ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
২৪ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি মেক্সিকোর চোখ গ্রুপসেরায়, দ.কোরিয়ার সামনে নকআউট নিশ্চিতের সুযোগ অপেক্ষা ফুরাচ্ছে ওচোয়ার! ইংল্যান্ডকে জিততে দিল না ঘানা মায়ের মৃত্যুতে দেশে ফিরে গেলেন ফ্রান্সের কোচ অতঃপর দেম্বেলে… প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডকে রুখে দিল ঘানা বিশ্বকাপে ইরানের সফর নীতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ক্যানভাসে চিরযৌবন নেইমারে ভয় নেই স্কটল্যান্ডের মাঠে হেঁটেই সফল মেসি রোনালদোর রেকর্ডের রাতে পর্তুগালের গোল উৎসব ৪১ বছরেও থামেননি রোনালদো, ভাঙলেন মেসির রেকর্ড পর্তুগিজ কিংবদন্তিতে ছাড়িয়ে শীর্ষে রোনালদো রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত?

দেশের মানচিত্রে এক টুকরা স্বর্গ বারিক্কা টিলা

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
দেশের মানচিত্রে এক টুকরা স্বর্গ বারিক্কা টিলা

যান্ত্রিক এই নগরে ব্যস্ততম দিনে সকাল শুরু হয় ঘড়ির অ্যালার্মে। শনিবার আসতেই মন বিষণ্ন হয়ে যায়। আগামীকাল আবার একঘেয়ে জীবনের পদাবলি শুরু। আর ভালো লাগছিল না কোলাহলমুক্ত ও সবুজে ঘেরা কোথাও যাওয়া দরকার। অনেক দিন কোথাও যাওয়া হয় না। প্রাণ কেমন যেন হায় হায় করছিল। এর মধ্যে হঠাৎ প্রদীপ দাদার কল বেজে উঠল।

দাদা আসছে সপ্তাহে সিলেটে আসবে ভ্রমণের নিমিত্তে। কোথায় যাওয়া যায় ভাবছিলাম হঠাৎ মনে হলো সুনামগঞ্জের দিকে ঘুরে এলে মন্দ হয় না। আমার মনটা খুশিতে নেচে উঠল যাই হোক শেষ পর্যন্ত কোথাও ঘুরতে যাওয়া হবে। সকাল হতেই তৈরি হয়ে নিলাম নতুন গন্তব্যে যাওয়ার নিমিত্তে। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯টা আমাদের চার চাকার বাহন এগিয়ে চলছে।

সুনামগঞ্জ অভিমুখে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। কিন্তু সুনামগঞ্জের কোন জায়গায় তা ঠিক করতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত দ্বারস্থ হলাম আমার অফিস সহকর্মী মুসা ভাইয়ের কাছে। তিনি বললেন বারিক্কা টিলার কথা বললেন। তবে সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হবে বুঝি বারিক্কার টিলায়।

যাত্রাপথের সঙ্গীদের অভিমত ওই পথে যাওয়ার। সিলেট থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার পথে গাছের ছায়া আমাদের অভিভূত করল। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমরা এসে পৌঁছালাম সুনামগঞ্জ শহরে। আমাদের চার চাকার বাহনের কাণ্ডারি পলাশ ভাই বললেন সুনামগঞ্জ শহর থেকে গাড়িতে গ্যাস ভরে নিতে হবে। শহরের বাইরে গেলে পরে গ্যাস বা তেলের কোনো পাম্প না-ও পাওয়া যেতে পারে। তাই আমরা গাড়িতে গ্যাস ভরার নিমিত্তে একটি সিএনজি পাম্পের সামনে দাঁড়ালাম। সেখানে বিশাল লাইন পরিলক্ষিত হলো কিন্তু কিছু করার নেই। বিরতির মাঝে আমরা পেট পূজার নিমিত্তে ঢুকে পড়লাম পাম্পের পাশের এক রেস্তোরাঁয়।

পরিবেশ খুব একটা ভালো না তারপরও কিছু করার নেই। সেই সকালে বের হয়েছি পেটে দানাপানি কারও পড়েনি। পরোটা, সবজি ও চায়ের অর্ডার দিল প্রদীপ দা। কিছু সময় পর আমাদের মাঝে পরিবেশন করা হলো খাবারগুলো। অনেক সময় পরে পলাশ ভাই গাড়িতে গ্যাস নিতে পারলেন। এবার আমাদের বারিক্কা টিলা অভিমুখে যাওয়া শুরু করলাম।

মুসা ভাই আগেই বলেছিলেন প্রথমে আমাদের যাদুকাটা নদীর তীরে যেতে হবে সেখান থেকে নৌকা করে পার হয়ে ইঞ্জিনচালিত যান করে যেতে হবে বারিক্কার টিলায়। আমরা চলছি পিচঢালা পথে, কিন্তু একটু পরপর পলাশ ভাই রাস্তার আগন্তুকে কাছে জানতে চাইছিলেন যাদুকাটা নদীর তীরে যাওয়ার রাস্তা কি ঠিক আছে? আমি মনে মনে অবাক হলাম একটি দর্শনীয় স্থান কিন্তু কোথাও কোনো পথের নির্দেশনা নেই। কিন্তু আমরা অন্য দেশের দিকে চোখ ফেললে দেখব শুধু পর্যটনশিল্পের বিকাশের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার আয় করছে। কিন্তু আমার দেশ এই ক্ষেত্রে একদম পিছিয়ে। যাই হোক পথের বিড়ম্বনা ভোগের পরে আমরা এসে পৌঁছালাম যাদুকাটা নদীর তীরে। অসাধারণ রূপ যাদুকাটা নদীর। যেন চোখের পাতা ফেলতে মনে চায় না।

একপাশে বাংলাদেশের সীমান্ত, ওপাশে ভারতের মেঘালয়, খাসিয়া পাহাড়। চিত্রপটে আঁকা এক অপূর্ব ক্যানভাস। আমাদের সঙ্গে সর্বকনিষ্ঠ ভ্রমণ সঙ্গী আদৃতা খুব খুশি, একটু পরপর বাবার মোবাইল দিয়ে ছবি তুলছে। আমরা ধু-ধু বালুময় পথ পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম নৌকার ঘাটের দিকে। সূর্যদেবের প্রখরতা আমাদের একটু সইতেই হলো।

নৌকার ঘাটে এসে এবার নৌকার জন্য অপেক্ষার পালা। আমাদের সঙ্গে বেশ কিছু যানবাহনও দেখলাম অপেক্ষা করছে। অপরূপা সীমান্ত নদী যাদুকাটা। এই নদীর পানি এমনই স্বচ্ছ, নিচের বালু স্পষ্ট দেখা যায়। যেন বালু ও পানি খেলা করছে। অপেক্ষার পালা শেষ করে আমরা নৌকায় উঠলাম বেশ বড় নৌকা। নৌকাটি মানুষ এর সঙ্গে সঙ্গে মোটরসাইকেল, ঠেলাগাড়ি নিল ওপারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আমি একটু ভয় পেলাম।

