ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
অপেক্ষা ফুরাচ্ছে ওচোয়ার! ইংল্যান্ডকে জিততে দিল না ঘানা মায়ের মৃত্যুতে দেশে ফিরে গেলেন ফ্রান্সের কোচ অতঃপর দেম্বেলে… প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডকে রুখে দিল ঘানা বিশ্বকাপে ইরানের সফর নীতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ক্যানভাসে চিরযৌবন নেইমারে ভয় নেই স্কটল্যান্ডের মাঠে হেঁটেই সফল মেসি রোনালদোর রেকর্ডের রাতে পর্তুগালের গোল উৎসব ৪১ বছরেও থামেননি রোনালদো, ভাঙলেন মেসির রেকর্ড পর্তুগিজ কিংবদন্তিতে ছাড়িয়ে শীর্ষে রোনালদো রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত? রেকর্ড তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ট্র্যাজেডি, পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণা, রিমান্ডে আইনজীবী

‘সাম্যবাদী’র শতবর্ষ: রুশ কনসাল জেনারেলের হাতে কবি নজরুলের ছবি তুলে দিল ছায়ানট কলকাতা

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:২৫ পিএম
আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:০৪ পিএম
রুশ কনসাল জেনারেলের হাতে কবি নজরুলের ছবি তুলে দিল ছায়ানট কলকাতা
ছবি: লেখক

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় রাশিয়ান ফেডারেশনের কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলোভের হাতে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিশেষ ছবি তুলে দেয় ছায়ানট (কলকাতা)। ছবিতে ১৯৬৭ সালে একটি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে সোভিয়েত প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) কলকাতায় গোর্কি সদনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ম্যাক্সিম কোজলোভ-এর হাতে এ ছবি তুলে দেওয়া হয়।

ছবিটির বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে - রাশিয়ান ভাষায় অনূদিত নজরুল রচনা-প্রকাশ অনুষ্ঠানে সোভিয়েত প্রতিনিধিদের মাঝখানে নজরুল (১৯৬৭)। 

কাজী নজরুল ইসলামের সুহৃদ মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ-এর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, ‘‘শুনেছি (চোখে দেখিনি) ‘সাম্যবাদী’ তখন রুশ ভাষায় তর্জমা করা হয়েছিল।’’

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলাম রচনাসমগ্রের ‘গ্রন্থপরিচয়’ থেকে জানা যায় - ‘সাম্যবাদী’ কাজী নজরুল ইসলামের অষ্টম কাব্য। এর প্রকাশকাল পৌষ ১৩৩২, ডিসেম্বর ১৯২৫।

‘সাম্যবাদী’ পূর্বতন কাব্যগুলির মতো কবিতা সংকলন নয়, দীর্ঘকালীন পরিকল্পনারও ফসল নয়, এটি একান্তই তাৎক্ষণিক গ্রন্থ-পরিকল্পনার ফল। উক্ত ‘লাঙল’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই ‘সাম্যবাদী’ নামক উপরোল্লিখিত শিরোনামে দীর্ঘ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। কবিতাটির কারনেই ‘লাঙল’ এর উক্ত সংখ্যাটি অসাধারণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই অভূতপূর্ব চাহিদার ফলে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই কবিতাগুলো চটি গ্রন্থের আকারে পুনর্মুদ্রিত হয়।

শতবর্ষ আগে ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে নজরুল যে বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কি শুধুই স্বপ্ন? এত বছর পরেও তাঁর সেই লেখা আমাদের উত্তরণের পথ দেখায়। অবুঝ বয়সেই আমরা যখন কাজী নজরুল ইসলামের নাম উচ্চারণ করি, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাঁর নামের আগে ‘বিদ্রোহী’ বিশেষণটি ব্যবহার করি। তিনি প্রকৃত অর্থেই ‘বিদ্রোহী’ - এ কথা অনস্বীকার্য। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তিনি লিখেছেন —
আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!

