ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম বড় উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের প্রমাণ করেছে। প্রতিবছর লাখো শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশ থেকে ভর্তি হতে আসে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এর মধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়—ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (IISc), জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি (JNU), বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি (BHU) এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভারতের শ্রেষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তা নিয়ে লিখেছেন তাসলিমা নীলু
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স, বেঙ্গালুরু
ভারতের কর্নাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি দেশটির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত IISc মূলত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এখানে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, প্রকৌশল, জীববিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে বিশ্বমানের গবেষণা পরিচালিত হয়।
শিক্ষার মান এখানে অত্যন্ত উচ্চ। প্রায় প্রতিটি বিভাগে রয়েছে অত্যাধুনিক গবেষণাগার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইনির্ভর নয়, বরং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার কাজে যুক্ত থাকে। খরচের দিক থেকে এটি তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল হলেও, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বৃত্তি।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি
রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান, রাজনীতি, ভাষা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ভারতের সবচেয়ে স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত JNU আজ ‘চিন্তার স্বাধীনতা’ ও ‘গবেষণার স্বাধীনতা’র প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
এখানে শিক্ষার মান শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিতর্ক, সেমিনার ও গবেষণামূলক আলোচনায় অংশ নেয়, যা তাদের চিন্তা ও যুক্তি বিকাশে সাহায্য করে। বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও এখানে উল্লেখযোগ্য। খরচ তুলনামূলকভাবে কম—সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় টিউশন ফি সাধারণ মানুষের নাগালে। গবেষণার সুযোগ এবং আধুনিক হোস্টেল ব্যবস্থাও শিক্ষার্থীদের জন্য বড় আকর্ষণ।
বানারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, বারানসী
ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বারানসীতে অবস্থিত বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রায় ১,৩০০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এতে ১৪টি অনুষদ ও শতাধিক বিভাগ রয়েছে, যেখানে বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কলা, আইন ও কৃষি সব বিষয়ের পড়াশোনা হয়।
BHU-র সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ঐতিহ্য ও বহুমুখী শিক্ষাকাঠামো। এটি ভারতের মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেয়। শিক্ষার মান অত্যন্ত ভালো, আর খরচ তুলনামূলকভাবে কম। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও এটি একটি জনপ্রিয় কেন্দ্র, বিশেষ করে ইন্দোলজি ও সংস্কৃত অধ্যয়নের জন্য।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের অন্যতম সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং, কলা ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগে এর সুনাম অতুলনীয়। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান ও গবেষণার দক্ষতা বাড়াতে এখানে রয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও শিল্প খাতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। পড়াশোনার খরচ অত্যন্ত কম, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বড় সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ভারতের এই চার বিশ্ববিদ্যালয় শুধু দেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভারতের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। উচ্চমানের শিক্ষা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং মুক্তচিন্তার পরিবেশ— সব মিলিয়ে তারা আজ ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার গর্ব।