গ্রামজুড়ে শোরগোল পড়ে গেছে। মানুষের মুখে মুখে গরু চুরি কথা ভেসে বেড়াচ্ছে। গ্রামের হাটের চায়ের দোকানগুলোয় গরু চুরির ঘটনা গল্পের রসদ জোগাচ্ছে। একটি গরু চুরি বিষয়ে গ্রামজুড়ে এতটা হইচই কেন?
তখন বয়স কম। পুরো বিষয়টি প্রথম দিকে ঠাহর করতে পারিনি। গ্রামের আখের খলায়, যেখানে আখ ভাঙিয়ে গুড় তৈরি করা হয়, সেখানে কাজ থামিয়ে মানুষের জটলা চলছে। যেখানেই যাই শুধু গরু চুরির ইতিবৃত্ত। তবে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হতে আমার বেশি সময় লাগল না। গরু যে চুরি করেছে, সে আর কেউ নয়। আলীপুর গ্রামের প্রধান মোড়ল ইব্রাহিম খাঁর ছেলে। যিনি পুরো গ্রামের ওপর মাতব্বরি করেন দক্ষতার সঙ্গে। আর তার ছেলেই কি না গরু চুরি করে ধরা খেল? এ কথাটিই গ্রামের কেউ মেনে নিতে পারছে না। গ্রামজুড়ে তাই তো চলছে ফিসফাস। গরুচোর গ্রামের প্রধান মাতব্বরের ছেলে হওয়ায় কেউই প্রকাশ্যে আলোচনা করতে সাহস পাচ্ছে না। তাই বলে তো মানুষের কানাঘুষা থামিয়ে রাখা যায় না।
এদিকে মাতব্বর ছেলের ঘটনা শুনেই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন। ছেলে গরু নিয়ে অন্য এলাকায় উঠেছেন। তাকে ফিরিয়ে আনার দেনদরবার চলছে। এদিকে যাদের গরু চুরি গেছে তারাও মাতব্বরের পদক্ষেপের দিকে চেয়ে আছেন। তিনি কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন গরুচোর ছেলের। এতক্ষণে অন্য কেউ হলে তার আর রেহাই হতো না। মাতব্বর দোয়ালদারকে দিয়ে ধরে আনাতেন। তারপর মাতব্বরের কাচারি ঘরে বসিয়ে পিটিয়ে আগে লাল করে তারপর চলত বিচারকার্য। কিন্তু মাতব্বর এখনো ছেলেকে হাতের নাগালে পায়নি। ছেলে এলাকা থেকে গভীর রাতে গরু চুরি করে দূরের একটি হাটে বিক্রি করতে গিয়েই ধরা খেয়েছে। যাদের গরু চুরি হয়েছে তারা তক্কে তক্কে ছিলেন চোর গরুটি হাটে বিক্রি করতে তোলে কি না। সবগুলো হাট শেষে গোপালপুর হাটে যেতেই চুরি যাওয়া গরুর খোঁজ মেলে তাদের। কিন্তু চোরকে দেখে যেন তারা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
হাট থেকে তারা গরুটি নিয়ে আসেন। এসে মাতব্বরকে ঘটনাটি বলেন। মাতব্বর তার ছেলে গরু চুরি করেছে শুনেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন অপমানে। নিজ হাতে তিনি কত চোরকে শাস্তি দিয়েছেন। গ্রামে মূলত গরু এবং সিঁধেল চোরের ঘটনাই বেশি হয়ে থাকে। দূরের কোনো গ্রামের চোর অন্য গ্রামে এসে সে গ্রামের চোর ছাড়া একা একা চুরি করতে পারে না। চোররা যে গ্রামে চুরি করবে সে গ্রামের চোরের সঙ্গে আগে দেন দরবার করে নেয়। সেই মূলত পথঘাট ভালো চিনে। তার সহযোগিতায় চুরি করার আগেই রাস্তাঘাট রেকি করে যান চোর চক্র। নতুন একটা গ্রামে চুরি করতে এলে মানুষের চোখে পড়তে হয়। তখন নানা কৈফিয়ত দিতে হয় তাদের। তাই তো যে গ্রামে চুরি করা হবে সে গ্রামে দিনে দিনে এসেই আগন্তুক চোররা হাজির হয়। তখন সন্দেহ করার কোনো অবকাশ থাকে না আর। রাতের আঁধারে কেউ এলে তখনই নানা ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়।
এ ঘটনার কয়েক দিন আগে আরেকটি চুরির বিচার করেছিলেন চোরের বাবা। সিঁধেল চুরির ঘটনা ছিল সেটা। এলাকার চিহ্নিত চোরের বাড়িতে সেদিন পিঠাপুলির আয়োজন করেছিল। রাত ১০-১১টা পর্যন্ত তখন পিঠা খাওয়া হয়। ঘরে চলছিল তখন মানুষের কথাবার্তার আওয়াজ। এনদাদ সরদারের ঘরে সে রাতে চুরি হয়। চোররা মাটি খুঁড়ে এনদাদ সরদারের ঘরের চৌকির নিচ দিয়ে উঠে। পরে রাত গভীর হলে ঘরের আলমারির ড্রয়ারে থাকা স্বর্ণ আর টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। বড় রাস্তায় কাপড়-চোপড় সরিয়ে খালি ট্রাংক রেখে যায়। এ ঘটনায় চোর প্রায় বেঁচেই গিয়েছিল। কিন্তু চোররা যে ঘরে বসে পিঠা খেয়েছে সে ঘরে সন্ধান চালাতেই বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। এলাকার চোরদের জিজ্ঞাসা করা হয়, গত রাতে তোমাদের ঘরে পিঠাপুলি খেয়েছে কে কে? চোররা বলল, আমার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন এসেছিল। তাদের জন্য পিঠাপুলির আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু এলাকার চোর বুঝতে পারেনি যাদের কথা বলেছে তার সে আত্মীয় তাদের বাসায় গত বছরের মধ্যে আসেনি। আর এখানেই চোররা ধরা খেয়ে যায়।