কারণ, আমি সাঁতার জানি না, তাই অল্প পানি দেখলেই বুকটা কেঁপে ওঠে। যাই হোক ফেরির মাঝি আমাদের ওপারে পৌঁছে দিলেন। ফেরি থেকে নেমেই আমরা তিন চাকার বাহন নিয়ে নিলাম বারিক্কার টিলা দর্শনের উদ্দেশে। গ্রামীণ ধুলা মাখা পথে আমরা এগিয়ে চলছি। উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দেওয়া একটু কষ্টসাধ্য তবে নতুন গন্তব্যে যাওয়ার আনন্দে সেসব তুচ্ছ।

প্রায় পৌনে একঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো। এবার হেঁটে ওপরে উঠতে হবে। আমরা সবাই নেমে হাঁটা ধরলাম। হেঁটে যত ওপরের দিকে উঠছিলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের তত বিমোহিত করছিল। মেঘালয় পাহাড়ে মেঘগুলো মনে হয় হাত বাড়ালেই ধরা যাবে। পাহাড়ের গায়ে নানা রঙের মেঘের খেলা। মেঘ কখনো সবুজ পাহাড়কে ডেকে দিচ্ছে, আবার কখনো তার রূপে বিলিয়ে দিচ্ছে তার আপন ভালোবাসায়। পাহাড় আর মেঘের সম্মিলনে এক অপরূপ শোভা।

আমরা টিলায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বারিক্কার টিলায় দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখে মনে হবে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ একটা দিন, যা আপনাকে বারবার স্মৃতির পাতায় নিয়ে যাবে। কথা হলো ওই এলাকার এক প্রবীণের সঙ্গে তিনি বললেন এই বারিক্কা টিলা বাংলাদেশের মানচিত্রে যেন স্বর্গের অংশ। একদিকে সবুজ পাহাড়, হাওরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।

প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বিল, নদী। বর্ষায় পাহাড়ি রূপবতী যাদুকাটার বুকে স্রোতধারা। আর হেমন্তে শুকিয়ে যাওয়া যাদুকাটার বুকজুড়ে ধু-ধু বালুচর। আইফেল টাওয়ার খ্যাত বারিক্কা টিলা থেকে ১২ মাস বিভিন্ন রূপবৈচিত্র্য উপভোগ করা যায়।

পাশে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি উঁচু-নিচু খাসিয়া পাহাড়, সবুজ বনায়ন ও মাটিয়া পাহাড়, যা প্রতিনিয়ত ছুটে আসা লোকজনের দৃষ্টি কাড়ে। এখানে রয়েছে হরেক রকম গাছগাছালি; রয়েছে বিশাল বনভূমিতে নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিতে বলীয়ান আদিবাসী ও বাঙালি বসতি। রয়েছে তাদের নিজেদের গোছানো বাড়িঘর ও ফসলি জমি।

আদিবাসীদের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে আপনি যখন বারিক্কা টিলায় উঠবেন তখন আপনার মনে হবে আপনি বাংলার আইফেল টাওয়ার থেকে পুরো তাহিরপুর উপজেলাকে দেখছেন। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে গ্রামগুলো দাঁড়িয়ে আছে। সবকিছু তখন আপনার চোখের সামনে অপার্থিব হয়ে উঠবে।

কীভাবে যাবেন
বারিক্কা টিলা বা বারেক টিলা দেখতে চাইলে প্রথমে সুনামগঞ্জ আসতে হবে। প্রতিদিন ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে মামুন ও শ্যামলী পরিবহনের বাস সরাসরি সুনামগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায় এবং মহাখালী থেকে ছেড়ে যায় এনা পরিবহনের বাস। এসব নন-এসি বাসে জনপ্রতি টিকিট কাটতে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা লাগে আর সুনামগঞ্জ পৌঁছাতে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। সুনামগঞ্জ থেকে সিএনজি কিংবা মোটরসাইকেল ভাড়া করে সরাসরি বারিক্কা টিলায় আসতে পারবেন।

/রোদসী 

রামু বৌদ্ধ বিহারে একদিন

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
রামু বৌদ্ধ বিহারে একদিন

ডান হাতের ওপর মাথা রেখে পা টান করে শুয়ে আছেন গৌতম বুদ্ধ! খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন তিনি। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। 

এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজারের রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি গ্রামের বৌদ্ধবিহারে। আমি আর আমার ভ্রমণসঙ্গীর আজ দ্বিতীয় দিন কক্সবাজারে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর ৫টা হবে, আমি গভীর নিদ্রায় শায়িত। সানন্দার ডাকাডাকির চোটে আমায় ঘুম থেকে উঠতেই হলো। ঘুম থেকে উঠেই চলে গেলাম সমুদ্র সৈকতের বালুকাবেলায়। 

সেখানে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে ফিরে এলাম আমাদের অস্থায়ী নিবাসে। সকালের নাশতা শেষ করতেই খাবারের টেবিলে সানন্দার প্রশ্ন–আজ কোথায় যাব আমরা? আমি বললাম, আমিও ভাবছি আজ কোথায় যাওয়া যায়। ভেবে কোনো উত্তর পাচ্ছি না প্রশ্নের। ভাবলাম এখানকার লোকদের কাছ থেকেই জেনে নিই কোথায় যাওয়া যেতে পারে আজ। 

আমি ইশারা দিতেই একজন এসে উপস্থিত। বললাম, ভাই আপনাদের শহরে এসেছি, নতুন কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় বলুন তো? উত্তরে হাসিমুখে বললেন, হিমছড়ি কি গিয়েছেন। আমি বললাম, গতকালই ঘুরে এসেছি। পরে বলল, ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে। আমি বললাম, তাও গিয়েছি। পরে বেচারা একটু চিন্তার মধ্যেই পড়ে গেলেন। কিছু সময় চিন্তা করে বললেন, তাহলে আপনি রামু উপজেলায় অবস্থিত ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি দেখে আসেন, ভালো লাগবে। আমি বললাম, ভালোই বলেছেন, পেপারে পড়েছি এই সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তির খবর। কিন্তু সৌভাগ্য হয়নি দেখার। আমি বললাম, ঠিক আছে তবে চলতি পথের ঠিকানাটা আমার পাইলটকে একটু বুঝিয়ে বলেন যেন আমরা সহজেই পৌঁছে যেতে পারি। 

এদিকে ভেবেছিলাম সব আইটেম চেখে দেখব, কিন্তু আর খেতে ইচ্ছা করছিল না। আমরা গন্তব্যের পানে যাত্রা শুরু করলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছালাম রামুতে। সেখানে হাতের বাঁয়ে প্রবেশ করলাম আমরা। দেখতে পেলাম বড় সাইনবোর্ড–‘এদিকে ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধের মূর্তি’। ওই দিকেই আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। 

আমরা চলছি এগিয়ে, দেখা পেলাম ধান খেতের। বেশ ভালোই লাগছিল চলতি পথে, কিছু দূর যাওয়ার পর বাধল বিপত্তি। সামনের ব্রিজ ভাঙা, তাই আর গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে আমরা পদব্রজে এগিয়ে গেলাম। 
চার-পাঁচ মিনিট হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। আমরা প্রবেশদ্বার পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম।

