ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন বইমেলা শুরু হয়। কিন্তু জমতে জমতে অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী ছুটির দিন শুক্রবারের জন্য। এবার প্রথম দিনটি ছিল শনিবার। শুক্রবার আসতে আসতে আরও পাঁচ দিন। প্রকাশকরা একটু ঢিমেতালে চলবেন, আয়েশ করে থিতু হবেন, তারপর পুরোপুরি নেমে পড়বেন কেনাবেচায়। এমনটাই ভেবেছিলেন। এমনটাই হয়। কিন্তু এবার দ্বিতীয় দিনেই পাঠকরা প্রকাশকদের প্রত্যাশার পারদ চড়িয়ে দিলেন।
বিকেল ৪টার দিকে যখন বাংলা একাডেমির দিক থেকে মেলায় ঢুকছি, তখন সামনের সড়কে লোকসমাগম তেমন ছিল না। বাংলা একাডেমির দিকটায়ও খুব বেশি দর্শনার্থী দেখিনি। বর্ধমান হাউসের পেছন দিকে যেখানে ‘খবরের কাগজে’র স্টল, সেই জায়গাটাও ছিল প্রায় সুনসান। চলে এলাম সোহরাওয়ার্দী প্রান্তের বিশাল প্রাঙ্গণে। সেখানে লোকসমাগম বেশি। তবে গা-বাঁচিয়ে চলার জন্য সতর্ক থাকতে হয়নি। চলে এলাম লেকের দিকটায়। সাধারণত লেকের দুই পাশ ঘিরে সারি সারি পাথুরে বেঞ্চ। কোনো বেঞ্চই খালি নেই। নানা বয়সের মানুষ বইমেলার দিকে পিঠ দিয়ে লেকের দিকে মুখ করে বসে গল্প-গুজব করছেন। তারা যে বই কিনতে আসেননি, সেটা তাদের আয়েশি ভঙ্গিতে বসে থাকা থেকেই বোঝা যায়। কারও হাতে বইয়ের ব্যাগ নেই।
ভেবেছিলাম, এরকমই হয়তো যাবে। কিন্তু সেদিকটা ঘুরে লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের দিকে আসতেই দেখলাম টিএসসির দিক থেকে অনেক মানুষ মেলায় ঢুকছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেলা প্রাঙ্গণ মানুষের সমাগমে সরগরম হয়ে উঠল। এই তো বইমেলার আসল চেহারা। এরপর প্রাঙ্গণটা আরও ভরে উঠল। প্রায় প্রতিটি প্যাভিলিয়ন ঘিরে পাঠক। থিকথিকে না হলেও একেবারে শীর্ণ নয়। দ্বিতীয় দিনেই মেলা অনেকটা জমে উঠল। প্যাভিলিয়নগুলোতে পাঠকের ভিড় ছিল। কিন্তু স্টলগুলোর চিত্র উল্টো। এখনো বইমেলার কুড়ি শতাংশ স্টল প্রস্তুত নয়। প্রস্তুতি শেষ করতে পারেনি বাংলা একাডেমি ও প্রকাশকরা। ইট-কাঠ সরিয়ে নিচ্ছেন নির্মাণ শ্রমিকরা।
অব্যবস্থাপনার ছবিটা আরও স্পষ্ট হলো লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে দাঁড়িয়ে। স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলোতে আলোর রোশনাই, কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনের চত্বরটি অন্ধকারে মুহ্যমান। ‘কেন এমনটা হচ্ছে?’ প্রশ্ন করলাম ওই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা ‘মগ্নপাঠ’ পত্রিকার সম্পাদক কবি আহমেদ শিপলুকে। তিনি জানালেন, ‘এখনো তো আলোর ব্যবস্থা হয়নি। তবে আজ সন্ধ্যার দিকে বাংলা একাডেমি দেবে বলেছে। সেই অপেক্ষাতেই আছি।’ লিটল ম্যাগাজিনের চত্বরটা ঘিরে প্রতিশ্রুতিশীল লেখকদের প্রতিবছরই অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করতে দেখা যায়। ‘এবার কি কোনো পার্থক্য দেখতে পাচ্ছেন?’