কিছু উত্তম-মধ্যম দিতেই সব ঘটনার জট খুলতে থাকে। সে ঘটনার অবসান ঘটার আগেই মাতব্বরের ছেলের অপকর্ম সামনে চলে এল। মাতব্বর ছেলেকে তার মামা বাড়ি থেকে আনার জন্য দোয়ালদার নিলু সরদারকে পাঠিয়েছেন। যাকে পাঠিয়েছিলেন, সে গিয়ে বলেছে তার বাবা গরু চুরির বিষয়টি ফয়সালা করে ফেলেছেন। তাই তাকে নিতে এসেছেন।
তখন গভীর রাত। চোর ছেলের জন্য বাবা কাচারি ঘরের সামনে অপেক্ষা করছেন। ছেলে বাড়ির সামনে আসতেই দোয়ালদার নিলু সরদারকে ইশারা দিলেন। নিলু সরদার ইশারা পেয়েই এক ঝটকায় চোরকে মাটিতে ফেলে বুকে একটা মোচড় দিলেন। শুধু মা বলে একটা ডাক দিল গরু চোর। তারপর আর কোনো শব্দ নেই। মাতব্বর তার নিজ ছেলেকে এভাবেই গভীর রাতে দোয়ালদারকে দিয়ে হত্যা করালেন। তিনি দশজনের বিচার করে থাকেন। আর তার ছেলে কিনা চোর হবে? এটা কিছুতেই মাতব্বর সাহেব মেনে নিতে পারলেন না। এ ঘটনাও পুরো গ্রামে এক কান দু’কান করে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
এখন লাশ কী করা যায়। রাতও প্রায় শেষের দিকে। যা কিছু করতে হবে রাত থাকতে থাকতেই করতে হবে। প্রথমে লাশটি একটি পুরোনো কবরে মাটি চাপা দিয়ে দিল। এলাকায় তখন সুনসান নীরবতা চলছে। আগে তো ফিসফিস করে গ্রামের লোকজন কানাঘুষা করত। এবার আর তা হচ্ছে না। হত্যার ঘটনা ছড়িয়ে পড়তেই মানুষ যেন বোবা হয়ে গেছে। মাতব্বর চুরির ঘটনায় নিজের ছেলেকেই ছাড় পর্যন্ত দেননি। অন্য কাউকেও যে ছাড়বেন না তা গ্রামের মানুষ ইতোমধ্যে বুঝে গেছেন। তাই সবাই ফিসফিসানি বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। এটা কী করলেন মাতব্বর সাহেব? নিজের ছেলেকেই শেষ করে দিলেন?
এদিকে থানা থেকে পুলিশ আসছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামে। মাতব্বর গ্রাম থেকে সরে পড়লেন। এদিকে যে দোয়ালদার বুকের ওপর উঠে চোরকে হত্যা করেছিলেন তিনিও গ্রাম ছাড়লেন। দিনে দূরের গ্রামে থাকলেও মাতব্বর সাহেব রাতে বাড়ি ফিরেন। লাশটি কী করা যায় তা নিয়ে ভাবতে থাকেন তারা। পুরাতন কবরে লাশটি রাখা এখন আর নিরাপদ নয়। তাই তো তিনি দোয়ালদারকে লাশটি উঠিয়ে নদীতে বালুর বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দিতে বললেন। তারা বাড়ির পাশে আড়িয়াল খাঁ নদে রাতে আঁধারে লাশটি বালুর বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দিল। এবার আর তাদের গ্রাম ছাড়তে হলো না। স্বাভাবিকভাবেই চোরের বাবা এবং দোয়ালদার গ্রামে এসে বসবাস করতে লাগল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল কয়েকদিন পরে। লাশ ফুলে নদীতে ভেসে উঠেছে। আবার হইচই পড়ে গেল গ্রামজুড়ে। লাশ ভাসছে, লাশ ভাসছে! নৌকায় করে আবার চোরের লাশ নদী থেকে তুলে নিয়ে আসা হলো। সে লাশ কোথায় কবর দিয়েছে তা আর কেউই ঘুণাক্ষরে টের পায়নি।
গ্রামের একজন মাতব্বর চোরের বাবার কলঙ্ক হয়ে বেঁচে থাকতে চাননি। গ্রামের দশজনের বিচার করেছেন কঠোর হস্তে। তাই মানুষকে থানা-পুলিশ কোর্ট কাচারি করতে হয়নি সে সময়। সে অবস্থা এখন আর নেই। নিরীহ মানুষকে বিচার পেতে তাই থানা-পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেই জুতার তলি ক্ষয় করে ফেলতে হচ্ছে। ভোগান্তির ভয়াবহতা কতটা, যে মামলায় পড়েছে সে ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারবে না।
এখন সমাজের মাতব্বরি পেশাটি চলে গেছে দুর্বৃত্তদের হাতে। তারা নগদের মাধ্যমে এখন বিচার করে থাকেন। যার ঘুষের প্যাকেট মোটা বিচারের রায় তার পক্ষেই যায়। আর নীরবে নিভৃতে চোখের পানি ফেলতে হয় নিরীহ মানুষকে। এভাবেই বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)