প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষা পাঠ্যক্রমে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয় যুক্ত করে শিক্ষাকে আরও বাস্তবিক ও শৈল্পিক রূপ দিতে চেয়েছিল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠনের সমালোচনায় ও আপত্তিতে সরকার সে সিদ্ধান্ত হতে সরে এসেছে। এই বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি সংশোধিত গেজেট জারি করে। ফলে প্রথমে আশার আলো দেখলেও এখন হতাশায় ভুগছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তিনটি কলেজে সংগীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ১) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ৩) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ৪) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ৫) রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, ৬) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ৭) শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ৮) রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়, ৯) সরকারি সংগীত কলেজ, ১০) দিনাজপুর সংগীত কলেজ এবং ১১) শহিদ সাধন সংগীত কলেজ।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিবছর অনেক শিক্ষার্থী সংগীত বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থাকলেও নেই বিষয়ভিত্তিক চাকরির সুযোগ। তাদের অন্যান্য সাধারণ বিষয়ে ডিগ্রিধারীদের সঙ্গে লড়াই করে অন্যান্য সেক্টরে চাকরি করতে হচ্ছে, যে সেক্টরগুলো কোনোভাবেই সংগীতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয় বা কোনো মিল নেই। বর্তমান সরকারের বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষা যুক্ত করার সিদ্ধান্তে প্রথমে আশার আলো দেখা দিলেও এখন সে আশার গুড়ে বালি। সংগীত বিভাগে বর্তমানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে হয় তাকে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পেশা বেছে নিতে হবে অথবা আবারও সাধারণ পড়াশোনা করে অন্যান্য চাকরির প্রস্তুতি নিতে হবে নতুবা বেকার থাকতে হবে।
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাফফাত হোসেন শিহাব ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে বলেন, ‘বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকলেও সেই বিষয়ের ওপর কর্মক্ষেত্র নেই। তাহলে দরকার কি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু রেখে, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হোক।
তিনি আরও বলেন, দেশের সংস্কৃতি এবং শেকড়কে ধরে রাখতে শিল্পী এবং শিল্পকে মূল্য দিতে হবে। না হলে একদিন দেশের এই সংস্কৃতির শেকড় উচ্ছেদ হয়ে যাবে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী ঐন্দ্রিলা ব্রহ্মচারী বলেন, ‘আমরা সংগীত বিভাগে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছি গানকে ভালোবেসে। আমরা সংস্কৃতিমনা মানুষ। এ জন্য এ বিষয়ে পড়ি। কিন্তু শুধু ভালোবাসা দিয়ে তো পেট চলে না। পেট চালাতে কাজ করতে হয়। কিন্তু সংগীত বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করার পর আমরা কী করব, যদি আমাদের কর্মক্ষেত্রই না থাকে? আমরা কি বেকার হয়ে বাবা-মায়ের ঘাড়ের বোঝা হয়ে থাকব? সরকার যদি কর্মক্ষেত্রই সৃষ্টি করতে না পারে, তাহলে এই বিভাগ কেন রেখেছে! বন্ধ করে দিক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হৃদয় খন্দকার বলেন, ‘এতই যখন আপত্তি, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের সংগীত বিভাগগুলোও বন্ধ করে দেন। কারণ একজন শিক্ষার্থী যখন একটা বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পড়াশোনা করার পর যদি তাকে বিষয়ভিত্তিক কর্মক্ষেত্রের সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে আমি মনে করি এমন সাবজেক্ট অফিশিয়ালি রাখার কোনো মানেই হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের আপত্তির ওপর ভিত্তি না করে সরকারের উচিত দেশের সামগ্রিক মানুষের কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।’
তবে যাদের এ বিষয়ে আপত্তি রয়েছে, তাদের প্রচণ্ড রকমের আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন! যে দেশের নিজস্ব কোনো সংস্কৃতি নেই, সেই দেশের কোনো নিজস্ব পরিচয় নেই।
এ বিষয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. সুশান্ত কুমার সরকারের সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের। তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয় হতে সংগীত শিক্ষা বিষয় বাদ দেওয়াটা খুবই দুঃখজনক। এই সরকার যখন সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু যতটা আশান্বিত হয়েছিলাম এখন ততটাই আশাহত হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংগীত বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আছে, সেখানে বিপুল পরিমাণ ছাত্রছাত্রী আছে। অনেকে পড়াশোনা করছে, অনেকের পড়াশোনা শেষ। সামনে আরও অনেকে ভর্তি হবে। কিন্তু যারা পড়াশোনা করছে, তাদের পড়াশোনা শেষের আগেই যদি স্বপ্নটা ভঙ্গ করে হয় যায়, তাহলে কীভাবে হবে? সামনে যারা ভর্তি হবে, তাদেরই বা কী বলব? যে, এই সাবজেক্টে পড়ে তারা কোথায় চাকরি করবে? তাদের আমরা কী স্বপ্ন দেখাব। তাহলে এই সংগীত বিষয়ে ভর্তি হতে তো মানুষ নিরুৎসাহিত হবে। ফলে একসময় আমাদের তো এই ডিপার্টমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। সরকার যদি কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করতে না পারে বা সাংস্কৃতিক শিক্ষা বা সংগীত বিষয়ে শিক্ষা যদি স্কুল লেভেলে বন্ধ করে, তাহলে সরকারের পদক্ষেপ এটাও হওয়া উচিত যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংগীত বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া। এই বিভাগ থেকে পাস করা ছেলেমেয়েগুলো কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে যদি কর্মক্ষেত্রই না থাকে।’
তিনি আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই সংগীতের গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। সংগীত দ্বারা মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। অনেক শিল্পী শহিদও হয়েছেন। আর সেই সংগীত শিক্ষাকে বাদ দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, জানি না। এ ছাড়া বর্তমানে গবেষণায় প্রমাণিত, ক্যানসারের মতো মহামারির চিকিৎসায় মিউজিক থেরাপি ব্যবহৃত হচ্ছে; যার কাছে সংগীত আছে, যে সংগীত সাধনা করে তার হাতে কখনো অস্ত্র উঠবে না। যার অন্তরে সংগীত আছে, তার দ্বারা অনৈতিক কাজ সম্ভব নয়। তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিষয়টি পুনরায় ভেবে দেখার অনুরোধ করেন।