সমাজের সমস্ত অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। প্রাক্ স্বাধীনতা যুগে যে মন্ত্রে তিনি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উজ্জীবিত করেছিলেন, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়েও সুন্দর-বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সেই মন্ত্রই হোক আমাদের পাথেয়।

তাঁর ‘বিদ্রোহী’ সত্তা অধিক আলোচিত হলেও বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে তাঁর সাম্যবাদী, মানবাতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিশেষভাবে চর্চার প্রয়োজন। সাম্যবাদী কবিতায় নজরুলের স্পষ্ট উচ্চারণ:
গাহি সাম্যের গান -
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ‘রুশ বিপ্লব, লালফৌজ ও কাজী নজরুল ইসলাম’ শীর্ষক লেখায় উল্লেখ করেছেন নজরুলের লেখায় কীভাবে আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রভাব বিস্তার করেছিল। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ লিখছেন - ‘ব্যথার দান’ পড়ে আমরা তখনও বুঝেছিলেম এবং এখনও বুঝতে পারছি যে রুশ বিপ্লব ও লাল ফৌজের প্রতি নজরুলের একটা আকর্ষণ জন্মেছিল। ফৌজ হতে ফেরার আগেই তার দুটি গল্প আমরা ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’য় ছেপেছিলেম। ১৩২৬ সালে মাঘ মাসে তো ‘ব্যথার দান’ ছেপেছিলেমই, তার আগে কার্তিক মাসে (নভেম্বর, ১৯১৯) আমরা ছেপেছিলেম তার ‘হেনা’ নামক গল্প। এই দুটি গল্পই সে ফৌজে থাকা অবস্থাতে লিখেছিল এবং লিখেছিল তার হাবিলদার হওয়ার পরে। ‘ব্যাথার দান’ গল্প যাদের নিয়ে লেখা হয়েছে তারা বেলুচিস্তানের বাসিন্দা। নজরুলের মুখে শুনেছি যে কোনো পলাতক সৈনিককে ধরার জন্য তাকে (হয়তো সঙ্গে অন্য সৈনিকও ছিল) একবার বেলুচিস্তানের গুলিস্তান, বুস্তান ও চমন প্রভৃতি ইলাকায় যেতে হয়েছিল। তার গল্পে পেশোয়ারের নামও আছে। পেশোয়ারের নিকটবর্তী নৌশহরা নামক স্থানে তো নজরুলরা প্রথম সৈনিক শিক্ষাই লাভ করেছিল। ‘ব্যাথার দানে’র দুটি চরিত্র দারা ও সয়ফুল মুল্ক্ বেলুচিস্তান হতে আফগানিস্তানের সহজ ইলাকা পার হয়ে তুর্কিস্তান কিংবা ককেসাসে গিয়ে লালফৌজে যোগ দিয়েছিল এবং বিপ্লব-বিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়েছিল। ‘হেনা’ ও ‘ব্যথার দান’ এই দুটি গল্পই প্রেমের গল্প। কিন্তু এই দুটি গল্পের ভিতর দিয়েই অদ্ভূত দেশ-প্রেমও ফুটে উঠেছে। দুটি গল্পেই আমরা লেখকের আন্তর্জাতিকতার পরিচয় পাই, তবে ‘ব্যথার দানে’ বেশী।

১৯১৭ সাল - কাজী নজরুল ইসলাম তখন রানীগঞ্জের শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র। সামনেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা। এই অবস্থায় হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কেবলমাত্র তাঁর স্কুলজীবনের পরম বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় এ-সম্পর্কে অবগত ছিলেন। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ৪৯ নম্বর বেঙ্গলী রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে, করাচি থেকে কলকাতায় এসে প্রথমে তাঁর বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মেসে এবং পরে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’-র অফিসে ওঠেন। করাচিতে নজরুলের সঙ্গে থাকতেন জমাদার শম্ভু রায়।