সেখানে জুতা রেখে নগ্ন পায়ে এগিয়ে গেলাম। দূর থেকে গৌতম বুদ্ধের পায়ের দেখা পেলাম। সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা। প্রায় শতাধিক সিঁড়ি পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতমবুদ্ধের মূর্তির কাছে। গৌতম বুদ্ধের মূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। গৌতম বুদ্ধ যেন খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। 

কিছু সময় আমরা দাঁড়িয়ে থাকলাম। কথা হলো ওই মন্দিরের এক ভিক্ষুর সঙ্গে। তিনি বললেন, ২০০৬ সালে সোনালি রঙের মূর্তিটি একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরির কাজ শুরু করেন শ্রীমৎ করুণা শ্রীভিক্ষু। 

২০০৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। মায়ানমার থেকে আসা দক্ষ একজন শিল্পীর সঙ্গে নিজেই স্থপতি হিসেবে কাজ করেন তিনি। করুণাশ্রী ভিক্ষু প্রায় দুই একর জায়গায় ২০০২ সালে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনাকেন্দ্র বৌদ্ধবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মূর্তি তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে তার। আমরা গৌতম বুদ্ধের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। পরে গেলাম পাশের গৌতম বুদ্ধের মন্দিরে। সেখানে গৌতম বুদ্ধকে দর্শন করে কিছু সময় থেকে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। আমরা বের হয়ে যাব, সে সময় এক ভিক্ষু আমাদের পেছন থেকে ডাকতে লাগলেন। বললেন, প্রসাদ খেয়ে যান আপনারা। 

খিচুড়ি এমনিতেই আমার পছন্দের খাবার, অন্যদিকে পেটেও খিদে লেগেছে, তাই আর না বললাম না। পেটপূজা শেষ করে আমরা এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। পাশেই দেখা পেলাম সবুজের সমাহার। বলা যায়, বন-পাহাড়-সমতলের মিলনমেলা যেন। প্রায় কোটি টাকা খরচে নির্মিত মূর্তিটি দেখতে শ্রীলঙ্কা, বার্মা, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বৌদ্ধ ধর্ম‍াবলম্বী দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকরা নিয়মিত আসেন এখানে।

কীভাবে যাবেন? 
এই ‘ভুবন শান্তি ১০০ সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি’ দেখতে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার। বাসভাড়া ঢাকা থেকে ৮০০-২২০০ টাকা। তাই দেশের যে প্রান্তেই থাকুন প্রথমেই চলে আসুন কক্সবাজার। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও মিনিবাসে রামু থানার উত্তর মিঠাছড়িতে এলেই পাওয়া যাবে বৌদ্ধবিহারটি। 

রাবার বাগান স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিমে (চা-বাগান) বৌদ্ধবিহারটি অবস্থিত। কক্সবাজার শহর থেকে ট্যাক্সি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা টমটম নিয়ে যেতে পারেন বৌদ্ধবিহারে। ভাড়া হবে জনপ্রতি ৪০ টাকা। আর রিজার্ভ গেলে ভাড়া পড়বে ২০০-২৫০ টাকা।

/এমটি 

বিমানবাহিনী জাদুঘরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০২:৩২ পিএম
বিমানবাহিনী জাদুঘরে

আকাশে ওড়ার স্বপ্ন কমবেশি আমাদের সবারই আছে। পাখির মতো আকাশে ভেসে বেড়াতে না পারলেও এখন উড়োজাহাজে করে মানুষ আকাশে উড়তে পারে। স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন দেখতে কার না ভালো লাগে। সেটা যদি হয় ‘যুদ্ধবিমান’ বিষয়ক কোনো নিদর্শন–তাহলে কৌতূহলের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তেমনই কৌতূহলের এক জাদুঘর ‘বাংলাদেশ বিমান জাদুঘর’। 

যেখানে রয়েছে ডাকোটা বিমানসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। অনেক দিন ধরে শুধু পরিকল্পনাই করে যাচ্ছিলাম বিমান বাহিনী জাদুঘর ঘুরতে যাব। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে হয়ে উঠছিল না। শেষ পর্যন্ত আমি আর পৃথু বের হলাম ভ্রমণ গন্তব্যের পানে। শুক্রবার বলে রাস্তায় তেমন যানজট নেই বললেই চলে। 

প্রায় ৩৯ মিনিটেই আমরা এসে উপস্থিত হলাম জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে। শুরুতেই কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিলাম। জাদুঘরের বাইরে দিকটা দেখে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ছোটখাটো একটি পরিসরের মধ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করার পর বুঝতে পারলাম এটি আয়তনের দিক থেকে বেশ বড়।

জাদুঘরটি বিশাল জায়গাজুড়ে অবস্থিত এবং এখানে একটি ছোটখাটো বিনোদনকেন্দ্রও আছে। নরম ঘাসের ওপর দিয়ে পদব্রজে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। অন্য সব জাদুঘর থেকে এ জাদুঘরটি আলাদা। এটি কোনো বদ্ধ ঘরে নয়। 

খোলামেলা সবুজ প্রান্তরে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে এ ঐতিহাসিক জাদুঘর। জাদুঘরের মধ্যে প্রবেশ করলে চোখে পড়ল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিমান বাহিনীর গৌরবের জঙ্গিবিমান, হেলিকপ্টার ও রাডার। আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। আমরা দর্শনীর বিনিময়ে চেপে বসলাম হেলিকপ্টারে। ছোটবেলায় খুব আগ্রহ ছিল কীভাবে বিমান আকাশে ঘুরে বেড়ায়। 

একজন আমাদের বলছিলেন কীভাবে হেলিকপ্টার আকাশে ডানা মেলে। আজ নিজের চোখে দেখতে পেলাম। মোট ১৯টি বিমান এবং ৩টি রাডার রয়েছে এ জাদুঘরে। যুদ্ধবিমান ডাকোটার পাশাপাশি রয়েছে ‘অ্যালিউট’ হেলিকপ্টার। এটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান বাহিনীর সেনানিবাসে আঘাত হানা হয়েছিল। মূল গেট থেকে খানিক এগোলে চোখে পড়ল বিশাল একটি বিমান।

 

বাংলাদেশের প্রথম পরিবহন উড়োজাহাজ এটি। রাশিয়ার তৈরি এন-২৪ বিমানটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে ১৯৭৩ সালে ‘বলাকা’ নামে সংযোজিত হয়। বিমানটির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪৪ জন। বলাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। বলাকা ছাড়াও আরও তিনটি বিমানে দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। বিমানগুলোয় প্রবেশের জন্য টিকিট মূল্য ৩০ টাকা। বিমানগুলোয় প্রবেশ করলে প্রদর্শন করা হয় বিমান বাহিনীর ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র। দেখা পেলাম হান্টার বিমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ বিমানটি দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের ওপর হামলা চালানো হতো। ওই সময়ে এটি খুবই শক্তিশালী এবং নির্ভরশীল বিমান ছিল। 

