চা বাগান মানেই অপার্থিব মুগ্ধতা ছড়ানো এক অস্তিত্ব। চা বাগান মানেই সবুজের অবারিত সৌন্দর্য। যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজের হাতছানি। সারি সারি চা বাগান, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর ঘন সবুজ আরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য যে কাউকেই আকৃষ্ট করে। চা বাগান বলতেই আমরা সিলেট বুঝি। পঞ্চগড়ে চা বাগান তৈরি হলেও খোদ চট্টগ্রামেই যে বিশাল চা বাগান আছে এটা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না।
হামিদ ভাইয়ের আমন্ত্রণে আমরা আগামীকাল সকাল বেলা বের হয়ে পড়ব নতুন গন্তব্য পানে। কর্ণফুলী নদীর তীরে এই চা বাগানটি কিন্তু নতুনও নয়, বরং বাংলাদেশের পুরোনো চা বাগানগুলোর একটি। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সফরভাটা গোডাউন বাজার ধরে সোজা ১০ কিলোমিটার দক্ষিণাংশে কোদালা ইউনিয়নে লুসাই কন্যা কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে সবুজ পাহাড় আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর রাঙ্গুনিয়া কোদালা এ চা বাগানের দেখা মিলবে।
ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় ঢাকার আরামবাগ থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হলাম। বাস নারায়ণগঞ্জ হয়ে যখন যাচ্ছিল, রাস্তার ধারে চোখে পড়ল রংবেরঙের সুতা শুকানোর দৃশ্য। রাস্তার ধারে গ্রামবাংলার চিরচেনা গ্রামীণ জীবন, দিগন্তজুড়ে থাকা সবুজ ফসলের মাঠ, খাল-বিল, নদীর চরাচর দেখতে দেখতে যাত্রাপথের সময়টুকু অনায়াসে কেটে যাচ্ছিল। আমাদের বিশাল দেহি বাহন এগিয়ে চলছে গন্তব্য পানে।
কুমিল্লা এসে যাত্রা বিরতিতে গেল আমাদের বাস। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি, বেশি বাক্য ব্যয় না করে বসে পড়লাম খাবার টেবিলে। গরম গরম ভুনা খিচুড়ি সঙ্গে মুরগির মাংস এককথায় অসাধারণ। নির্ধারিত বিরতির পরে আমরা আবারও গন্তব্য পথে রওনা হলাম। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলছে সঙ্গে আমাদের বহনকারী বাস। আমি এই ফাঁকে গুগলে সার্চ দিয়ে কোদালা চা বাগান সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। বিশদ কোনো তথ্য পেলাম না।
স্থানীয় ইতিহাস বলে, ব্রিটিশরা কর্ণফুলী নদী দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় কোদালায় বিস্তীর্ণ জায়গা দেখে চা বাগান করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই ১৮৯৪ সালে বাগানটি শুরু হয় ব্রিটিশ মালিকানায়, এর পরে বিভিন্ন সময় এর মালিকানা হাতবদল হয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৬ সালে তৎকালীন সরকার ব্যক্তি মালিকানায় লিজে চা বাগানগুলো ছেড়ে দেয়। এর মধ্যে প্ল্যাটাস বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কোদালা চা বাগান পরিচালনা করেছে। লোকসানের কারণে ১৯৯৩ সালে প্ল্যাটাস বাংলাদেশ থেকে আনোয়ার গ্রুপ চা বাগানটি লিজ নেয়। তারাও লাভের মুখ দেখতে না পাওয়ায় ২০০৪ সালে ৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে ব্র্যাক কোদালা চা বাগানের লিজ নেয়।
অন্যরা লাভের মুখ না দেখলেও ব্র্যাকের নির্দেশনায় কোদালা চা বাগান লাভের মুখ দেখে। আমরা এসে পৌঁছালাম চট্টগ্রাম শহরে ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ২টা। অস্থায়ী ডেরায় ব্যাগ রেখে বের হয়ে পড়লাম নতুন গন্তব্য পানে। আমার কাছে ভ্রমণ মানে শুধু জায়গা পরিবর্তন নয়, এটি জীবনের গভীর অনুভূতি ও শিক্ষা। আপনি যদি মানসিক শান্তি ও নতুন কিছু জানার খোঁজে বের হন, তবে চা বাগান ভ্রমণ সত্যিই আপনার জন্য আদর্শ স্থান। এই ভ্রমণ আপনাকে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই দেখাবে না, বরং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সহায়ক হবে। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে কিছু সময় বের করে একবার ঘুরে আসুন। ঝেরে ফেলুন নাগরিক জীবনের সব ক্লান্তি।