১৯৫৭ সালের ৬ জুন তারিখে চুঁচুড়ার প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়কে লিখিত জমাদার শম্ভু রায়ের পত্র থেকে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। সেই সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ। ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথায়’ তিনি লিখেছেন - জমাদার শম্ভু রায়ের লেখা পত্র হতে আমরা জানতে পারছি যে, করাচিতে তাঁদের ব্যারাকের প্রতি কর্তৃপক্ষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল। যে কোন রকমের রাজনীতিক সাহিত্যের ব্যারাকে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সেন্সরিং-এর ব্যবস্থা অতি কঠোর। তবুও এইসব ব্যবস্থা নজরুলের নিকটে হার মেনেছিল। সে এমন গোপন পথ খুলেছিল যে যার সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে নিষিদ্ধ পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা অবলীলাক্রমে ব্যারাকের ভিতরে প্রবেশ করত। রাওলাট বা সিডিশন কমিটির রিপোর্ট তাঁদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু জমাদার রায় সেই রিপোর্ট নজরুলের নিকটে দেখেছিলেন। রুশ বিপ্লব সম্বন্ধেও নিষিদ্ধ সাহিত্য নজরুলের হাতে এসেছিল। জমাদার রায় ও নজরুলের আরও ক’জন বিশ্বস্ত বন্ধুকে নজরুল সে সাহিত্য দেখিয়েছিল। একদিন নজরুল তার নিজের ঘরের সামনে একটি উৎসব করেছিল। এই উৎসবের উপলক্ষ অক্টোবর বিপ্লব ছিল, না, লালফৌজের কোনো বিশিষ্ট জয়লাভ ছিল, তা জমাদার শম্ভু রায়ের পত্র হতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। আমার মনে হয় লালফৌজের কোনো বিশিষ্ট জয়লাভ উপলক্ষেই উৎসবটি হয়ে থাকবে। 

জমাদার রায় বলছেন: ‘‘নজরুল তার বন্ধুদের মধ্যে যাদের বিশ্বাস করত তাদের এক সন্ধ্যায় খাবার নিমন্ত্রণ করে, অবশ্য এইরকম নিমন্ত্রণ প্রায়ই সে তার বন্ধুদের করত। কিন্তু ঐ দিন যখন সন্ধ্যার পর তার ঘরে আমি ও নজরুলের অন্যতম বন্ধু তার অরগ্যান মাস্টার হাবিলদার নিত্যানন্দ দে প্রবেশ করলাম তখন দেখলাম অন্যান্য দিনের চেয়ে নজরুলের চোখে মুখে একটা অন্য রকমের জ্যোতি খেলে বেড়াচ্ছিল। উক্ত নিত্যানন্দ দে মহাশয়ের বাড়ী ছিল হুগলী শহরের ঘুটিয়া বাজার নামক পল্লীতে। তিনি অরগ্যানে একটা মার্চিং গৎ বাজানোর পর নজরুল সেই দিন যে-সব গান গাইল ও প্রবন্ধ পড়ল তা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, রাশিয়ার জনগণ জারের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে। গান বাজনা প্রবন্ধ পাঠের পর রুশ বিপ্লব সম্বন্ধে আলোচনা হয় এবং লালফৌজের দেশপ্রেম নিয়ে নজরুল খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে এবং ঠিক নাম মনে নেই সে গোপনে আমাদের একটি পত্রিকা দেখায়। ঐ পত্রিকাতে আমরাও বিশদভাবে সংবাদটি দেখে উল্লসিত হয়ে উঠি। সে দিন সারা রাতই প্রায় হৈ হুল্লোড়ে আমাদের কেটে গিয়েছিল।’’

‘বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য’ প্রবন্ধে নজরুল বিশ্বের মহান সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ‘‘বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্যের দিকে একটু ভালো করে দেখলে সর্বাগ্রে চোখে পড়ে তার দুটি রূপ। এক রূপে সে শেলীর Skylark-এর মতো, মিল্টনের Birds of paradise-এর মতো এই ধূলি-মলিন পৃথিবীর ঊর্ধ্বে উঠে স্বর্গের সন্ধান করে, তার চরণ কখনো ধরার মাটি স্পর্শ করে না; কেবলই ঊর্ধ্বে - আরও ঊর্ধ্বে উঠে স্বপনলোকের গান শোনায়। এইখানে সে স্বপন-বিহারী।

আর এক রূপে সে এই মাটির পৃথিবীকে অপার মমতায় আঁকড়ে ধরে থাকে - অন্ধকার নিশীথে, ভয়ের রাতে বিহ্বল শিশু যেমন করে তার মাকে জড়িয়ে থাকে - তরুলতা যেমন করে সহস্র শিকড় দিয়ে ধরণী-মাতাকে ধরে থাকে - তেমনি করে। এইখানে সে মাটির দুলাল। 