বিমান বাহিনীতে ১৯৮৯ সালে চীনের তৈরি ‘এফটি-৭ বিমান’ যুদ্ধবিমান হিসেবে প্রথম সংযোজিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৮৬ যুদ্ধবিমানটি ব্যবহার করে। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়ে বিমানটিকে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় ফেলে রেখে যায়। পরে বিমান বাহিনীর প্রকৌশল কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানরা বিমানটি মেরামত করেন এবং ১৯৭২ সালে সফলভাবে উড্ডয়ন করান। বিমানটি ১৯৪৭ সালের তৈরি। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ ডিসেম্বর বিমান বাহিনীর বৈমানিকরা কানাডায় নির্মিত অটার-৭২১ বিমান দিয়ে হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটিতে আঘাত হানে। সেটিও আছে এই জাদুঘরে। রয়েছে মিগ-২১ এফএল বিমান। বিমানটি প্রধানত আকাশ প্রতিরক্ষা ও ভূমি পাহারার জন্য ব্যবহৃত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এ বিমানটি আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশ থেকে ভূমিতে আক্রমণের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রাখে। ‘ন্যাট-৯১৬ বিমান’ জঙ্গিবিমানগুলোর মধ্যে সর্বাধিক হালকা এবং আয়তনে ছোট।

১৯৫০ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীতে এটি অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। সে সময়ে ন্যাট বিমান আকাশযুদ্ধে অত্যন্ত চৌকস বিমান হিসেবে পরিচিতি ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে তিনটি ন্যাট বিমান পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট (এফ-৮৬) ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর বগুড়ায় আকাশযুদ্ধে এ বিমানটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখে। জাদুঘরে স্থাপিত প্রতিটি নিদর্শনের সঙ্গে আছে তথ্যাবলি। আগ্রহীরা তা থেকে জেনে নিতে পারেন প্রয়োজনীয় তথ্য। 

মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর শহিদদের স্মরণ করতে তৈরি করা হয়েছে শহিদ কর্নার। জাদুঘরে দর্শনার্থীদের খাবারের সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রাঙ্গণের দক্ষিণ দিকে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ফুড কোর্ট। এছাড়া বিমান বাহিনীর বিভিন্ন দ্রব্যাদি দিয়ে সজ্জিত হয়েছে স্যুভেনির শপ ‘নীলাদ্রি’। শিশুদের মনোরঞ্জন ও উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য শিশু পার্কের পাশাপাশি ফুটপাথের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে জিরাফ, শিম্পাঞ্জি, হরিণ ইত্যাদি নানা রকম পশুপাখির প্রতিকৃতি। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘চিলড্রেন হেভেন’। রয়েছে পানির ফোয়ারাও। এছাড়া পাহাড়ের আদলে তৈরি হচ্ছে ‘থিম পার্ক’।

বিমান জাদুঘরের সময়সূচি
বিমান বাহিনী জাদুঘর সোম থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্র থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি।


বিমান জাদুঘরের টিকিট মূল্য
৫০ টাকা মূল্যের টিকিট সংগ্রহ করে জাদুঘরে প্রবেশ করা যায়। মাত্র ৩০ টাকায় বিমান ভ্রমণ! এখানে ৩০-১০০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে ভেতরের হেলিকপ্টার বা বিমানে ওঠা যায়।

কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে আগারগাঁও চলে আসুন। রাজধানীর গুলিস্তান থেকে বিহঙ্গ, হিমাচল, স্বাধীন, হাজি ট্রান্সপোর্ট, ইটিসি ট্রান্সপোর্টসহ অনেক বাসে আগারগাঁও যেতে পারবেন। বিমান বাহিনী জাদুঘর বললেই নামিয়ে দেবে। এছাড়া রামপুরা থেকে হিমাচল, আলিফ পরিবহনেও যেতে পারবেন। কিংবা নিজস্ব পরিবহন বা সিএনজি নিয়ে ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে সহজে যেতে পারবেন।

/এমটি

পদ্মার জলের হাতছানি...

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
আপডেট: ২৩ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
পদ্মার জলের হাতছানি...

রাজধানীর কোলাহল ছেড়ে একদিনের জন্য কোথাও বেড়াতে যেতে চাইলে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। সেখানে গেলে পদ্মার সৌন্দর্য যেমন আপনাকে মোহিত করবে, তেমনি খেতে পাবেন পদ্মার তাজা ইলিশ। আমরা সাধারণত পরিচিত জায়গা ছাড়া ঘুরতে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি না। নিরাপত্তার কারণেও আমরা অনেক জায়গায় যেতে চাই না। 

যান্ত্রিক নগরী ঢাকার আশপাশে ঘোরার জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেকে ছুটির দিনগুলো ঘুমিয়েই কাটান। অনেকের আবার ঘুরতে যাওয়ার আগে কত কিছু চিন্তা করতে হয়! সময়, পর্যাপ্ত অর্থ এবং ভালো ভ্রমণ সঙ্গী নিয়ে একটা চিন্তা থেকেই যায়।

হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ও সময় নেই দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার, অথচ নিজেকে প্রাণবন্ত করার জন্য একটু নান্দনিক এবং মনোরম পরিবেশের প্রয়োজন। তাই হন্যে হয়ে খুঁজছেন ঢাকার আশপাশেই কোনো মনোরম পরিবেশ।

এমন সবকিছুর সমাধান দিতে মৈনট ঘাটকে বেছে নিতে পারেন। আমি খুব ঘুমপ্রিয় মানুষ, তাই শুক্রবার এলেই দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। কয়েক দিন ধরে চিন্টু কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছিল ওকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

গত শুক্রবারও ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ার জন্য কোথাও যেতে পারিনি আর সেই ধারাবাহিকতায় আজও দেরি করে উঠেছি ঘুম থেকে। এদিকে চিন্টুর মন খুব খারাপ, আজও যেতে পারল না কোথাও। 

আমি মনে মনে ভাবলাম ছোট মানুষ বেশ কিছুদিন ধরে বায়না ধরেছে ঘুরতে যাবে, তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া উচিত। এদিকে বেশ কিছুদিন ধরে ফেসবুকের কল্যাণে মৈনট ঘাটের নাম শুনছিলাম। তাই ভাবলাম দূরত্ব কম যেহেতু তাই বিকেল বেলাতেই চিন্টুকে নিয়ে বের হব। এখন আর কিছু না বলে চিন্টুকে সারপ্রাইজে দেব। 

কাল বেলা ব্যাংকের কিছু কাজ ছিল তা শেষ করলাম দুপুর হতেই চিন্টুকে বললাম বিকেল ৩টার মধ্যে রেডি থাকিস। ঠিক বিকেল ৩টায় আমরা গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের সামনে থেকে মৈনট ঘাটের উদ্দেশে বাসে রওনা হলাম।

শুক্রবার তাই যান্ত্রিক শহরের কোলাহল কিছুটা হলেও কম আমাদের ফিটনেসবিহীন বাস এগিয়ে চলছে গন্তব্যস্থলে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছালাম মৈনট ঘাটে। চিন্টু তো মৈনট ঘাটে এসে খুব খুশি দোহারের কার্তিকপুরের যে জায়গাটি পদ্মাপাড়ে গিয়ে মিশেছে তার নাম মৈনট ঘাট। এখানে ডানে-বাঁয়ে বালু চিকচিক করা স্থলভূমি থাকলেও সামনে শুধু রুপার মতো চকচকে পানি।