হোটেল থেকে বের হয়ে সিএনজিযোগে চলে গেলাম রাঙ্গুনিয়ার সফরভাটা গোডাউন বাজারে। সেখান থেকে গেলাম চা বাগানের গেটে। পদব্রজে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। বাগানের ভেতর পানে। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাখিদের মিষ্টি সুর, শীতল বাতাস, শান্ত পানি- সব মিলিয়ে এক মহাজাগতিক মায়ায় আমাদের মন ঢেকে গেল। বোধহয় সে জন্যই পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়তেন বিশ্ব বিখ্যাত মনীষীরা, শিখতেন জীবনের মর্মার্থ, জানতেন কেন প্রকৃতি তার নীরব ভাষায় মানুষকে জ্ঞানের অসীম আকাশে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
বিশ্বকে চেনাতেন নতুন করে, অর্জিত সেই জ্ঞান পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে ধাপে ধাপে। যেদিকে তাকাই সবুজ চায়ের বাগানের সমারোহ। আলো ছায়ার খেলা আর ব্রিটিশ স্থাপত্য রীতিতে বানানো বাংলো-বাড়িগুলোও দেখার মতো একেকটা জিনিস। উঁচু-নিচু টিলা আছে, তাতে আছে আঁকাবাঁকা সরু রাস্তা। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। হঠাৎ দেখা পেলাম অটোমেটিক মেশিন দিয়ে বৃষ্টির মতো করে চা গাছে পানি দেওয়া হচ্ছে। দেখা পেলাম বাগানের কর্মীরা চা পাতা আহরণ করছেন। কাজটি যতটা সহজ মনে হয়, অতটা অবশ্য সহজ নয়!
কারও কাজের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে আপনিও চেষ্টা করতে পারেন একবার। ছবি তোলার জন্য খুবই চমৎকার একটা জায়গা, সবুজ প্রকৃতি আর নীল আকাশের নিচে এলাকাটি আসলেই অনেক সুন্দর। চলতি পথে দেখা পেলাম রাবার বাগানের তার সঙ্গে অন্যান্য গাছের বনায়নও। এক জায়গায় দেখতে পেলাম গাছ থেকে রাবার রস সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেটা দিয়ে রাবারের বিভিন্ন আকারের প্লেট বানিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে শুকাবার জন্য। ভ্রমণ শেষে মননে গভীর শান্তির অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসার পর বুঝতে পারলাম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা জায়গায় গিয়ে, প্রকৃতির শুদ্ধ রূপ দেখতে না গেলে, জীবনের এক বড় অভিজ্ঞতা মিস করা হতো। এখানে গিয়ে প্রকৃতির স্পর্শে হৃদয়ের কোথাও একটা কোনায় নিজেকে আবিষ্কার করা যায়। জীবনের দিকে তাকানো যায় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে, যা আমার জন্য একধরনের উপলব্ধি- আমরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, কিন্তু প্রকৃতি আমাদের খুব ভালো শিক্ষক হতে পারে।
কীভাবে যাবেন
চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান হয়ে কোদালা চা বাগানের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রোডে চলাচলকারী বাসে চন্দ্রঘোনা লিচুবাগান অথবা সরফভাটা গোডাউন এলাকায় নেমে সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরের কোদালা চা বাগান যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে সড়ক, রেল এবং আকাশপথে চট্টগ্রাম যাওয়া যায়।
ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সৌদিয়া, ইউনিক, টিআর ট্রাভেলস, গ্রিন লাইন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী, সোহাগ, এস আলম, মডার্ন লাইন ইত্যাদি বিভিন্ন পরিবহনের এসি-নন এসি বাস চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম ভ্রমণ করতে চাইলে কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, সোনার বাংলা, সুবর্ণ এক্সপ্রেস, তূর্ণা-নিশীথা, মহানগর প্রভাতী/গোধূলী, চট্টগ্রাম মেইলে যাত্রা করতে পারেন। এ ছাড়া বেশকিছু বিমান ঢাকা থেকে সরাসরি চট্টগ্রাম ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে।
/রোদসী

.jpg)