সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল প্রান্তরজুড়ে বিকেলের মিঠে রোদ ম্লান হয়ে আসছে। মেলার নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাইক থেকে ভেসে এল সতর্কবার্তা–‘আকাশের মুখ ভার, সন্ধ্যায় নামতে পারে বৃষ্টি। প্রকাশকরা যার যার স্টল ও প্যাভিলিয়নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।’
ঘোষণাটি শেষ হতে না হতেই মেলা প্রাঙ্গণে শুরু হলো এক অন্যরকম ব্যস্ততা। অপ্রত্যাশিত বৃষ্টির হাত থেকে অমূল্য বইগুলোকে রক্ষা করতে তড়িঘড়ি করে ত্রিপল বের করলেন বিক্রয়কর্মীরা। স্টলের ওপরের অংশে নীল-কালো প্লাস্টিকের আবরণ টেনে দেওয়ার সময় সবার চোখেমুখে ছিল উৎকণ্ঠা। বই ভিজে যাওয়া মানেই তো অপূরণীয় ক্ষতি। তার ওপর বসন্তের দমকা হাওয়ায় ধুলোবালি উড়ে এসে নতুনের ঘ্রাণ মাখা বইগুলোর মলাট মলিন করে দিতে পারে, তাই সতর্কতার কোনো কমতি ছিল না।
তবে প্রকৃতির এই চোখরাঙানি দমাতে পারেনি মেলায় আসা অগণিত পাঠককে। বৃষ্টির শঙ্কা বা ধুলোবালির ওড়াউড়ি, সবকিছু উপেক্ষা করে গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে উঠেছিল মুক্ত আলোচনার ময়দান। মেলা এখন শেষ ভাগে, তাই ভিড়ও অন্য সময়ের চেয়ে ঢের বেশি।
কাঙ্ক্ষিত বইটি হাতে পেতে যেন তর সইছিল না অনেকের। ঘাসের ওপর বসে কেউ কেউ মেতেছেন নতুন বইয়ের পাঠে। স্টলের এক কোণে বা লিটল ম্যাগ চত্বরে দেখা গেল তরুণদের জটলা। সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কোনো রাজনীতি বা অর্থনীতি নয়, বরং প্রিয় লেখকের ছোটগল্পের রহস্য কিংবা উপন্যাসের বুনন।
মেলার শেষ দিনগুলোতে উদ্যানজুড়ে এমন দৃশ্যে সত্যিই মন জুড়িয়ে যায়। একদিকে বৈরী প্রকৃতির মোকাবিলার প্রস্তুতি, অন্যদিকে পাঠকদের অকৃত্রিম বইপ্রেম, সব মিলিয়ে অমর একুশে বইমেলা যেন তার আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। ধুলো আর মেঘের লুকোচুরিতেও দিনশেষে জয় হলো সেই মলাটের গন্ধ আর শব্দের জাদুকরী শক্তির।
শেষবেলার আলোচিত বই
সরদার ফজলুল করিম কেবল একজন দার্শনিক বা অধ্যাপক নন, তিনি ছিলেন এ দেশের মননশীল ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার অন্যতম বাতিঘর। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘সেই সে কাল: কিছু স্মৃতি কিছু কথা’ বইটি মূলত তার স্মৃতিকথা এবং বিভিন্ন সময়ের আলাপচারিতার সংকলন, যা পাঠককে এক অন্যরকম অতীতে নিয়ে যায়।
বরিশালে জন্ম নেওয়া এক মেধাবী তরুণের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে ওঠা, কারাবরণ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের গল্প উঠে এসেছে এই বইয়ে। নাজমা জেসমিন চৌধুরী স্মারক বক্তৃতায় দেওয়া তার সেই আলোচিত ‘স্মৃতি কথা’র ওপর ভিত্তি করে এই সংকলনটি সাজানো।
কথাপ্রকাশ থেকে বইমেলার শেষভাগে এসেছে সুজন বড়ুয়ার ছোটগল্প সংকলন ‘স্বপ্ন মরীচিকা’। ওয়াসি আহমেদের উপন্যাস ‘কার্পাসমহল’।
‘স্বপ্ন মরীচিকা’ বারোটি ছোটগল্পের একটি সুবিন্যস্ত সংকলন। বইটির ব্লার্ব থেকে জানা যায়, এটি নিছক কল্পিত গল্প নয়, বরং আমাদের চারপাশের চেনাজানা জীবনের গভীর প্রতিচ্ছবি। মানুষের জীবনের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি, উল্লাস আর বিষাদ–সব মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতির বয়ান।
