বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক মেনোপজ সোসাইটি যৌথভাবে ২০১৪ সাল থেকে অক্টোবর মাসটিকে ‘বিশ্ব মেনোপজ মাস’ হিসেবে পালন করে আসছে। এর লক্ষ্য হলো- নারীরা মেনোপজের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে জানুক এবং এটি গ্রহণ করুক ভয় বা বিভ্রান্তি ছাড়াই।
মেনোপজের প্রতি সচেতনতা নারীর স্বাস্থ্য ও মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু শারীরিক নয়, সামাজিক ও মানসিক জীবনেও প্রভাব ফেলে। বিশ্ব মেনোপজ মাস নারীদের মনে করিয়ে দেয় যে, মেনোপজ জীবনচক্রের স্বাভাবিক অংশ এবং এটি গ্রহণের মাধ্যমে তারা স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে।
মাসিক ও মেনোপজের পার্থক্য
অনেকে মাসিক এবং মেনোপজকে একই বিষয় মনে করেন, কিন্তু এরা ভিন্ন।
মাসিক (রজঃস্রাব): মাসিক হলো নারীর প্রজননচক্রের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যেখানে জরায়ু থেকে রক্ত ও টিস্যু নির্গত হয়- যদি ডিম্বাণু পরিপক্ব না হয় বা গর্ভধারণ না ঘটে। এটি সাধারণত ২১-৩৫ দিনের মধ্যে একবার ঘটে, যা স্বাভাবিক ধরা হয়।
মেনোপজ: মেনোপজ হলো মাসিকের স্থায়ী বন্ধ হয়ে যাওয়া। যখন ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণ বন্ধ হয় এবং নারীর প্রজনন ক্ষমতা শেষ হয়, তখন এটি মেনোপজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সাধারণত ৪৫-৫৫ বছর বয়সের মধ্যে আসে, গড় বয়স প্রায় ৫০ বছর।
মেনোপজ নির্ণয়
মেনোপজ নির্ণয় মূলত উপসর্গ ও বয়সের ওপর নির্ভর করে। যদি একটানা ১২ মাস মাসিক বন্ধ থাকে, তবে চিকিৎসক এটিকে মেনোপজ বলে ধরে নেন। অনেক সময় অন্যান্য রোগের কারণে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে। তাই নিশ্চিত করা হয় রক্তে নারী হরমোনের মাত্রার (ইস্ট্রোজেন, প্রজেস্টেরন) পরিমাপ। থাইরয়েড বা অন্যান্য হরমোনজনিত সমস্যা পরীক্ষা। প্রয়োজনে জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের স্বাস্থ্য যাচাই।
কারণ
মেনোপজের প্রধান কারণ হলো বয়সজনিত পরিবর্তন, যখন ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যায়। এর পাশাপাশি আরও যেসব কারণ থাকতে পারে...
• অস্ত্রোপচারে ডিম্বাশয় কেটে ফেলা: ডিম্বাশয় সার্জারির কারণে হরমোন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
• ক্যানসার চিকিৎসার প্রভাব: কেমোথেরাপি দিলে এটা হতে পারে।
• জিনগত প্রভাব: পরিবারে আগেভাগে মেনোপজের ইতিহাস থাকলে একই প্রবণতা দেখা দেয়।
• ধূমপান ও মদ্যপান: এগুলো হরমোন নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটায়।
• অপুষ্টি ও মানসিক চাপ: অপুষ্টি ও মানসিক চাপ শরীরের ভারসাম্য নষ্ট করে আগেভাগে মেনোপজ ঘটাতে পারে।
লক্ষণ
মেনোপজের সময় শরীর ও মনে নানা পরিবর্তন দেখা দেয়।
শারীরিক লক্ষণ
• মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া।
• হঠাৎ শরীর গরম লাগা ও ঘাম ঝরা (হট ফ্ল্যাশ)।
• রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া বা নিদ্রাহীনতা।
• মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও ঘুমের সমস্যা।
• ত্বক শুষ্ক হওয়া, চুল পাতলা হওয়া বা ঝরে পড়া।
• ওজন বৃদ্ধি ও মেদ জমা।
• যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া, যোনিপথে শুষ্কতা বা জ্বালা।
• হাড় দুর্বলতা বা জয়েন্ট ব্যথা।
মানসিক লক্ষণ
• মনঃসংযোগ কমে যাওয়া।
• মেজাজ খিটখিটে বা অস্থিরতা।
• উদ্বেগ, হতাশা, হতাশাবোধ বৃদ্ধি।
• আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া।
• হঠাৎ রাগ, কান্না বা আবেগপ্রবণতা।
এই লক্ষণগুলো নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে সচেতন থাকলে ও জীবনধারার পরিবর্তন আনা হলে এগুলো অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
জটিলতা
মেনোপজের পর হরমোন কমে গেলে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-
• হাড় দুর্বলতা (অস্টিওপোরোসিস): ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড় ভাঙার ঝুঁকি বৃদ্ধি।
• হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি: রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে যায়, হৃৎপিণ্ডের চাপ বৃদ্ধি পায়।
• স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে সমস্যা: মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
• যোনি ও মূত্রনালির সমস্যা: শুষ্কতা, ব্যথা বা সংক্রমণ হতে পারে।
• দীর্ঘমেয়াদি অবসাদ ও মানসিক ভারসাম্যহীনতা: বিষণ্ণতা বা উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।
সাবধানতা ও প্রতিকার
খাদ্যাভ্যাস: দুধ, ছোট মাছ, ডিম, বাদাম, শাকসবজি ও ফল খেতে হবে। অতিরিক্ত চিনি, তেল ও লবণ এড়িয়ে চলতে হবে। পানি পর্যাপ্ত পরিমাণে পান করতে হবে। ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করা করতে হবে।
শরীরচর্চা: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করতে হবে। যোগব্যায়াম, মেডিটেশন মানসিক শান্তি দেয়।
মানসিক যত্ন: বই পড়া, সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা জরুরি। বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা। মানসিক চাপ কমাতে মেডিটেশন বা প্রার্থনা।
পরিশেষে
মেনোপজ কোনো সমাপ্তি নয়, বরং নারীর জীবনের নতুন সূচনা। এটি জীবনচক্রের একটি স্বাভাবিক অংশ, যা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে আরও সমৃদ্ধ করে। সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক দৃঢ়তা মেনোপজের এ সময়কে স্বাস্থ্যকর ও সুখময় করে তোলে।
লেখক: চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক


