বর্ষায় হাঁস পালনে ভাগ্য ফিরছে নড়াইলের খামারিদের। সদর উপজেলার শোলপুরসহ ১২টি বিল এলাকায় গড়ে উঠেছে শতাধিক অস্থায়ী হাঁসের খামার। খামারিরা বলছেন, উন্মুক্ত পানিতে কম খরচে হাঁস পালন সম্ভব। অনেকে বেকারত্ব দূর করে পেয়েছেন সচ্ছলতা। হাঁস পালন হয়ে উঠেছে লাভজনক পেশা। জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস বলছে, বর্ষায় হাঁস পালনে আয় বেশি, খরচ কম। খামারিদের দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বর্ষার পানিতে থইথই করছে সদর উপজেলার দুধপাতালের বিল। চারদিকে কেবল পানি আর পানি। ওই পানিতেই দল বেঁধে খাবার খাচ্ছে সাদা, ধূসর আর কালো বর্ণের হাঁস। কখনো তারা প্যাক প্যাক করে ডাকছে। কখনো এক সঙ্গে পানিতে ডুব দিচ্ছে। খাওয়া আর সাঁতার কাটা চলছে সমান তালে।
সারা দিন বিলের পানিতে ঘুরে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় খামারে ফেরে হাঁসের ঝাঁক। সামনে হাঁস, পেছনে নৌকা- এই দৃশ্য এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে নড়াইলের শোলপুর গ্রামে। এ ছাড়া বড়েন্দারের, ইছামতী, কলোড়া, দুধপাতাল, পাটেরশরীসহ ১২টি বিল ঘিরে অন্তত ১৫০ কৃষক ও যুবক গড়ে তুলেছেন অস্থায়ী হাঁসের খামার। বর্ষার পানিতে হাঁস পালন এখন তাদের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
শোলপুর গ্রামের বাসিন্দা হাদিউজ্জামান একসময় কৃষি কাজ করতেন। ছয় বছর আগে কৃষিতে লোকসান গুনতে গুনতে শুরু করেন হাঁস পালনের কাজ। বললেন, ‘ইউটিউব দেখে আর বন্ধুদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে প্রথমে ২০০ হাঁস দিয়ে খামার শুরু করি। এখন খামারে ৫০০ হাঁস আছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ ডিম পাচ্ছি।’ হাদিউজ্জামান আরও বলেন, ‘শুধু ডিম বিক্রি করেই প্রতি মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মতো আয় হচ্ছে। আর যখন ডিম দেওয়া বন্ধ হয়, তখন হাঁসগুলো মাংস হিসেবে বিক্রি করি। এতে আলাদাভাবে আরও দুই-আড়াই লাখ টাকা আসে।’
শোলপুরে এখন হাদিউজ্জামানের মতো অনেকেই হাঁস পালনে আগ্রহী হয়েছেন। কম খরচে বেশি লাভ- এটাই তাদের মূল আকর্ষণ। খামারিরা বলছেন, উন্মুক্ত বিল, জলাশয় আর নদীর পানিতে হাঁস সহজেই খাবার পেয়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই হাঁস পালন করা যাচ্ছে।
শোলপুরের আরেক কিশোর খামারি জাহিদ শেখ। সিংঙ্গাশোলপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। পড়াশোনার ফাঁকে নিজের বাড়িতেই গড়ে তুলেছে ২৫০ হাঁসের খামার। প্রতিদিন ডিম বিক্রি করে আয় করছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। মাসে তা দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজারে। জাহিদ বলে, ‘প্রতিবেশীদের দেখে তিন বছর আগে খামার শুরু করি। প্রথম বছরই লাভ পাই। এরপর হাঁসের সংখ্যা বাড়িয়েছি। এখন গ্রামের অনেকেই হাঁস পালন করছেন।’
শোলপুরের পাশের তারাপুর গ্রামের চাষিরাও হাঁস পালনে নেমেছেন। রেজাউল হক নামে এক বাসিন্দা বললেন, ‘বর্ষায় কৃষকের কাজ কম থাকে। এ সময় বিলের পানিতে কম খরচে হাঁস পালন করা যায়। শোলপুর দেখে এখন আশপাশের বেকার যুবকরাও এগিয়ে আসছে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, জেলায় বর্তমানে ৪৮০টি হাঁসের খামার রয়েছে। এসব খামারে পালিত হচ্ছে ৩ লাখ ৫১ হাজার ৩৭টির বেশি হাঁস। এর মধ্যে ক্যামবেল, ইন্ডিয়ান রানার ও চায়না জাতের হাঁস রয়েছে। তবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও বেশি ডিম দেওয়ার কারণে ক্যামবেল জাতই সবচেয়ে জনপ্রিয়।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিদ্দীকুর রহমান জানান, নড়াইলে প্রতি বছর সাড়ে ৩ কোটি হাঁসের ডিম উৎপাদিত হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেড় কোটিরও বেশি ডিম আসে অস্থায়ী খামার থেকে। তিনি বলেন, ‘বিল এলাকায় হাঁস পালন করলে খামারিরা বেশি লাভবান হন। খাবারের জন্য বাড়তি খরচ লাগে না। আমরা হাঁসের উৎপাদন বাড়াতে খামারিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও ভ্যাকসিন দিচ্ছি।’ ডা. সিদ্দীকুর রহমান আরও বলেন, ‘বর্ষায় ধানখেতে পানি জমে থাকে। এ সময় কৃষকের হাতে তেমন কাজ থাকে না। তখন হাঁস পালনই হতে পারে আয়ের ভালো মাধ্যম। খরচ প্রায় না থাকায় একজন খামারি সহজেই দেড় থেকে ২ লাখ টাকা আয় করতে পারেন।’