৩৩ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও ২১টি হল সংসদ নির্বাচন। কেন্দ্রীয় সংসদে ভিপি পদে ৯ ও জিএস পদে লড়ছেন আটজন। ক্যাম্পাসে ভোটের উত্তেজনা তুঙ্গে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে ভোট উৎসবের আমেজ। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোট গ্রহণ।
নির্বাচন উপলক্ষে প্রশাসন কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১ হাজার ৫০০ পুলিশ সদস্য, ৭ প্লাটুন বিজিবি ও ৫ প্লাটুন আনসার মোতায়েন রয়েছে। গতকাল বুধবার থেকে ক্যাম্পাসে বাড়তি টহল চলছে। এবারের নির্বাচনে ১১ হাজার ৯১৯ জন শিক্ষার্থী ভোট দেবেন। এর মধ্যে ৫ হাজার ৮১৭ জন নারী, যারা মোট ভোটারের ৪৮.৮ শতাংশ। তারা নির্বাচনে ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
ভোটের প্রস্তুতি
জাকসু নির্বাচনের ভোটের সব প্রস্তুতি নিয়েছে কমিশন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিচালক ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাকসু নির্বাচন কমিশন ভোটের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ১১টি ছাত্র ও ১০টি ছাত্রী হলে একযোগে ভোটগ্রহণ চলবে। ২১টি ভোটকেন্দ্রে ২২৪টি বুথ স্থাপন করা হয়েছে। ৬৭ জন পোলিং অফিসার (শিক্ষক) ও ৬৭ জন সহায়ক পোলিং অফিসার (কর্মকর্তা) দায়িত্ব পালন করবেন। ভোট গণনা হবে সিনেট হলে।
মীর মশাররফ হোসেন হল গেট ও প্রান্তিক গেট ছাড়া সব গেট ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১২ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ক্যাম্পাসের ভাসমান দোকান, টারজান পয়েন্ট, মুরাদ চত্বর, প্রান্তিক ও প্রধান গেটের দোকানগুলো আজ সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। হলের ক্যানটিন খোলা ও খাবার মজুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জরুরি বিভাগ ছাড়া মোটরসাইকেল চলাচল নিষিদ্ধ। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাচন কমিশনের স্টিকারযুক্ত গাড়ি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে।
ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-সমর্থিত সাদী-বৈশাখী-সাজ্জাদ-ইকরা পরিষদ গত শনিবার অদম্য-২৪ ভাস্কর্যের সামনে ইশতেহার ঘোষণা করে। ভিপি প্রার্থী শেখ সাদী হাসান ও জিএস প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী বলেন, তাদের লক্ষ্য শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস। তাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে, নিয়মিত জাকসু নির্বাচন ও অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্তি, কোর্স কারিকুলামের মানোন্নয়ন, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, ল্যাব আধুনিকায়ন, হলের সিট নিশ্চিতকরণ, র্যাগিং ও গেস্টরুম সংস্কৃতি বন্ধ, নারীদের নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরা, আলাদা নামাজ কক্ষ, যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠন। চিকিৎসাকেন্দ্র আধুনিকায়ন, ২৪/৭ চিকিৎসক, বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান, পরিবহনসংকট সমাধানে অটোরিকশা, ইলেকট্রিক কার্ট, জিপিএস ট্র্যাকিং চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে তাদের।
সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেল
সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার নিয়ে এই প্যানেল নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে শিক্ষক মূল্যায়ন, গবেষণায় তহবিল, ২৪ ঘণ্টা গ্রন্থাগার খোলা রাখা, চিকিৎসাকেন্দ্রকে হাসপাতালে রূপান্তর, স্বাস্থ্যবিমা, ক্যানটিনে ভর্তুকি প্রদান, হল সংস্কার, নারী নিরাপত্তা, নতুন বাস রুট চালু ও সাংস্কৃতিক উৎসব।
ছাত্রফ্রন্ট
গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছাত্রফ্রন্ট ইশতেহারে ঘোষণা করেছে। তাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে, সেশনজট নিরসন, গবেষণায় ১০ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ, ২৪ ঘণ্টা গ্রন্থাগার খোলা রাখা, র্যাগিং বন্ধ, নিরাপত্তা চৌকি, মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, নিজস্ব অর্থায়নে বাস, শাটল কার্ট, ক্রীড়াবিদদের ভাতাও দিতে চান তারা।
শিবির-সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট
গত রবিবার বটতলায় ৯ দফা ইশতেহার ঘোষণা করে সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের ভিপি প্রার্থী আরিফ উল্লাহ। জিএস প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘ভর্তুকি ও মেডিকেল সুবিধায় হ্যাঁ, সেশনজট ও র্যাগিংয়ে না।’ প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে সেশনজট নিরসন, নারী নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বই প্রদান।
নারী প্রার্থী ও ভোটারদের ভূমিকা
জাকসু ও ২১টি হল সংসদের ৩৪০টি পদের জন্য ৬২০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ৪৪৮ জন পুরুষ ও ১৭২ জন নারী। প্রত্যেক ভোটার ৪০টি পদে (জাকসুর ২৫টি ও হল সংসদের ১৫টি) ভোট দেবেন। জাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে ১৩টি পদে নারী-পুরুষ উভয় ভোটার ভোট দিতে পারবেন। এই ১৩টি পদে ৯৫ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১১ জন নারী। সহসভাপতি (ভিপি) পদে কোনো নারী প্রার্থী নেই, তবে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-সমর্থিত তানজিলা হোসাইন বৈশাখী একমাত্র নারী প্রার্থী।