ধূলি-মলিন পৃথিবীর এই কর্দমাক্ত শিশু যে সুন্দরকে অস্বীকার করে, স্বর্গকে চায় না, তা নয়। তবে সে এই দুঃখের ধরণীকে ফেলে সুন্দরের স্বর্গলোকে যেতে চায় না, সে বলে : স্বর্গ যদি থাকেই তবে তাকে আমাদের সাধনা দিয়ে এই ধূলির ধরাতে নামিয়ে আনব। আমাদের পৃথিবীই চিরদিন তার দাসীপনা করেছে, আজ তাকেই এনে আমাদের মাটির মায়ের দাসী করব। ...দুই দিকেই বড় বড় রথী-মহারথী। একদিকে নোগুচি, ইয়েটস্, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি dreamers স্বপ্নচারী, আর এক দিকে গোর্কি, যোহান বোয়ার, বার্নার্ড শ’, বেনাভাঁতে প্রভৃতি। 

আজকের বিশ্ব-সাহিত্যে এই দুটো রূপই বড় হয়ে উঠেছে। এর অন্যরূপও যে নেই, তা নয়। এই দুই extreme - এর মাঝে যে, সে এই মাটির মায়ের কোলে শুয়ে স্বর্গের কাহিনী শোনে। রূপকথার বন্দিনী রাজকুমারীর দুঃখে সে অশ্রু বিসর্জন করে, পঙ্খীরাজে চড়ে তাকে মুক্তি দেবার ব্যাকুলতায় সে পাগল হয়ে ওঠে। সে তার মাটির মাকে ভালোবাসে, তাই বলে স্বর্গের বিরুদ্ধে অভিযানও করে না। এই শিশু মনে করে - স্বর্গ এই পৃথিবীর সতীন নয়, সে তার মাসি-মা। ...এঁদের দলে লিওনিদ, আঁদ্রিভ, ক্লুট হামসুন, ওয়াদিশ্‌ল, রেমঁদ প্রভৃতি।’’

বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে নজরুল যখন আলোচনা করেছেন তখন স্বাভাবিকভাবেই রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির কথা উঠে এসেছে। গোর্কি সম্পর্কে নজরুল বলেছেন - ‘‘তারপর এল এই মহাপ্লাবনের ওপর তুফানের মতো - ভয়াবহ সাইক্লোনের মতো বেগে ম্যাক্সিম গোর্কি। চেকভের নাট্যমঞ্চ ভেঙে পড়ল, সে বিস্ময়ে বেরিয়ে এসে এই ঝড়ের বন্ধুকে অভিবাদন করলে। বেদনার ঋষি দস্তয়েভস্কি বললে : তোমার সৃষ্টির জন্যই আমার এ তপস্যা। চালাও পরশু, হানো ত্রিশূল! বৃদ্ধ ঋষি টলস্টয় কেঁপে উঠলেন। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বলে উঠলেন : That man has only one God and that is Satan. কিন্তু এই তথাকথিত শয়তান অমর হয়ে গেল, ঋষির অভিশাপ তাকে স্পর্শও করতে পারলে না। 

গোর্কি বললেন: দুঃখ-বেদনার জয়গান গেয়েই আমরা নিরস্ত হব না - আমরা এর প্রতিশোধ নেব। রক্তে নাইয়ে অশুচি পৃথিবীকে শুচি করব।’’ 

নজরুল গবেষক মাহবুবুল হকের নজরুল তারিখ অভিধান থেকে জানা যায় - ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই খ্যাতনামা রুশ লেখক মক্সিম গোর্কির মৃত্যুতে (১৮ জুন, ১৯৩৬) প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে কলকাতার অ্যালবার্ট হলের কমিটি রুমে যে শোক সভা হয় তার অন্যতম আহ্বায়ক ছিলেন নজরুল। নজরুল ছাড়াও এ সভায় উপস্থিত ছিলেন সতেন্দ্রনাথ মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বিবেকান্দ মুখোপাধ্যায়, খগেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ। এই সভা থেকেই নরেশচন্দ্র সেনগুপ্তকে সভাপতি ও সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামীকে সম্পাদক করে নিখিল বঙ্গ প্রগতি লেখক সংঘ গঠনের কথা ঘোষিত হয়। 

