অনিক ছেলেটা বেশ চঞ্চল। বয়স নয় বছর। অদ্ভুত সব কাণ্ড করে বেড়ায় সারাক্ষণ। বলা চলে পুরো ক্লাসের সবাইকে সে একাই মাতিয়ে রাখে। পড়ালেখাতেও ভালো। তাই সব শিক্ষকের মুখপাত্র। আর ভালো হবে নাইবা কেন, পরিবারের সবাই কত শিক্ষিত।
অনিকের মা একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। বাবা শিক্ষক। শিক্ষাদীক্ষায় পরিবারের সবাই সমাজের উঁচু পর্যায়ের মানুষ।
সাভারের রেডিও কলোনি থেকে সিআরপি হাসপাতালের দিকে যে রোডটা গেছে তারই এক গলিতে অনিকের বসবাস। বাসায় বাবা-মা ছাড়াও আরেকজন সদস্য আছে। বড় ভাই। নাম রায়হান। বাকপ্রতিবন্ধী। সারাক্ষণ বাসায় থাকে।
অনিক পৃথিবীতে আসার আগ অব্দি বেশকিছু বছর অনিকের মা রেহানা বড়সড় রকমের ডিপ্রেশনে ভুগেছেন। অন্য সন্তানরা যখন তাদের মাকে মা বলে ডাকত, তখন একবুক হতাশা নিয়ে একদৃষ্টিতে রায়হানের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না রেহানার।
অতঃপর অনিক পৃথিবীতে এসেছে। রেহানার ‘মা’ ডাক শুনতে না পারার আক্ষেপ আর দুঃখ ঘুচে গেল।
অনিকের জন্মদিন জুলাই মাসের সতেরো তারিখ। প্রতিবছর এই দিনটাকে কেন্দ্র করে সে ভীষণ এক্সাইটেড থাকে। এ বছর তার পরিকল্পনা জন্মদিনে ক্লাসের সব সহপাঠীকে বাসায় এনে জন্মদিন উদযাপন করবে। রেহানা তার সন্তানের কোনো কথায় অমত করেন না।
জুলাইয়ের প্রথম থেকেই দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। নিজেদের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছে ছাত্রসমাজ। জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে এসে আন্দোলনের মোড় ঘুরে গেল। তার পর থেকে সময় যত এগোচ্ছে আন্দোলন তত জোরালো হচ্ছে।
পনেরো জুলাই থেকে পুলিশও এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ছে। দেশে স্বাভাবিকতার কোনো ছিটেফোঁটা নেই।
ষোলো জুলাই। দুপুর ২টার মতো বাজে।
অনিক বসে আছে তার মায়ের রুমে। তাকে আজ খুব আনন্দিত দেখাচ্ছে। কারণ সন্ধ্যা হতেই মায়ের সঙ্গে সে থানা স্ট্যান্ডে যাবে অর্ডার দেওয়া কেকটা আনতে। অনিকের যেন আর সময় কাটছে না। কখন সন্ধ্যা হবে।
ছেলের এমন দিশেহারা অবস্থা দেখে রেহানা বললেন-
‘তোমার বুঝি সময় কাটছেই না?’
‘হ্যাঁ, আম্মু।’
‘ঠিক আছে, আমি তাহলে নিচে নিয়ে তোমার জন্য এক প্যাকেট বেলুন কিনে আনি। তুমি এখন থেকেই বেলুন ফুলিয়ে ঘর সাজানো শুরু করো। দেখবে সময় কেটে যাবে।’
‘তোমার যেতে হবে না আম্মু। আমাকে টাকা দাও আমি নিজেই নিয়ে আসছি।’
‘বাইরে অবস্থা ভালো না বাবা। তোমার যেতে হবে না।’
অনিক তার মায়ের কথাকে কোনোরকম পাত্তা না দিয়েই হাত থেকে টাকা নিয়ে ছুটে নিচে চলে গেল।
বাসার নিচে এসে অনিক যেন মস্ত এক গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে। গলিতে একপাশে বেশকিছু ছেলে স্লোগান দিচ্ছে। অপর পাশ থেকে পুলিশ দৌড়ে আসছে। ছেলেরা সবাই হাতে ইটের টুকরো নিয়ে ছুড়ছে পুলিশগুলোর দিকে। পুলিশও গুলি ছুড়তে শুরু করে দিয়েছে।
অনিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বুঝতে পারছে না। চারদিকে মানুষের ছোটাছুটি। গুলি ছুড়তে ছুড়তে পুলিশ এদিকে এগিয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে এমন বদলে যাওয়া পরিবেশে অনিক কিছু ভাবতে পারছে না। কোনদিকে যাবে সে। শেষমেশ দোকানের পাশে রেখে দেওয়া এক রিকশার পেছনের গিয়ে দাঁড়াল সে। অনিকের দেখাদেখি আর দুজন মাঝবয়সী লোক রিকশার পেছনে এসে বসে পড়ল।
গোলাগুলির শব্দে রেহানা আর স্বাভাবিক নেই। জানালা দিয়ে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকিয়ে অনিককে খুঁজছে। কোথাও না দেখতে পেরে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
নিচের অবস্থা আরও ভয়ানক। অপরদিক দিয়ে পুলিশের আরেকটা গাড়ি এসেছে। অনিকরা যে রিকশার পেছনে গুটিসুটি মেরে বসেছিল, পুলিশের গাড়িটা এসে থেমেছে ঠিক তার পেছনে সোজাসুজি। কাজেই আর গুলি করতে বিলম্ব করেনি।
হিংস্র পশুর মতো দুপাশে থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ছে পুলিশ। তার ঠিক মাঝামাঝিতে একটা রিকশার পেছনে তিনজন মানুষ। চোখ বন্ধ করে চুপচাপ গুটিসুটি মেরে বসে আছে অনিক। পেছন দিক থেকে করা একটা গুলি হঠাৎ অনিকের মাথায় পেছন দিকে লাগল। তৎক্ষণাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল অনিক।
ঘরে থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসার পর রেহানা যখন সিঁড়ি দিয়ে নামছিল। দোতালায় সিঁড়ির সামনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দৃষ্টি থেমে গেল তার। একটা রিকশার পেছনে তার আদরের ছেলে গুটিসুটি মেরে ভয়ে কাঁপছে। এমন অবস্থায় একটা গুলি তার মাথায় লাগে। অনিকের মাটিতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখে রেহানা নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ‘অনিক’ বলে চিৎকার দিলেন। কিন্তু তার গলা থেকে তেমন কোনো আওয়াজই বের হলো না।
বাদ এশা অনিকের জানাজা নামাজ। সাড়ে ৮টার মতো বাজে। অনিকের সব সহপাঠী এসেছে। অথচ অনিক প্রত্যাশা করেছিল ঠিক রাত ১২টার সময় তার বন্ধুরা এসে তাকে চমকে দেবে। নির্ধারিত সময়ের আরও কয়েকঘণ্টা আগে এলেও তাদের একবার জড়িয়ে ধরার ভাগ্য হলো না অনিকের।
রেহানা বেগম তার অতীত জীবনেই ফিরে এলেন আবার। ‘মা’ ডাক শুনতে না পারার আক্ষেপটা তার পিছু ছাড়ল না কখনই।
নাসিম আহমেদ শুভ
ঢাকা কলেজ, অর্থনীতি বিভাগ
ধানমন্ডি, ঢাকা।
তারেক
.jpg)
.jpg)