মৈনট পদ্মাপাড়ের একটি খেয়াঘাট। এখান থেকে প্রতিদিন ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে। খেয়া পারাপারের জন্য জায়গাটির পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। তবে এখন সেটা জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা হিসেবেও।

এত দিন অনেকটা আড়ালে থাকলেও ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনট ঘাট। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া মৈনট ঘাটের নতুন নাম হলো–মিনি কক্সবাজার! বিস্তীর্ণ জলরাশির ঢেউ আর সঙ্গে শরতের নির্মল আকাশ–এ এক অনবদ্য কাব্য। ছুটির দিন তাই অনেক মানুষের পদচারণে মুখর মৈনট ঘাট। জন মানবের পদচারণা দেখে মনে হলো নগরবাসীর কাছে নতুন এক নির্মল বিনোদনের স্থান। 

মিনি কক্সবাজারের তীরে আমরা হেঁটে বেড়াচ্ছি। খানিক পরপর মাছ ধরার ট্রলার ছুটে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকা দেখে মাছ কেনার জন্য এগোচ্ছেন। দরদাম ঠিক থাকলে অনেক ভ্রমণপিপাসু মাছ কিনে নিচ্ছেন। পুরো নদীর তীর ও তার আশপাশের এলাকা সমুদ্রসৈকতের মতো করে সাজানো। হঠাৎ চিপসের প্যাকেট পড়ে আছে দেখে খুব খারাপ লাগল, আমরাই আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছি। 

পদ্মা এত বিশাল যে, ওপারের কিছুই দেখা যায় না, দেখা যায় না ডান-বাঁয়ের কোনো বসতি। নদীর পারে ট্রলার ও স্পিডবোটের মহাজনদের মেলা। আপনি চাইলে ট্রলারে চেপে ওপারের চরভদ্রাসন থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। আবার ঘণ্টা চুক্তিতে ট্রলার বা স্পিডবোট ভাড়া করে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন। 

যা-ই করেন এখানে সময়টা কিন্তু বেশ কাটবে। আমরা ট্রলারে চেপে বসলাম ঘুরে বেড়ালাম প্রমত্ত পদ্মায়। আমাদের ট্রলারের মাঝি রহিম মিয়া বললেন এখানে সকালবেলাটা খুব ভালো কাটে, দুপুর কিছুটা মন্থর, তবে বিকেলবেলা অনেক বেশি জমজমাট। 

সোনা রোদের গোধূলিবেলার তো কোনো তুলনাই চলে না। নদীতে পাল তোলা নৌকার ঘুরে বেড়ানো আবার কখন উথাল-পাতাল ঢেউ–এ এক অন্য রকম অনুভূতি। দেখতে দেখতে সূর্য দেবের বিদায়বেলা চলে এল, সূর্য দেবের বিদায়বেলায় প্রকৃতি অসাধারণ রূপ ধারণ করেছে। নদীতে ভ্রমণ শেষে চিন্টু ইলিশ মাছ ভাজা খাওয়ার বায়না ধরল। তাই তাকে নিয়ে ঘাটে অবস্থিত একটি হোটেলে গেলাম। সেখানে ইলিশ মাছ ভাজা খেলাম—কী অসাধারণ স্বাদ। এখানে ইলিশ ১৩০ থেকে ১৯০ টাকা। বড় সাইজের ইলিশ খেতে চাইলে আগেই অর্ডার দিতে হবে আপনাকে। 

কীভাবে আসবেন
ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাস। 
৯০ টাকা ভাড়া আর দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন মৈনট ঘাট। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। যারা প্রাইভেট কার অথবা বাইক নিয়ে আসতে চাচ্ছেন, তারা এই বাসের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন। আসতে সুবিধা হবে।
 
সচেতনতা 
মৈনট ঘাটে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যদি আশপাশে ময়লা দেখতে পান তাহলে নিশ্চয় আপনার ভালো লাগবে না। তাই পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। যেখানে-সেখানে পানির বোতল, চিপস-বিস্কুটের প্যাকেটসহ কোনো ময়লা ফেলা যাবে না। আপনি নিজে যেমন ফেলবেন না, তেমনি কাউকে ফেলতে দেখলে তাকে নিরুৎসাহিত করাটাও আপনার দায়িত্ব। আরেকটি কথা সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় পদ্মার বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো।

/এমটি

ঐতিহ্যের খোঁজে গ্রিনিচ শহরে

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
ঐতিহ্যের খোঁজে গ্রিনিচ শহরে

বেরিয়ে পড়েছি কেন্টের উদ্দেশে। কেন্ট হাসপাতালের প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা. শাহাদত হোসেন ও ভাবির আমন্ত্রণে আমরা ছয়জন ছুটছি লন্ডন ছেড়ে কেন্টের উদ্দেশে। সম্পর্কে চিকিৎসক সাহেব আমার ভাসুর। গাড়ি চালাচ্ছে আমার সহোদর ব্যারিস্টার মুয়ীদ খান, আইন পেশায় সেন্ট্রাল লন্ডনে তার দীর্ঘ প্রবাসজীবনে দুবার নিজের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেছেন লন্ডন ও ওয়েলসের ২০ হাজার আইনজীবীর মধ্যে নির্বাচিত ‘বেস্ট হিউম্যান রাইটস ল’ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। আগেই পরিকল্পনা করা হয়, আমরা গ্রিনিচ শহর দেখতে দেখতে কেন্ট শহরে ঢুকব। 

ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি শহরের নাম গ্রিনিচ। এটি লন্ডনের চেয়ারিং ক্রস জাংকশন থেকে ৫ দশমিক ৫ মাইল পূর্ব-দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত। কয়েক শ’ বছর ধরে এটি কেন্ট প্রদেশের একটি শহর ছিল এবং প্রদেশটি ভেঙে গেলে পরবর্তী সময়ে গ্রেটার লন্ডনের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল হয়। গ্রিনিচের সমুদ্রের সঙ্গে জড়িত ইতিহাস, অসংখ্য ‘টিউডর’ রাজবংশের জন্মস্থান এবং গ্রিনিচ মানমন্দিরের জন্য এ শহরটি বিখ্যাত। ১৮ শতকে এটি ভ্রমণকারীদের জন্য একটি জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হওয়ায় এখানে অনেকগুলো ম্যানসনের মতো বড় বড় বাড়ি, প্রাসাদ ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রিনিচের সঙ্গে সম্পর্কিত সমুদ্র সংযোগগুলো বিংশ শতাব্দীতে উদযাপিত হয়। এই স্থানের ওপর দিয়ে মূল মধ্য রেখা অতিক্রম করেছে। এখানে পৃথিবীর স্ট্যান্ডার্ড সময় গণনা করার মান মন্দির অবস্থিত।

