বাসে ঢিল ছোড়াকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজ ও ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনায় দুই কলেজের প্রায় ৩২ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা যায়।
বুধবার (২০ নভেম্বর) বেলা আড়াইটার দিকে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে ঘটনার সূত্রপাত। এরপর তা চলে প্রায় সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। এ সময় মিরপুর রোড়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন এই রুটে চলাচলকারীরা। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সংঘর্ষে আহতরা হলেন শাহরিয়ার (২১), নূর হোসেন (২৪), মোহাম্মদ তুষার (১৮), অনিম (২১), সেজন (১৮), রিফাত (২১), আরাফাত (২১), নীরব (২১), শরিফ (২১), ইয়াকুব (১৮), মেহেদী হাসান (২১), আল ইমরান (১৮), তানভীর (১৮), সুজন (১৮), আরিফ (১৭), মহিউদ্দিন (২৩), তারেক (৩২), তাহসিন (১৮), ফয়সাল (১৮), অরিকুল তরিকুল ইসলাম রাজীব (২৫), মোহাম্মদ আলী (১৭), হাসান (১৮), ইসমাইল (১৮), ফাইয়াদ (১৮), মাহির (১৭), সাকিন (১৮), তানভীর (১৮), তামিম (১৮), তাজফিকুর রহমান (১৭), আশিক (১৮), রাজ (১৮) এবং মেহেদী (১৮)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের দিকে ঢাকা কলেজের একটি বাস সিটি কলেজের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা এতে ঢিল ছোড়েন। এ খবর ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা জানতে পারলে তারা লাঠিসোঁটা নিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন। একপর্যায়ে সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল ছুড়ে পাল্টা জবাব দেন। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে।
এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দুই পক্ষকেই নিবৃত করার চেষ্টা করেন। তার পরও রাস্তা ছাড়েননি শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে সেনাসদস্যরা শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিয়ে স্ব স্ব ক্যাম্পাসের দিকে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেন। এরপর দুই পক্ষই রাস্তা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
এদিকে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে সেনাবাহিনীর মেজর রিজওয়ান বলেন, “এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। এখন বলা হচ্ছে, ‘সেনাবাহিনী হামলা করেছে।’ আসলে এমন কোনো কিছুই ঘটেনি। সেনাবাহিনী ও শিক্ষার্থী একসঙ্গেই কাজ করেছেন। তা ছাড়া সেনাবাহিনী-শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমরা চেষ্টা করছি, পুরো বিষয়টি কীভাবে দুই প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে সমাধান করা যায়।”
৯ দফা দাবি
ঢাকা কলেজের শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আ ক ম রফিকুল আলম গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় কলেজের শহিদ আ ন ম নজিব উদ্দিন খান খুররম অডিটোরিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের পক্ষে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেন।
এর মধ্যে রয়েছে আহত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতকরণ, সংঘর্ষের সময় কলেজের নানা অবকাঠামো ভাংচুরে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, সিটি কলেজকে অন্যত্র স্থানান্তর, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে সশরীরে ক্যাম্পাসে এসে পরিদর্শন, হামলায় জড়িত সেনা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ। ঢাকা কলেজের ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই সব দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে তিনি ঢাকা কলেজে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি দাবি করেন, সংঘর্ষে ঢাকা কলেজের অন্তত দেড় শ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আজকের আমাদের ১৮৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান শেষ করে শিক্ষার্থীরা কলেজবাসে করে যাচ্ছিল। সায়েন্সল্যাব মোড়ে যাওয়ার পথে সিটি কলেজের সন্ত্রাসীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে সেই বাসে হামলা চালায়। বর্তমান সরকারের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যর্থ করতেই আওয়ামী দোসরদের এই সন্ত্রাসী হামলা। টিভি ফুটেজ দেখে সিটি কলেজের সন্ত্রাসীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় আনতে হবে। আমাদের যেসব পরীক্ষার্থী রয়েছে, বৃহস্পতিবার (আজ) তাদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আহত পরীক্ষার্থীরা যেন পরীক্ষা দিতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
যানজটে দুর্ভোগ
শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের কারণে সায়েন্সল্যাব মোড় দিয়ে চলাচল করা যানবাহনগুলো আটকা পড়ে। এই রুট দিয়ে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, গাবতলী, সাভার, এয়ারপোর্ট-আব্দুল্লাহপুরগামী যানবাহন চলাচল করে। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকায় এই রুটের বাসগুলো বিকল্প রুট দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করে। ফলে যানজট ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সায়েন্সল্যাব দিয়ে চলাচল করা অনেক বাসকে পান্থপথ দিয়ে যেতে দেখা যায়। রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান যাত্রীরা।
শাহবাগে এয়ারপোর্ট পরিবহনে কথা হয় হাসিবুর রহমানের সঙ্গে। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘গুলিস্তান থেকে শাহবাগ আসতে ১ ঘণ্টা হয়ে গেল। শুনেছি সায়েন্সল্যাবে গণ্ডগোল হয়েছে। এগুলো বন্ধ করার দরকার। দুই দিন পরপর এই অবরোধ। এই রাস্তা বন্ধ।’
এদিকে নীলক্ষেত-নিউ মার্কেট এলাকায় অনেকেই বই এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে গিয়ে আটকা পড়েছেন। বই কিনতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়েন মোহাম্মদপুরের আলহাজ মকবুল হোসেন কলেজের শিক্ষার্থী সিফাত আলম।
যান চলাচল স্বাভাবিক হলে খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘বেলা ২টায় নীলক্ষেতে বই কেনার জন্য এসেছিলাম। বই কেনা শেষে যখন যাব, তখন দেখি বাস চলাচল একেবারেই বন্ধ হয় যায়। সংঘর্ষের খবর শুনে সামনে আর যায়নি। তা ছাড়া কিছু করার নেই। এখন বাস চলছে, তাই এখন ফিরছি। দেরি হলেও নিরাপদে ফিরতে পারছি, এটাই তো অনেক।’