৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। দশম এই জাকসু নির্বাচন ঘিরে ফ্যাকাল্টি থেকে আবাসিক হল, ক্লাসরুম থেকে হলের করিডর সবখানেই চলছে নির্বাচনি উত্তাপ। চলছে প্রার্থীদের প্রচার।
সমানতালে চলছে ভোটারদের চুলচেরা বিশ্লেষণ। ভোটাররা চাইছেন এমন নেতৃত্ব, যারা দলের প্রতিনিধি নয়, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করবেন। তারা বলেছেন, নেতৃত্ব নির্বাচনের সততা, পরমতসহিষ্ণুতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, যোগাযোগের দক্ষতা, দূরদর্শিতাসহ বিভিন্ন দিক মূল গুণাবলি হওয়া উচিত। এই নেতৃত্বই হয়তো ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসের সংস্কৃতি বদলে দেবে।
তারা আরও বলেছেন, প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার পর আর ভিন্ন শ্রেণি তৈরি করবেন না। বরং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখবেন।
এ বিষয়ে ইউআরপি বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল হাকিম বলেন, ‘আমরা নিজেদের নেতা নির্বাচনে প্রার্থীর গণ-অভ্যুত্থানে ভূমিকা দেখব। কারণ এ সংগ্রাম ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে।’
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী লাল লম বলেন, ‘লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক প্রভাব থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতিই হবে নেতৃত্বের অন্যতম মানদণ্ড।’
ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আগে কী করেছেন, সেটাই বলে দেবে, তিনি আসলেই শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাজ করবেন কি না।’
আইআইটির শিক্ষার্থী মাহবুবুর রহমান মারুফ বলেন, ‘নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হবেন- এটাই প্রত্যাশা। যৌক্তিক অধিকার আদায়ে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে। অতীতে যেসব টর্চারসেল (গণরুম-গেস্টরুম) চালু ছিল, সেগুলো যাতে আর ফিরে না আসে, সেদিকে নজর দিতে হবে।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিহা জান্নাতি বলেন, ‘প্রার্থীরা এখন সমস্যার কথা জানতে আসছেন। প্রশ্ন হলো- বিজয়ী হওয়ার পর তারা কী একইভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে আসবেন? তারা স্বজনপ্রীতি বা অপশক্তির বিরুদ্ধে কতটা অবস্থান নেবেন? এসব জানা জরুরি।’
নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম ইসলাম বলেন, ‘প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ার পর প্রথমেই যেন শিক্ষা ও গবেষণার দিকটা নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলেন।’
রফিক জব্বার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘একজন ভোটার হিসেবে আমি প্রথমেই দেখব, প্রার্থীর এজেন্ডা শিক্ষার্থীদের স্বার্থের সঙ্গে মেলে কি না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- পরমতসহিষ্ণুতা। যদি প্রার্থীর এ গুণ না থাকে, তবে অন্য যোগ্যতাও কোনো কাজে আসবে না।’
আইন ও বিচার বিভাগের শিক্ষার্থী মেহজাবিন হৃদি বলেন, ‘ভোটার হিসেবে প্রার্থীর কাছে আমার প্রত্যাশা খুবই সাধারণ, নির্বাচনের আগে তারা যেভাবে প্রচারে মনোযোগী হন, বিজয়ী হওয়ার পরও একই গুরুত্ব ও আন্তরিকতায় যেন দায়িত্ব পালন করেন। প্রার্থীদের ভুলে গেলে চলবে না যে ভোটাররাই তাদের নির্বাচিত করেছেন। তাই ভোটারের স্বার্থকেই সর্বাগ্রে দেখতে হবে।’
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী তৌফিকুর রহমান তামিম বলেন, ‘আমার কাছে প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি। শিক্ষকদের স্বৈরাচারী আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কিন্তু এতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময় ছাত্র প্রতিনিধিদের লোভ। তারা যেন অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে না যান। কারণ শিক্ষকরা তাদের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথে যিনি বাধা হয়ে দাঁড়াবেন, তাকে দমন করতে ক্ষমতা কিংবা অর্থ, যা দরকার তাই করবেন।’
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ইশতেহার ঘোষণা
জাকসু ও ২১টি হল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত সাদী-বৈশাখী-সাজ্জাদ-ইকরা পরিষদ ইশতেহার ঘোষণা করেছে। গত শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরসংলগ্ন অদম্য-২৪ ভাস্কর্যের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ইশতেহার ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভিপি প্রার্থী শেখ সাদী হাসান ও জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী। উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সম্পাদক পদপ্রার্থী সাজ্জাদুল ইসলাম ও আনজুমান আরা ইকরাসহ প্যানেলের অন্য সদস্যরা।
ইশতেহারের দফাগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে নিয়মিত জাকসু নির্বাচন অন্তর্ভুক্ত করা, কোর্স কারিকুলামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি ও ল্যাব আধুনিকায়ন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য প্রথম দিন থেকেই সিট নিশ্চিত করা এবং মানোন্নয়ন পরীক্ষার সুযোগ রাখা।
এ ছাড়া ইশতেহারে বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক কর্মসূচি, গেস্টরুম-গণরুম সংস্কৃতি, র্যাগিং, দখলদারত্ব ও সন্ত্রাস বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। নারী শিক্ষার্থীদের হলগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নারী রাজনীতিবান্ধব ক্যাম্পাস, যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলকে কার্যকর করা এবং স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে নারী চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্র আধুনিকায়ন, ২৪/৭ চিকিৎসক ও নার্সের উপস্থিতি, অ্যাম্বুলেন্স-ফার্মেসি সুবিধা এবং জরুরি ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পরিবহন-সংকট সমাধানে পরিকল্পিত অটোরিকশা চালু, ইলেকট্রিক কার্ট বাড়ানো ও ভাড়া কমানো, বাস রুট পর্যালোচনা, নতুন রুট চালু ও প্রতিটি বাসে জিপিএস ট্র্যাকার স্থাপন করে অ্যাপসের মাধ্যমে বাস ট্র্যাকিং সুবিধা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
ভিপি প্রার্থী শেখ সাদী হাসান বলেন, ‘আমাদের ইশতেহার শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার প্রতিফলন। আমরা সবাই মিলে তা বাস্তবায়নে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।’
জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরের ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী নারী। তাদের বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এগোতে পারবে না। আমরা ইশতেহারে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, অধিকার ও অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দিয়েছি।’
প্রসঙ্গত, গত ২৮ আগস্ট ছাত্রদল ২৫ সদস্যের এই পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে।