বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) হেলথ কেয়ার সেন্টারের নিম্নমানের সেবা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কয়েক প্রকার ওষুধেই সীমাবদ্ধ এখানকার চিকিৎসাসেবা। বিশেষজ্ঞ না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ১৪ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ডেন্টাল ইউনিট। নেই কোনো নার্স। সেবার মান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের চলছে নানামুখী সমালোচনা। এখানকার পুরো ব্যবস্থাপনাই অগোছালো বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে হেলথ কেয়ারে বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ৮ জন চিকিৎসক। এদের মধ্যে চিফ মেডিকেল অফিসারসহ নিয়মিত চিকিৎসক আছেন ৬ জন। খণ্ডকালীন চিকিৎসক ২ জন। দীর্ঘদিন ধরে ৫টি মেডিকেল অফিসারের পদ শূন্য থাকায় রোগীরা নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন না। হেলথ কেয়ার সেন্টারে নার্সের কোনো পদই নেই। নেই কোনো বিশেষায়িত ইউনিট। কোনো ডেন্টাল ইউনিটও নেই। ডেন্টাল বিভাগে ১৪ বছর আগে একজন খণ্ডকালীন নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসক ছিলেন। ২০১১ সালে তিনি চলে যাওয়ার পর গত ১৪ বছরেও আর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ডেন্টাল চিকিৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি এখন প্রায় অকেজো হয়ে গেছে।
বর্তমানে হেলথ কেয়ার সেন্টারে কর্মকর্তা আছেন ১০ জন। কর্মচারী আছেন ১৬ জন। যার মধ্যে ৬ জন নিয়মিত, ৭ জন মাস্টাররোলে, আর ৩ জন কর্মচারীর পদ শূন্য থাকায় ঘাটতি মেটাতে অন্য শাখা থেকে লোক আনা হয়েছে।
হেলথ কেয়ারে ৭ প্রকার অ্যান্টিবায়োটিক, গ্যাসের ওষুধ, চর্মরোগের মলম ও প্যারাসিটামল বিনামূল্যে দেওয়া হলেও চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। দিনের বেলায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর তুলনায় বহিরাগত রোগীর সংখ্যা থাকে বেশি।
সরেজমিনে দেখা যায়, হেলথ কেয়ার সেন্টারের নিচতলার টয়লেট অপরিচ্ছন্ন। কোনোটার দরজা ভাঙা। হেলথ কেয়ারের বাইরেই রয়েছে ময়লার ভাগাড়। বিভিন্ন আবাসিক হলের ময়লা ফেলা হয় সেখানে। দিনের বেলা কখনো সেন্টারটির বারান্দা মোটরসাইকেলের পার্কিং হিসেবে ব্যবহার হতে দেখা যায়। হেলথ কেয়ারের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা কয়েক বছর ধরেই নারী শিক্ষার্থীদের সাময়িক আবাসনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক শিক্ষার্থী হাসান তপু বলেন, ‘আমি কয়েক দিন আগে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হেলথ সেন্টারে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে আমাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলা হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ কেয়ারে জরুরি চিকিৎসার সব ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু ডাক্তার নেই। ওষুধও নেই। আসলে পুরো ব্যবস্থাপনাই অগোছালো।’
হেলথ কেয়ার সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্সের সমস্যাও প্রকট। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মাহিরুজ্জামান নিলয় খবরের কাগজকে বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না। অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া খুব জটিল প্রক্রিয়া। ডাক্তারের স্বাক্ষর থেকে শুরু করে অনেক জায়গায় নাটক হয় এখানে। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরের অংশ ভাঙা। সাইরেন ঠিক নেই। বাজেই না। অ্যাম্বুলেন্স যেন লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মো. সাঈদুর রহমান (শওকত) খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের হেলথ কার্ড প্রস্তুত। ভিসি ও অ্যাডভাইজারের সঙ্গে কথা বলে শিগগির এটা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছে দেব।’
চিফ মেডিকেল অফিসার বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ব্যক্তিগতভাবে কোনো ওষুধ কেনে না। সরকারি কিছু ক্রয় নীতিমালা আছে। গুণগত মান ও মূল্য দেখেই ওষুধ কেনা হয়।’
হেলথ কেয়ারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘একটা সময় কেবল ৮-১০টা টেস্ট করা হতো। এখন করা হয় ২৮টা। এর মধ্যে ১৫টা টেস্ট করা হয় নামমাত্র মূল্যে। ডেঙ্গু ও ইউরিন টেস্ট সম্পূর্ণ ফ্রি। বাকি টেস্টগুলোর দামও বাইরের হাসপাতাল থেকে অনেক কম। ছাত্রদের জন্য প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ছাড়। এক্স-রের জন্য রয়েছে ডিজিটাল মেশিন।’
অ্যাম্বুলেন্সের কাঠামোগত ত্রুটি ও সময়মতো না পাওয়ার বিষয়ে ডা. সাঈদুর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সব গাড়ি পরিবহন শাখার অন্তর্গত। দুটো অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটা সব সময় থাকে, একটা রিজার্ভ থাকে। অ্যাম্বুলেন্স কে নিচ্ছে সবই রেকর্ড থাকে। অ্যাম্বুলেন্স ভাঙা কি না, তাতে জ্বালানি আছে কি না, সব দেখে পরিবহন শাখা।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘হেলথ কেয়ারের ডাক্তারসংকট সমস্যার ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। সমস্যাটি সমাধানের ব্যাপারে ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে। ডাক্তার নিয়োগের ব্যাপারটি সময় সাপেক্ষ একটি ব্যাপার। এই সংকট দূর করতে কিছুটা সময় লাগবে। তবে ওষুধের ব্যাপারটি খতিয়ে দেখে খুব দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’