আমরা নামলাম হক্সমুরের নকশায় সেন্ট আলফেজ চার্চটি দেখতে। ঐতিহাসিক স্থাপনা এটি। গ্রিনিচের টাউন সেন্টারের পশ্চিমে যা ১৭১৪ সালে নির্মাণ করা শুরু হয়ে ১৭১৮ সালে সম্পন্ন হয়। একটি নারকীয় ও জঘন্যতম হত্যার শিকার হন সেন্ট আলফেজ। জানা যায়, অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিখ্যাত একটি জাতির নাম ভাইকিং যারা দক্ষিণ স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে আগত এবং সমগ্র ইউরোপ থেকে শুরু করে পশ্চিমের আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, ভিনল্যান্ড পর্যন্ত এরা জলদস্যুতা, লুটতরাজ ও কিছু কিছু সময় ব্যবসা-বাণিজ্য চালনা করত।

সামরিক শাসনামলে কেন্ট প্রদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এই ভাইকিং বাহিনীর বিশাল শিবির স্থাপিত হয় এবং এ বাহিনী এক সময় কেন্ট আক্রমণ করে। ১০১২ সালে তারা কান্টারবেরি শহর দখল করে এবং অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতের কান্টারবেরির একজন বিখ্যাত বিশপ আলফেজকে বন্দি করে নিয়ে যায় যাকে গ্রিনিচের সেনাশিবিরে প্রায় সাত মাস ধরে বন্দি করে রাখা হয় (সে সময় গ্রিনিচ কেন্ট প্রদেশের অংশ ছিল)। আলফেজের কাছ থেকে তারা মুক্তিপণ হিসেবে বিরাট অঙ্কের পাউন্ড দাবি করে কিন্তু আলফেজ তা দিতে রাজি হননি।

ফলে ইস্টার সানডের যে আট দিনব্যাপী ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় তাদের মধ্যে একটি শনিবারে মৃত্যুদণ্ড হিসেবে আলফেজের গায়ে তারা পশুর হাড় ও মাথা নিক্ষেপ করতে শুরু করে, একপর্যায়ে কুঁড়ালে গাঁথা এরকম একটি হাড় তার মাথার খুলি ফুটো করে ঢুকে যায় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করার পরও শেষ হাড়টি তার রক্তে না ভেজা পর্যন্ত তারা তাকে আঘাত করে গিয়েছিল। এ ঘটনার পর আলফেজকে সেন্ট উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং ১২ শতকে প্যারিশ চার্চ তার নামে উৎসর্গ করা হয়।

গ্রিনিচ ও এর আশপাশের নদীগুলো বেশ গভীর। গ্রিনিচের দক্ষিণ দিকের অঞ্চলটি গ্রিনিচ পার্ক থেকে ব্ল্যাকহেথ পর্যন্ত খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে, যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ১০০ ফিট। দেখতে পাচ্ছি এখানকার উচ্চতর এলাকাগুলো এক ধরনের পাথুরে পাললিক মাটির স্তর দিয়ে গঠিত। এই মাটিকে ব্ল্যাকহেথ বেড বলা হয়। আসলে টেমস নদীর অববাহিকার দক্ষিণদিকের একটি প্রশস্ত প্ল্যাটফর্মের ওপর গ্রিনিচ অবস্থিত। গ্রিনিচ মূলত শীতপ্রধান এলাকা।

গ্রিনিচ মানমন্দির (Royal Observatory, Greenwich) ইংল্যান্ডের লন্ডন শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। রয়্যাল অবজারভেটরি গ্রিনিচ পার্কের চূড়ায় অবস্থিত। এটি একটি ভৌগোলিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটির দ্রাঘিমাগত মান ০° অর্থাৎ এর ওপর মূলমধ্যরেখা গেছে। দিক নির্ণয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্থান। গ্রিনিচ মানমন্দির শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি সময় এবং স্থানের বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু। গ্রিনিচের মান মন্দির (রয়্যাল অবজারভেটরি), ন্যাশনাল মেরিটাইম জাদুঘর, রানির বাড়ি ও ক্যাটি সার্ক একত্রে রয়্যাল মিউজিয়াম গ্রিনিচ নামে পরিচিত। 

প্রাইম মেরিডিয়ান ও জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ পৃথিবীর সময় অঞ্চল এবং মানচিত্র তৈরিতে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। এটির সময়কে প্রমাণ ধরে অন্যান্য জায়গার সময় নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায়। এটির সাহায্যে অন্যান্য স্থানের দ্রাঘিমাগত মান নির্ণয় করা যায়। ১৬৭৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রিনিচ মানমন্দিরটি জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সময় গণনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এখান থেকেই পৃথিবীর সময় অঞ্চলগুলোর জন্য আদর্শ সময় বা গ্রিনিচ মান সময় (Greenwich Mean Time - GMT) নির্ধারণ করা হয়।

এই মানমন্দিরের মধ্যে প্রাইম মেরিডিয়ান অবস্থিত, যা পৃথিবীকে পূর্ব ও পশ্চিম গোলার্ধে ভাগ করেছে। জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ হিসেবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই স্থানটি বর্তমানে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত এবং এখানে বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সরঞ্জাম প্রদর্শন করা হয়। গ্রিনিচ মান ০° অবস্থিত ধরে বাংলাদেশের অবস্থান ৯০° পূর্বে অর্থাৎ বাংলাদেশের সময় ৯০×৪ = ৩৬০ মিনিট বা ৬ ঘণ্টা আগে। তাই বলা যায় গ্রিনিচ সময়ের সঙ্গে ছয় ঘণ্টা যোগ করলে বাংলাদেশের সময় হয়।

প্রাইম মেরিডিয়ান পৃথিবীর দ্রাঘিমাংশের (longitude) জন্য জিরো ডিগ্রি রেখা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৃথিবীর ভূভাগকে পূর্ব গোলার্ধ ও পশ্চিম গোলার্ধ এই দুই ভাগে ভাগ করে। গ্রিনিচ মেরিডিয়ানকে ১৮৮৪ সালে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। মজার বিষয় হলো, মেরিডিয়ান রেখা একটি সরলরেখা হলেও প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে পাঠানোর সময় কিছুটা ঝিকঝাক রয়েছে। এর মূল কারণ, সময় অঞ্চলের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার (International Date Line) সংযোগ নিশ্চিত করা।

প্রাইম মেরিডিয়ানের বিপরীত দিকে ১৮০° দ্রাঘিমাংশে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অবস্থিত। এটি দিন এবং সময়ের হিসাব নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারিখ রেখা অতিক্রম করলে সময় এক দিন যোগ বা বিয়োগ হয়। পৃথিবী ঘুরতে ২৪ ঘণ্টা সময় নেয় এবং এই ২৪ ঘণ্টা ৩৬০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ডিগ্রি অতিক্রম করতে সময় লাগে চার মিনিট। তাই, পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানে সূর্য ওঠা এবং অস্ত যাওয়ার সময় আলাদা হয়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরে প্রবেশ করতেই দেখতে পাই একটি সুন্দর বাগান। বাগানের কেন্দ্রে দুটো ডলফিনের মূর্তি রয়েছে, যা একটি সূর্য ঘড়ি। এই সূর্য ঘড়ির সাহায্যে প্রাকৃতিক সূর্যালোকের ভিত্তিতে সময় নির্ণয় করা হয়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর টেলিস্কোপ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের সরঞ্জাম। এখানে দুটি প্রাথমিক টেলিস্কোপ রয়েছে, যা ১৭ ও ১৮ শতকে ব্যবহৃত হতো। এই টেলিস্কোপগুলো বসিয়েছিলেন প্রথম জ্যোতির্বিদ জন ফ্ল্যামস্টিড। গ্রিনিচ মানমন্দিরে একটি ক্যামেরা অবস্কিওরা রয়েছে, যা প্রথম দিকের জ্যোতির্বিদ্যার এক অনন্য উদ্ভাবন। এটি সূর্যের প্রতিবিম্ব এবং কুইন্স হাউসের পিলারগুলোর প্রতিফলন পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো।

