রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে বছরে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন হয়ে থাকে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বাণিজ্যিক যাত্রায় এই মাছের কেবল অর্ধেক থেকেই রাজস্ব পায় সরকার।
আর চলতি মৌসুমের প্রথম ৭ মাসেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রেকর্ড পরিমাণ ১৯ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। মিঠাপানির মাছ এবং সুস্বাদু হওয়ায় ভোক্তা পর্যায়ে এই মাছের চাহিদা বেশি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্যে। মাছের বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগের দাবি খাতসংশ্লিষ্টদের।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের হাত ধরে ১৯৬০ সালে কাপ্তাই হ্রদের সৃষ্টি হলেও এখন মিঠা পানিতে মৎস্য উৎপাদন ও সরকারের রাজস্ব আদায়ে ভূমিকা রাখছে। বাণিজ্যিকভাবে নেওয়া ২০২০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত গেল ৫ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৩৪৫ মেট্রিক টন মাছ থেকে শুল্ক আদায় হয়েছে প্রায় ৬৯ কোটি টাকা। এসব মাছের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই চাপিলা আর কাচকি। ফলে এই দুই ছোট মাছ এখন মাছের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে।
কাপ্তাই হ্রদে ৮৬ প্রজাতির মাছ রয়েছে। একেবারেই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠে এসব মাছ। এর মধ্যে দেশি প্রজাতির ৭০টি, বিদেশি ৭টি, ৮টি চিড়ি প্রজাতির এবং একটি কচ্ছপ প্রজাতির মাছ।
তবে জেলে ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, হ্রদে রুই, কাতল, মৃগেল, আইড়, বোয়ালসহ ৩০-৩৫ প্রজাতির মাছ ধরা পড়লেও এর ৯০ থেকে ৯৫ ভাগই চাপিলা আর কাচকি। ৭২৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরেন নিবন্ধিত ২৭ হাজার জেলে।
কাপ্তাই হ্রদ বৃহত্তর মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শুক্কুর বলেন, ‘কাপ্তাই লেকের মাছ মিঠা পানির মাছ নিরাপদ ও সুস্বাদু। তবে কার্পজাতীয় মাছ কমে গেছে। এখন আধিক্য চাপিলা আর কাচকির। কাপ্তাই লেকের মাছ দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। আমরা চাই আমাদের দেশের পণ্য বিশ্বে সুপরিচিত হোক। এ জন্য সরকারি বেসরকারি আরও বেশি উদ্যোগ দরকার।’
রাঙামাটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের গেল ৫ বছরের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থ বছরে ৬ হাজার ৭৯৪ মেট্রিকটন মাছের শুল্কায়ন থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ হাজার ৫২৩ মেট্রিকটন মাছ থেকে শুল্ক এসেছে ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ হাজার ৪৯০ মেট্রিকটন মাছ থেকে শুল্ক এসেছে ১১ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ হাজার ৬৩৭ মেট্রিকটন মাছ থেকে শুল্ক এসেছে ১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ৯০০ মেট্রিকটন মাছ থেকে শুল্ক আদায় করা হয়েছে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি। এবারের লক্ষ্যমাত্রা গেল বছরের সমান ধরা হলেও মৌসুম শেষের দুই মাস আগে ফেব্রুয়ারিতেই তা পূরণ হয়েছে। এতে এই মৌসুমে সাড়ে তিন কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন-বিএফডিসির রাঙামাটির ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. ফয়েজ আল করিম বলেন-‘কাপ্তাই হ্রদের আহরিত মাছের প্রায় ৯০ ভাগই চাপিলা আর কাচকি। চলতি মৌসুমে ২ সেপ্টেম্বর থেকে গেল ৭ মাসে ৮ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন মাছ থেকে শুল্কবাবদ রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৯ কোটি টাকার বেশি। এবার রাজস্ব আয় ২১ কোটি টাকা ছাড়াবে বলে আশা করছি'।
পর্যটক আপ্যায়নে হ্রদের মাছ
রাঙামাটি শহর ও কাপ্তাইয়ে দৈনিক গড়ে ১০ হাজার পর্যটক ভ্রমণে আসেন। ঈদ-পূজা ও সাপ্তাহিক ছুটিতে এই সংখ্যা বাড়ে কয়েক গুণ। খাবারের তালিকায় এসব পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ কাপ্তাই হ্রদের প্রাকৃতিক সুস্বাদু মাছ। সহনীয় হোটেল রিসোর্টে বাঙালি, চায়নিজ আর পাহাড়ি এই তিন ধরনের খাবারেই হ্রদের তাজা মাছ আর চাপিলা ফ্রাই রয়েছে শীর্ষে। মাথাপিছু চার থেকে ৫০০ টাকা বাজেটে মিলছে খাবার। অনেকেই কাঁচা মাছও কিনে নিয়ে যান আগ্রহভরে।
ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি
রাঙামাটির স্থানীয় ব্যবসায়ী শ্যামল পালিত ও মো. ইলিয়াস বলেন, কাপ্তাই হ্রদের মাছের মধ্যে চাপিলা, কাচকি, বাঁচা, মইল্যা, টেংরা, কাজরি, বাইম, চিংড়ি, আইড়, বোয়াল, বাঁশপাতা ও বাতাসি বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে বিডিফুড, সীমার্ক, মাসুদ ফিশ ও আনরাজ ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এসব মাছ আরব আমিরাত ও লন্ডনসহ বিশ্বের বিভন্ন দেশে রপ্তানি করছে। এসব কোম্পানি স্থানীয় এজেন্টরা দৈনিক প্রায় তিন মেট্রিকটন মাছ বিদেশে রপ্তানির জন্য পাঠিয়ে থাকেন। যার স্থানীয় বাজার মূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা।
দরকার সরকারি উদ্যোগ
রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ মামুন বলেন, ‘দেশে ও দেশের বাইরে এই মাছের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। একসঙ্গে দেশের মৎস্য ভান্ডারে পর্যাপ্ত আমিষের জোগান দেওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক আয়ও বাড়বে। এ জন্য সরকারি বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।’