দেশের শীর্ষ লিচু উৎপাদন এলাকা দিনাজপুরে এবার চায়না-থ্রি জাতের লিচুর ফলন তুলনামূলক ভালো হলেও আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব, শিলাবৃষ্টি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উদ্বেগে রয়েছেন চাষিরা। এ পরিস্থিতি, বাজার দর, উৎপাদন খরচ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার লিচুচাষি মনিরুজ্জামান চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দৈনিক খবরের কাগজের রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান এনায়েত করিম।
দৈনিক খবরের কাগজ : কত বিঘা জমিতে লিচুর চাষ করেছেন?
মনিরুজ্জামান চৌধুরী: গত বছর প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে লিচুর চাষ করেছিলাম। এ বছর সেই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২১ বিঘা হয়েছে। আমার বাগানে চায়না-থ্রি, বোম্বাই, মাদ্রাজি ও বেদানা জাতের লিচু রয়েছে। তবে এ বছর বেদানা, মাদ্রাজি ও বোম্বাই জাতের গাছে খুব একটা মুকুল আসেনি। অন্যদিকে চায়না-থ্রি জাতের ফলন বেশ ভালো হয়েছে।
দৈনিক খবরের কাগজ: গত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন কেমন হয়েছে?
মনিরুজ্জামান চৌধুরী: চায়না-থ্রি জাতের ফলন গত বছরের তুলনায় ভালো হয়েছে। তবে আবহাওয়ার কারণে কিছু ক্ষতি হয়েছে। শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির ফলে ফল ঝরে গেছে এবং পরিচর্যার খরচও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন ভালো হলেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ রয়েছে।
দৈনিক খবরের কাগজ: আবহাওয়ার প্রভাব কতটা পড়েছে?
মনিরুজ্জামান চৌধুরী: আবহাওয়ার প্রভাব অনেক বেশি ছিল। কখনো প্রচণ্ড দাবদাহ, আবার হঠাৎ বৃষ্টি হয়েছে। এতে মুকুল ঝরে গেছে, অনেক ক্ষেত্রে পুড়েও গেছে। ফলে বাড়তি পরিচর্যা করতে হয়েছে। পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়েছে।
দৈনিক খবরের কাগজ: রোগবালাইয়ের আক্রমণ কেমন ছিল?
মনিরুজ্জামান চৌধুরী: আবহাওয়ার কারণে রোগবালাইয়ের চাপ অন্য বছরের তুলনায় বেশি ছিল। তাই নিয়মিত নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। তা না হলে ফলনের ক্ষতি আরও বেশি হতো।
দৈনিক খবরের কাগজ: প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ কত হয়েছে?
মনিরুজ্জামান চৌধুরী: প্রতি বিঘায় গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন লিচু সংগ্রহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ১০ থেকে ১১ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। অর্থাৎ ১০০ লিচু প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসাবে প্রতি বিঘা থেকে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে বলে আশা করছি।
আরও পড়ুন: ‘লাভ তো দূরের কথা বাড়ি থেকে টাকা দিতে হচ্ছে’
দৈনিক খবরের কাগজ: বর্তমান বাজার দরে বিক্রি করে লাভ হচ্ছে, নাকি লোকসান?
মনিরুজ্জামান চৌধুরী: এখনো বাজারে চাহিদা কিছুটা কম। ঈদের কারণে ক্রেতা কম ছিলেন। তবে ঈদ শেষ হওয়ায় মানুষ কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করায় চাহিদা বাড়ছে। ফলে দামও বাড়তে শুরু করেছে। এতে কৃষক কিছুটা লাভবান হবে।
দৈনিক খবরের কাগজ: লিচু কোথায় বিক্রি করছেন?
মনিরুজ্জামান চৌধুরী: বেশির ভাগ লিচু বাগান থেকেই বিক্রি হয়। ঢাকা ও বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগানে আসেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও ক্রেতারাও বাগান পরিদর্শন করে লিচু কিনে নিয়ে যান। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও সহযোগিতা করছেন।
দৈনিক খবরের কাগজ: সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
মনিরুজ্জামান চৌধুরী: সরকার যদি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করে, তাহলে কৃষকরা একসঙ্গে সব ফল বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। এতে ভালো দাম পাওয়া সম্ভব হবে। কেননা, লিচুর ন্যায্য দাম পেতে সংরক্ষণ সুবিধা জরুরি। পাশাপাশি লিচু ও আম রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে। আর কৃষকদের ব্যবহৃত বালাইনাশক যেন সঠিক দামে ও মানসম্মতভাবে পাওয়া যায়, সে বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন।