পাখিরা একে অপরের সঙ্গে কিচিরমিচির স্বরে যোগাযোগ করে। প্রতিটি পাখির নিজস্ব ভাষা আছে। নিজেদের ভাষায় তারা ভাব আদান প্রদান করে। তবে মানুষের জন্য তাদের ভাষা বোঝা দুষ্কর। তবুও পৃথিবীতে অনেকেই আছেন যারা পাখির ভাষা বোঝেন এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। যদিও বর্তমানে পাখির ভাষা বোঝার জন্য প্রযুক্তি আছে।
বিজ্ঞানীরা কিছুটা পাখির ভাষা বা যোগাযোগ ব্যবস্থা বোঝার প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন। তা ছাড়া পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত আল্লাহ প্রেরিত নবি হজরত সুলায়মান (আ.) পাখিদের ভাষা বুঝতে পারতেন। এটা ছিল তার বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা । বর্তমানে পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনা না ঘটলেও অনেক মানুষ আছেন যারা পাখিদের ভাষা বা ডাক রপ্ত করেছেন এবং সেই ডাকে পাখিদের ডাকতে পারেন।
সিঙ্গাপুরে আছে এমন একজন যে কিনা প্রতিদিন হাজার হাজার পাখির সঙ্গে ভাব বিনিময় করেন। তার নাম রাজালি বিন মোহাম্মদ হাবিদিন। তিনি কাজ করেন সিঙ্গাপুরের জুরং বার্ড পার্কে। যিনি ছোটবেলায় প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন। তবুও তিনি পাখিদের ভাষা বোঝেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। জুরং বার্ড পার্ক হাজার হাজার পাখির অভয়ারণ্য। এখানে পাখিদের দেখাশোনা করতে কাজ করেন অসংখ্য কর্মী। তাদের মধ্যে একজন রাজালি। তিনি অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। কেননা তিনি পাখিদের ভাষা বুঝতে পারেন।
তিনি পাখিদের সঙ্গে অঙ্গভঙ্গি এবং শারীরিক ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। তিনি পাখিদের তাদের ‘আচরণ এবং ব্যক্তিত্ব’ দিয়ে চিনতে পারেন। পাখিরা সব তার বন্ধু। অঙ্গভঙ্গি এবং মালয় ভাষার মিশ্রণে যোগাযোগ করেন তাদের সঙ্গে। পার্কে তোতাপাখি থেকে শুরু করে হর্নবিল পর্যন্ত ৫ হাজারেরও বেশি পাখি বাস করে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তোতাপাখি, হাইসিন্থ ম্যাকাও পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিয়ে ডাকাডাকি বন্ধ করে দেয়। পাখিদের দেখেই তিনি বুঝতে পারেন তার অবস্থা কেমন। ৪৮ বছর বয়সী এই রাজালিকে ‘পাখির ফিসফিসারি’ নামে একটি ডাকনামও দিয়েছেন।
অন্যদিকে উরুগুয়ের জুয়ান পাবলো কুলাসো কখনো পাখি দেখেননি। কিন্তু তার শ্রবণশক্তির মাধ্যমে তিনি ৩ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন পাখির শব্দ শনাক্ত করতে পারেন এবং ৭২০টিরও বেশি প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন। জুয়ান জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তবুও তিনি শব্দ শুনে পাখিদের শনাক্ত করতে পারেন। ২৯ বছর বয়সী জুয়ানের মতো এই বিরল ক্ষমতা, প্রতি ১০ হাজার জনের মধ্যে মাত্র একজনের এটি আছে। তার বাবা তাকে একটি বিশ্বকোষ থেকে পাখিদের ডাকের অডিও ক্যাসেট পড়ে শোনান। এভাবে তিনি পাখিদের ডাক মুখস্থ করেন।
২০০৩ সালে পাখির প্রতি তার ভালোবাসার কারণে তিনি পাখির ডাক শেখায় আসক্ত হয়ে পড়েন। এক পাখি বিশেষজ্ঞ তাকে রেকর্ডার দেন এবং তা দিয়ে পাখির ডাক শেখা শুরু করেন। জুয়ান এখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে পাখির ভাষা শিখছেন। তিনি সম্প্রতি অ্যান্টার্কটিকায় দুই মাসের যাত্রা সম্পন্ন করেছেন, যেখানে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল, বন্য এবং সবচেয়ে রহস্যময় মহাদেশ থেকে শব্দ রেকর্ড করেছেন।
দৃষ্টিশক্তিহীন কুলাসো আলোর পার্থক্য করতে পারে, ফলে সে রাত ও দিনের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। তবে তিনি আকার, রূপ, এমনকি পাখির রং বুঝতে পারেন না। তার কান সব সময়ই পৃথিবীর সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম। প্রকৃতির শব্দ চিনতে এবং রেকর্ড করার দক্ষতা তাকে ডকুমেন্টারি সাউন্ডট্র্যাকের জন্য কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। ব্রাজিলে এক দশকেরও বেশি সময় থাকার পর কুলাসো বর্তমানে তার জন্মস্থান মন্টেভিডিওতে বসবাস করছেন, যেখানে তিনি জৈব-শব্দবিদ্যা এবং প্রকৃতির শব্দ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।
২০১৪ সালে কুলাসোর পাখিদের শব্দের মাধ্যমে চিনতে পারার দক্ষতা তাকে ন্যাট জিও টিভির একটি অনুষ্ঠানে ৪৫ হাজার ডলারের পুরস্কার এনে দেয়। তিনি বেশির ভাগ অর্থ অডিও সরঞ্জামে বিনিয়োগ করেছিলেন। চূড়ান্ত পরীক্ষায়, তাকে ২৫০টি পাখির দল থেকে এলোমেলোভাবে বাছাই করা ১৫টি পাখির শব্দ শনাক্ত করতে হয়েছিল এবং তিনি প্রতিটি পাখিকে শব্দ শুনেই চিনতে পেরেছিলেন।
তারেক
.jpg)
.jpg)