১০টি হলের ২০ জন নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপে তারা জানান, তারা লিঙ্গ সমতা ও নারী ক্ষমতায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রার্থীদের সমর্থন করবেন। নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নুশরিকা আদ্রি বলেন, ‘যারা সন্ধ্যার কারফিউ ফিরিয়ে আনতে চায় বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে আছে, তাদের ভোট দেব না।’ সাংবাদিকতা বিভাগের জেরিন তাসনিম বৈশাখী বলেন, ‘নারীদের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার। যারা নারীবিদ্বেষ ছড়ায়, তারা সমাজকে পিছিয়ে নেয়। আমি নারীবান্ধব ক্যাম্পাস নিশ্চিত করবে এমন প্রার্থীদের ভোট দেব।’
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে প্রার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘মৌলবাদী শক্তি পরাজিত না হলে নারী শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া বাড়বে।’ আরেক প্রার্থী ফারিয়া জামান নিকি বলেন, ‘নারীদের স্বাধীনতা সীমিত করতে চায়, এমন দল নির্বাচিত হলে ক্যাম্পাসের অন্তর্ভুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নারী ভোটাররা তাদের প্রত্যাখ্যান করবে বলে আশা করি।’
সম্ভাবনা বেড়েছে বৈশাখীর
সাধারণ সম্পাদক পদে একমাত্র নারী প্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী নিজেকে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘নারীদের জন্য রাজনীতি কঠিন। আমি দেখাতে চাই, যোগ্যতা থাকলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগোনো যায়।’ তার প্রতিদ্বন্দ্বী অনন্যা ফারিয়া ভোটের দুই দিন আগে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় বৈশাখীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। অন্যান্য জিএস প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন ছাত্রশিবির-সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের মাজহারুল ইসলাম, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম, সম্প্রীতির ঐক্যের শারণ আহসান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শাকিল আলী।
শিক্ষার্থীদের মতে, মাজহারুলের কলা, সমাজবিজ্ঞান ও চারুকলা অনুষদে নারী ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে জীববিজ্ঞান ও বিজ্ঞান অনুষদে তিনি কিছু নারী ভোট পেতে পারেন। তার দলের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের সাইবারবুলিংয়ের অভিযোগ থাকলেও ডানপন্থি সমর্থক ও জীববিজ্ঞান-বিজ্ঞান অনুষদের ভোটে তিনি বৈশাখীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তৌহিদ অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়েছেন, আর শরণ এহসান নারী ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য। সিয়াম ও শরণ বৈশাখীর ভোট ভাগ করে নিতে পারেন, যা মাজহারের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু নারী হলগুলোতে বেশ জনপ্রিয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-সমর্থিত আরিফুজ্জামান ও ছাত্রদল-সমর্থিত শেখ সাদী হাসান। গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কয়েকজন নেতাও আরিফুজ্জামান উজ্জ্বলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তারা বলছেন, আরিফুজ্জামান নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন। তিনি আসলে ডানপন্থি রাজনীতিতেই বিশ্বাস করেন। এ জন্য তিনি ডানপন্থি ও জীববিজ্ঞান-বিজ্ঞান অনুষদের নারী ভোট পেতে পারেন। সাদী উত্তরাঞ্চলের (রাজশাহী ও রংপুর) ভোটারদের সমর্থন পেলে ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারেন।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী লাল লম বলেন, ‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন নিশ্চিত করাই প্রার্থীদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।’ অর্থনীতি বিভাগের তৈমুর খান তূর্য বলেন, ‘ইশতেহারে বাস্তবায়নযোগ্য দিক আছে, প্রার্থীরা শিক্ষার্থীবান্ধব হোক।’ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘৩৩ বছর পর ভোট দিতে যাচ্ছি। আশা করি নির্বাচিত প্রার্থীরা অধিকার আদায়ে কাজ করবেন।’
ডোপ টেস্ট ও স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ
ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক হলেও অনেক প্রার্থী গতকাল পর্যন্ত ডোপ টেস্ট করাননি। যারা টেস্ট করেছেন, তাদের ফলাফলও চূড়ান্ত হয়নি। পজিটিভ ফলাফল এলেও প্রার্থীদের নাম ব্যালটে থাকছে, যা নিয়ে ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। ছাত্রফ্রন্টের প্রার্থী সজীব আহমেদ জেনিচ বলেন, ‘ডোপ টেস্ট নাটক। পজিটিভ ফলাফলের প্রার্থীরা কি থাকবে?’ সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই, কারচুপি নয়।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘পজিটিভ ফলাফলের ক্ষেত্রে বহুল প্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের জানানো হবে। তবে শেষ মুহূর্তে ব্যালট থেকে নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।’