হিংস্রতাটা সৃষ্টি করেছিল মতলববাজ লোকেরা।
দাঙ্গার আগে কলকাতায় ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক সব মিছিল হয়েছে যাতে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ অংশ নিয়েছেন; হতাহতও হয়েছেন, একসঙ্গে। রশীদ আলী দিবসের মিছিল ছিল বিশেষভাবে স্মরণীয়। ডাক ও তার বিভাগের কর্মচারীরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে ধর্মঘট করেছেন কিছুদিনব্যাপী। নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এসব ঘটনা আমরা কলকাতায় আসার আগেই ঘটেছে; কিন্তু প্রভাবটা পরেও পাওয়া যাচ্ছিল। মাসব্যাপী ট্রাম ধর্মঘট ততদিন শেষ হয়েছে, কিন্তু ধর্মঘটের সময়ে ট্রাম গাড়ির সামনে কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকাকে মাঝখানে রেখে কংগ্রেস ও লীগের যে তিনটি পতাকা ওঠানো হয়েছিল ধর্মঘট শেষ হওয়ার পরেও তাদের উড়তে দেখেছি।
ভালো কথা, ট্রামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে নতুন ক্লাসের পাঠ্যবই কিনতে গিয়ে। রাজশাহীতে যেমন নিয়ম দাঁড়িয়েছিল প্রমোশনের দিন বিকেলেই সাহেববাজারের বইপাড়ায় গিয়ে বই কেনা হবে, কলকাতাতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আব্বার সঙ্গে ট্রামে চেপে আমরা দুভাই কলেজ স্ট্রিটে গেছি, বই কিনেছি মহানন্দে, কিন্তু ফেরার পথে ধর্মতলায় নামার সময় আমি পড়েছিলাম পিছিয়ে, নামতে যাব এমনি সময় ট্রাম দিয়েছে ছেড়ে। উঁচু গলায় আব্বা বললেন পরের স্টপেজে গিয়ে নামতে। তাই করেছিলাম এবং আব্বা শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে নামার সময় সামনের দিকে মুখ করে নামতে হবে। সামনে চলা চাই, পেছনমুখো হলে বিপদ, চলার ওই দিকনির্দেশটা প্রতীকী অর্থেও সত্য বটে।
ট্রামের প্রত্যেকটি স্টেশনে খবরের কাগজ পত্রপত্রিকার একটা স্টল থাকত। সেখানে বইও পাওয়া যেত। আমরা আজাদ পত্রিকা পড়তাম, মুসলমান পাঠকদের জন্য সেটাই ছিল তখনকার ধারা। আজাদ মওলানা আকরম খাঁর পত্রিকা; তিনি রক্ষণশীল; ওই পত্রিকার বিপরীতে দৈনিক ইত্তেহাদ বের হয়েছিল, সোহরাওয়ার্দী সাহেবদের মুখপাত্র হয়ে। সে পত্রিকার ছোটদের পাতা সম্পাদনা করতেন কবি আহসান হাবীব; ওই পাতায় আমি লেখা পাঠাব এমন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, সেজন্য প্রত্যেক রবিবার ট্রাম স্টেশনে গিয়ে এক কপি কিনে আনতাম। কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা স্বাধীনতা কে যেন একবার বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। মনে আছে আব্বা মন্তব্য করেছিলেন, ‘আসল স্বাধীনতার কথা কিন্তু ওই পত্রিকাই বলে’। তবে একসঙ্গে দুটি পত্রিকার গ্রাহক হওয়ার জন্য উপযুক্ত সাংস্কৃতিক মানসিকতা ও আর্থিক সঙ্গতি কোনোটাই আমাদের তখন ছিল না।
খিদিরপুরপাড়ায় দুটি সিনেমা হল ছিল, কোনোটিতেই একবারের অধিক সিনেমা দেখা হয়নি। তবে আসল সিনেমাপাড়া ছিল ধর্মতলাতেই। নামকরা ছিল মেট্রো ও লাইট হাউস। লাইট হাউসে ‘কিসমত’ নামে একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী চলছিল। ছবিটি হিন্দি, তবে নায়ক ছিলেন বাঙালি অশোককুমার। সে সময়ে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা। ছবিটি একটানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল। তার কারণ যে কেবল অশোককুমার ও তার বিপরীতে লীলা চিটনিসের অনবদ্য অভিনয় তা নয়, মূল কারণ ছিল একটি গান, সেটি এরকমের, ‘দূর হটো, দূর হটো সব দুনিয়াওয়ালে হিন্দুস্থান হামারা হায়’। স্বাধীনতার জাতীয়তাবাদী ওই সংগীত দর্শক টানত; অনেকেই একাধিকবার দেখেছেন, আমি অবশ্য একবারই দেখেছি, হয়তো আমার বন্ধু ও আত্মীয় মুজিবের সঙ্গে। সুভাষ বসু তখন নেই, কিন্তু মনে হতো আজাদ হিন্দ ফৌজের কণ্ঠস্বর চলচ্চিত্রের ওই গানে চলে এসেছে।