এইসব তথ্যের ভিত্তিতে সহজেই বলা যায় - রুশ বিপ্লব, রুশ সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত ছিলেন চেতনার কবি নজরুল। তাই ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের শতবর্ষে ছায়ানট (কলকাতা) এই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

গত ১৮ বছর ধরে কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টির বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে ছায়ানট (কলকাতা)। শুধুমাত্র কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী কিংবা প্রয়াণ দিবস স্মরণ করা নয়, সারা বছর ধরেই তাঁর সৃষ্টি নিয়ে চর্চা করাই ছায়ানটের উদ্দেশ্য। নজরুল স্মৃতিবিজড়িত জায়গাগুলির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নজরুলপ্রেমীদের অবগত করাও ছায়ানটের কার্যক্রমের অংশ। আমরা জানতে পারি, নজরুলের বেশ কিছু সাহিত্যকর্ম রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এই বিশেষ ছবির সন্ধান পাই যা সত্যি আমাদের চমৎকৃত করে। আজ সেই ছবিটি গোর্কি সদনে রাশিয়ান ফেডারেশনের কনসাল জেনারেল ম্যাক্সিম কোজলভ - এর হাতে তুলে দিতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত। বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি গোর্কি সদনের প্রোগ্রাম অফিসার শ্রী গৌতম ঘোষের প্রতি, তাঁর আন্তরিক সহযোগিতায় আমাদের স্বপ্নপূরণ হয়েছে। আশা করি গোর্কি সদনের সংগ্রহশালায় যত্ন সহকারে প্রদর্শিত হবে এই ছবি, সংস্কৃতিমনস্ক মানুষেরা এলে সহজেই দেখতে পাবেন।

লেখক: সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা) নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ও গবেষক

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাত দশকের অগ্রগতির দাবি প্রশ্নবিদ্ধ: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাত দশকের অগ্রগতির দাবি প্রশ্নবিদ্ধ: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বাংলা একাডেমিতে নিজের ৯১তম জন্মদিনের আয়োজনে বক্তৃতা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি: খবরের কাগজ

বাইরে চকচকে দালানকোঠা আর রাস্তাঘাটের বিপুল উন্নতি হলেও ভেতরে ভেতরে সমাজ কতটা পচে গেছে, সেই রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

বাংলাদেশের শিশুদের ভয়াবহ পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সাত-আট দশকের এই বস্তুগত উন্নয়ন ও তথাকথিত অগ্রগতির শেষ পরিণতি কী তবে অবোধ শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতন আর হত্যাকাণ্ড?

মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে বাংলা একাডেমিতে নিজের ৯১তম জন্মদিনের আয়োজনে ‘কী দেখেছি, কী বুঝেছি’ শিরোনামে এক আত্মজৈবনিক বক্তৃতায় প্রবীণ এই চিন্তাবিদ রাষ্ট্র ও সমাজের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজের এসব গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে জন্মদিনে ফুলেল শ্রদ্ধা। ছবি: খবরের কাগজ

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'অনেক উন্নতি হয়েছে উপর কাঠামোতে, বস্তুগতভাবে, চেহারায়, দালানকোঠায়, রাস্তাঘাটে প্রচুর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ভেতরে?'

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, "৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময়ে রাজশাহীতে আমার মা এক পরিত্যক্ত শিশুকে নিজের কাছে আশ্রয় দিয়েছিলেন, যাকে জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে পাওয়া গিয়েছিল। মা তার নাম দিয়েছিলেন ‘কুরানি’। সে আমাদের সাথেই বড় হয়েছে। সেই শিশু তখন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও, তার ওপর অন্য কোনো অত্যাচার হয় নাই।"

বর্তমান সময়ের নির্মমতার চিত্র টেনে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, "আজকে বাংলাদেশে শিশুদের কী অবস্থা, তা আপনাদের সবারই জানা। আজকে শিশুরা কীভাবে ধর্ষিত হচ্ছে, কীভাবে ধর্ষণের পরে তাকে হত্যা করা হচ্ছে! ভেতরে ওই যে শিশু পরিত্যক্ত হয়েছিল ৪৩-এর দুর্ভিক্ষে, আজকে ২০২৬ সালে সেই শিশু ধর্ষিত হচ্ছে এবং তাকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতাটা আমি লক্ষ্য করেছি।"

