ইতিহাস বলতেই আমাদের ভাবনায় চলে আসে কেবল রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ-বিজয় কিংবা সাম্রাজ্য বিস্তারের কাহিনি। অথচ ইতিহাসের একটা বড় অংশ জুড়ে গাথা আছে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার নানা জটিল কাহিনি, যেগুলো আমাদের সভ্যতা গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
তবুও তাদের আমরা খুব একটা আগলে রাখতে চাইনি কখনো। আজ আমরা রাজা-বাদশাহ নয় বরং সাধারণ মানুষের এক অদ্ভুত পেশার ইতিহাস সম্পর্কে জানব । সেই অদ্ভুত পেশার নাম ‘নকার-আপার’ (Knocker-Upper)।
এক সময় এটি ছিল ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের কিছু অঞ্চলের মানুষের জীবনের অপরিহার্য একটা অংশ, কারণ এই পেশায় নিয়োজিত থেকেই সংসার চলত অনেকের। যান্ত্রিক অ্যালার্ম ঘড়ি তখনো আবিষ্কার হয়নি, কিন্তু কাজের চাপে ঠিক সময় ঘুম থেকে উঠা ছিল অনিবার্য আর সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই উদ্ভব হয় এই অদ্ভুত পেশা। অর্থাৎ মানুষের সময়মতো ঘুম থেকে জাগানোর দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলেন একদল বিশেষ ব্যক্তি যাদের নাম নেওয়া হলো নকার-আপার।
পেশার পটভূমি: শিল্পবিপ্লবের সময় ইংল্যান্ডে ব্যাপকহারে কল-কারখানা, কয়লাখনি এবং রেলওয়ের উন্নয়ন ঘটে। লাখ লাখ মানুষ তখন গ্রাম থেকে শহরে চলে আসে জীবিকার সন্ধানে। এই নতুন শ্রমজীবী সমাজের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল সময়মতো কাজে পৌঁছানো। সেই সময় সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ঘড়ি ছিল না। অ্যালার্ম ক্লক তো দূরের কথা, অনেকের কাছে সময় দেখার কোনো উপায়ই ছিল না। এই প্রেক্ষাপটেই ‘নকার-আপার’ পেশাটি ছড়িয়ে পড়ে। এরা মূলত এমন পেশাজীবী যারা ভোরবেলা বা মাঝ রাতের পর থেকে ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করতেন, যাতে পেশাজীবীরা সময়মতো কাজে যেতে পারেন। মানব অ্যালার্ম ক্লক বললে ভুল হবে না।
নকার-আপাররা প্রতিদিন মাঝ রাতেই কাজে বের হতেন। অনেক সময় মাঝ রাত থেকেই তাদের কাজ শুরু হতো। যাদের সঙ্গে আগেই ঘুম ভাঙানোর চুক্তি থাকত, সেসব বাড়ির জানালায় গিয়ে দরজায় বা জানালায় লাঠি দিয়ে ঠুকতেন প্রয়োজনে ছোট পাথর ছুড়ে মারতেন। মানুষকে জাগানোর জন্য সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে মটরদানা ছুড়ে মারার পদ্ধতিটি। মূলত একটি লম্বা ধাতব নল ব্যবহার করা হতো মটরদানা ছুড়তে। এই ধাতব নলের মাধ্যমে জানালার কাচে ছোট ছোট মটরদানা ছুড়ে দেওয়া হতো। ফলে আচমকা অনবরত শব্দে ঘরের ভেতরের মানুষ জেগে উঠত। এই কাজ সহজ মনে হলেও এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। প্রায় প্রতিদিনই ভোর বেলা ঠাণ্ডা হাওয়া থাকুক কিংবা বৃষ্টি, কর্মীদের এর মধ্যেও বাইরে কাজ করতে হতো। এ ছাড়া ভুলে কোনো বাড়িতে না যাওয়াটা বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো তখন। কারণ, এতে লোকজনের চাকরি হারানোর মতো ব্যাপার জড়িয়ে থাকত।
.jpg)
নকার-আপারদের মধ্যে অন্যতম পরিচিত নাম হলো মেরি স্মিথ। ইস্ট লন্ডনে তিনি একজন দক্ষ এবং জনপ্রিয় নকার-আপার ছিলেন। তার ছবি আজও ইতিহাসপ্রেমীদের মাঝে ঘুরে বেড়ায়। তিনি একটি লম্বা পিতলের নলের মাধ্যমে জানালায় মটরদানা ছুড়ে লোকজনকে জাগাতেন। জানা যায় মেরি স্মিথ প্রতি সপ্তাহে ছয় পেনি পেতেন এই কাজের জন্য, যা সে সময়ের দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের জন্য মানানসই ছিল। মেরির ছবি আজ ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। ছবিতে দেখা যায়, তিনি কনুই ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছেন, মুখে নল ধরে জানালার দিকে তাকিয়ে যেন নিজের নিশানা নিশ্চিত করছেন।
সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকায় তখনকার সময়ে (নকার-আপার) এ পেশার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তাদের ওপর নির্ভর করেই হাজার হাজার মানুষ সময়মতো কাজে যেতেন। এই পেশা মূলত গড়ে উঠেছিল শ্রমঘন শিল্প এলাকায় যেমন- লন্ডন, ম্যানচেস্টার, লিভারপুল, বার্মিংহামের মতো এলাকাগুলোতে। এসব এলাকার শ্রমিকদের মধ্যে সময়ানুবর্তিতা ছিল অত্যন্ত জরুরি, কারণ কারখানায় নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে ঢুকতে দেওয়া হতো না। নকার-আপার পেশায় নারী-পুরুষ উভয়ই কাজ করতেন। অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি পরিবারকে বা একটি পাড়াকে দায়িত্ব নিয়ে জাগিয়ে তুলতেন। নারীরা সাধারণত জানালায় মটর ছুড়ে দিতেন আর পুরুষরা লম্বা লাঠি দিয়ে জানালায় ঠুকতেন।
চুক্তি: নকার-আপারদের সঙ্গে শ্রমিকদের একটি মৌখিক চুক্তি হতো। কেউ কেউ এক মাস বা সপ্তাহ আগেই অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখতেন। অনেকে আবার প্রতিদিন সকালে মুদ্রা দিয়ে দিতেন। তবে জানা যায়, কিছু কিছু বড় ধরনের কারখানা থেকে নকার-আপার নিয়োগ দেওয়া হতো যেন তাদের কর্মচারীরা সময়মতো আসেন এবং কাজের বিঘ্ন না ঘটে।
এই পেশার সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও যুক্ত ছিল। যেমন- পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, আবহাওয়ার বাধা আর সবচেয়ে বড় ভয় নিরাপত্তার ঝুঁকি। কারণ, অনেক সময় চোর বা অপরাধীর চোখে পড়লে বিপদ হতো। এ ছাড়া একদিন কাউকে না ডাকলে চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত।
এই পেশা বিলুপ্তির কারণ: ১৯৪০-এর দশক থেকে ধীরে ধীরে ‘নকার-আপার’ পেশা বিলুপ্ত হতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ-
-অ্যালার্ম ক্লকের আবিষ্কার ও জনপ্রিয়তা
-সাশ্রয়ী দামে ঘড়ি কিনতে পারা
১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে আর কোনো পেশাদার নকার-আপার পাওয়া যেত না। ধীরে ধীরে এটি ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেয়।
নকার-আপার পেশাটি আজ আর না থাকলেও তা সাহিত্য, সিনেমা, ইতিহাস এবং চিত্রকলায় জায়গা করে নিয়েছে। অনেক উপন্যাস, শিশুতোষ গল্প এবং ইতিহাসভিত্তিক বইতে এই পেশা নিয়ে আলোচনা আছে। ব্রিটিশ ইতিহাসভিত্তিক কিছু ডকুমেন্টারিতেও নকার-আপারদের জীবনচিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
আজকের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি সেই সঙ্গে হারিয়েছি কিছু সংস্কৃতি, কিছু গল্প, কিছু পেশা। তবে ইতিহাস তাদের বাঁচিয়ে রাখবে যদি আমরা জানার চেষ্টা করি, আগ্রহ প্রকাশ করি।
তারেক/
.jpg)
.jpg)