প্রাইম মেরিডিয়ানে দাঁড়ানো একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। মাটিতে তামার পাতের মাধ্যমে চিহ্নিত জিরো ডিগ্রি রেখা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। কেউ যদি ডান পা তামার পাতের পূর্ব দিকে এবং বাম পা তামার পাতের পশ্চিম দিকে রাখেন, তাহলে একসঙ্গে দুই গোলার্ধে দাঁড়িয়ে থাকার এক অনন্য অসাধারণ অভিজ্ঞতা লাভ করবেন। আমার দুই ছেলে খুব মজা পেল এই অভিজ্ঞতা নিতে গিয়ে। পা পাল্টে পাল্টে তারা মজা নেয় এবং ছবি তুলে স্মৃতিবন্দি করে আনন্দমুহূর্তগুলো। 

এই স্থান ঐতিহাসিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাজা প্রথম উইলিয়ামের সময়কাল থেকে। গ্রিনিচ প্রাসাদ, যেটি বর্তমানে মেরিটাইম জাদুঘর; রাজা অষ্টম হেনরি ও তার কন্যা প্রথম মেরির জন্মস্থান। প্রথম এলিজাবেথ ও ট্যুডররা গ্রিনিচ প্রাসাদ তাদের হান্টিং লজ হিসেবে ব্যবহার  করতেন। গ্রিনিচের এই প্রাসাদ দুর্গটি রাজা অষ্টম হেনরির বিশেষ প্রিয় ছিল। তার উপপত্নীদের আবাসস্থল ছিল এটি। মূল প্রাসাদ থেকে এখানে তিনি সহজেই যাতায়াত করতে পারতেন বলে এটি তার বিশেষ প্রিয় জায়গা ছিল।

১৮৮৪ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে গ্রিনিচ মেরিডিয়ানকে প্রাইম মেরিডিয়ান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এতে ২৫টি দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন এবং আন্তর্জাতিক আলোচনা স্থলে স্থির হয়ে যে লন্ডনের গ্রিনিচ মানমন্দিরের ওপর দিয়ে যে দ্রাঘিমা রেখা গেছে সেটাই হবে মূল দ্রাঘিমারেখা মূল মধ্যরেখা। তৎকালীন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বৈশ্বিক প্রভাব ছিল। পৃথিবীর অধিকাংশ নাবিক এবং মানচিত্র গ্রিনিচকে সময়ের জন্য ব্যবহার করছিল।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নত কেন্দ্র হিসেবে গ্রিনিচের ভূমিকা অপরিসীম। গ্রিনিচ পরিদর্শনের একটি আকর্ষণীয় উপায় হলো লন্ডনের ক্যাবল কারে চড়া। এটি টেমস নদীর ওপর দিয়ে চলে এবং দর্শনার্থীদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। নদী পারাপারের সময় লন্ডনের নানা মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

গ্রিনিচ মানমন্দিরের উপরিভাগ থেকে লন্ডনের স্কাইলাইন অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। এখান থেকে ক্যানারি ওয়ার্ফ, লন্ডন আই এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গ্রিনিচ মানমন্দির শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি সময় এবং স্থানের বৈজ্ঞানিক নির্ণয়ের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু। ভবনটিকে সহসাই ‘ফ্ল্যামস্টিড হাউস’ নামেই ডাকা হতো। বর্তমান সময়ে সায়েন্টিফিক কাজকর্মগুলো অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তাই গ্রিনিচের এই ভবনটি এখন মূলত জাদুঘর হিসেবেই বিবেচ্য হচ্ছে। স্থানটি ভ্রমণপিপাসীদের জন্য একটি দর্শনীয় স্থান বটে। হাজার হাজার মানুষ এখানে ঘুরতে ও দেখতে আসেন। মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক বিবেচনায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। পর্যটকদের জন্য গ্রিনিচ একটি অনন্য গন্তব্য, যেখানে ঐতিহ্য, বিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মেলবন্ধন ঘটে।

/এস লুপিন

বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ছাড়াই দেশ ভ্রমণের সুযোগ

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম
আপডেট: ০৯ মে ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম
বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভিসা ছাড়াই দেশ ভ্রমণের সুযোগ
ছবি: সংগৃহীত

সেশেলেস (Seychelles) বিশ্ব ভ্রমণে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আমার ১৫৯তম দেশ। সেশেলস–১১৫টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দেশ। প্রথমে আমি এই দেশের নাম শুনে ভেবেছিলাম, এটা বুঝি কোনো বড় ফ্রেঞ্চ কলোনি। কিন্তু পরে জানতে পারি, এটি ১৯৭৬ সালের ২৯ জুন ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও তার আগে বহু বছর ফরাসিদের শাসনে ছিল। তাই এখানকার প্রধানত ভাষা ফরাসি, পাশাপাশি ইংরেজি ও ক্রেওলও প্রচলিত।

বাংলাদেশ থেকে যখন বের হয়েছিলাম তখনই ইচ্ছা ছিল আলজেরিয়ায় যাব, কিন্তু হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ায় মার্চ মাসে থাকার সময় ইরান যুদ্ধ বেধে গেল, সেজন্য ইমিরেটস কিংবা কাতার এয়ারলাইনসে ভ্রমণ করা দুষ্কর হয়ে গেল। 

তখনই মাথায় এল সেশেলেস দেশটি, যা বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন। যখনই চিন্তা সঙ্গে সঙ্গেই টিকিট কাটব, তারপর হঠাৎ মনে পড়ল আমাদের বাংলাদেশ থেকে এর আগে কে ভ্রমণ করেছে? ফেসবুক ঘেঁটে দেখলাম, Flyer ট্রাভেল এক্সপ্রেসের সুমন বাহাদুর ভাই বেড়াতে গিয়েছিলেন। তার কাছ ফোন করলেই টিকিট কাটার আগেই তিনি বললেন, ১০ ইউরোতে একটি অন অ্যারাইভাল পারমিট নিতে হয়। 

তারপর আমি অনলাইনে টিকিট কেটে ব্যাংকক থেকে ইন্ডিগোয় চেপে বসলাম এই নতুন দেশের উদ্দেশে। ফ্লাইটে ভাড়া অবশ্য খুব বেশি নয়, আফ্রিকার কোনো দেশে যাওয়ার জন্য। 

