ক্যানভাস যেন এক নীরব ভাষা, যেখানে তুলির আঁচড়ে জমে ওঠে অস্ফুট অব্যক্ত কথা। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, মানুষের চোখের জলছবি আর রাজপথের সংগ্রামী মানুষদের নীরব মর্যাদার মিশেলে তৈরি এক অদ্ভুত সুরের মূর্ছনা এখন ঢাকার ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে।
শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধ্যায় তিনটি ভিন্ন ধারার প্রতিভাবান শিল্পী মো. ফারিয়াজ ইমরান, নীহারিকা অহনা বারসাত এবং সুরভী আক্তারের শিল্পকর্মে সেজে উঠেছে প্রদর্শনী ‘ত্রিবন্ধন’। শিল্পীর মন ও ক্যানভাসের মধ্যকার এই যে নিবিড় সংযোগ, তা যেন আজ এক মূর্ত রূপ পেয়েছে শিল্পানুরাগীদের সামনে। উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী সাইদুল হক জুইস, রশীদ আমিন এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আনিস।
স্মৃতির অতল থেকে উঠে আসা পরিচয়, প্রকৃতির সাথে মানবিক বন্ধন আর নগরের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্পগুলো এখানে একে অপরের সাথে সংলাপে মগ্ন।
নীহারিকা অহনা বারসাত দর্শকদের নিয়ে গেছেন এক স্বপ্নিল কাব্যিক জগতে। তার জলরঙ ও অ্যাক্রিলিকের বহুস্তরবিশিষ্ট কাজগুলোতে বৃক্ষ, পাখি ও নারীমূর্তির পুনরাবৃত্তি যেন এক প্রকার আরোগ্যের মন্ত্র উচ্চারণ করে। প্রকৃতিকে তিনি কেবল দৃশ্যপট হিসেবে নয়, বরং আত্মরূপান্তরের এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
উল্টো পিঠেই আবার সুরভী আক্তারের শিল্পভাষায় ধরা দিয়েছে মানবিকতার সূক্ষ্ম রেখা। এই শিল্পী ব্রাউন পেপারের ধূসর জমিনে লাল বলপয়েন্ট কলমের আঁচড়ে মানুষের চোখের ভাষা পড়তে চেয়েছেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে যেখানে মানুষ একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেখানে তার প্রতিকৃতিগুলো দর্শককে থমকে দাঁড়াতে এবং দৃষ্টির গভীরে লুকিয়ে থাকা নীরব কথাগুলো শুনতে আহ্বান জানায়।
নগরজীবনের না বলা আখ্যানকে মলাটবন্দি করেছেন মো. ফারিয়াজ ইমরান। ঢাকার রাজপথ, রিকশাচালকদের ঘামভেজা শরীর আর প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামগুলোকে তিনি জলরঙের মায়ায় জীবন্ত করে তুলেছেন। সমাজের জনপরিসরে যারা প্রায়শই অদৃশ্য থেকে যান, ফারিয়াজের তুলিতে তারাই হয়ে উঠেছেন অনন্য সাধারণ।
সামগ্রিকভাবে ‘ত্রিবন্ধন’ কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, এটি ব্যক্তি, সমাজ ও প্রকৃতির মধ্যকার সম্পর্কের এক নান্দনিক উদযাপন। আগামী ১৭ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
জয়ন্ত সাহা/রিফাত/