বন্ধু মুজিবের প্রসঙ্গ আগেই এসেছে। তার বাবা, অর্থাৎ আমাদের ফুপা, বদলি হয়ে এসেছিলেন টালিগঞ্জে, কোর্ট ইন্সপেক্টর হিসেবে। তারা বাসা নিলেন আমাদের বাসার কাছেই। মুজিবও ভর্তি হলো সেন্ট বার্নাবাস স্কুলেই, এবং একই ক্লাসে। ফলে দুজনের বন্ধুত্বটা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। সেটা অক্ষুণ্ন ছিল তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মুজিব মারা যায় ২০১১ সালে। তার মৃত্যু আমাকে অত্যন্ত গভীরভাবে আঘাত করেছে।
কলকাতায় থাকার সময়ে আমাদের দুজনকে এক ধরনের খেলায় পেয়েছিল। সেটা হলো বাংলা অর্থসহ কতটা ইংরেজি শব্দ বলতে পারি তার প্রতিযোগিতা। মুজিবরা থাকত দোতলা বাড়ির দোতলায়; অনেকদিনই আমরা বিকেলে তাদের বাসার ছাদে হাঁটতে হাঁটতে শব্দ নিয়ে ওই প্রতিযোগিতার খেলাটা উপভোগ করেছি। বলাবাহুল্য, উপকৃতও হয়েছি। আব্বা খুব খুশি হতেন এ খেলাটা জমছে দেখে। সে সময়ে নেসফিল্ডের ইংলিশ গ্রামার ছিল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যাকরণ বই। স্কুলে পাঠ্য ছিল, আব্বা আমাকে উৎসাহিত করতেন গ্রামার বই থেকে প্রিপজিশনের ব্যবহার মুখস্ত করতে। বলতেন, কাজে দেবে। এ ব্যাপারে তার ধারণা নির্ভুল ছিল; প্রিপজিশনের ব্যবহার আমাকে তখন তো অবশ্যই, অনেক পরেও, এমনকি এখনো জ্বালাতন করে।
রাত করে বাসায় ফিরলে উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করেছি। ওই উদ্বেগ আমাকেও একদিন ভীষণ রকম কাতর করেছিল। আব্বা অফিস থেকে ফেরার পথে কোনো কোনো দিন বাজার থেকে সওদাপাতি কিনে আনতেন, তখন ফিরতে কিছুটা দেরি হতো। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত এসে গেছে তবু আব্বা বাসায় ফেরেননি। কারণ কী? তিনি কী কোনো বিপদে পড়লেন? না জেনে হিন্দুপাড়ায় গিয়ে পড়েছেন কী? রাজশাহীতে আব্বাকে দেখেছি অফিসের অন্যসব বাবুদের মতোই ধুতি পরে অফিসে যেতে। কলকাতায় এসে তিনি পোশাক বদলে ফেলেছিলেন। ঠিক পাজামা নয়, আবার ট্রাউজার্সও নয়, নাম দিয়েছিলেন প্যান্ট-পাজামা; পাজামাই তবে দুদিকে দুই পকেট; তার ওপরে শার্ট। হিন্দু না মুসলমান, একনজরে যাতে চেনা না যায় তার ব্যবস্থা। হিন্দুপাড়া দিয়ে গেলে মনে হবে হিন্দু বটে; মুসলমানপাড়া দিয়ে যাওয়ার সময় ধারণা হবে মুসলমানই তো, পাজামা পরেছে। যা হোক, রাত হয়ে যাচ্ছে আব্বা তবু ফিরছেন না, এতে আমার ভেতর ভীষণ অস্থিরতা শুরু হলো। মা কিছু বলছেন না; ব্যস্ত রয়েছেন এটা-সেটায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনিও যে উদ্বিগ্ন সেটা আমি টের পাচ্ছি। মাকে কিছু না বলে আমি বের হয়ে পড়েছিলাম ট্রাম স্টেশনের উদ্দেশে। মা কিছু জিজ্ঞাসা করেননি, তার দশ-এগারো বছরের ছেলে আমি সন্ধ্যার পরে একাকী কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি জানতে চাননি, তবে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন কোন দিকে এবং কেন যাচ্ছি। যাচ্ছি রাস্তায় গিয়ে অপেক্ষা করতেই। আমার মায়ের সঙ্গে অনুভূতির নীরব কথোপকথন পরে আরও অনেক সময়ে ঘটেছে; কিন্তু এটাই ছিল সর্বপ্রথম। আমি ট্রাম স্টেশন পর্যন্ত চলে গেছি। দেখছি আব্বা নামেন কি না। ট্রাম আসছে, ট্রাম যাচ্ছে, আব্বার দেখা নেই। আমি ঘোরাফেরা করছি আশপাশে। এমন সময় মুজিবের হঠাৎ আবির্ভাব। সে ফিরছে তাদের বাসায়। তার মা হয়তো তাকে দোকানে পাঠিয়েছিলেন কিছু কিনতে। আমার ফুপুরা চারজনই খুব জাঁদরেল ছিলেন। আমাকে অকারণে ওইখানে দেখে পিঠে থাপ্পড় দিয়ে মুজিব বলল, ‘কী রে, এখানে কীসের ঘোরাঘুরি?’ আমি তাকে আমার উদ্বেগের বিষয়টা বলতে পারলাম না; এবং বাধ্য হলাম তার সঙ্গে বাসার দিকে রওনা হতে। আব্বা ফিরলেন আমার ফেরারও পরে। তখন সবার একই প্রশ্ন, ‘কী হয়েছিল’? অপরাধীর মতো হেসে আব্বা বললেন, ‘কলিন্স স্ট্রিটে এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা। সে তার বাসায় নিয়ে গেল। আমার ভুল হয়েছে।’ আব্বার সেই ম্লান হাসিটা অনেককাল আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। আগে কখনো তাকে অপরাধীর মতো ওভাবে হাসতে দেখিনি; পরে দেখেছি হয়তো, কিন্তু সেদিনকার মতো নয়। তিনি বুঝেছিলেন আমরা কতটা উদ্বেগের মধ্যে সময় পার করেছি। ছেচল্লিশের রায়ট কলকাতার মানুষকে অমনভাবেই সন্ত্রস্ত রাখত। আর আমি নিজে উদ্বিগ্ন বহুবার বহুভাবে হয়েছি, কিন্তু ওই প্রথমবারের মতো আর কখনো নয়।
সাতচল্লিশের অস্বাভাবিতার মধ্যেও আমরা অবশ্য স্বাভাবিক জীবনই যাপন করেছি। আমার মা বাসা তৈরি করতে পারতেন বাবুই পাখির দক্ষতায়। কলকাতার বাসায় এসে তিনি কিছুটা হতাশই হয়েছিলন; কিন্তু দমে যাননি। গুছিয়ে বসেছিলেন। আত্মীয়-স্বজন আসতেন। তিনি নিজেও যেতেন কখনো কখনো। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছিল। এমনকি রাজশাহী থেকেও হায়াত আলী শেখ একবার এসে ঘুরে গেছেন।
আমরা দুভাইও খুশিই ছিলাম। মনে পড়ে নতুন শহরে আসার একেবারে প্রথম দিকেই গঙ্গার ধার ধরে আমরা মির্জাপুর স্ট্রিটের খোঁজে বের হয়ে পড়েছিলাম। সেখানে আব্বার চাচাতো বোনদের সবচেয়ে বড় যিনি তিনি থাকতেন। ফুপার চাকরি ছিল স্ট্রিমার কোম্পানিতে। মির্জাপুর পাড়াটা ছিল বই বাঁধাইয়ের। ছাপাখানাও ছিল কয়েকটি ছোটখাটো, তবে বই বাঁধাই ছিল বিরাট ব্যাপার। ওই কাজে মানিকগঞ্জের অনেক মানুষ তখন নিযুক্ত ছিলেন। তারা আশপাশেই বসবাস করতেন। ফুপুরা যে দোতলায় থাকতেন তার নিচতলাতেও কয়েকটি পরিবার থাকত, দেশভাগ নিশ্চয়ই এদের ভীষণ বিপদে ফেলেছিল। অচেনা শহরে সদ্য-আগত আমরা দুই কিশোর ফুপুর বাসা খুঁজে বের করে, সেখানে গিয়ে আচমকা হাজির হয়েছি দেখে তিনি যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি বিস্মিতও হয়েছেন আমাদের ‘সাহস’ দেখে। আমাদের কিন্তু কোনো অসুবিধা হয়নি; মির্জাপুর স্ট্রিট এবং তাদের বাসা খুঁজে পেতে। ফুপুর দুই ছেলে আমার প্রায় সমবয়সী। ওরা অবশ্য তখন বাসায় ছিল না।
কলকাতায় তো আমরা মোটামুটি গুছিয়ে বসেছি; দেশ স্বাধীন হবে এমনই আশা, তাতে আমাদের সুবিধা হবে এটাও নিশ্চিত। কারণ আব্বার চাকরি কলকাতার হেড অফিসে, সেখান থেকে বদলি হয়ে মফস্বলে যে যাবেন এমন শঙ্কা নেই। স্কুলের হিন্দু সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কারও কারও সঙ্গে বন্ধুত্বও গড়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিযোগিতার জন্যও প্রস্তুত হচ্ছি। ম্যাট্রিক শেষ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হব এ রকমের ধারণা।
এর মধ্যেই যেটা ছিল কল্পনারও বাইরে, তার ঘোষণা এল। দেশ ভাগ হয়ে যাবে হিন্দুস্থান-পাকিস্তানে- জুনের ৩ তারিখে রেডিওতে শোনা গেল ওই কথা। ‘স্বাধীনতার’ ওই ঘটনার বাস্তবিক ফলটা কী দাঁড়াবে সে সম্বন্ধে আমরা ছোটরা তো নয়ই, আমাদের অভিভাবকরাও কিছুই ভাবতে পারছিলেন না। তারা হতবাক হয়ে গেছিলেন। দাঙ্গা দেখেছেন, এবার না জানি কী দেখতে হবে- এই বুঝি ছিল তাদের প্রশ্ন। কে কোথায় ছিটকে পড়বেন কে জানে?
চলবে...