নিজের দীর্ঘ জীবনে ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এই তিনটি রাষ্ট্র দেখার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আয়তন, নাম, পতাকা কিংবা শাসকের পরিচয়ে পার্থক্য থাকলেও চরিত্রগতভাবে এই তিন রাষ্ট্রের মধ্যে এক গভীর ও নির্মম সাদৃশ্য রয়েছে। তিনটি রাষ্ট্রই ছিল মূলত পিতৃতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী এবং আমলাতান্ত্রিক।

রাষ্ট্র ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজ বিচ্ছিন্ন নয়, বরং রাষ্ট্র সবসময় সমাজের ওপর কর্তৃত্ব খাটায়। তার ভাষায়, "আমাদের সকলেরই অভিজ্ঞতা এই যে, রাষ্ট্র কি রকম পিতৃতান্ত্রিক এবং সমাজ অনেকটা মায়ের মতো। সমাজ আমাদেরকে আশ্রয় দেয়, লালন-পালন করে; কিন্তু কর্তৃত্ব থাকে ওই পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ওপর। রাষ্ট্র ভাঙলেও সমাজ কিন্তু রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়।"

অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। 

জয়ন্ত সাহা/এসএন

জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় সেরা হলো বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম
জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় সেরা হলো বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। ছবি: খবরের কাগজ

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় স্কুল পর্যায়ে দেশসেরা ১০ জনের মধ্যে নির্বাচিত হয়েছেন বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের সদস্য ও পাঠক ফাওজিয়াহ হক জিনাত।

সোমবার (২২ জুন) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তার হাতে সনদ ও পুরস্কার তুলে দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। এছাড়া মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ কার্যক্রমের বিচারকমণ্ডলীর সদস্য লেখক ও অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হক, কথাসাহিত্যিক শাহনাজ মুন্নী এবং লেখক ও সংগঠক সাবিদিন ইব্রাহিম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম।

অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি গ্রন্থাগারের প্রতিনিধি, পাঠক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ৭২টি বেসরকারি গ্রন্থাগার থেকে মোট ৬৪৭ জন পাঠক-শিক্ষার্থী এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। প্রাথমিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে ১৪৫ জনকে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচিতদের নিয়ে ৮ থেকে ১০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র মিলনায়তনে পাঠ-উত্তর মূল্যায়ন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের পাঠ-অনুভূতি মৌখিকভাবে গ্রহণ করা হয় এবং উপস্থাপনার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।

স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার জন্য হুমায়ূন আহমেদ রচিত সায়েন্স ফিকশন গ্রন্থ তোমাদের জন্য ভালোবাসা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, ‘এসো বই পড়ি, নিজেকে আলোকিত করি’ স্লোগানকে সামনে রেখে ২০১০ সালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চৌরাকররা গ্রামে গড়ে ওঠে বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঠাগারটি মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সেলুন, বাসস্ট্যান্ড ও স্টেশনে অণু-পাঠাগার স্থাপনসহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। পাশাপাশি আর্তমানবতার সেবায় বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করে আসছে।

জুয়েল রানা/রিফাত/

বাংলা একাডেমিতে মানিক রফিক আজাদ ও চন্দ্রাবতীকে স্মরণ

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:১৩ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
বাংলা একাডেমিতে মানিক রফিক আজাদ ও চন্দ্রাবতীকে স্মরণ
ছবি: সংগৃীহত