শিপলু জানালেন, ‘এবার এই প্রাঙ্গণের বিন্যাসটা ভালো হয়েছে। উন্নতমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে টেবিলগুলো বানিয়েছে। একাডেমি নিজের উদ্যোগেই প্রতিটি স্টলের ব্যানার তৈরি করে দিচ্ছে। সেসব দিক থেকে আগের চেয়ে ভালোই বলব। এদিকটা জমতে আরও সপ্তাহখানেক লাগবে।’
পাঠকশূন্য লিটল ম্যাগাজিনের প্রাঙ্গণ পেরিয়ে প্যাভিলিয়নের দিকে আসতেই চিত্রটা পাল্টে গেল। ‘সময়’ প্রকাশনের প্যাভিলিয়ন ঘিরে বেশ কিছু পাঠক। নতুন বই খুঁজছেন। আজই তাদের স্টলে এসেছে বিশিষ্ট কথাশিল্পী মোস্তফা কামালের দুটি বই- ‘বিষাদ বসুধা’ ও ‘কাটামুণ্ডু রহস্য’। প্রথমটি উপন্যাস, দ্বিতীয়টি রহস্য উপন্যাস। বিক্রয়কর্মীরা বললেন, রহস্য উপন্যাসের চাহিদাই বেশি। তবে ভালো উপন্যাসের চাহিদাও আছে। সেদিক থেকে ‘বিষাদ বসুধা’ নিয়ে পাঠকের আগ্রহ থাকবে। ‘তাম্রলিপি’ প্রকাশনীর কর্মীরাও একই কথা বললেন। মেলা থেকে বিশেষ একশ্রেণির পাঠক সব সময় থ্রিলার কেনেন। প্রকাশনীটি বইমেলার দ্বিতীয় দিনেই এনেছে আয়মান সাদিকের ‘ম্যাথ অভিযান’ নামের শিক্ষামূলক সিরিজ আর অন্তিক মাহমুদের ‘ক্রাইম থ্রিলার গল্প’।
সিরিয়াস বইয়ের প্রকাশক হিসেবে পাঠক সমাবেশের সুনাম আছে। পাঠক সমাবেশের প্যাভিলিয়নে ঢুকতেই দেখা হলো কথাশিল্পী স্বকৃত নোমান ও মঈনুল হাসানের সঙ্গে। ‘মেলায় এবার কী ধরনের পরিবর্তন দেখছেন’, জিজ্ঞেস করতেই স্বকৃত জানালেন, ‘এবারের মেলাটাকে বলতে পারেন, সমন্বয়ধর্মী মেলা।’ কথাটা আমার মনে ধরল। ব্যাখ্যা চাইলাম। স্বকৃত জানালেন, ‘এবার মেলায় সব ধরনের বইয়ের স্টল স্থান পেয়েছে। এটা ইতিবাচক দিক। অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র পেয়েছে। সবার মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি বজায় রাখতে এই ধরনের বইমেলার গুরুত্ব আছে।’ ‘অন্য কোনো পরিবর্তন?’- আমার এই প্রশ্নের উত্তরে স্বকৃত বললেন, ‘নতুন প্রকাশকদের স্থান দেওয়ায় বইমেলার পরিসর এবার বেড়েছে। সৃজনশীল বইয়ের পাশাপাশি আরও নানা ধরনের বই পাওয়া যাবে।’ স্বকৃতের কথাটাই ঠিক। আমারও মনে হয়েছে শুধু পরিসর নয়, বিষয়বস্তুর দিক থেকেও মেলার ব্যাপ্তি বেড়েছে। আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সেটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। কথাশিল্পী মঈনুলের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় দিনেই মেলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাঠকরা আসছেন। বই হয়তো প্রথম দিকে ততটা বিক্রি হবে না, তবে এটা যে প্রাণের মেলা সেটা তারা বোঝেন। ধীরে ধীরে অন্য বছরগুলোর মতো লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের মিলনমেলায় পরিণত হবে। স্বকৃত নোমানের এবার একটি উপন্যাস বেরিয়েছে, প্রকাশক অন্যপ্রকাশ। বইটি অন্যপ্রকাশের স্টলে পাওয়া গেল। অনন্যা থেকে আসবে ‘নির্বাচিত গল্প’।
