নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে বিষধর সাপের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বর্ষা মৌসুমে ঝোপঝাড়, জলাবদ্ধতা ও পরিচ্ছন্নতার অভাবে সাপের বিচরণ বেড়ে গেছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের এক শিক্ষার্থী সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে Neurotoxic (স্নায়ুবিষক্রিয়) বিষধর সাপের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো অ্যান্টিভেনম নেই, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ক্যাম্পাসজুড়ে সম্প্রতি বিষধর সাপ, বিশেষ করে গোখরার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একাডেমিক ভবন-৩, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, নীল দিঘি, কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন এলাকা এবং আবাসিক হলগুলোর আশপাশে একাধিকবার সাপ দেখা গেছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে চলাচলে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৫ জুলাই নিয়োগপ্রাপ্ত ৯ জন মালির মধ্যে মাত্র পাঁচজন কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন। বাকি দুজন ছুটিতে থাকলেও অন্য দুজন কেন অনুপস্থিত ছিলেন, তার কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
ইএসডিএম বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে যত্রতত্র ঝোপঝাড়, আগাছা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে সাপের আবাসস্থল তৈরি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের চলাফেরাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। কে কখন কোথায় সাপের মুখে পড়বে, বলা যায় না। ক্যাম্পাসে আমরা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে চাই। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাপে কামড় দিলে মেডিকেল সেন্টারে কোনো অ্যান্টিভেনম নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম মজুত নেই বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল অফিসার ডা. ওয়াকিল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের মেডিকেল সেন্টারে সাপের কামড়ের অ্যান্টিভেনম নেই। এ ধরনের ওষুধ সংরক্ষণ ও প্রয়োগের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত নার্স প্রয়োজন যা আমাদের এখানে নেই। ভুল প্রয়োগ হলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। সাপে কাটা রোগী এলে তাৎক্ষণিকভাবে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়, যেখানে অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায়। তবে সময়মতো পৌঁছানো না গেলে রোগীর জীবনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মফিজ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে এখনো অ্যান্টিভেনম মজুদ নেই। সিভিল সার্জনের কাছে আবেদন করলেও তারা অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করতে রাজি হননি। কারণ, অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের আগে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ, বিষ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষিত জনবল থাকা জরুরি যা আমাদের এখানে নেই। আমরা যেকোনো সাপে কাটা রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে নোয়াখালী সদর হাসপাতাল বা কাছাকাছি অ্যান্টিভেনম-সুবিধাসম্পন্ন স্থানে পাঠিয়ে দিই। এর আগেও এমন একটি ঘটনার সময় আমরা জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী পাঠিয়ে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করেছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট অ্যান্ড হাউস শাখার ব্যবস্থাপক ড. এ এস এম শরিফুর রহমান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে সাপের উপদ্রব কমাতে পরিচ্ছন্নতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ক্যাম্পাসের জন্য ৯ জন মালি থাকলেও তারা নিয়মিতভাবে কাজ করেন না। তাদের কাজ তদারকির জন্য একজন দক্ষ সুপারভাইজার প্রয়োজন। এ ছাড়া একাডেমিক ভবন-৩-এর অভ্যন্তরীণ ও আশপাশের অংশ অনেকটাই অপরিচ্ছন্ন। এসব এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত লোকবল ও বাজেট দরকার।’
তিনি জানান, বৃষ্টির সময় মালিদের মাঠে নামতে সমস্যা হয় কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে এখনো রেইনকোট কিনে দেওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে কোনো ধরনের সাপ তাড়ানোর স্প্রে বা ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না। হলগুলোর প্রভোস্টরা যদি নিজ নিজ হলের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখেন, তাহলে আমাদের ওপর চাপ কমে যাবে। প্রতিটি বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় মাঠে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি সমন্বিতভাবে কাজ করেন, তবে পুরো ক্যাম্পাসের পরিবেশ অনেকটাই উন্নত হবে।’
কাউসার/পপি/