বাংলা সাহিত্যের তিন নক্ষত্র–কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি রফিক আজাদ ও মধ্যযুগের কবি চন্দ্রাবতী। ভিন্ন ভিন্ন সময়ের এই তিন কালজয়ী সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা আর বিশ্লেষণের আলোয় উদ্ভাসিত করতে বাংলা একাডেমি শুরু করেছে সেমিনার সিরিজ। গতকাল সোমবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এই সিরিজের সূচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী আয়োজিত এই সেমিনারে সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ ও বিবর্তন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তিন সাহিত্যিকের সৃষ্টির মৌলিকতা নিয়ে আলোকপাত করেন বিশিষ্টজনরা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে দাম্পত্যের জটিলতা
গতকাল (২২ জুন) বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া প্রথম আলোচনায় ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে দাম্পত্যজীবনের রূপায়ণ’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন লেখক ও গবেষক ড. উৎপল তালুকদার। আলোচনায় অংশ নেন কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীম। সভাপ্রধান ছিলেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী।

বক্তারা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলা কথাসাহিত্যের ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তার উপন্যাসে শ্রেণিগত প্রপঞ্চ ও দাম্পত্যজীবনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন যেভাবে উঠে এসেছে, তা আজও অতুলনীয়। বদ্ধ হাওয়ায় হাঁসফাঁস করা চরিত্রদের মুক্তি খোঁজার চিরন্তন আকুতি মানিকের লেখনীতে যেভাবে ফুটেছে, তা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতা।

রফিক আজাদের কবিতায় চৈতন্যের কোলাজ
গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় দ্বিতীয় আয়োজনে ছিল ‘রফিক আজাদের কবিতা: চৈতন্যের কোলাজ’ শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও সমালোচক চঞ্চল আশরাফ। আলোচনায় অংশ নেন কবি হিজল জোবায়ের। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বক্তারা বলেন, রফিক আজাদের কবিতা বাংলা কবিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তিনি বিদ্রোহ ও প্রেমের রঙে কবিতার ক্যানভাস সাজিয়েছেন। যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি এবং পরিবেশ-প্রকৃতির সুরক্ষা তার কবিতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তার ভাষার আধুনিকতা ও শৈল্পিক নান্দনিকতা নতুন প্রজন্মের কবিদের জন্য আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

চন্দ্রাবতীর গীতিকায় নারী-অস্তিত্বের শাঁস
সন্ধ্যা ৬টায় সিরিজের শেষ পর্বে আলোচিত হয় ‘চন্দ্রবতীর গীতিকায় রমনীয় স্বৈরিতা আর নারী-অস্তিত্বের শাঁস’। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী। আলোচনায় অংশ নেন চলচ্চিত্র নির্মাতা এন. রাশেদ চৌধুরী। সভাপ্রধান ছিলেন গবেষক ও নির্মাতা ড. ইউসুফ হাসান অর্ক। বক্তারা বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতীকে ‘পথিকৃৎ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বৈরী সমকাল উপেক্ষা করে তিনি নারীর বৈজয়ন্তী ঘোষণা করেছিলেন তার কালজয়ী সৃষ্টিতে। তার গীতিকায় মানবমঙ্গলের গান ও সুন্দর পৃথিবীর আকুতি ফুটে উঠেছে। চন্দ্রাবতীর সাহিত্যকৃতি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন আলোচকরা।

সুরে সুরে শেষ হলো বিশ্ব সংগীত দিবসের বর্ণিল আয়োজন

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম
সুরে সুরে শেষ হলো বিশ্ব সংগীত দিবসের বর্ণিল আয়োজন
ছবি: খবরের কাগজ

‘কণ্ঠ মেলাও সুর ও তানে, বিশ্ব জাগুক গানে গানে’- এই স্লোগানকে ধারণ করে রাজধানীজুড়ে উদযাপিত হলো বিশ্ব সংগীত দিবস। সুরের ঐকতানে মেতে উঠেছিলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা মিলনায়তন।

সোমবার (২২ জুন) শেষ হলো দুই দিনব্যাপী বর্ণিল আয়োজনের এই সংগীত উৎসব।

গত রবিবার থেকে থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব ঘিরে শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের আয়োজনে গত দুদিন রাজধানীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিলো মুখরিত। আলোচনা সভা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং দেশের জনপ্রিয় ও গুণী শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনায় উঠে এসেছে সংগীতের অসীম শক্তির কথা।

সোমবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা মো. রুহুল কবির রিজভী।

সংগীতের শক্তির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সংগীতের মধ্যে যে বিপুল শক্তি নিহিত রয়েছে, তা যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও অধিকারের সংগ্রামে বিস্ফোরিত হয়েছে। আমাদের বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে নব্বই ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান- প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংগীতের তুমুল শক্তির বিস্ফোরণ আমরা দেখেছি।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বলেন, ‘আমরা সংস্কৃতিকে একটি সৃজনশীল অর্থনীতির মধ্যে নিয়ে আসতে চাই।’

সমাপনী সন্ধ্যায় একাডেমির শিল্পীদের নজরুলের গানের সমবেত পরিবেশনা ছাড়াও অংশ নেন, সুকণ্যা মজুমদার, তানভীর আলম সজীব, পিন্টু ঘোষসহ একঝাঁক শিল্পী। হাসান রাজা লোক সাহিত্য পরিষদ ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর শিল্পীদের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। সর্বশেষ ব্যান্ড সংগীতের মূর্ছনায় উৎসবের ইতি টানে এসেইস, সর্বনাম ও জাসাস। 

সোমবার বিকেল ৪টায় কিশলয় কচি-কাঁচার মেলার শিল্পীদের দলীয় নৃত্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসব। এরপর আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, সংগঠনের সভাপতি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত গণসংগীত শিল্পী মাহমুদ সেলিম।

এ পর্বে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ সঙ্গীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র শীল। প্রধান অতিথি ছিলেন, লোকসংগীত শিল্পী আকরামুল ইসলাম।

পরে দলীয় পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে ওঠেন বাঁশুরিয়া লোকসংগীত গবেষণা ও চর্চা কেন্দ্র, সুর নন্দন, মহীরুহ, সপ্তরেখা শিল্পীগোষ্ঠী ও লোকাঙ্গন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা। এ ছাড়াও, একক সংগীত পরিবেশন করেন দেশের বরেণ্য শিল্পীরা।

জয়ন্ত সাহা/নাঈম

জন্মবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠান: সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্ব সবাইকে আলোকিত করে

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ১২:২১ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ১২:৩২ এএম
জন্মবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠান: সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্ব সবাইকে আলোকিত করে
ছবি: সংগৃহীত।

সুফিয়া কামাল তার জীবনযাপন ও ধারণের মধ্য দিয়ে নারীবাদ, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও বাক্স্বানতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে গেছেন। তার ব্যক্তিত্ব সবাইকে আলোকিত করে। বাংলাদেশকে যারা ভালোবাসেন, তারা সবাই এই কবির দ্বারা প্রভাবিত।

প্রখ্যাত কবি, নারী জাগরণের অগ্রদূত সুফিয়া কামালের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও স্মরণানুষ্ঠানে এসব কথা বলেছেন অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক মানবাধিকারকর্মী ও উন্নয়ন সংগঠক খুশী কবির।

 রবিবার (২১ জুন) বিকেলে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) ও সাঁঝের মায়া ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে কবির বাড়ি ’সাঁঝের মায়া’প্রাঙ্গণে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

কবির ১১৫তম জন্মবার্ষিকী ছিল ২০ জুন শনিবার।

এমএসএফের নির্বাহী প্রধান আইনজীবী সাইদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ‘তরুণ প্রজন্মের ভাবনায় কবি সুফিয়া কামাল’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করেন মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক খুরশীদা ইমাম, সংস্কৃতিকর্মী তৃষ্ণা সরকার, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক কর্মী মো. জাহেদুল আলম হিটো, কবিকন্যা সাঈদা কামাল প্রমুখ। এতে বক্তারা সুফিয়া কামালের সাহিত্যকর্ম ও জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। 

আলোচনা ও স্মরণানুষ্ঠান শেষে সাংস্কৃতিক পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন ছায়ানট ও নজরুল ইনস্টিটিউটের শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস লাকী, সানবিমস স্কুলের শিক্ষক ফেরদৌস রহমান চন্দন এবং সুফিয়া কামাল সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণের শিক্ষক মাহবুবা সুলতানা লিমা। এ ছাড়া সুফিয়া কামালকে নিয়ে লেখা পাঠ করেন এমএসএফের কর্মী মো. মনির হোসেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন একই সংগঠনের কর্মী তানিয়া খাতুন।

আবদুল্লাহ আল মামুন/এসএন