‘অনন্যা’য় দ্বিতীয় দিনে ১১টি বই এসেছে। এর মধ্যে মোস্তফা কামালেরও তিনটি বই আছে। বই তিনটি হচ্ছে- ‘কবি ও একজন নর্তকী’ (উপন্যাস), ‘পারমিতার সুখ দুঃখ’ (উপন্যাস) ও ‘ফটকুমামা গোয়েন্দাসমগ্র-২’ (কিশোর গোয়েন্দা)। ‘আগামী’ প্রকাশনী থেকেও আজ বেরিয়েছে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ভ্রমণকাহিনি ‘চীনদেশে কয়েকবার’। হাসনাত আবদুল হাই মূলত কথাশিল্পী। কিন্তু ভ্রমণকাহিনির লেখক হিসেবেও খ্যাতিমান।
স্বকৃত নোমানের সঙ্গে যখন সমন্বয়ধর্মী বহুত্বের কথা নিয়ে আলাপ করে পাঠক সমাবেশ থেকে বেরুচ্ছি, তার একটু পরেই দেখা হয়ে গেল মোহাম্মদ আবদুল মান্নান নামের একজন ‘লেখকে’র সঙ্গে। ক্রাচে ভর দিয়ে তিনি হাঁটছিলেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, ‘ইসলামি’ বই রচনা করেন তিনি। পেশায় প্রুফ রিডার। কাজ করেন বাংলাদেশ ইসলামী ফাউন্ডেশনে। ক্রাচে ভর দিয়ে চলার কারণটাও জানালেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের সময় একদিন অফিস থেকে রায়েরবাগের বাসায় ফিরতে গিয়ে বাসের ভেতরে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন। তার শরীরের জায়গায় জায়গায় দেখলাম দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন। সেই থেকে ক্রাচ তার সঙ্গী। করোনার সময় যখন ঘরে আটকে ছিলেন, তখন কলম তুলে নেন লেখালেখির জন্য। সেই থেকে ‘লেখক’ও তিনি। এ পর্যন্ত তার ৩৭টি বই বেরিয়েছে। সবই ইসলামি বই।
বইমেলা থেকে বেরুবার সময় বাংলা একাডেমির দিকে দুটো স্টলকে বেশ আকর্ষণীয় মনে হলো। এর একটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্টল, আরেকটি ‘জিয়া স্মৃতি সংসদ’-এর স্টল। স্টলটির শুরুতেই বিএনপির ৩১ দফার প্রচার চোখে পড়ল। তাতে লেখা ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা’। স্টলটিতে জিয়াউর রহমান, তারেক রহমান ও খালেদা জিয়াকে লেখা বইয়ের সমাহার। কিন্তু পাশাপাশি চোখে পড়ল বিশিষ্ট কথাশিল্পী জাকির তালুকদারের দুটো বই- ‘পিতৃগণ’ ও ‘মুসলমানমঙ্গল’; প্রকাশক রোদেলা। পাশেই দেখলাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দুই খণ্ডের আত্মজীবনী- ‘আমার স্বপ্ন আমার দেশ’। প্রকাশক ‘জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থা’। এই স্টলেই দেখা হলো মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আবদুস সালামের সঙ্গে। তিনি জানালেন, তারা কেন্দ্রীয়ভাবে একটা পাঠাগার স্থাপন করেছেন। সেখানে পাঠচক্র হয়। তিনি সেই পাঠচক্রের চেয়ারম্যান। তাকে সহায়তা করেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তাদের একটা প্রকাশনীও আছে- ইতি প্রকাশনী। সেই প্রকাশনীর বইসহ অন্যান্য প্রকাশনীর বই নিয়ে এই স্টলটি দিয়েছেন মেলায়। তাদের রাজনৈতিক কর্মীদের জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চায় তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।