ওয়াসি আহমেদ তার মিতভাষীতা কিন্তু গভীর গদ্যের জন্য পরিচিত। ‘কার্পাসমহল’ উপন্যাসেও তিনি বিশদ পরিসরে পাহাড়ের প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের বিদীর্ণ আত্মার মহাকাব্য রচনা করেছেন। পাহাড়ের ঝরনা, জঙ্গল আর ধ্রুপদি পাহাড়ের গাম্ভীর্য তার লেখনিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন এবং অভিনেতা-পরিচালক আবুল হায়াতের দীর্ঘদিনের শিল্প-সম্পর্কের ফসল ‘যুগলবন্দি’ বইমেলায় এনেছে অন্যপ্রকাশ। বইটি সাজানো হয়েছে রাবেয়া খাতুনের লেখা সাতটি ছোটগল্প এবং সেই গল্পগুলোর ওপর ভিত্তি করে আবুল হায়াতের তৈরি নাট্যরূপ বা চিত্রনাট্য দিয়ে। এই সংকলনের বিশেষ দিক হলো, এখানে পাঠক একই সঙ্গে মূল সাহিত্যকর্ম এবং সেটির দৃশ্যরূপটি (চিত্রনাট্য) দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদ হওয়ার সুবাদে মানুষের জীবনের টানাপোড়েনগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছেন সেলিম জাহান। এর ছাপ তার গল্পগুলোতে স্পষ্ট। জাগৃতি থেকে প্রকাশিত ‘গল্প নাও তো হতে পারে’ সংকলনটি তার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার নান্দনিক প্রতিফলন। তার গল্পগুলোতে জীবনের অতিসাধারণ মুহূর্তগুলোর অসাধারণ উপলব্ধি খুঁজে পাবেন পাঠক।
বিপ্লবী লায়লা খালেদ ১৯৬৯ সালে বিমান ছিনতাইয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামের বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মাই পিপল শ্যাল লাইভ: দ্য অটোবায়োগ্রাফি অফ আ রেভ্যুলশনারি’ গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ ‘আমার যুদ্ধ আমার ফিলিস্তিন’ এবারের বইমেলায় এনেছে বাতিঘর, অনুবাদ করেছেন মিলটন মোল্লা।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত পিয়াস মজিদের ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থটি মূলত কবির দীর্ঘ কাব্যযাত্রার এক নিবিড় কোলাজ। বইটির ব্লার্বে বলা হয়েছে, তিনি কবিতার ছলে নিজেকে জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করেন, অথবা হয়তো নিজেকে নিজেই ভেঙে টুকরো করেন। এই যে ভাঙা-গড়ার খেলা, এটাই পিয়াসের কবিতার মূল সুর।
জাভেদ আখতার মূলত বলিউডি সিনেমার কালজয়ী চিত্রনাট্যকার বা গীতিকার হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও তার সত্তার গভীরে বসবাস করেন একজন সংবেদনশীল কবি। তিনি অত্যন্ত সহজ শব্দ ব্যবহার করে মানুষের মনের জটিল অনুভূতি, আধুনিক জীবনের টানাপোড়েন এবং প্রগতিশীল চিন্তাকে ফুটিয়ে তোলেন। উর্দু কবিতার ভাব ও মাধুর্য বজায় রেখে জাভেদ আখতারের কবিতা অনুবাদ করেছেন শফিকুন্নবী সামাদী। বইটি বইমেলায় এনেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স।
তরুণ লেখক আবিদুল ইসলামের ‘সৌন্দর্যের ওপারে প্রতীক্ষমাণ অপচ্ছায়া’ বইমেলায় এনেছে বাঙালা গবেষণা। লেখক তার লেখাকে কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রায় ষাট হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে আধুনিক মানুষের বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার যে ইতিহাস, তার সঙ্গে বর্তমান কালের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকে একসূত্রে গেঁথে উপন্যাস লিখেছেন তিনি।