গোপালগঞ্জে তীব্র জ্বালানিসংকটে কৃষি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডিজেলের অভাবে সেচ দিতে না পেরে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন কৃষকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করেও মিলছে না প্রয়োজনীয় তেল। এতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে এবং বাজারে কঠোর নজরদারি না বাড়ালে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের কৃষি বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
গত বৃহস্পতিবার সকালে শহরের বেদগ্রাম এলাকার মিতা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ড্রাম, বোতল ও বিভিন্ন পাত্র নিয়ে কৃষকরা তেলের অপেক্ষায় বসে আছেন। কেউ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাননি। কেউ আবার খালি হাতে ফিরে গেছেন। কৃষকদের চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক নেই। ফলে কৃষকরা সময়মতো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। কৃষি কার্ড দেখিয়েও প্রয়োজন মতো তেল মিলছে না। এতে অনেক এলাকায় সেচ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
বর্তমানে বোরো মৌসুম চলছে। এই সময়ে নিয়মিত সেচ প্রয়োজন। কৃষকরা বলছেন, সেচ না দিতে পারলে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। এরই মধ্যে অনেক জমিতে ধান গাছে শিষ এসেছে। কিন্তু পানি না পেলে এসব শিষ থেকে আসা ধান চিটা হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এদিকে এরই মধ্যে অনেক জমি পানিশূন্য হয়ে পড়ছে, যা পুরো মৌসুমে কৃষিকাজকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ফিলিং স্টেশন মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কৃষক ও সাধারণ গ্রাহকদের চাহিদামতো তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে অনেক পাম্পে পেট্রোল ও অকটেন শেষ হওয়ায় বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক শারফুল শরীফ বলেন, ‘প্রতিদিন আমার কমপক্ষে ৫ লিটার তেল দরকার। গত ৫ দিন আগে মাত্র ১ লিটার তেল পেয়েছিলাম। এতে ৩-৪ দিন জমিতে সেচ দিতে পারিনি। আজ আবার ভোরে পাম্পে এসেছি। ৩ ঘণ্টা পার হলেও তেল পাইনি। যদি এভাবে চলতে থাকে, আমার জমির সব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তাহলে সারা বছর পরিবার নিয়ে চলবো কীভাবে?’
অন্য কৃষক শুহিন মোল্যা বলেন, ‘তেলের অভাবে কয়েকদিন ধরে জমিতে পানি দিতে পারছি না। মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে। গাছ নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দ্রুত তেলের ব্যবস্থা না হলে বড় ক্ষতির মুখে পড়বো। কৃষি কার্ড দিয়েও তেল পাচ্ছি না।’
ব্লক ম্যানেজার আব্দুস সালাম সিকদার বলেন, ‘আমি প্রতিদিন জমিতে সেচ দেই। আমার ১৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু বিভিন্ন পাম্প ঘুরে ২ থেকে ৩ লিটার তেল পাই। এতে প্রয়োজনীয় সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বোরো ধানে শীষ এলেও পানির অভাবে তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে।’
জেলা শহরের নিগি ফিলিং স্টেশনের মালিক মিজুনুর রহমান লফিজ বলেন, ‘আমার পাম্পে পেট্রোল ও অকটেন শেষ হয়ে গেছে। যে পরিমাণ ডিজেল আসে, তা দিয়ে কৃষকদের চাহিদা পূরণ করা যায় না। ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘জেলায় ডিজেলের সংকট এখনো আসেনি। চলতি বোরো মৌসুমে ৮২ হাজার ৫৮৮ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এটি সেচের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কোনো কৃষক তেল না পেলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। জমি যাচাই করে প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’