তারপর ২৪ মার্চ চলে এলাম এই দেশে। এয়ারপোর্টে নেমেই অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করল। সিকিউরিটির লোকরা হোটেলগুলো একটু যাচাই-বাছাই করে নিল। তারপর সহজেই চলে গেলাম মাহি এয়ারপোর্ট দিয়ে। হোটেল থেকে আগে থেকেই ট্রান্সপোর্ট বলা ছিল ৭৫ ইউরো, যা আমার জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। নীল সমুদ্রের সুন্দর রিসোর্টে চলে গেলাম। থাকা হলো প্রায় ১১ দিন।

এই দেশটি আফ্রিকার অনেক দেশের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত নয়–এটি আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি। এখানকার ট্যুরিজম মন্ত্রণালয় ও লেবার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ হয়েছিল এবং তাদের আন্তরিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়।

দেশটি আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য–নীল সমুদ্র, বিশাল পাথরের গঠন, সবুজ পাহাড়ে ঘেরা সাদা বালুর সৈকত আর সারি সারি পাম গাছ চোখধাঁধিয়ে দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কচ্ছপগুলোরও দেখা মেলে এখানে, যা সত্যিই অসাধারণ।

সেশেলসের রাজধানী ভিক্টোরিয়া–বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাজধানীগুলোর একটি। মাহে (Mahé) দ্বীপে এয়ারপোর্টটি অবস্থিত, যদিও এটি আকারে ছোট। আমি যতগুলো আফ্রিকার দেশ ভ্রমণ করেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ধনী বলে মনে হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য যাচাই করেও দেখা যায়, এটি আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে উন্নত। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার স্থানীয় এবং বাকিরা প্রবাসী কর্মী।

এখানকার গড় বেতন প্রায় ৬২০ ইউরো, যা ইউরোপের কিছু দেশের সমতুল্য। মজার বিষয় হলো, এখানে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, একটি পুরুষ ও তিনটি নারী এবং তারা আধুনিক, আত্মনির্ভরশীল ও শিক্ষিত। তারা খুবই উদার, আনন্দপ্রিয় ও সহজ-সরল। অনেক সময় মনে হয় না যে আমি আফ্রিকায় আছি—বরং ইউরোপের কোনো দ্বীপে আছি।

এখানকার প্রায় সব পণ্যই আমদানি করা হয়, তাই জীবনযাত্রার খরচ একটু বেশি। যেমন–একটি টমেটোর দামই প্রায় ১৪০ টাকা! শ্রমিকের সংকট থাকায় সবকিছুর দামই তুলনামূলক বেশি। তবু দেশের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত এবং নিয়ম-শৃঙ্খলা খুব ভালো।

বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলে এখানে শ্রমবাজারে ভালো সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর হানিমুনের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি গন্তব্য। অনেকেই মালদ্বীপ ঘুরে ফেলেছেন–তাদের জন্য সেশেলস হতে পারে চমৎকার বিকল্প।

এখানে বেশির ভাগ হোটেলে সেলফ-ক্যাটারিং সুবিধা আছে, অর্থাৎ আপনি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে নিজেই রান্না করতে পারেন। অনেক হোটেলেই হালাল খাবারের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা লাগে না–শুধু হোটেল বুকিং, রিটার্ন টিকিট এবং অনলাইনে আগমনী কার্ড পূরণ করলেই হয়।

তবে বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য এটি সাশ্রয়ী নয়। সেলফ-ক্যাটারিং হোটেলের খরচ প্রতিদিন ১২০ থেকে ২০০ ইউরো (দুজনের জন্য)। আর বিলাসবহুল হোটেলগুলোর দাম ৪৫০ ইউরো থেকে শুরু করে ৪০০০ ইউরোরও বেশি হতে পারে। খাবারে প্রায় ২৫ ইউরো (প্রতি ব্যক্তি) খরচ হয়।

আমি এখানে কয়েকটি দ্বীপে ঘুরেছি–প্রাসলিন আইল্যান্ড ছিল দারুণ সুন্দর। Les Ducs Resort এবং Paradise Sun হোটেলগুলো বেশ ভালো লেগেছে, তুলনামূলক কম খরচে ভালো সেবা দেয়। প্রথমে আমি থেকেছিলাম টাকামাকা বিচে, মাহে দ্বীপে–সেটিও অসাধারণ। বোভালন সৈকত খুবই আকর্ষণীয়, যেখানে বিচ শ্যাক ও বোট হাউস রেস্টুরেন্টে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং সন্ধ্যাটা খুব সুন্দরভাবে কাটানো যায়। এখানে জাতীয় ফল কিংবা জাতীয় প্রতীক কোকো।

যে গাছটি চমৎকার, ছেলে ও মেয়ে দুটি গাছের সমন্বয় এখানে ফল ধারণ করে। মেয়ে গাছটির ফলের গঠন মেয়েদের শরীরের নিম্নাংশের মতো, যা একটি নারী গোপন অংশের মতো দেখতে আর ছেলে গাছটির লিঙ্গটি দেখতে ঠিক পুরুষের লিঙ্গের মতো। এই গাছটির ফল ধরে সবুজ রঙের একটি লেজার আছে, তার মাধ্যমে সে ছেলে গাছটির কাছ থেকে এক ধরনের সাদা পাউডার খেয়ে মেয়ে গাছটির কাছে গিয়ে তার গোপন অংশের চেটে পাউডার ছড়ায়, তারপর সেখানে ফল ধরে। এই গাছটি পৃথিবীতে অনন্য হওয়ায় একে তাদের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।

এখানে বেশ কিছু ক্যাসিনো রয়েছে, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে ভালো খাবার পাওয়া যায় এবং পরিবেশও উপভোগ্য–খেলার জন্য নয়, বরং সময় কাটানোর জন্য। তবে অবাক হয়েছি ক্যাসিনোগুলোয় বাংলাদেশি শ্রমিকে ভর্তি, বিশেষ করে শুক্রবার ও শনিবার রাতে। তাছাড়া মাছ ধরার বড় বড় ট্যুর রয়েছে, যারা সমুদ্রে বড় মাছ ধরতে চান তাদের জন্য এটি চমৎকার অভিজ্ঞতা হতে পারে। সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা ছিল ফ্রুট ব্যাট খাওয়া–৪৫ ইউরো দিয়ে খেয়েছিলাম। মাংসের স্বাদটা একটু মিষ্টি, আর রান্নাটাও ছিল চমৎকার। যারা ভিন্নধর্মী খাবার পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

এখানে বড় কোনো শপিং মল নেই, তাই শপিংয়ের ঝামেলা ছাড়া নিরিবিলিতে হানিমুন বা পারিবারিক সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ। আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই অসাধারণ যে ছবি তুলতে তুলতে হাতই ব্যথা হয়ে যেতে পারে! সব মিলিয়ে, যারা বাংলাদেশি পাসপোর্টে সহজে ভ্রমণ করতে চান, তাদের জন্য সেশেলস একটি অসাধারণ গন্তব্য হতে পারে। আমার এই দুই সপ্তাহের ভ্রমণ ছিল সত্যিই স্মরণীয়।

/এমটি